| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

প্রেসিডেন্সি কলেজে মেয়েদের বিলম্বিত প্রবেশাধিকার : অসিত দাস

Reporter
অসিত দাস / ৫৩৬ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫

ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, ১৯৪৪ সালের আগে প্রেসিডেন্সি কলেজে মেয়েদের ভর্তির ব্যবস্থা ছিল না। প্রথম ব্যাচে মেয়েরা ভর্তি হয় ১৯৪৪-এ। ১৮১৭ থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি ছিল মানবীহীন। স্বভাবতই ঠাকুরপরিবারের সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে জীবনানন্দ দাশ হয়ে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত কেউই কোএড প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েননি। তাঁদের সময় প্রেসিডেন্সি ছিল ছাত্রীবর্জিত।

তবে মহিলারা তখন পড়তেন কোথায়? মূলত জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেব প্রতিষ্ঠিত বেথুন কলেজেই কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলের মেয়েরা পড়তেন, গ্র্যাজুয়েট হতেন। কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ও চন্দ্রমুখী দেবী সেখানকার প্রথম দুই স্নাতক। কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও শ্রীরামপুর কলেজও তখন কোএডুকেশন কলেজ। আর কোএড ছিল স্কটিশচার্চ কলেজ। যেখান থেকে সেই ১৯৩৬-এ অসীমা চ্যাটার্জী কেমিস্ট্রিতে স্নাতক হয়েছিলেন। বিখ্যাত এই বিজ্ঞানীর কথা অনেকেই জানেন।

অদ্ভুত ব্যাপার যে, ১৯৪৪ সালের প্রেসিডেন্সির কোনও ছাত্রীর নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রথম ছাত্রীর নাম পাচ্ছি ১৯৪৬ সালে ভর্তি হওয়া ইতিহাস বিভাগের উমারানি সেন (মুখার্জি) ও ১৯৪৮ সালের শিপ্রা সরকারের। দুজনেই বিএ ও এমএ-তে প্রথম হয়েছিলেন। ১৯৫৩ একজন গীতা গুহরায়ের সন্ধান পাচ্ছি।

শিপ্রা সরকারকে নিয়ে বাঙালি গর্ব করতেই পারে। এক অনন্য মেধার অধিকারী ছিলেন তিনি। ইতিহাসের এই বিশিষ্ট অধ্যাপিকা কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতে তুফান তুলেছিলেন তাঁর সময়ে। তাঁর মৃত্যুতে তাঁকে নিয়ে লেখক-সাংবাদিক রুদ্রাংশ মুখার্জির স্মৃতিচারণটি উদ্ধৃত করলাম, — “মঙ্গলবার, ২৪ জুন গভীর রাতে শিপ্রা সরকার চির-অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। সময় ছাড়া তাঁর কোনো শত্রু ছিল না। তিনি জন্মেছিলেন ৩০ মে, ১৯৩১ সালে। তাঁর বাবা ছিলেন সুশোভন সরকার — প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের কিংবদন্তী শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী। ইন্টারমিডিয়েট আর্টস পড়েছিলেন আশুতোষ কলেজে। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে এসে বিএ ও এমএ করেন। উভয় পরীক্ষাতেই (বিএ ১৯৫০ এবং এমএ ১৯৫২) তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।

তাঁর প্রথম চাকরি ছিল সুরেন্দ্রনাথ কলেজে, যেখানে তিনি ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত পড়ান। ১৯৫৭ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ গঠিত হলে তিনি সেখানে যোগ দেন এবং ১৯৯১ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত সেখানেই পড়ান।

শিপ্রার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা তাঁকে প্রেসিডেন্সির গৌরবময় ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম করে তুলেছিল। তাঁর মেধা, ব্যক্তিত্বের শান্ত অথচ শক্তিশালী উপস্থিতি তাঁকে কলেজ ও কফিহাউস — উভয় জায়গাতেই এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তিনি বহু জুনিয়রের কাছে — ছেলে ও মেয়ে নির্বিশেষে এক অসাধারণ রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন। ছাত্রজীবন ও পরবর্তীকালে তাঁর বহু অনুরাগী ছিল। তিনি সারা জীবন অবিবাহিত ছিলেন।

শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর গুণ এমন ছিল যে অনেক সিনিয়রও তাঁর মেধায় বিস্মিত হতেন। আমার শিক্ষক তপন রায়চৌধুরী একবার আমাকে বলেছিলেন — যখন তিনি তরুণ প্রভাষক, তখন এমএ পরীক্ষার প্রথম যে খাতা তিনি হাতে পান, সেটি এতটাই নিখুঁত, স্বচ্ছ ও বিশ্লেষণক্ষমতায় ভরপুর ছিল যে তিনি প্রায় ৮০-র ঘরে নম্বর দেন — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতিতে যা অভূতপূর্ব। পরে মনে সন্দেহ জাগলে তিনি সে খাতা নিয়ে যান তাঁর শিক্ষক অনিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। মাত্র হাতের লেখা দেখে তিনি বলেন, “এটা শিপ্রার খাতা। চিন্তার কিছু নেই।” রায়চৌধুরীর বিশ্বাস — কলকাতা, দিল্লি ও অক্সফোর্ডে আজীবন পড়ানোর অভিজ্ঞতায় — শিপ্রার এমএ উত্তরপত্রই তাঁর পড়া সেরা খাতা।

এই একই নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা ও বিশ্লেষণক্ষমতা তিনি শিক্ষক-জীবনেও ধরে রেখেছিলেন। যত জটিলই হোক না কেন, তিনি কখনও কোনো লেকচারে একটি নোটও নিতেন না — কারণ পুরো বক্তৃতাটা তাঁর মাথায় আগেই সাজানো থাকত। তাঁর লেকচারের গঠন ও বিশ্লেষণী দৃঢ়তা তুলনাহীন। আমি তাঁর সরাসরি ছাত্র হতে পারিনি, কিন্তু যখন শিক্ষকতা শুরু করি, তাঁর পদ্ধতি শেখার জন্য যাদবপুরে তাঁর কিছু লেকচারে উপস্থিত ছিলাম। তাঁর লেকচারের কঠোর শৃঙ্খলা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিত প্রেসিডেন্সিতে আমার শিক্ষক অশীন দাশগুপ্তের কথা — যিনি কখনও নোট নিতেন না। দু’জনেই তাঁদের শিক্ষক সুশোভন সরকার থেকে শিখেছিলেন যুক্তি ও সামঞ্জস্যের গুরুত্ব। তবে দাশগুপ্ত ও শিপ্রা দু’জনেই ছিলেন সেই বিরল প্রতিভা—যাঁরা শিক্ষার্থীদেরকে খুব সহজ ধাপের মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতেন বিষয়টির গভীরতম সীমান্ত পর্যন্ত।

দীর্ঘদিন শিপ্রা পড়িয়েছেন ইউরোপীয় ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস। যখন তিনি রুশ বিপ্লব পড়ানোর দায়িত্ব নেন, তখন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বসে ইংরেজিতে যা কিছু পাওয়া যায় সবই পড়েন। কারণ তিনি জানতেন — ভাল শিক্ষক হতে হলে শর্টকাট নেই। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর। টিউটোরিয়াল লেখায় কেউ বই থেকে হুবহু নকল করলে তিনি বইটির নাম ও পৃষ্ঠাসংখ্যা পর্যন্ত লিখে দিতেন মার্জিনে।

শিপ্রা সরকার কখনও বিদেশে পড়তে যাননি — যদিও সুযোগ ছিল। তিনি কলকাতায় থেকে পড়াতে ও কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করতে বেছে নেন। তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাগ্রন্থ লেখেননি। আজকের অ্যাকাডেমিক প্রতিযোগিতায় তাঁকে হয়তো ব্যর্থ বলা হতো। কিন্তু তাঁর বাবার শিক্ষক কুরুভিলা জাখারিয়ার মতোই তিনি অমরত্বের অহংকারকে নিজে থেকে চলে যেতেই দিলেন — তিনি নিজের মনোযোগ রাখলেন পড়ানো এবং ছাত্রদের ওপর।

শিপ্রা ছিলেন সেই বিরল রত্ন — যাকে সাগর শুধু ছাত্রদের কল্যাণের জন্য তুলে দিয়েছে। তাঁকে যারা চিনতেন এবং ভালোবাসতেন, তাঁরা সকলেই উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের শব্দে তাঁকে মনে রাখবেন — “এক প্রিয়, উজ্জ্বল নারী।”

ওটেন সাহেবের সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর বিবাদ-বিসংবাদ প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

সুভাষচন্দ্র বসুর ‘ভারতপথিক’ বইয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর নিজের পড়ার দিনগুলির বিবরণ পাই।

“পুরনো কথায় ফিরে আসা যাক। কলকাতায় আমি ভরতি হলাম প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রেসিডেন্সি ছিল সে সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো কলেজ। গ্রীষ্মের বন্ধের পর কলেজ খোলবার তখনো তিনমাস বাকি। এই তিনমাস আমি বসে ছিলাম না। একবছর আগে কটকে যে ছেলেটির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল, তার দলটিকে খুঁজে বের করলাম। সাধারণত যোলো বছরের একটি ছেলে যদি একা কলকাতার মতো বড় শহরে আসে তবে প্রথম প্রথম সে দিশা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আমার বেলা তা ঘটেনি — কলেজ খোলবার আগেই আমি কলকাতায় বেশ গুছিয়ে বসলাম, পছন্দমতো অনেক বন্ধুও জুটিয়ে ফেললাম।

কলেজে প্রথম কয়েকদিন ভারি মজায় কেটেছিল। যে কোনো বৃটিশ য়ুনিভার্সিটির চাইতে এদেশের কোনো য়ুনিভার্সিটির প্রবেশিকা পরীক্ষা অনেক সহজ বলে এদেশের ম্যাট্রিকুলেটরা ইংরেজ ছেলেদের চেয়ে একটু অল্প বয়সেই কলেজে ভরতি হয়। আমি যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ভরতি হলাম তখন আমার বয়স ষোলোর সামান্য উপরে, তবু কলেজে ঢোকবার সময়ে মনে হল আমি যেন বড়দের পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। অনুভূতিটা বেশ সুখকর সন্দেহ নেই। প্রথম কয়েকটা দিন নতুন বন্ধুত্ব পাতাতেই কেটে গেল। প্রবেশিকা পরীক্ষায় যারা উঁচু স্থান অধিকার করেছিল তাদের দেখবার জন্য সকলেই ব্যগ্র হয়ে ছিল। মফঃস্বল থেকে আসার দরুন আমি গোড়ার দিকে একটু লাজুক ও মুখচোৱা গোছের ছিলাম। কলকাতার হিন্দু এবং হেয়ার স্কুল জাতীয় আরো স্কুল থেকে কয়েকটি অত্যন্ত চালিয়াত এবং সবজান্তা ছেলে এসে আমাদের সঙ্গে ভরতি হয়েছিল। কিন্তু তাদের চালিয়াতি বেশিদিন টেকেনি, কারণ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উঁচু স্থানগুলি বেশির ভাগই অধিকার করেছিল মফঃস্বলের ছাত্ররা, তাছাড়া আরও কিছুদিনের মধ্যেই শহুরে ছেলেদের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিতে শুরু করেছিলাম।

অল্পদিনের মধ্যেই আমি সহপাঠীদের মধ্য থেকে আমার মতোই একদল ছেলে জুটিয়ে ফেললাম। আমাদের এই দলের সকলেই বাইরে বেশ একটু গোঁড়াভাব নিয়ে চলাফেরা করতাম বলে সহজেই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। কিন্তু লোকে কী ভাবে না ভাববে তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতাম না। তখনকার দিনে কলেজের ছাত্রদের মধ্যে এরকম অনেক বিভিন্ন ধরনের দল দেখা যেত। রাজা ও ধনীর দুলাল এবং তাদের মোসাহেবদের নিয়ে এমনি একটি দল ছিল। এরা সেজেগ‍ুজে বেড়াত আর পড়া পড়া খেলত। আর একটি দল ছিল গ্রন্থকীটদের — পুরু কাচের চশমাপরা শান্তশিষ্ট, সুবোধসুশীল গোছের, এই ছেলেরা পড়া ছাড়া জগতে আর কিছুই জানত না। তৃতীয় একটি দলে ছিল অনেকটা আমাদের মতোই একদল পরম উৎসাহী ছেলে—নিজেদের তারা রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের মানসপুত্র বলেই বোধ হয় মনে করত। এই কটি দল ছাড়া একটি গুপ্ত বিপ্লবী দল ছিল। এদেৱ সম্বন্ধে বেশির ভাগ ছেলেই বিশেষ কিছু জানত না। আজকের প্রেসিডেন্সির সঙ্গে সেযুগের প্রেসিডেন্সি কলেজের অনেক প্রভেদ ছিল। অধ্যাপকমণ্ডলীতে সে সময়ে জগদীশচন্দ্র বসু এবং প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো মনীষীদের উপস্থিতি এর একটা কারণ। সরকারী কলেজ হলেও প্রেসিডেন্সির ছাত্ররা মোটেই সরকারভক্ত ছিল না। এর কারণ, লেখাপড়ায় ভালো হলেই যে-কোনো ছেলে প্রেসিডেন্সিতে ঢুকতে পারত। সি. আই. ডি. মহলে প্রেসিডেন্সির ছাত্রদের অত্যন্ত বদনাম ছিল বলে শোনা যায়। ইডেন হিন্দু হস্টেলকে তো বিপ্লবীদের প্রধান আড্ডা বলে ধরা হত। এজন্য পুলিশ প্রায়ই এসে হস্টেল খানাতল্লাসী করে যেত। কলেজে প্রথম দুবছর রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ ভক্তদের প্রভাব আমার উপর খুব বেশি ছিল। দলের অধিকাংশই ছিল ছাত্র এবং এদের নেতা ছিল মেডিক্যাল কলেজের দুজন ছাত্র — সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও যুগোলকিশোর আঢ্য। এরা রামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দের আদর্শকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তবে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য একা জনসেবার উপরেই বেশি জোর দিত। জনসেবা বলতে এদের বিবেকানন্দের শিষ্যদের মতো হাসপাতাল বা দাতব্য চিকিৎসালয় ইত্যাদি স্থাপন করার উপরে বিশেষ আস্থা ছিল না — এদের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার প্রসারের মধ্য দিয়ে দেশের উন্নতি করা। এ ব্যাপারে এদের উপর খৃস্টান মিশনারিদের প্রভাব পড়া বিচিত্র নয়। বিবেকানন্দের শিষ্যরা অর্থাৎ রামকৃষ্ণ মিশনের কর্মীরা বিবেকানন্দের আদর্শ পুরোপুরি অনুসরণ করেননি। আমরা এই ত্র‌ুটি সংশোধন করতে এগিয়ে গেলাম। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হল ধর্ম এবং জাতীয়তার সমন্বয় ঘটানো — শুধু চিন্তায় নয়, কাজেও। তখনকার দিনে কলকাতার রাজনৈতিক আবহাওয়ায় জাতীয়তাবাদ প্রায় অপরিহার্য ছিল।”

প্রেসিডেন্সি কলেজে মেয়েদের আধিপত্য সেই উমা সেন, শিপ্রা সরকারের যুগ থেকেই। গায়ত্রী চক্রবর্তী (স্পিভাক), মালবিকা সরকার, নবনীতা দেব, অনুরাধা লোহিয়া, যশোধারা বাগচীরা তাঁদের দাপট দেখিয়ে গেছেন নিজেদের সময়ে। নামী কবি ও লেখক যশোধরা রায়চৌধুরীও এই কলেজের ছাত্রী। অপর্ণা সেন ইংলিশে অনার্স নিয়ে বিএ পড়তে ঢুকেছিলেন এখানে, কিন্তু মাঝপথেই ছেড়ে দেন। এখনকার পড়ুয়ারাও কম যান না। তবে প্রেসিডেন্সি কলেজে মেয়েদের প্রবেশ ও অধিষ্ঠান এত দেরিতে (১৯৪৪) হল কেন, সেটি গবেষণার বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev