ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বাধিনায়ক নরেন্দ্র মোদি আর্যাবর্তের জনগণকে জাতীয় কংগ্রেস মুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখাতে দেখাতে, কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনে বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণের ভূখণ্ডে ভারতীয় জনতা পার্টি মুক্ত জাদুবাস্তবতা হয়ে গেল! ১৩ মে থেকে দক্ষিণ আর পূর্বের সব কটা রাজ্য বিজেপি মুক্ত।
১০ মে কর্ণাটকের ২২৪টা আসনে ভোট নেওয়া হয়। মানুষ উপচে পড়ে ভোট দিয়েছেন। যুবাদের ভোট দেওয়ার উৎসাহ দেখে বিজেপি কোমর বাঁধলেও সেটা যে গত এক দশকের কেন্দ্রিয় সরকারের আর্থিক, রাজনৈতিক, কৃষ্টির অব্যবস্থার বিরুদ্ধে মূর্তি প্রতিবাদ, সে ইঙ্গিত ভাজপার ভোট ম্যানেজারেরা বোঝেন নি। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ যে ছিল, এটা ভাজপার থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জানত। ক্ষোভে প্রলেপ দেওয়ার জন্যে বিশ্বের সব থেকে ধনী দল ভোটে জেতার হ্যান্ডবুকে যত টোটকা ছিল প্রায় সব কটি প্রয়োগ করতে বাকি রাখে নি — বিধানসভায় অধিকাংশ পুরোনো প্রার্থীকে বাদ করে নতুন প্রার্থী দিয়ে মানুষকে প্রবোধ দেওয়া থেকে শুরু করে কেরালা ফাইলস নিয়ে মিথ্যাচার থেকে ব্যাঙ্গালুরুর শহুরে কাঠামো বদলে দেওয়ার আশ্বাসবাণী থেকে টিপু সুলতানের চরিত্র হরণ পর্যন্ত সব কিছুই তারা ভোট প্রচারে নিয়ে এসেছে। এমন কী বজরঙ্গবলীর নামেও ভোটের বোতাম টিপতে তাঁর ভোটারদের অনুরোধ করেছেন ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী! সমস্যা হল কোনওটাই কাজ করে নি, সেটা বিধানসভার ভোট গণনার ফলেই প্রমান।

যদিও অনেকেই পাত্তা দেবেন না, কিন্তু একটা বড় গণ্ডগোল হয়েছে বিজেপির টিপু সুলতানের চরিত্র হরণ করতে গিয়ে। আর্যাবর্তে মুঘল আর আওরঙ্গজেবকে নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো ভাজপা ১০০% নিশ্চিত ছিল টিপুকে নিয়ে তার ইসলামবিদ্বেষী প্রচার ভোটে ফল দেবে। মাথায় রাখতে হবে হেলাল আহমেদ বলেছেন, আওরঙ্গজেবকে দক্ষিণ এশিয়ার বড় সংখ্যক মুসলমান সমাজ স্বীকৃতি দেয় না — অতীতে মুসলিম লিগ তাঁকে অস্বীকার করেছে, আবুল কালাম আজাদ বিষোদগার করেছেন [নেহেরুর কাছে তো তিনি ভিলেনই]। বিজেপি, মারাঠা, শিখ রাজনীতি সাম্প্রতিককালে মুঘল আওরঙ্গজেব নিয়ে প্রচুর বিষাক্ত প্রচার চালিয়েছে। টিপু সুলতান যে আওরঙ্গজেবের ১০০ বছর পরের এবং তাঁকে নিয়ে খুবই প্রামাণ্য, গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, এমন কী উপনিবেশিকদেরও আছে, এটা ভাজপার আনপঢ় তাত্ত্বিকেরা ভুলেগিয়েছিল। অথচ কর্ণাটকে ভাজপার বড় ইস্যু ছিল টিপু। আমরা ভুলে যাই দক্ষিণে টিপু আজও অসীম সম্মান পান — তিনি লুঠেরা ইংরেজদের আটকাতে গিয়ে খুন হয়েছেন। তার ছেলেপুলেরা কালের প্রভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দালাল হয়েছেন, কিন্তু টিপুর ইমেজ উপনিবেশিক প্রগতিশীল আধুনিক নবজাগরণীরা ধ্বংস করার চেষ্টা করলেও সফল হয় নি। হেলাল প্রশ্ন তুলেছেন কটা মানুষের নাম আওরঙ্গজেব, দেখান। সত্য। ফলে আওরঙ্গজেব বিদ্বেষী আর্যাবর্ত ভাজপার মুঘল, আওরঙ্গজেবকে নিয়ে ঘেন্নার রাজনীতি আটকাতে পারে নি। কিন্তু কর্ণাটকে টিপুর চরিত্রহরণ করা ভাজপার এই চেষ্টা ভোট বাক্সে জবাব দিয়েছেন কান্নাডিগা ভাই-বোনেরা। এই ব্যাপারটা সঙ্ঘী তাত্ত্বিকদের আগামী ৫ বছর তাড়া করবে। এর ফল হল কর্ণাটকের শিক্ষামন্ত্রী বি সি নাগেশের ব্যাপক হার। এই নাগেশ কর্নাটকে হিজাব নিষিদ্ধ করেছিলেন। তার জবাব কান্নাডিগারা দিয়েছেন আগামী ৫ বছর বাড়িতে বসিয়ে রেখে।

তাছাড়া কংগ্রেসও বুঝতে পারছিল আরও একটু লড়লে অধরা জয় আসলেও আসতে পারে। রাহুল কয়েক মাস আগে এই অঞ্চল দিয়েই ভারত যাত্রা নিয়ে গেছেন, তিনি অসামান্য সক্রিয় ছিলেন। কংগ্রেস মূলত ভদ্রলোক, উকিল আর পেশাদারদের দল। অভদ্রলোকেদের নিয়ে বহু আইনটাইন আছে কিন্তু সে সব বদ্ধ ঘরে পড়ে থাকে মুখ লুকিয়ে। দু-চারজন দেওয়ালে পিঠ ঠেকা নেতা এ সব নিয়ে কথা বললেও বড় নেতারা ছোটলোকদের নিয়ে স্পিকটি নট। কর্ণাটকে এই বস্তাপচা কংগ্রেসি ঐতিহ্যকে রাহুল অতিক্রম করতে পেরেছেন। একটা ভিডিও দেখছিলাম, কোনও একটা প্রেক্ষাগৃহের সভায় রাহুল গান্ধী প্রাকাশ্যে বলছেন — কর্ণাটকে কংগ্রেসের সরকার এলে শহরের হকার, নির্মাণ মজদুর, সাফাই কর্মীদের স্বার্থ দেখা হয় সেটা তিনি দেখবেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইউপিএ আমলেই হকার বিল পাস করেছিল কংগ্রেস উদ্যোগ নিয়ে। আমরা দেখেছি ভোটে জিতলে মহিলাদের বাসের টিকিট ফ্রি করার মত প্রতিশ্রুতি দিতে ভোলেন নি কংগ্রেস নেতারা। রাহুল প্রথম প্রচার সভায় আদানি নিয়ে বলার পরে তাঁকে স্থানীয় ইস্যুগুলো ধরে ধরে বলতে বলেছিলেন স্থানীয়দের পালস বোঝা কংগ্রস প্রেসিডেন্ট। সে পরামর্শে কানে তুলেছেন রাহুল, হাতে গরম ফলও পেয়েছেন। প্রিয়াঙ্কাকে দেখে ইন্দিরা গান্ধীর ট্রু কপি মনে হচ্ছিল।
চিকমাগালুরের বাবা বুদানগিরি ভারতের প্রথম কফি চাষের এলাকা, জরুরি অবস্থায় সাংসদ পদ হারানোর পরে এখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই লড়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। শুধু চিকমাগালুর নয়, কর্নাটকের অধিকাংশ আসনে বক্তৃতা করতে গিয়ে বারবার প্রিয়াঙ্কা-রাহুল খুন হওয়া দাদিমার কথা তুলেছেন। চিকমাগালুর থেকে ভাজপার সিটি রবি হেরেছেন ৫ হাজারের বেশি ভোটে। একের পর এক ইন্দ্রপতন হয়েছে কর্নাটকে। দল পাল্টেও শেষ রক্ষা করতে পারেন নি বহু ভাজপা নেতা যেমন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগদীশ শেট্টার। উত্তর কর্ণাটকের আসন থেকে কংগ্রেসের টিকিটে লড়ছেন আরএসএস ঘনিষ্ঠ জগদীশ শেট্টার। বিজেপির লিঙ্গায়েত নেতাদের মধ্যে অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। সেই জগদীশই এবার টিকিট না পেয়ে দল ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি হুবলি-ধারওয়াড় সেন্ট্রাল থেকে ৩৪ হাজার ভোটে হেরেছেন। কংগ্রেসের টিকিটে তারা হেরেছেন।

১০ মে যদিও ভোট দেওয়া শেষে কংগ্রেসকে এগিয়ে রেখেছিল বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম, কিন্তু অধিকাংশ বিশেষজ্ঞর ধারণা ছিল কংগ্রেস আর বিজেপির আসনের ফারাক কম হবে – বিজেপি জনতা দল ইউ জোট বেঁধে শেষ পর্যন্ত সরকার গড়বে। কিন্তু ১৩ মে সকাল থেকেই দেখা গেল কংগ্রেস এগিয়ে দুপুর ১২টার পর বোঝা গেল এ যাত্রায় বিজেপির সমস্ত তীর ব্যর্থ হয়েছে। ২টোর পরে কংগ্রেস ১৩০ আসন ছাড়িয়ে পৌঁছে গেল ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
একমেবদ্বিতীয়ম নরেন্দ্র মোদি হার স্বীকার করে নিয়েছেন — ‘কর্ণাটক নির্বাচনে যাঁরা আমাদের সমর্থন করেছেন আমি তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি বিজেপি কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমেরও প্রশংসা করতে চাই। আমরা আগামী দিনে আরও জোরালোভাবে কর্ণাটকের সেবা করব — এই কথা বলা ছাড়া তার আর অন্য কোনও উপায় ছিল কী? প্রিয়াঙ্কা স্পষ্ট খোঁচা দিয়েছেন বিজেপির ভোটের মুখ নরেন্দ্র মোদিকে, ‘আমি কর্ণাটকের জনগণকে অভিনন্দন জানাতে চাই। তাঁরা রাজ্য জুড়ে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন যে জনগণ এমন রাজনীতি চায় যাতে তাঁদের সমস্যার সমাধান হবে, তাঁরা এমন রাজনীতি চান, যেখানে তাঁদের সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করা হবে… কর্ণাটক এবং হিমাচল প্রদেশের লোকেরা প্রমাণ করেছে যে নজর ঘোরানোর রাজনীতি আর কাজ করবে না…’।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের নাম না নিয়েই বলেছেন ‘পরিবর্তনের পক্ষে জনমত প্রদানের জন্য কর্ণাটকের মানুষকে স্যালুট করছি। নিষ্ঠুর একনায়কতন্ত্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি পরাজিত হল। যখন মানুষ বহুত্ববাদী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিকে জয়ী করতে চান, তখন কোনও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা তাঁদের দমিয়ে দিতে পারে না। এটাই আজকের মোদ্দা কথা ও আগামিদিনের শিক্ষা’।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে এই নির্বাচন আগামী দিনের ভারতের দিশামুখ ঠিক করে দেবে। এইরকম পরিস্থিতিতে ঠিক দু-বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে ২০০ বিধানসভার আসন জেতার ঘোষণা করে দেওয়া বিজেপিকে মাটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি হেন কোনও ট্রিক নেই সেই নির্বাচনে প্রয়োগ করে নি, প্রধানমন্ত্রীর অশ্লীলতম ‘দিদি ও দিদি’ ডাক থেকে শুরু করে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি যোগ দেওয়া হেভিওয়েট নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘মমতাজ বেগমের’ মত ধর্মীয় বিদ্বেষের বার্তা থেকে অমিত শাহের মমতাকে ‘হাফ প্যান্ট’ পরে খেলতে নামার নিদান পর্যন্ত। সব বিদ্বেষ বঙ্গোপসাগরের জলে ছুঁড়ে ফেলেছিল বাংলার ভোটারেরা। একই ঘটনা ঘটল কর্ণাটকে।
লোকসভা নির্বাচনে আর বছর খানেক বাকি। দক্ষিণ আর পূর্ব ভারত থেকে বিজেপি উজাড়। পূর্ব ভারতের চারটে প্রদেশে লোকসভার আসন সংখ্যা হল বিহারে ৪০, ওডিসায় ২১, পশ্চিমবঙ্গে ৪২, ঝাড়খণ্ডে ১৪ — মোট ১১৭। লোকসভার মোট আসনের ২৫%-এর কাছাকাছি। ২০২৪ দক্ষিণে মুখ থুবড়ে পড়ছে বিজেপি এটা পরিষ্কার। পূর্ব ভারতে চারটে রাজ্যে যদি ৫০টার বেশি আসন নিতে না পারে বিজেপি, তাহলে ২০২৪ কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসা প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যাবে।
কর্ণাটকের বিজয় কী বিরোধীদের একটা কার্যকর বোঝাপড়ার দিকে ঠেলে দেবে?
এখানে কয়েকটা কথা মনে রাখতে হবে অবশ্যই –
১। কর্ণাটকেই, লোকসভা ভোটে অন্যরকম ফল হলেও হতে পারে। কান্নাডিগারা বিধানসভা এবং লোকসভায় আলাদা মাইন্ডসেট নিয়েই ভোট দেন।
২। বিরোধিজোট যতই “সার্বিক” করার কথা বলা হোক, না সেটা বাস্তবে সম্ভব, না সেটা খুব ভালো কিছু হবে। মোস্ট এফেক্টিভ জোট তৈরি হওয়া দরকার ন্যুনতম সাধারণ কর্মসূচীর ভিত্তিতে। জোটের বাইরে যারা থাকল, তারা গিয়ে বিজেপির হাতে তামাক খাওয়া শুরু না করলে তবেই এই মোমেন্টাম ধরে রাখা যাবে।
৩। শুধু দক্ষিণ এবং পূর্ব নয় – উত্তর-পূর্বেও কার্যত বিজেপি শূন্যই – ঘোড়া কেনাবেচা করে সরকারে থাকা আর রাজনীতির ময়দানে থাকার মধ্যে ফারাক আছে। কর্ণাটকের বিপ্রতীপে উত্তর-পূর্বও লোকসভায় অন্য খেলা দেখাবে। কেন্দ্র নিজের স্বার্থেই চাইবে মণিপুরের অশান্তি দীর্ঘস্থায়ী হোক – যাতে ওদিকে ভোটিং কম হয়।