আরামবাগ জুড়ে একের পর এক মৃত্যু সাপের দংশনে, ফণাহীন কালাচই এখন ত্রাস : মোহন গঙ্গোপাধ্যায়
গোঘাট ও খানাকুল জুড়ে এখন সাপের দংশনে একের পর এক মৃত্যু। আতঙ্ক আরামবাগের ছ’টি ব্লকের বাসিন্দাদের। বর্ষার শুরু থেকেই ভয়ানক বিষধর সাপের উপদ্রব ভাবিয়ে তুলেছে এখানকার মানুষকে। মাটির বাড়ি, তিল, বাদাম ও খড়ের গাদায় এদের এখন আস্তানা। মাঠঘাট ও উঁচু আলের গর্তেও এদের দেখা মিলছে। চাষি থেকে শুরু করে গৃহস্থ মানুষ কেউ এদের দংশন থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহেই ৩৭টি বিষধর সাপ ধরা পড়েছে। তাছাড়া গত একমাসে ছ’টি ব্লকে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, ফণাহীন কালাচই এখন ত্রাস আরামবাগ ও খানাকুলের মানুষের কাছে। বিষধর কালাচ সাপের আতঙ্ক এখন আরামবাগ ও খানাকুল জুড়ে। সূত্রের খবর, এখানে গত ছ-মাসে কয়েক জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দু-টি ব্লকের বিভিন্ন জায়গায় এই প্রজাতির সাপের দেখা মেলায় সন্ত্রস্ত মানুষ। খানাকুলের নন্দনপুর, বন্দীপুর, রামচন্দ্রপুর এবং আরামবাগের পীরিজপুর, হরিণখোলা ইত্যাদি এলাকায় এই সাপের কামড়ে কয়েকজন মারা গেছেন। এছাড়া হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন অনেকে। এখন রাত হলে একটাই আতঙ্ক কালাচ সাপকে নিয়ে। আরামবাগ স্নেক অ্যান্ড অ্যানিমাল রিলিফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন থেকে জানানো হয় গত পাঁচ বছর আগেও খানাকুল ও আরামবাগে কালাচ প্রজাতি সাপের উপদ্রব ছিল না। নদীবাহিত এলাকার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুন্দরবন এলাকা থেকে এখানেও চলে আসছে। সাধারণত এই দুটি ব্লকে বিষধর সাপ বলতে চন্দ্রবোড়া ও গোখরো সাপের দেখা মিলত। কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে এতদ অঞ্চলে কালাচ সাপের উপদ্রব বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কালাচ রহস্যময় সাপ। পিঁপড়ার মতো কামড়ায়। জায়গা অসাড় হয়ে যায়। কামড়ানোর দাগ থাকে না। ফুলেও যায় না। জ্বালা-যন্ত্রণা হয় না। পেট ও গলায় ব্যথা করে। সময়ে চিকিৎসা না হলে রোগি মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। সর্প বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই প্রজাতি সাপের বিচরণক্ষেত্র হল শ্রীলঙ্কা, ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, চিন, নেপাল ইত্যাদি জায়গা। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণাতেই বেশি দেখা মেলে এই সাপের। বিশেষ করে সুন্দরবন এলাকায়। এরা নদীবাহিত স্যাঁতস্যাঁতে এলাকায় থাকতে ভালোবাসে। সাধারণত খাবারের সন্ধানে রাতে বের হয়। সুন্দরবন এলাকা থেকে নদীবেয়ে হুগলির আরামবাগ ও খানাকুলেও হানা দিয়েছে। ছিপছিপে কালো রঙের উপর সাদা সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে। ফণাহীন এই সাপের বিষ অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, অনেক জায়গায় এই কালাচ সাপের আলাদা আলাদা নাম। যেমন ডোমনাচিতি, শাঁখাচিতি, শিরচাঁদা ও নিয়রচাঁদা বলেও উল্লেখ করা হয়। কেউ কেউ আবার ঘামচাটা সাপও বলে থাকেন। বাড়ির আনাচকানাচে, ঝোপঝাড়ে এদের দেখা মেলে। এমনকী এই প্রজাতির সাপ বিছানা ও বালিশের নিচে থাকতে ভালোবাসে। মানুষের ঘামের গন্ধে এরা বিছানায় উঠে আসে। মানুষের সাহচর্য এদের পছন্দ। তবে এরা নিশাচর।
এবার এই রহস্যময় সাপের বিষের সমস্যার সমাধান দিলেন একদল ভারতীয় বিজ্ঞানী। সাপে কাটা ব্যক্তির সামান্য রক্তের নমুনা থেকেই এবার চিহ্নিত করা যাবে কালাচের বিষ। বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এই গবেষণা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল কালাচের বিষ বলছিলেন গবেষক বিশাল সাঁতরা। তাঁর মতে — “মূলত সেলেক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম সিঙ্গেলস্ট্রেন ডিএনএ-র সাহায্যে এই চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়াটি করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া এমন একটা টক্সিনকে সনাক্ত করা হয়, যেটা কালাচ ছাড়া অন্যান্য বিষধর সাপের বিষে নেই। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের সিরামের এক ফোঁটা নমুনা সংগ্রহ করে বিশেষ ডিভাইসের মাধ্যমে খুব দ্রুত এই টক্সিনটিকে চিহ্নিত করতে পেরেছি আমরা।” কোনো দামি সরঞ্জাম নয়, বরং স্বল্প মূল্যের নাইট্রোসেলুলোজ পেপার স্ট্রিপের মাধ্যমেই সনাক্ত করা সম্ভব কালাচের বিষ। পদ্ধতিটি সাশ্রয়ী হওয়ায়, তা বিশেষভাবে উপযোগী ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে। সম্প্রতি গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের প্রথম সারির বিজ্ঞানপত্রিকা ‘বায়োসেনসরস অ্যান্ড বায়ো ইলেকট্রনিক্স’ জার্নালে।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে এই কালাচ সাপের কামড়ে গড়ে প্রায় এক হাজার মানুষ মারা যান। যার প্রায় অর্ধেক স্বল্প বয়সী। বিশেষজ্ঞদের মতে সাপে কামড়ালে গ্রামের মানুষ এখনো প্রথমেই ওঝা ও গুনিনের কাছে ছুটে যান। বিপদটা এখানেই। চিকিৎসা শুরু করতে অনেক সময়ে দেরি হয়ে যায়। ফলে মৃতু হয় অনেকের। কালাচ সাপ যেহেতু বিছানা ভালোবাসে, তাই শুতে যাবার আগে ভালো করে বিছানা ঝেড়ে নিন। সেইসঙ্গে অবশ্যই মশারি খাটিয়ে চারপাশ ভালো করে গুঁজে নেবেন। মনে রাখতে হবে সাপ নিরীহ ও শান্ত প্রাণী। ওকে আঘাত করলে কিংবা বিরক্ত করলে বাঁচার জন্য ছোবল মারে। এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে সপ বিশেষজ্ঞ বিপ্লব মৈত্র তাঁর নিজের গ্রাম পূর্ব রাধানগর, অরুণ্ডা, চব্বিশপুর, বালিপুর, নাঙ্গুল পাড়া, চিলাডিঙ্গি, সোদপুর, রাজা রামমোহন রায়ের জন্মস্থান রাধানগর-সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে সাপ ধরে বন দপ্তরের হাতে তুলে দেন। তাঁর কথায়, ‘আমি সাপ ধরার জন্য কোনও ট্রেনিং নিইনি। ২০১৬ সাল থেকে এই কাজ করছি। কাজটা করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। বাড়িতে সাপ ঢুকলেই অনেকেই আমাকে ফোন করেন। আমি সাপ ধরে জ্যান্ত অবস্থায় বন দপ্তরের হাতে তুলে দিই।’ হুগলি জেলা বিজ্ঞান কেন্দ্রের সহ-সম্পাদক নবকুমার মণ্ডল বলেন, উনি শিক্ষকতা করেন শুনেছিলাম। পাশাপাশি রাজনীতিও করেন। কিন্তু উনি যে সাপ ধরেন, সেটা জানতাম না।