আরামবাগ মহকুমায় পঞ্চাশোর্ধ যে কোন মানুষকে কারকাণ্ডার কথা বললেই তাঁদের জিভে জল চলে আসতে বাধ্য। রাজা রামমোহন রায়ের জন্মস্থান রাধানগরে একসময় এই কারকান্ডার রমরমা বাজার ছিল। কোনো বনেদি পরিবারের অতিথি আপ্যায়নের সময় পাতে এই মিষ্টি না থাকলে যেন মান রক্ষাই হতো না। আর এমন বেয়ারা কান্ড তখনকার দিনে কেউ করতও না। এখন আর সেই দিন নাই। রকমারি নামের মিষ্টিতে পাত ভরে উঠলেও এখন আর দেখা পাওয়া যায় না কারকাণ্ডা নামের সেই জিভে জল আনা মিষ্টান্ন।
সে অনেক কাল আগের কথা, রামমোহনের পরবর্তী সময়ে তখন তার নাতি হরিমোহন রায়ের জমিদারি। সেই সময় একটা রীতি ছিল, বছরের একটি বিশেষ দিনে প্রজারা জমিদারের কাছারিতে তাদের খাজনা দিতে আসতো, সঙ্গে জমিতে উৎপাদিত কিছু ফসল, বাড়িতে তৈরি মিষ্টান্ন ইত্যাদি প্রজারা নিয়ে আসতো জমিদারের মনোরঞ্জনের জন্য। সে এক উৎসবের মতো। একে বলা হতো “পুণ্যাহ”।

পুণ্যাহের দিন সাজো সাজো রব পড়ে যেত জমিদার বাড়িতে। সেই বছর স্থানীয় কৃষ্ণনগরের কুঞ্জ বিহারী মোদক অদ্ভুত এক মিষ্টির হাঁড়ি এনে জমিদারের পায়ের কাছে রাখলেন। সেগুলি দেখতে অনেকটা মোয়ার মত হলেও আসলে কিন্তু তা নয়। হাঁড়ির ঢাকা খুলতেই গাওয়া ঘি আর বিভিন্ন মসলার গন্ধে ম ম করে উঠলো চতুর্দিক। মুখে দিয়েই জমিদার একেবারে মুগ্ধ। “এ কার কান্ড?” কুঞ্জ বিহারী মোদক জোড়হাত করে উঠে দাঁড়ালেন। বহু প্রশংসা করে তাঁকে পুরস্কৃত করা হলো। জমিদারবাবু মিষ্টান্নের নাম দিলেন “কারকাণ্ডা”। এরপর থেকে দীর্ঘকাল কারকাণ্ডার স্বাদে মুগ্ধ ছিল এলাকার মানুষ। কিন্তু এখন আর তার তেমন কদর নাই। পাওয়াও যায় না সচরাচর। কুঞ্জ বিহারী মোদক এর বর্তমান বংশধর হারাধন মোদক এখন এই মিষ্টি তৈরি করতে পারেন। তবে অর্ডার ছাড়া তিনি করেন না। প্রাচীন মানুষজন অবশ্য বলছেন, এখন আর আগের মত সেই স্বাদ পাওয়া যায় না কারকান্ডায়।
কেন এমনটা হল?
কারিগর হারাধন বাবুর কথায়, ‘এলাচ, কাবাব চিনি, শা-জিরে, শা-মরিচ ইত্যাদি বহু রকম মসলা থাকলেও এর মূল উপাদান কনকচূড় ধানের খই এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এখানে যেমন পাওয়া যায় তাই দিয়েই আমরা এই মিষ্টান্ন করতে বাধ্য হই। কী করে আগের স্বাদ পাওয়া যাবে?’

তাও এখানে মেলা বা রামমোহন সংক্রান্ত কোন উৎসব অনুষ্ঠানে যখন দেশ-দেশান্তরের মানুষজন আসেন তখন তাঁরা এই ঐতিহ্যের মিষ্টান্নের খোঁজ করেন। বিক্রি বাটাও কম হয় না।
সম্প্রতি রাজা রামমোহন রায়ের জন্মস্থানে তাঁর স্মৃতিসৌধ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেরিটেজ কমিটি অধিগ্রহণ করেছেন। আশা করা যাচ্ছে, ঢেলে সাজানো হবে রামমোহনের স্মৃতিবিজড়িত রাধানগরকে। পর্যটকদের ভিড় বাড়বে ক্রমে ক্রমে।
এই পরিস্থিতিতে রাধানগরের ঐতিহ্য কারকান্ডা মিষ্টান্ন কেও নতুন আঙ্গিকে সুন্দর করে তুলে ধরার প্রয়োজন। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এই মিষ্টান্নের জিভে জল আনা আসল স্বাদই তো পেল না। এটা অত্যন্ত আফসোসের বিষয়।
একটু পরিচর্যা পেলে এবং গুরুত্ব পেলে এই মিষ্টান্ন আবার বাংলার গর্ব হয়ে উঠতে পারে, এই আশা অমূলক নয়।