বর্ষার মুখ ভার করা কালো ঢাকনাটা সরে যেতেই যেন খিলখিল করে হেসে উঠেছে সারা আকাশ। সাদা মেঘের পাল তোলা নৌকোগুলো মনের আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে ইচ্ছে মতো। কারা যেন মুঠো মুঠো সাদা আবির ছড়িয়ে দিয়েছে কাশ আর শিউলির বনে বনে। আর তার খুশিতেই নেচে উঠেছে মাঠ ঘাট। হবে না! শরৎ এসেছে যে। উৎসবের খবর নিয়ে এসেছে বাতাসের সুগন্ধ, খবর পৌঁছে দিচ্ছে রামধনু রং আকাশ।
খবর যে এসেছে তা শুধু জানতে পারছে বেনে-পুকুরের রংবাহারি শাপলা শালুক। আর জানতে পারছে টুম্পা নামের সেই মেয়েটি। সে এখন পুকুর ঘাটে। রাজ্যের কাজ ফেলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশ যে তার বন্ধু হয়, কত গল্প বলে। কখনো বাঘ সিংহের, কখনো বা শিংওয়ালা দৈত্যের রূপকথার। আকাশের গায়ে গায়ে আঁকা হয়ে যায় তাদের ছবি। বাপটু, বাবাই, মিষ্টু, মোম তারা অবশ্য এত শত খবর জানে না। কি করে জানবে? ওদের যে পরীক্ষা চলছে, বই থেকে মুখ তোলবার জো-টি নেই। সকালে টিউটোরিয়াল, দুপুরে ইস্কুল তারপর আবার প্রাইভেট। সময় কোথায় আকাশের দিকে তাকাবার, বাতাসের গন্ধ নেবার? টুম্পারও অবশ্য খুব সময় নেই। পড়াশোনা না থাকলে কি হবে, কর্তাদের বাড়িতে বাসন মাজা, ঘর মোছা আরো কত কি কাজ করতে হয় তাকে। ইচ্ছে থাকলেও ইস্কুল যাওয়া হয়ে ওঠেনি তার। আর সবার মত তার বাবা নেই কিনা! থাকলে হয়তো বই খাতা কিনে দিতেন, স্কুলে ভর্তি করে দিতেন।

দেখতে দেখতে পুজো এসে গেল। স্কুলের ছুটি পড়তেই বাট্টু, বাবাইরা মেতে উঠল পুজোর আনন্দে। মন্ডপে মন্ডপে ঝলমলে সব ঠাকুর এসে গেছে। বাড়িতে এসেছে কত নতুন নতুন জামা কাপড়। ওরা সব কর্তা-বাড়ির ছেলে যে। ওদের তো কোন কিছুরই অভাব নেই। পুজোর কদিন ওরা খুব হইচই করে কাটাবে। টুম্পাকেও অবশ্য ওবাড়ি থেকে একটা নতুন জামা দেবার কথা ছিল। সেটা তার পাওনা। কিন্তু টুম্পা নেয়নি। আসলে তার বদলে সে টাকা চেয়েছে। তাকে অনেক টাকা জমাতে হবে কিনা! সে সেই টাকা দিয়ে নিজেদের একটা ঘর বানাবে। মাটির দেয়াল, খড়ের চাল, ছোট্ট একটা উঠোন। তাদের নিজেদের ঘর।
তার বাবা নেই বলে মাকে সবাই খুব অপমান করে, কেউ বাড়ির আশেপাশেও থাকতে দেয় না তাদের। কখনো রাস্তায়, কখনো শিবতলার ছোট্ট চালাটায় রাত কাটাতে হয়। বর্ষায় বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দেয় সবকিছু। শীতে শুধুমাত্র একটা ছেঁড়া কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে থাকতে হয়। মায়ের যে আবার তাও নেই। নিজের কাঁথাটাই একটুখানি মায়ের গায়ে চাপিয়ে দিয়ে মাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে টুম্পা। কথায় কথায় লোকে তাদের ‘রাস্তার লোক’ বলে খোঁটা দেয়। মা দিনভর খেটেও টাকা জমাতে পারে না। তাই টুম্পা-ই জমাবে। তার পেট ভরে খাওয়ার দরকার নেই, নতুন জামা কাপড়েরও দরকার নেই। শুনে অবশ্য হোঃ হোঃ করে হেসে উঠেছিল কেষ্ট কাকা। ‘ঘর বানানো কি এত সহজ? সে অনেক টাকার ধাক্কা!’ সেই থেকে আর কারো কাছে সে বলে না কথাটা। কিন্তু সামান্য পয়সা পেলেও জমিয়ে রাখে।
কর্তাদের বাড়ি থেকে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে সবাই। গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকেও যাবে। টুকটাক ফাই-ফরমাস খাটার জন্য টুম্পাকেও সঙ্গে নিয়েছে ওরা। এমনিতে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না তার। সবার সঙ্গে সঙ্গে দুগ্গা মাকে হাত তুলে প্রণাম করলেও তাকে কখনো তার ‘মা’ বলে মনে হয় না। তার মায়ের সঙ্গে যে কোন মিলই নেই দুগ্গা মায়ের। তার মা তো ওরকম ঝলমলে শাড়ি পড়ে না। তার গরিব মায়ের গায়ে যে একটাও গয়না থাকে না কোনদিন। ওতো বাপটু, বাবাইদের মা, ও তো মিষ্টু-মোমদের মা। বড়লোক বাড়ির ওই মা কি করে তার মা হবে? তবে তার মায়ের মুখটা আরো মিষ্টি। তার আদর মাখানো হাসির কাছে হার মেনে যাবে আর সব্বাই। এসব কথা অবশ্য মনে মনেই ভাবে টুম্পা, বলে না কাউকে।

গ্রামের সীমা ছাড়িয়ে তাদের গাড়ি যেই শহরে ঢুকলো বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল টুম্পা। এত আলোর রোশনাই! এত বড়ো বড়ো রাজবাড়ীর মতো মণ্ডপ, এত ঝলমলে সাজ পোশাক! সে খানিকটা হাঁপিয়েও উঠেছিল মনে মনে। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটা মণ্ডপের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো সে। এটা যেন সবার থেকে অন্যরকম। একেবারে সাদামাটা একটা খড়ের চার চালার মধ্যে আটপৌরে পোশাক পরে দুগ্গা মা। মন ভরে গেল তার। পাশাপাশি কয়েকটা মাটির বাড়ি। ঠিক যেমনটি সে ভেবেছিল। মাটির দেয়াল, খড়ের চাল, ঝকঝকে তকতকে একটুখানি উঠোন। এসব দেখেই হাঁ হয়ে গেল সে। বলল, ‘এগুলো কাদের ঘর?’
ওরা বলল, ‘দূর বোকা, তাও জানিস না? এ তো মিছিমিছির ঘর। কেউ থাকে না এখানে। এ শুধু পুজোর কদিনের জন্য তৈরি করা।’
সে কি! তারপর কি হবে?
তারপর ভেঙে দেবে।
শুনেই মনটা ভারী হয়ে যায় টুম্পার। ভাবে, এমন একটা মিছিমিছির ঘর যদি কেউ দিয়ে দিত ওদের! আহারে! তাহলে বেশ হতো। কিন্তু কে বুঝবে ওদের কষ্ট? শুধু কর্তা বাবুরাই কেন, দুগ্গা মাও তো ‘মা’ নয় টুম্পাদের। তাদের কেউই না।
দারুন
মনে দাগ কাটলো
মনে দাগ কাটলো
অসাধারণ
সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ