আজ ৬ জানুয়ারি কলকাতার ‘আর্মেনিয়ান চার্চ অফ দ্যা হোলি নাজারেথ… এ পালিত হচ্ছে আর্মেনীয়দের ‘ক্রিসমাস’। রোমান ক্যাথলিক তথ্য অনুযায়ী, আগে সমস্ত খ্রিস্টানরাই ৬ জানুয়ারি যীশুখ্রীষ্টের জন্মদিন পালন করতেন। আর ইউরোপের পেগানরা ২৫ ডিসেম্বর সূর্যদেবের জন্মদিন পালন করতেন। পেগানদের শায়েস্তা করতেই রোমান চার্চ ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস ও ৬ জানুয়ারি দিবস এপিফ্যানি দিবস পালন করেন। আর্মেনীয় গির্জা রোমান চার্চের অধীনে ছিল না। চতুর্থ শতকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে আর্মেনিয়ান অ্যাপোস্টলিক অর্থোডক্স খ্রিস্টানরা ৬ জানুয়ারি যীশুখ্রীষ্টের জন্মদিন ক্রিসমাস পালন করেন।
ক্যাথলিকদের বিপরীতে, আর্মেনীয়রা খ্রিস্টের এপিফেনি উদযাপন করে, যা খ্রিস্টের জন্মদিনের পরিবর্তে ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে যিশু খ্রিস্টের প্রকাশ। আর্মেনিয়ানরা এই ধর্মীয় ছুটির দিনটি উপবাস করে উদযাপন করে, তারপরে ভাত, বাদাম, মিষ্টান্ন এবং মিছরি-সহ ভোজ পালন করে।

ব্রিটিশদের অনেক আগে আর্মেনিয়ানরা ব্যবসার সূত্রে ভারতে এসেছিলেন। আর্মেনিয়রা চুঁচুড়ায় বসতি স্থাপন করে ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ডাচেদের পরে। চুঁচুড়ার বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমলে, সেখান থেকেই এসে তারা কলকাতা চিনা বাজার অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। অষ্টাদশ শতকে আর্মিনিয়ানরা ব্রিটিশদের নানা কাজে সাহায্য করেছিল। ১৬৮৮ সালের ২২ জুন ভারতের আর্মেনিয়ানদের সঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-র একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ব্রিটিশ কোম্পানির পক্ষে সেই চুক্তিতে সই করেছিলেন স্যার জোসিয়া চাইল্ড, আর আর্মেনিয়ানদের পক্ষ থেকে ছিলেন খোজা সারহাদ ও খোজা ফানুস ।
সেই চুক্তি অনুযায়ী, যেখানে অন্তত ৪০ জন আর্মেনিয়ান একসঙ্গে বাস করবেন সেখানে একটি গির্জা বানিয়ে দেবে এবং সেই গির্জার যাজক কে বেতন দেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

১৬৮৮ সালে কোম্পানি তাদের জন্য একটি ছোট কাঠের চার্চ বানিয়ে দেয়। ভারতের সমস্ত আর্মেনিয়ান অ্যাপোস্টোলিক চার্চের মধ্যে, কলকাতার প্রাচীনতম আর্মেনিয়ান গির্জাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কারণ এটি ভারতীয় আর্মেনিয়ানদের মাদার চার্চ হিসাবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, কাঠের কাঠামো হওয়ায় ১৭০৭ সালের একটি বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে যায় সেটি। এরপর ১৭২৪ সালে জনৈক আগা জ্যাকব নাজারের উদ্যোগে আজকের আর্মেনিয়ান চার্চ অফ দ্যা হোলি নাজারেথ তৈরি হয়। ১৭৩৪ সালে হাজার মল পরিবারের অনুদানে তৈরি হয় ক্লক টাওয়ার এবং ঘন্টাঘর। পরে অবশ্য আভ্যন্তরীন কিছু সাজ সজ্জার পরিবর্তন ঘটানো হয়।
আর্মেনিয়ান স্ট্রিট, ওল্ড চায়না বাজার স্ট্রিটের গলিপথ ত্রিভুজের মতো ঢেকে রেখেছে বড়বাজারের গির্জাটিকে। চত্বরের মধ্যে দিকে ঢুকলেই উঠোনে আর্মেনিয়াতে সাবেক সমাধিক্ষেত্র যার একটি কবরের স্থিতিফলকের তারিখ ১১ জুলাই ১৬৩০।

আর্মেনিয়ান স্ট্রিট ছাড়াও পার্ক সার্কাস ও ট্যাংরা, চুঁচুড়া ও সাইদাবাদে আছে আর্মেনিয়ান গির্জা। কিন্ত আজ কলকাতার এই গির্জাতেই দিনভর বড়দিন পালন করা হলো। ক্ষয়িষ্ণু কিন্তু আভিজাত্যে ভরপুর কিছু আর্মেনীয় এখনো শিকরের টানে এই বড়বাজারে আসেন আজ। অজানা ভাষায় উপাসনার মন্ত্র ধাক্কা খায় চার্চের দেওয়ালে।
চুঁচুড়া শহর কলকাতা থেকে ৩৫ মাইল দূরে। বছরের একদিন চুঁচুড়ায় আর্মেনিয় গির্জায় সেন্ট জন দি ব্যাপটিস্ট-এর ভোজের দিনের নিকটতম রবিবার (সাধারণত জানুয়ারি মাসে) কলকাতার আর্মেনীয়রা তাদের পুরোহিতকে নিয়ে এখানে তীর্থ করতে আসেন। পুরোহিত ‘হোলিসাস’ অনুষ্ঠান করেন এবং এখানে সমাধিস্থদের জন্য প্রার্থনা করেন। এই প্রার্থনা সভার পর সার্বজনীন ভোজে আর্মেনিয়রা অংশ নেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কলকাতার আর্মেনীয় গির্জা।

আর্মেনীয়রা চুঁচুড়ার বসতি স্থাপন করে ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত চুঁচুড়ায় আর্মেনিয়ান বসতি ছিল বেশ বড়। ১৯৬৫ সালে আর্মেনিয়ান চার্চ প্রতিষ্ঠা হয়। এটি বাংলার দ্বিতীয় চার্চ স্থাপন করেন খোজা জোহানেস মারগার। তার ভাই যোসেফ ১৬৬৭ তে নির্মাণ সম্পন্ন করে, তাঁর মৃত ভাই জোহানেসের স্মৃতিতে চার্চটি সেন্ট জন দি ব্যাপ্টিস্টকে উৎসর্গ করেন। মৃত্যুর পর জোহানেসকে চার্চের ভেতরেই কবর দেওয়া হয়। কোন এককালের আর্মেনীয়দের সমৃদ্ধ উপনিবেশের স্মৃতি হিসেবে এই গির্জাই আজকের একমাত্র নিদর্শন।
১৬৯৫ থেকে ১৮৬৮ এই সময়ের মধ্যে বহু আর্মেনিয়ান চুঁচুড়ায় বাস করে দেহ রেখেছেন। গির্জার মধ্যে কবরের সংখ্যা ১০০-র বেশি নয়, এর মধ্যে মাত্র ২৮টি চার্চের গৃহের ভেতরে।

গির্জাটিতে প্রথমে কোন শিখর ছিল না। সোফিয়া বগরাম নামে এক কলকাতাবাসিনী ধনী আর্মেনিয়র বদান্যতায় ১৮২২ সালে তারই স্বর্গগত স্বামী সিমন ফানুন বাগরাবের স্মৃতিতে এটি নির্মিত হয়।।
তথ্যসূত্র : Little Armenia, Yahwehs Restoration Ministry, হুগলি চুঁচুড়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতি — সংগ্রাম মল্লিক।