| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

দেবব্রত বিশ্বাস : শ্রদ্ধাঞ্জলী

Reporter
ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায় / ৭৭৯ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২০

দেবব্রত বিশ্বাস কি শুধুমাত্র একজন প্রথিতযশা রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ছিলেন? আমার কাছে এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত ভাবেই ‘না’। তিনি ছিলেন আরো কিছু ।

দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনটাই সংগ্রাম। তাঁর দূরারোগ্য ব্যাধি হাপানির বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা তিনি নিজেই বলে গেছেন, কিন্তু সেটা গৌণ। মুখ্য হল প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে তাঁর জীবনভর সংগ্রাম । শৈশবে ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণের কারণে গোঁড়া হিন্দুদের কাছ থেকে পাওয়া যন্ত্রণার বিরুদ্ধে নীরব সংগ্রাম, যৌবনে গণচেতনা জাগ্রত করার আহ্বানে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম, আর জীবনের উপান্তে পৌছে তার গাঙ গাওয়া বন্ধ করে দেবার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। হয়তো থেমে গেছে। কিন্তু আপোষ করেননি। সেই আপোষহীন মানুষটিকে নিয়েই এই লেখা।

দেবব্রত বিশ্বাস প্রথাগত ভাবে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেননি বা শান্তিনিকেতন থেকেও রবীন্দ্রগানের পাঠ গ্রহণ করেননি। অথচ রবীন্দ্রগানে ছিল তার অনায়াস অধিকার। তিনি যত রবীন্দ্রগান গেয়েছেন প্রায় সমপরিমান অন্যগানও গেয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্রগানে তাঁর গায়কীর গুনে আমাদের অন্তরে এক নবতর উপলব্ধির সন্ধান দিয়েছিলেন। কবে থেকে তিনি গান গাওয়া শুরু করেছিলেন তা তিনি নিজেও মনে করতে পারেননি। তাঁর নিজের কথায় “গান গাইছি তো গাইছি। ছোটবেলার দিনগুলি থেকে শুরু করে শুধু গান শুনেছি আর গেয়েছি”।

পূর্ব্বঙ্গের এক গোঁড়া ব্রাহ্ম পরিবারে দেবব্রত’র জন্ম। তিনি বলতেন “রবীন্দ্রগানের জন্ম ব্রাহ্মসমাজে, আমার জন্মও ব্রাহ্ম পরিবারে, সুতরাং রবীন্দ্রগান আমার ভাই”। ব্রাহ্ম পরিবারে উপাসনার জন্য গান গাওয়া ছিল আবশ্যিক, তাই মায়ের কোলে চড়েই তাঁর গান গাওয়ার প্রথম পাঠ। এই ব্রাহ্ম সমাজের এক প্রার্থনা সভায় রবীন্দ্রনাথকে গান শোনানোর দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। এবং কি আশ্চর্য! রবীন্দ্রগানের জগতে তিনি যখন অগণন মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় লোকপ্রিয়তার তুঙ্গে তখনই রবীন্দ্রগানের জগতে তিনি ব্রাত্য হয়ে গেলেন। তাঁর নিজের কথায় “আমি জন্মেছিলাম ম্লেচ্ছ হয়ে — শেষ জীবনে রবীন্দ্র সঙ্গীত জগতে হয়ে গেলাম হরিজন”।

দেবব্রতর পিতামহ কালীকিশোর বিশ্বাস ময়মন সিন্ধ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার ইটনা গ্রামে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। গোঁড়া হিন্দুরা তাঁকে একঘরে করে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেছিল। বিরিশালে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। শইশবে বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর হিন্দু সহপাঠিরা তাঁকে ম্লেচ্ছ বলতো। ১৯২৭ এ কিশোরগঞ্জে মেত্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশকরে কলকাতায় সিটি কলেজে ভর্তি হলেন এবং সেখান থেকে ইন্টার মিডিয়েট পাশ করে ভর্তি হলেন বিদ্যাসাগর কলেজে। এই সময় সেকালের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ—সুরকার হিমাংশু দত্ত, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ সেনগুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে পরিচয় হয়। কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজের প্রার্থনা সভা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত গান করতেন। ১৯৩৪এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম এ পাশ করে হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানীতে চাকুরী জীবন শুরু করলেন। প্রথম একবছ বিনা বেতনে চাকরী, পরের বছর থেকে পঞ্চাশ টাকা মাসিক বেতনের স্থায়ী চাকুরী। হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স পরে ‘ভারতীয় জীবিন বীমা নিগম’ এ রূপান্তরিত হয়, সেখান থেকেই ১৯৭১ সালে ষাট বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন ।

দেবব্রত তাঁর আত্মকথন ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত’ গ্রন্থে জানিয়েছেন “আমার সারা জীবন কেটে গিয়েছে কেরাণীগিতি করে, এরই মধ্যে কয়েকটি বৎসর গণচেতনা উদবুদ্ধ করার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নানা ধরনের দেশাত্মবোধক গা্ন করে আর বাকি সময় আমার ব্যাধির সঙ্গে সংগ্রাম করে”। আজীবন অকৃতদার দেবব্রত ১৯৩৯ সালে ভারতের কম্যুনিষ্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। পার্টি তখ বে-আইনী। শুধু যুক্ত হওয়া নয়, সক্রীয় সদস্য। সেকালের প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্বিক ফ্যাসিবিরোধী লেখক সঙ্ঘ ও ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা চিন্মোহন স্নেহানবিশ ছিলেন তাঁর সহকর্মী, সেই সূত্রেই তারকম্যুনিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠা । গণনাট্য সঙ্ঘে তখন উদয় শঙ্কর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, শম্ভূ মিত্র, তৃপ্তী ভাদুড়ী(মিত্র), বিজন ভট্টাচার্য, সুচিত্রা মিত্র প্রমুখ – বাংলা সংস্কৃতির সে এক জোয়ারের কাল। মাঠে ময়দানে, সভা সমিতিতে দেবব্রত সুকান্ত, সলিল চৌধুরীর গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানও গাইছেন। ১৯৪৯এ পার্টি যখন বে-আইনী, নেতৃত্ব আত্মগোপনে—দেবব্রতর ওপর দায়িত্ব বর্তালো সঙ্গীতানুষ্ঠান করে অর্থ সংগ্রহের। হেমন্ত ও সুচিত্রার শযোগিতায় ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য প্রদঈশনীর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। ১৯৫৩ তে ভারতের সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি চিনে গেলেন গা্ন গাইতে, চিন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন ‘অন্তরঙ্গ চিন’ গ্রন্থে ।

আবার সেই দেবব্রতই ১৯৬২-র পর নিজেকে বাঁয়ের রাস্তা থেকে গুটিয়ে নিলেন। তার মানে তিনি ‘দক্ষিণ পন্থী’ হয়ে গেলেন তা কিন্তু নয়, বলা ভালো নিজেকে গুটিয়ে নিলেন – তাঁর নিজের কথায় “থেমে যেতে হ’লো”। কেন তিনি সরে গেলেন সে অন্য প্রসংগ । ষাটের দশক থেকেই কম্যিনিষ্ট পার্টির মধ্যে মতাদর্শের দ্বন্ড্ব প্রবল হয়ে ওঠে এবং অবশেষে কম্যুনিষ্ট পার্টি দু টুকরো হয়ে যায়, যার অনিবার্য প্রভাব পড়ে সামাজিক সংগঠনগুলিতেও। কর্মক্ষেত্রে যে ইউনিয়নের সক্রীয় কর্মী ছিলেন সেটিও বিভেদের শিকার হ’ল, সেখান থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিলেন দেবব্রত। পার্টি ও ইউনিয়ন্রের বিভাজনে এতোটাই আহত হয়েছিলেন যে অবসরের পর ইউনিয়নের সকর্মীরা তাঁকে বিদায় সম্বর্ধনা দেবার প্রস্তাব করলে তিনি তা গ্রহণ করতে অসম্মত হন। তাঁর আত্মকথন ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন …… প্রায় উনিশ- কুড়ি বৎসর বেশ বাঁদিকে হেলে কেটে যাচ্ছিল। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই আমার মনে রাজনীতির ব্যাপারে  কি রকম জানি একটু সংশয়ের উদয় হয়েছিল। হঠাৎ ১৯৬২তে দেখলাম বাঁদিকে নিদারুণ অগ্নিকান্ড— পরস্পর বিরোধ ও বিদ্বেষের আগুন। ভীষণ দমে গেলাম। …… বহু বৎসর অভ্যাসের ফলে আমার মনতাও বাঁয়ে হেলে চলতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই মনটাকে অন্য কোন ধরণের নতুন পথে চলতে বা নতুন পথ ধরতে রাজী করাতে পারলামনা”। দেবব্রত থেমে গেলেন। এ একরকম থাম, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। কিন্তু অন্য দিকে তাঁকে থামানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছিল।

রবীন্দ্রগানের ভুবনে তাঁর অনায়াস গতিকে থামিয়ে দেবার প্রক্রিয়া সুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। মায়ের কোলে চড়ে তাঁর গান গাওয়ার সুরু। বাবা, মা দুজনেই ব্রহ্ম সংগীত গাইতেন। রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্ম সঙ্গীত ছাড়াও ছাত্র জীবনে হিমাংশু দত্ত, শচীন দেব বর্মণ, সায়গল প্রমুখের অনেক গানও ছাত্রজীবনে গাইতেন। রবীন্দ্রনাথের গা্ন রেকর্ডে গাওয়ার আগে নজরুল ইসলামের কথায় ও সুরে দুটি গান তিনি  রেকর্ডে গেয়েছিলেন। সেই সময় (১৯৩৫-৩৬) কয়েকটি ছায়াছবিতেও গান গেয়েছিলেন। গ্রামোফোন রেকর্ডে তিনি প্রথম রবীন্দ্রগান গাইলেন ১৯৩৯ এ কনক দাশের সঙ্গে দ্বৈত কন্ঠে ‘হিংশায় উন্মত্ত পৃথ্বি’ ও সঙ্কোচের বিহবলতা’। বলা যেতে পারে শুরু থেকেই তাঁর গানকে থামিয়ে দেবার অবাক করা প্রয়াস শুরু হয়েছিল। সেই সময়ে বিদেশী গ্রামোফোন কোম্পানীই ছিল রেকর্ড প্রকাশের বনেদি প্রতিষ্ঠান ও একচেটিয়া অধিকারী, তারা ‘হিজ মাশটার্স ভয়েস’ এবং ‘কলম্বিয়া’ এই দুটি লেবেলে গান রেকর্ড ও প্রচার করতো। পরে ‘হিন্দুস্থা্ন, ‘সেনোলা’ এই রকম দু একটি দেশীয় রেকর্ড কোম্পানী হয়। ১৯৩৯ এ প্রথম রেকর্ড বেরোবার পর   হিস মাস্টার্স ভয়েস থেকে তাঁর আরর১০/১২টি গাঙ প্রকাশিত হয়। এর পর ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ কোম্পানী তাঁকে আধুনিক গান গাইবার আবদার করে, কারণ রবীন্দ্রনাথের গান নাকি তেমন চলছেনা বাজারে। প্রখর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন দেবব্রত বিশ্বাস। হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ থেকে গান করাই বন্ধ করে দিলেন। অর্থের জন্য তিনি গান গাইতেন না, গান গাইতেন প্রাণের আনন্দে। রেকর্ড করা বন্ধ হলেও গান গাওয়াকেতো থামানো যায়না! গনাট্য সঙ্ঘের হয়ে রবীন্দ্রগান, সলিল চৌধুরী, সুকান্ত, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান নিয়ে দাপিয়ে বেড়ালেন গ্রামে গঞ্জে, মাঠে ময়দানে। ইতিমধ্যে দেশীয় দু একটি রেকর্ড কোম্পানীর পত্তন হয়েছে। ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ থেকে গান রেকর্ড করা বন্ধ হবার দশ বছর পর হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানীর মালিক চন্ডীচরণ সাহা তাঁকে রবীন্দ্র সঙ্গীত রেকর্ড করার অনুরোধ করেন ১৯৬০এ। পরের বিছর রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষ। দশ বছর রেকর্ড করা বন্ধ থাকার পর ১৯৬১তে হিন্দুস্থান রেকর্ডস থেকে তাঁর প্রথম গাঙ ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ এবং যেতে যেতে একলা পথে’ প্রকাশিত হল — প্রবল জনপ্রিয় হয়ে উঠলো গান দুটি। বাঙালি যেন রবীন্দ্রগানকে নতুন করে আবিস্কার করলো। ১৯৬১তে রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষে রবীন্দ্রগানের মহাপ্লাবনে দেবব্রত বিশ্বাস উঠে গেলেন জনপ্রিয়তার উত্তুঙ্গ শিখরে। এবং কি আশ্চর্য ঠিক তখনই হয়তো তাঁর জনপ্রিয়তার কারণেই দেবব্রতকে থামিয়ে দেবার প্রয়াস আবারও গতি পেয়ে গেলো।

মার্চ ১৯৬৪তে বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি তাঁর চারটি গান রেকর্ড করার অনুমতি দিলনা, অভিযোগ, তাঁর গানে যিন্ত্রসঙ্গীত ব্যবহারের আধিক্য। এরপর মাঝেমধ্যে দুএকটি গান অনুমোদন পেয়েছিল, কিন্তু আবার ১৯৬৯এ দুটি গানের অনুমোদন দিলনা। বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পত্র বিনিময় হয়েছিল এই বিষয়ে। তিতি বিরক্ত দেবব্রত রবীন্দ্রগান রেকর্ড করাই বন্ধ করে দিলেন। দুই বাংলার আগণিত সঙ্গীতপ্রেমী তীব্র প্রতিবাদ করলেন, তাঁকে রবীন্দ্রগান থেকে সরে না আসার জন্য কাতর প্রার্থনা জানালেন, কিন্তু রবীন্দ্রগানের প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের সঙ্গে কোন আপোষ করতে সম্মত হলেন না দেবব্রত। তাঁর আত্মকথন ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’ গ্রন্থে লিখে গেছেন “আমি আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিতে পারিনি”।

মায়ের কোলে চড়ে যার রবীন্দ্রগান গাওয়া শুরু তিনি জীবনের শেষ দশটা বছর রবীন্দ্রনাথের গান — গাইলেন না — গাইতে দেওয়া হ’লনা। এই যন্ত্রণা তো আমাদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, কিন্তু আমরা এই উপলব্ধিতে পৌছে যাই যে দেবব্রত বিশ্বাস শুধুমাত্র রবীন্দ্রগানের অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেননা, ছিলেন এক ঋজু মেরুদন্ডের প্রখর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ঋষিতুল্য মানুষ।

বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি নামক প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের কাছে তিনি যতই ‘হরিজন’ হয়ে থাকুন না কেন, সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালির হৃদয়ে, মননে দেবব্রত বিশ্বাস রবীন্দ্রগানের ‘মহাজন’ হয়েই থাকবেন চিরকাল — যতদিন বাঙালি তার সখে-দুঃখে রবীন্দ্রনাথের গান শুনবে গাইবে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev