প্রায় নিঃশব্দে চলে গেলেন বুদ্ধিচর্চা জগতে ছোট দেবীপ্রসাদ নামে খ্যাত অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। জ্ঞানচর্চা জগতে অতিপ্রখ্যাত, যার বইএর ভূমিকা লেখেন যোশেফ নিডহ্যাম, সেই বড় দেবীপ্রসাদের সঙ্গে যাতে তার নাম কেউ অন্তত লিখিতভাবে কেউ গুলিয়ে না ফেলে, সেই জন্যে তিনি নিজের প্রথম নাম দেবীর সঙ্গে মধ্য নাম প্রসাদের মাঝে একটি দীর্ঘ শূন্যস্থান বসাতেন। বাংলার জ্ঞানচর্চার অঞ্চল থেকে আরও দূরে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়া মানুষ হিসেবে তিনি অনন্য ছিলেন। একই সঙ্গে রাজনীতিতে প্রায় সফল দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত হলেন।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, যে মানুষটা অতি তীব্রতায় বহুকাল অধ্যাপনা এবং কিছুকাল রাজনীতি উভয়ই সফল উৎসাহে করেছেন, তিনি যখন প্রয়াত হলেন, তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠজন এবং আমাদের মত কিছু অখ্যাত মানুষ ছাড়া আজকের রাজনীতিতে বাস করা বহুবর্ণিল নেতারা প্রায় চুপ। আশা করি না, নরেন্দ্র মোদি বা অমিত শাহ বা রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ২০০৯তে পদ্মবিভূষণ সম্মান পাওয়া মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করবে; কিন্তু একজনের বিষয়ে আশাছিল বলতে পারি; সৌগত রায় তাঁর সম্বন্ধে নিশ্চই কিছু বলবেন। নিয়ম ভেঙে আমি আগামী কালের সংবাদপত্রটি দেখব। আশাকরি তিনি তার প্রাক্তন সাথী সম্বন্ধে আগামী দিনে কিছু না কিছু বাক্য এবং কালি উভই ব্যয় করবেন। দেবী প্রসাদ, সৌগতবাবু এবং কংগ্রেসি রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী হয়ে উঠে কিছু দিন সফলভাবে দক্ষিণীবার্তা পত্রিকা চালানো প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি একসঙ্গে বাংলা এবং দিল্লিতে সমান্তরালভাবে রাজনীতি করেছেন। বাংলায় সত্তরের দশকে তিনি যখন যাদবপুরে দর্শন পড়াচ্ছেন, সে সময় কতটা দাপটে রাজনীতি করতেন, সে তথ্য জানিয়েছেন প্রাক্তন সাংবাদিক অধ্যাপক ইমানুল হক, ‘১৯৭৭ এ একটা বিখ্যাত কার্টুন ছিল, কুট্টির -সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে উৎখাতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়’। সংবাদ মাধ্যম কী অবস্থান নেবে সেটা বলাই বাহুল্য। সে নিয়ে কলমপাত না করাই ভাল। বাংলা সংবাদমাধ্যমের বুদ্ধিচর্চা নিয়ে খুব কিছু বলার যে নেই, তাঁদের ভাঁড়ে মা ভবানী, সে বিষয়ে নিশ্চই অনেকে অবগত আছেন।

এ প্রসঙ্গে আমি কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথায় নিজের কিছু আশংকার কথা বলব। সিপিআই পরিবারের সন্তান হওয়ায় বাম নেতা, বেশি ওজনের বুদ্ধিজীবিদের বেঘতা থেকে দেখেছি। সিপিএমে সেই অর্থে প্রায় কোনও মান্য বুদ্ধিজীবি ছিল না, বুদ্ধিজীবিরা ছিলেন দুই এক্সট্রিমে অধিকাংশ সিপিআইতে আর কিছু ১০৮টা ভাগে বিভক্ত নকশাল দলগুলোয়। ১৯৮৪-র সিপিআই আবার ভাঙা এবং তার কয়েক বছর পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হওয়ার পর সিপিএম/বামফ্রন্ট কিছু বুদ্ধিজীবি পেল। অধিকাংশ কংগ্রেসি হাল আমলের মানুষ। তাদের না জানাই স্বাভাবিক কিন্তু সৌগত রায়ের, দেবী প্রসাদকে খুব ভাল চেনার কথা। কংগ্রেসি রাজনীতিতে মিঠুবাবু নামে খ্যাত দেবপ্রসাদ রায়ও ওনাকে খুব ভাল চিনতেন। অবশ্য মিঠূবাবু বুদ্ধিজীবি কাতারে পড়েন কী না জানি না। শোনাযায় দুজনেরই গান্ধী পরিবারের অন্দরমহলে বেশ ভাল যোগাযোগ ছিল। দেব প্রসাদ তো স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীর পিক এন্ড চুজ ছিলেন। সৌগতবাবু গত কয়েক দিন বঙ্গ রাজনীতিতে রাজনীতির ঘুটি চালাচালিতে ব্যর্থ ফলে মনমরা হয়ে সাইডলাইনের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু আশা করব দেবী প্রসাদের জন্যে তিনি নিশ্চই কিছু বলবেন, লিখবেন। আমি টিভি দেখি না, উনি টিভিতে যদিও কিছু বলে থাকেন, জানতেও পারব না। কিন্তু বাংলা টিভি সাংবাদিকতা নিয়ে খুব বেশি আশাপ্রদ হওয়ার কারন নেই।
সৌগত রায়ের তুলনায় কংগ্রেসি মহলে মিঠুবাবু আর দেবী প্রসাদ দুজনেই অনেক বেশি দিল্লির মানুষ হিসেবে পরিচিত। ফলে এখন পুরোনো চিন্তাভাবনা করা বাম মনস্ক কংগ্রেসিদের মধ্যে সৌগতবাবু আর মিঠুবাবু রইলেন সর্বগ্রাসী তৃণমূলে। হয়ত তারা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় নিরুত্তর থাকবেন। সৌগত রায়, মিঠুবাবু এবং দেবী প্রসাদ তিনজনেই সিপিআই-কংগ্রেস জোটের অন্যতম তাত্ত্বিক সতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বা সতীন চক্রবর্তীর গড়িয়াহাটের ফার্ন রোডের বাড়িতে রাজনৈতিক শলাপরামর্শ করতে যেতেন; তাঁরা তার ছাত্রতুল্যও বলা যায়। আরও অনেকেই আসতেন। আমার বাবার কল্যাণে সেই বুধমণ্ডলীতে আটের দশকের শেষের দিক থেকে চ্যাংড়া অবস্থা থেকেই নিতম্বপক্ক আমার অবাধ সস্নেহ প্রবেশাধিকার ছিল। দেবী প্রসাদের সঙ্গে তাঁদের অনেককেই দেখেছি, আটের দশকের শেষে গোটা নয়ের দশক পর্যন্ত। পরে রাস্তা আলাদা হতে থাকে। ২০০৫ থেকে শহুরে রাজনীতি থেকে সরতে থাকি। কিন্তু মেনস্ট্রিম শিক্ষাঙ্গন এবং রাজনীতির আলো এরাই ছিলেন।

দেবী প্রসাদকে নিয়ে আরও কিছু কথা। তিনি দর্শনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সে গবেষণা করেন। তাঁর বইগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য হল ইন্ডিভিজুয়ালস এন্ড সোসাইটি — আ মেথডলজিক্যাল ইনকুয়ারি (১৯৬৭), হিস্টোরি ইন্ডিভিজুয়াল এন্ড ওয়ার্ল্ড (১৯৭৬), রূপ, রস, গন্ধ (১৯৮০), শ্রী অরবিন্দ এন্ড কার্ল মার্ক্স – ইন্টিগ্রাল সোসিওলজি এন্ড ডায়ালেক্টিক্যাল সোসিওলজি (১৯৮৮), এনথ্রোপলজি এন্ড হিস্টিরিওগ্রাফি অব সারেন্স (১৯৯০)। তাছাড়া তিনি রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স এবং ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ফিলোজফি, প্যারিসের আজীবন সদস্য ছিলেন।
প্রয়াত দেবী বাবুর বিষয়ে তার সময়কালের মানুষজন নিশ্চই কথা বলবেন। তবে তারা নিরুত্তর যদি থাকেন তাহলে ব্যক্তিগতভাবে খুবই আঘাত পাব, বিশেষ করে প্রাক্তন ভাবনাচিন্তা করা কংগ্রেসিদের নিশ্চুপ মনোভাব আমায় খুব ভাবাবে। দেবীবাবু সফলভাবে জ্ঞানচর্চা করেছেন, ভি পি সিংএর রাজত্বকালে তিনি রাজ্যপালও হন। রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিলের থেকে তিনি সম্মাননাও নিয়েছেন। আশাকরি এই মানুষটাকে নিয়ে যে এমনেশিয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে উত্তোরণের সুযোগ বাঙালি নিজেই খুঁজে নেবে।
কভার ছবি : প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের হাত থেকে পদ্মবিভূষণ সম্মান গ্রহণ করছেন দেবী প্রসাদ