রাজনীতি করা লোকেরা আসলে দুই প্রকার। সরব ও নীরব। কেউ দলটা করেন বিশাল হাঁকডাক করে, সশব্দে। আরেক দল কাজ করে যান নীরবে, নিঃশব্দে। প্রথমোক্তদের দলে উন্নতি অবধারিত দ্বিতীয়োক্তরা স্রেফ সংখ্যা হয়েই জেগে থাকেন। তাদের চলে যাওয়াটা বোঝা যায়না। অনেকদিন ঘরের মেঝেতে একটা আসবাব থাকলে কঠিন মেঝেতে যেমন দাগ থেকে যায়, ঠিক তেমনি তারা থেকে যান মানুষের মনে। মানুষের মনে মানে কিন্তু অসংখ্য মানুষ নয়, কিছু কিছু মানুষ যারা তাকে চেনেন তাদের মনে। প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা দেবব্রত বসুর মৃত্যুর খবর জেনে এ কথাগুলো মনে এল।
চিৎকার করা মানুষের সংখ্যা এখন সমাজই বলুন বা দল, সর্বত্র বেশি। জোরে ‘ভুল কথা’ বলে মিথ্যাকে সত্যি করে তোলা যখন বেশ চালু কায়দা, সেই সময়ে বেনুদা থুড়ি দেবব্রত বসুর চলে যাওয়া নিয়ে খুব বেশি হৈচৈ হবেনা এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা রাজনীতি ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নেন, আদর্শ যাই হোক না কেন পাড়ার মোড়ে ভাঙা শহীদবেদিতে কোনক্রমে জেগে থাকা নামগুলিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে এদিকওদিক তাকিয়ে মুছে নেন চোখের জল, তারা দেবব্রত বসুর মত রাজনীতিবিদদের জন্য কষ্ট পাবেন। তা তিনি ডান-বাম যে দলই করুন না কেন। এরা প্রকৃত অর্থেই ‘হোলটাইমার’। রাজনীতি ব্যবসায়ী বাড়লেও যাদের সংখ্যা সত্যিই কমে গেছে।
যেকোন প্রতিকূল অবস্থায় যারা নীরবে অথচ শক্ত করে দলের ঝাণ্ডা ধরে থাকেন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং দ্রুত ক্ষমতা পেয়ে যাওয়া নেতারা যাদের মোটেই পাত্তা দেননা রাজনীতিতে তেমন মানুষের জায়গা সত্যিই কমছে। সব দল আলো করে থাকা পার্টি ব্যুরোক্র্যাটদের এসব নিঃশব্দ প্রস্থানে মোটেই কিছু যায় আসে না। কিন্তু রাজনীতির যায় আসে। কারণ অনেক নাম না জানা মানুষ এদেরকে দেখেই দলটাকে দেখেন। কংগ্রেসের সুদিনেও তার তেমন কোন হাঁকডাক ছিল না। আবার মৌলালির কাছে ফাঁকা বিধান ভবনে দলে থেকে যাওয়া সাধারণ কর্মীদের ট্রেনের টিকিট কনফার্ম করা থেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি সাধারণ অনুরোধ তিনি সমান মনোযোগে সামলেছেন।
আসলে দেবব্রত বাবুরা এমনই হন। বুকে আদর্শ আর মুখে হাসি নিয়ে মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে এরা বিস্মৃতিতে মিলিয়ে যান। এরা বড় নেতা নন, মুখে মুখে প্রচারের আলোয় ভেসে ওঠা ‘বোমা বিশু’ বা ‘পেটো পাঁচু’র মত স্থানীয় তারকাও নন। এরা সভাপতি নন, চেয়ারম্যান নন, প্রায় সব সময় এরা থেকে যান সহ সভাপতি বা ভাইস চেয়ারম্যান। এরা প্রার্থী হন না, শুধুই হয়ে থাকেন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন প্রার্থীর বিশ্বস্ত সঙ্গী। তবুও এদের দেখে মানুষ রাজনীতি করতে আসেন, রাজনীতির প্রতি বিশ্বাস বাড়ে মানুষের। এরা অনেকটা লীলা মজুমদারের সমাদ্দার ডিটেকটিভ এজেন্সি গল্পের সেই ‘নেই হয়ে থাকা’ গোয়েন্দা। যাদের উপস্থিতি বোঝা যায়না। শুধু চলে যাওয়ার পর বোঝা যায় শূন্যতা। শূন্য হয় রাজনীতি।
বেণুদা ছিলেন একজন আদর্শবান রাজনীতিক। তাঁর চাওয়া-পাওয়া বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। দলীয় দপ্তরই ছিল তাঁর ঘরবাড়ি। সকাল-সন্ধ্যে, গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত, তিনি নিয়মিত আসতেন, সাধ্যমত সাহায্যপ্রার্থীদের পাশে দাঁড়াতেন। দলীয় সমস্ত অনুষ্ঠানে হাজির থাকতেন, যে কোনও দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। ভোটে দাঁড়াবার কোনও আগ্রহ কখনও দেখান নি। দলের অভ্যন্তরে ঘন ঘন পট পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে তাঁর কখনও কোনও অসুবিধে হয়নি। তার মূল কারণ, তিনি ছিলেন দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি তাঁর যেমন বিশেষ আনুগত্য ছিল না, তেমন বিদ্বেষও ছিল না। এমন নির্বিরোধী মানুষ আজকের দিনে মেলা ভার। দল তাঁকে যেটুকু সম্মান দিয়েছে তাতেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। আজ বেণুদা নেই। ভাবতে গেলেই মনে হচ্ছে, আমার বিগত ৪৫ বছরের আকাশ থেকে একটা তারা খসে গেল। ওঁ শান্তি।
বেণুদা ছিলেন একজন আদর্শবান রাজনীতিক। তাঁর চাওয়া-পাওয়া বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। দলীয় দপ্তরই ছিল তাঁর ঘরবাড়ি। সকাল-সন্ধ্যে, গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত, তিনি নিয়মিত আসতেন, সাধ্যমত সাহায্যপ্রার্থীদের পাশে দাঁড়াতেন। দলীয় সমস্ত অনুষ্ঠানে হাজির থাকতেন, যে কোনও দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। ভোটে দাঁড়াবার কোনও আগ্রহ কখনও দেখান নি। দলের অভ্যন্তরে ঘন ঘন পট পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে তাঁর কখনও কোনও অসুবিধে হয়নি। তার মূল কারণ, তিনি ছিলেন দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি তাঁর যেমন বিশেষ আনুগত্য ছিল না, তেমন বিদ্বেষও ছিল না। এমন নির্বিরোধী মানুষ আজকের দিনে মেলা ভার। দল তাঁকে যেটুকু সম্মান দিয়েছে তাতেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। আজ বেণুদা নেই। ভাবতে গেলেই মনে হচ্ছে, আমার বিগত ৪৫ বছরের আকাশ থেকে একটা তারা খসে গেল। ওঁ শান্তি।