| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

দেখার ভুবন : ছোট গল্প লিখেছেন সেলিনা হোসেন

Reporter
সেলিনা হোসেন / ৩৬৪ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০২২

মোবাইল ফোন অন করলে যে ছবিটা ফুটে ওঠে সেটি ভাস্করের কাছে কোনো সাধারণ ছবি নয়। ছবিটির নানা ব্যাখ্যা করে ও আনন্দ পায়। ভাবে, এটাও বেঁচে থাকার উপাদান। একে বেঁচে থাকার শর্তও বলা যায়। বেঁচে থাকাতো শুধু শ্বাস ফেলা নয়। দম বন্ধ করে পূর্ণতার অনুভবই বেঁচে থাকার অনেক শর্তের একটি।

ছবিটিকে ভাস্কর কখনোই সাধারণ ছবি বলে মনে করে না।

বন্ধুদের দেখিয়ে বলে, এর অনেক ব্যাখ্যা আছে।

—বোগাস! চেঁচিয়ে ওঠে নিলয়।

—আমাদেরকে কোনোকিছু বোঝাতে হবে না। চেঁচিয়ে বলে সুতপা। জ্ঞান জাহির করার জায়গা পাস না। এটা তোর খুব খারাপ অভ্যাস ভাস্কর।

—ও না হয় নিজের ভালোলাগার কথা বলেছে। তোরা ওর সঙ্গে এমন করছিস কেন? ছবিটা নিয়ে ওর আনন্দ আছে, বিষণ্ণতা আছে। থাকতে দে। আমরা কেন ওকে খোঁচা দেবো?

—বুঝেছি তুই ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমরা ওর ফালতু বন্ধু।

হা-হা-হা-হা হাসিতে মেতে ওঠে সবাই। ভাস্করও প্রাণখোলা হাসিতে দিগন্ত মাতায়।

ছবিটি ও তুলেছে তিস্তা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে শ্রাবণের এক রোদঝরা দিনে। নদীর তরঙ্গস্রোতে নীলাভ আভা ছিল। নদীর ওপরে ছিল নীল আকাশের উজ্জ্বল দীপ্তি। পুঞ্জীভূত সাদা মেঘের গা-ভাসিয়ে রাখা সৌন্দর্য যৌবনের স্ফূরণ ছিল। ঝকঝক করছিল দিগন্ত রেখা। ওর মনে হয়েছিল এক আশ্চর্য প্রদীপ্ত যৌবন এখানে বিচ্ছুরিত হচ্ছে। বুকভরা আবেগে ও দিশেহারা হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল পুরো প্রকৃতিতে যৌবনের স্রোত এক অবিস্মরণীয় সময়ের কথা বলেছিল ওকে। ও বুঝেছিল নদীর স্রোত এবং পেঁজাতুলোর মতো টুকরো মেঘের ভেসে থাকার গতিতে যৌবন আছে। এ কথাই ও বন্ধুদের বলে। বলে, যৌবন হলো, বেঁচে থাকার সবচেয়ে সুন্দর সময়। জানিস, এই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলে আমার ডিপ্রেশন কেটে যায়। আমার ভেতরে নিঃসঙ্গতা থাকে না। মনে হয় আমি এক গভীর বিনোদনে আছি।

—বেড়ে বলেছিস বন্ধু। তোর সামনে এখন কবি হওয়ার সময়।

রাকিব ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে তালি দিলে অন্যরাও তালি বাজায়। এভাবেই ভাস্কর প্রচলিত আড্ডা ভেঙে দেয়। নদীর কথা বলতে শুরু করে।

—তিস্তা আমার প্রাণের নদী। এই নদীর পাড়ে বড়ো হয়েছি। পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে যেতাম।

—হয়েছে বুঝেছি, তোর অনেক স্মৃতি আছে। ঝাড়ি দিয়ে কথা বলে সুতপা। এখন তোর জ্ঞানের কথা বল।

—হ্যাঁ, তিস্তার খোঁজখবর তুই রাখিস। বল শুনি। নিলয় নড়েচড়ে বসে আবার বলে, একদিন বলেছিল তিস্তা নদী সিকিম, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে।

—যখন ঢুকেছিল তখন বাংলাদেশের জন্ম হয়নি।

—জানি, জানি। এসব হাজার বছর আগের কথা। তুই বাংলাদেশ ধরেই বল।

রাকিব ওকে উচ্ছ্বসিত রাখতে চায়। ও নানা কারণে ডিপ্রেশনে ভোগে। কেন, এর কোনো উত্তর নেই ভাস্করের কাছে। রাকিব মাঝে মাঝে বলে, তোর সাইকিয়াটিস্টের কাছে যাওয়া উচিত। ডেট ঠিক কর আমি তোর সঙ্গে যাব।

—না, ভাস্কর গভীর চোখে তকিয়ে না বলে। গাঢ় স্বরে বলে, এটা আমার কাছে কোনো অসুখ নয়। আমি ডিপ্রেশন এনজয় করি।

—বোগাস! রাকিব ঝাড়ি দেয়। বাহাদুরি নেবার চেষ্টা করিস না। একদিন বুঝবি ডিপ্রেশন তোকে কোথায় নিয়ে ফেলবে।

ভাস্কর নিশ্চুপ থাকে। নিজের ডিপ্রেশন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে না।

—কি রে কথা বলছিস না কেন?

ভাস্কর সবার মুখের ওপর নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনলে সুতপা চেঁচিয়ে বলে, তোর দৃষ্টি নদীর মতো লাগছে রে ভাস্কর। তোর চোখ এখন চোখ না, তিস্তা নদী।

হা-হা করে হাসে সবাই।

নিলয় হাসতে হাসতে বলে, সুতপাও কবি হবে।

এখন ভাস্কর কারও দিকে না তাকিয়ে বলতে থাকে, পাহাড় থেকে নেমে খরস্রোতা তিস্তা নদী নীলফামারি, লালমণিরহাট, কুড়িগ্রামের চিলমারী হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর সঙ্গে মেলার জন্য ছুটল।

অন্যরা হাততালি দিতে দিতে বলে দুয়ের মিলন মহামিলন—হা-হা-হা। মিলেমিশে সাগরে গেল।

—বোগাস! চুপ কর।

—তুই আর কিছু বলবি?

—না। আমি বেশি কথা বলি না।

—তোর নদীতে এখন বালুচর। তিস্তার ধারের মানুষ—

—চুপ কর। আমার নদী। নদীই।

—তোর এই ছবির মতন।

—হ্যাঁ, তাই। আর কিছু শুনতে ভালো লাগে না।

—হয়েছে কি তোর?

—কি আবার, আমি বুঝেছি। ও এখন ডিপ্রেশনে ঢুকেছে।

—ডিপ্রেশনের সঙ্গে প্রেম এবং বসবাস।

—না, তোদের সঙ্গে আমার হবে না। গেলাম।

রাকিব হাত টেনে ধরে বলে, কাউনিয়া কবে যাবি?

—আগামী শুক্রবারে।

—আমিও যাব তোর সঙ্গে। দেখে আসব তোর ক্যামেরার সুন্দর দৃশ্য।

নিলয় লাফিয়ে ওঠে, আমিও যাব।

সুতপা জিজ্ঞেস করে, তোর সেই মাছধরা ছেলেগুলো কেমন আছে রে?

—ওদের আবার থাকা। বেঁচে আছে এই বেশি।

—তা ঠিক। বাপ-মায়ের দিনমজুরির টাকায় কি দিন চলে? নাকি সব বেলায় ভাত জোটে।

—হয়েছে এসব নিয়ে আর গবেষণা করতে হবে না। আয় আমরা ওদের বেঁচে থাকা সেলিব্রেট করি।

—কীভাবে? তোর যত পাগলামি সুতপা?

—আমি নদী কবিতার দুটো লাইন মুখস্ত বলে সেলিব্রেট করতে চাই।

—কার কবিতা?

—সৈয়দ শামসুল হকের।

—দারুণ। বল দেখি।

—পুরো কবিতাটা মুখস্ত নেই। ভালোলাগার কয়েকটি লাইন শোনাচ্ছি তোদের। সুতপা গলা কেশে নিয়ে এক মিনিট চুপ করে থেকে বলতে শুরু করে, ‘বাঙাল নদীর দেশে একদিন দুপুর বেলায়….।’ ও এক মুহূর্ত থেমে আবার বলে, ‘আজও আমি দেখে উঠি নদীও রূপের মোহে ঘূর্ণিজলে গান করে ওঠে,/রোদের হাঁসুলি পরে ঢেউগুলো ভাঙে আর গড়ে…।’ ও আবার থামে। সবার মুখের দিকে তাকায়। অন্যরা চুপ করে ওর দিকেই তাকিয়ে থাকে। ও বলতে শুরু করে, ‘এ নদী এখনও আছে—আছে তার সেই নাব্যতাও।/অঙ্গের হলুদ নিয়ে আজও সেই নদীঢেউ বাংলার গভীরে/বাঙালি বরের মন ভাঙছে কোথাও।’

সুতপা শেষ করলে বাকিরা হাততালি দেয়।

—দারুণ বলেছিস রে।

—এই না হলে সুতপা। ও বেঁচে থাকা সেলিব্রেট করলো দারুণভাবে।

ভাস্কর গদগদ স্বরে বলে, কনগ্রাচুলেশনস সুতপা। আমি মাছধরা ছেলেদের কাছে গিয়ে তোর কথা বলব।

মাছধরা ছেলেদের কাছে আমিও যেতে চাই।

চল, আমরা একসঙ্গে একটা প্রোগ্রাম বানাব।

হ্যাঁ, তাই করব। ওদেরকে আমায় দেখতেই হবে।

ভাস্কর তুই ওদের ছবি তুলিসনি?

তুলেছিলাম। এখন নেই আমার কাছে।

ছবি দেখব না। ওদেরকে দেখব।

ঠিক বলেছিস। আসল দৃশ্য দেখাই দরকার।

ভাস্কর মনে মনে বলে, দৃশ্য। হ্যাঁ, দৃশ্যই। ওরা ঘাসের দড়িতে মাছ ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরছে, এমন দৃশ্য তো ও কতবারই দেখেছে। কিন্তু এই দৃশ্যের ব্যাখ্যায় যৌবন নেই। এই দৃশ্য মরা শৈশবের দৃশ্য। এতে ছবির ব্যাখ্যা হয় না। ও ডিপ্রেশনের ভেতরে ঢুকতে থাকে।

আড্ডা ভেঙে গেলে যে যার পথে যায়। ভাস্করের মনে হয় ওর পথ নেই। ও এই মুহূর্তে পথহারা বালক। ফুটপাথটা বালুর চর। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। ও ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। মাথা ঝিমঝিম করে। রাস্তার ধারে চা খাওয়ার জন্য দাঁড়ায়। কাছে গিয়ে বেঞ্চের ওপরে বসে। দোকানি জিজ্ঞেস করে, সাদা চা না লাল চা দিমু স্যার?

ভাস্কর দূরের দিকে তাকিয়ে বলে, লাল। দোকানির মুখ দেখার ইচ্ছা হয় না ওর। ওর ডিপ্রেশন বাড়তে থাকে।

পাশে বসে থাকা ছেলেটা হাততালি দিয়ে বলে, লাল। লাল। লাল চায়ে লাল পিঁপড়া। সাদা চায়ে কালো পিঁপড়া।

—তুই কি আমাকে পিঁপড়া খাওয়াবি?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ। হাসিতে গড়িয়ে পড়ে ছেলেটি।

দোকানি বলে, ও আমার ছেলে নয়ন স্যার। সবার লগে এমুন মজা করে।

—কোন ক্লাসে পড়ে?

—থিরি পয্যন্ত পড়াইছি। অহন আর পড়ে না। অর মা বাসাবাড়িতে কাম করে। আমি চা বেচি। অরে ইসকুলে নিমু কহন?

—তাইতো। ভাস্কর উদাস হয়ে যায়। মাছধরা ছেলে দুটির কথা মনে হয়। ওদেরও স্কুল নাই। দোকানি ওকে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। লোকটার চোখে চোখ পড়ে ভাস্করের। মনে হয় লোকটার বাড়ি বুঝি তিস্তা পাড়ের কোথাও। ও চোখ নামিয়ে চায়ে চুমুক দেয়। মাথা ঘুরিয়ে নয়নকে বলে, তোর বাবা আমাকে পিঁপড়ে দেয়নি রে ছোটকু।

—আমি ছোটকু না, আমি নয়ণ।

—তুই আমার আদরের ছোটকু।

—আমি আদর চাই না।

—তাহলে কি চাস? পিঁপড়ে ভাজা?

হি-হি করে হাসতে হাসতে বেঞ্চ থেকে নেমে দৌড়ে যায় ফুটপাথের খানিকটুকু। ভাস্করের কানে ওর হাসির শব্দ লেগে থাকে। এই সময়টুকু উপভোগ করবে বলে ও কারও দিকে তাকায় না। দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আশেপাশের গাছে দোয়েল কিংবা বুলবুলি আছে। ডাক ভেসে আসছে। ও কান পেতে শোনে। পাখির ডাকের সঙ্গে নয়নের হাসির কোনো তফাৎ খুঁজে পায় না। দুটোই এক হয়ে ওকে নিয়ে যায় কাউনিয়ায়। দৌড়ে আসে দুই ভাই।

—সাংবাক কাকু তুমহি ক্যানকা আছ? হামারকে কুতা মনে আছে তুমহার?

ওদের একজন নয় বছরের রতন। অন্যজন দশ বছরের মানিক। ওরা মাছ ধরতে ভালোবাসে। ওদের বাবা-মা দিনমজুরির কাজ করে। এলাকায় তিস্তা নদীর বালুচর নিয়ে রিপোর্ট করতে এলে হাসিখুশিতে ভরা ছেলেদুটোকে নিয়ে মজা করেছিল ও। ও জেনেছিল কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, কোন ক্লাসে পড়িস তোরা?

ওরা হাসতে হাসতে বলে, মাছধরার ক্লাসে।

—গাধা। বাদরামি করার জায়গা পাস না? স্কুলের নাম কি?

—তিস্তা নদী। হি-হি করে হাসতে হাসতে দুই ভাই লাফালাফি করে। ঘাসের দড়িতে বেঁধে কাঁধে মাছ ঝুলিয়ে বাড়িতে ফেরে ওরা। ওদের কাছে নদীই স্কুল। ওদের কাছ থেকে এমন কথা শুনে ভালো লেগেছিল ভাস্করের। ওদের ঘাড়ে হাত রেখে বলেছিল নদীর পাড়ে এইখানে দাঁড়া। তোদের ছবি তুলব।

—না, না আমরা ছবি তুলবই না।

দুজনে ছুটে চলে গিয়েছিল। নদীর পাড় ধরে অনেকটা পথ দৌড়ে ঘরের আড়ালে চলে গেলে ভাস্করের মনে হয়েছিল ওরা ছবির চেয়ে বেশি সুন্দর। ওদের ছবি তোলার দরকার নেই। নিজস্ব ভাবনার মাঝে কাপের বাকি চা শেষ করে। কাপ-পিরিচ দোকানির হাতে দেবার সময় দোকানি জিজ্ঞেস করে, আপনে অ্যাতক্ষণ কার কথা মনে করলেন?

—তোমার ছেলের মতো দুটো ছেলের কথা।

—আমার পোলাডো খুব দুষ্টু। কারও কথা হোনে না।

—এই শহরের সব জায়গাই ওর জন্য স্কুল ভাই। ও নিজের মতো করে শিখে বড়ো হচ্ছে।

—বকতিতা দিলেন স্যার। আমার পোলার কামে লাগবে না।

—লাগবে। তুমি এখন বুঝতে পারছ না।

ভাস্কর পকেট থেকে টাকা বের করে চায়ের দাম শোধ করে। তখন নয়ন দৌড়ে এসে কাছে দাঁড়ায়।

—কি রে কোথায় গিয়েছিলি?

—জানি না।

ও প্যান্টে হাত ঘঁষে।

জানবি না কেন? পাখি দেখতে গিয়েছিলি?

—না। শরের পাখি তো পাখি না।

—তবে কী? ভাস্কর কৌতূহলী হয়ে ওর দিকে তাকায়।

—মেশিন।

—মেশিন? কী বলিস?

—হ, হ। ঠিকই কই। হি-হি করে হাসে ও।

—পাখি ডাকে না। মেশিনের মতো শব্দ করে না রে?

ও ঘন ঘন মাথা ঝাঁকায়।

দোকানির দিকে তাকিয়ে ভাস্কর চোখ বড়ো করে বলে, দেখো তোমার ছেলের পড়ালেখা। ও চারপাশ থেকে দেখতে শিখছে।

দোকানি উত্তর দেবার আগেই দুজন লোক আসে দোকানে। বেঞ্চের ওপর বসে বলে, দুধ চা দাও।

তারপর নিজেরা কথা বলতে শুরু করলে ভাস্কর ফুটপাথ ধরে এগোতে থাকে। পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পায় ছেলেটি নারকেল গাছের গোড়ায় বসে আঙুলে কোনো কিছুর হিসেব করছে। এক-দুই করে করে গুনছে। ভাস্করের ভেতরে ডিপ্রেশন ঘূর্ণির মতো পাক খায়। ওর মাথা টলে ওঠে। রাস্তার ধারের একটি গাছে পিঠ ঠেকিয়ে মোবাইল অন করে। ভেসে ওঠে অপরূপ সৌন্দর্যের ছবিটি। ওর চোখের ভেতরে জলের ধারা নামে। চোখ মোছে না। ঝাপসা চোখেও ছবিটি যৌবন হয়ে ওকে টেনে নিয়ে যায় তিস্তার ধারে। নদীতে লাল রঙের পাল উড়িয়ে চলে যাচ্ছে নৌকা। যেন রতন আর মানিক যৌবনে পৌঁছেছে। লাল রঙের পালের নৌকা উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। ভাস্কর নিজের ভাবনায় মগ্ন হয়ে গাছের কাণ্ডে মাথা ঠেকিয়ে আকাশ দেখে। ওর মাথার ঝিমঝিম ভাব কাটতে থাকে। কিন্তু অবসন্ন বোধ করে। কীভাবে বাড়ি ফিরল বুঝতে পারল না। প্রবল বিষণ্ণতার ওর সামনে থেকে শহরের চেহারা মুছে গেল। শুনতে পাচ্ছে পাখিগুলো ওর চারপাশে মেশিনের মতো শব্দ করছে। ওর মাথার ভেতরে ঘর্ঘর শব্দের ঘূর্ণি।

এসবের মাঝে দিন গড়ায়। খবর সংগ্রহের জন্য যেতে হয় বিভিন্ন এলাকায়। ধুপ করে মনে হয় অনেক দিন কাউনিয়া যাওয়া হয় নি। কেমন আছে মাছধরা ছেলেরা। সে খোঁজও ওর কাছে নেই। মন খারাপ হয়ে থাকে। এর মধ্যে শুরু হয় প্রবল বর্ষা। নদীগুলোর পানি বাড়ছে। চারদিকে বন্যার আশঙ্কা। একদিন পত্রিকা অফিস থেকে ওকে কাউনিয়ায় খবর সংগ্রহের জন্য যেতে বলা হলো। তিস্তার দু-পাড়ের কোথাও কোথাও ভাঙন শুরু হয়েছে।

কাউনিয়া যাবার কথা শুনে বন্ধুরা বলল, তোর সঙ্গে আমরাও যাব।

—কেন? এই বর্ষায়—

—বর্ষার তিস্তা দেখার জন্যই তো যাব। ভরা যৌবনের নদী।

—ঠিক। আমারও তাই মনে হয়। তোর ছবিতেই আমরা দৃষ্টি আটকে রাখব নাকি? বাস্তবে দেখতে হবে না?

সুতপা তুড়ি দিয়ে কথা বলে। ওর সঙ্গে কথা যোগ করে নিলয়।

—তোর দেখা মাছধরা বিচ্ছুগুলোকেও দেখতে চাই।

—ঠিক আছে চল। ভালোই হবে।

—এমন মিনমিন করে বলছিস কেন?

সুতপা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ভাস্কর এখন ডিপ্রেশনে আছে। ওকে আর না ঘাঁটানোই ভালো।

ভাস্কর অন্যদিকে দৃষ্টি ঘোরায়। বোঝাতে চায় ওর আশেপাশে কেউ নেই। দূরের আকাশের নীলাভ দৃশ্য ওর সামনে সৌন্দর্য তৈরি করে না। ও মোবাইলের সুইচ অফ করে দেয়।

দু-দিন পরে যখন তারা রতন আর মানিকের এলাকায় পৌঁছায় তখন কালো মেঘে ঢেকেছিল আকাশ। কিন্তু বৃষ্টি নেই। ওরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

—ভালোই হয়েছে। বৃষ্টিতে না ভিজেই নদীর পাড়ে ঘোরা যাবে।

নিলয় ফেঁাস করে ওঠে, মোটেই ভালো হয়নি। বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে এটাই তো চাই।

সুতপা ঝাড়ি দেয়, আজ তোর ইচ্ছার পূরণ হবে না। চল নদীর ধারে যাই। আমি রতন-মানিকের হাত ধরে নদীর পাড়ে দৌড়াব। আর বলব, স্রোত তুমি আমাদের সঙ্গে থাক।

হা-হা করে হাসে সবাই। হাসতে পারে না ভাস্কর। নদী আর কালো মেঘের পাহাড়ে ওকে বিষণ্ণ করে রাখে। নদীর দিকে যেতে যেতে চমকে ওঠে ওরা। এত ভিড় কেন? কারও ঘর কি ভাঙনে তলিয়ে গেল? তখন কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াতে থাকে দুটো মেয়ে। ভাস্কর ওদের পথ আটকায়।

—কি হয়েছে রে ওখানে?

—মানিক-রতন শ্যাষ। নদী গিলে খাইছু।

—কী? কী বললি?

সুতপার আর্ত চিৎকার বাতাসের বেগে ছুটে যায়। দৌড়ে ভিড়ের কাছে যায় ওরা। লোকজন ওদের নদী থেকে উঠিয়েছে। ঘাসের ওপর রাখা হয়েছে ওদের প্রাণহীন দেহ। পাশ থেকে কেউ একজন বলছে, ওরা যেখানে বসে মাছ ধরছিল সেখানে পাড় ভেঙে ওদের মাথার ওপর পড়ে। আহা রে, আহা রে, ছাওয়াল দুইডা—চারদিকে কান্নার ধ্বনি। বাবা-মাকে সামলানো যাচ্ছে না। ঘাসের ওপর গড়াগড়ি করছে মা। ওদের কাছে বসে কাঁদছে সুতপাও।

ভাস্কর নিজের ভেতর মগ্ন হয়। বাস্তব ওর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। জেগে থাকে তরঙ্গসংকুল নদী। কালো মেঘে ঢেকে রাখা আকাশ। এবং জলের পরশে স্নিগ্ধ চেহারার দুই বালক। এমন অপরূপ দৃশ্য ধারণ করার জন্য ও নিজের ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করে।

ক্যামেরায় দৃশ্যটি ধারণ করার সময় ওর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই। কিন্তু বলা হয় না। বুকফাটা চিৎকারে ও হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে।

স্তব্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষ।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “দেখার ভুবন : ছোট গল্প লিখেছেন সেলিনা হোসেন”

  1. কৌশিক পাল says:

    বেশ ভাল লাগল ….????

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev