বিধানসভার মতো ঝাড়ু উঁচিয়ে দিল্লির পুরনিগমও দখল করলো অরবিন্দ কেজরীওয়ালের আপ। গত ২৪ বছর ধরে বিজেপির কাছে দিল্লি বিধানসভার জয় অধরা রয়ে গিয়েছে। তবে দিল্লির সরকারে আপ বা কংগ্রেস যেই থাক না কেন, গত দেড় দশক যাবদ দিল্লি পুরনিগমে বিজেপির দাপট অটুট ছিল। প্রসঙ্গত, দিল্লির পুরনিগম তৈরি হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। ২০১২ সালে দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শিলা দীক্ষিত সেই পুরনিগমকে তিনটি ভাগে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। সেই অনুযায়ী তৈরি হয় এনডিএমসি (উত্তর দিল্লি পুরনিগম), এসডিএমসি (দক্ষিণ দিল্লি পুরনিগম) এবং ইডিএমসি (পূর্ব দিল্লি পুরনিগম)। ২০২২ সালে ফের সেই তিনটি পুরসভাকে দেওয়া হল ভেঙে, গড়া হল দিল্লি পুরনিগম বা ‘মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অফ দিল্লি’ (এমডিসি)। তখন রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হালচাল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লক্ষ্য করেন যারা তাদের কেউ কেউ বলেছিলেন, আসলে দীর্ঘ দিন অধরা পুরনিগম পুনর্দখলের উদ্দেশেই মোদী এ কাজ করলেন। তারা ভুল বলেছিলেন একথা বলা না গেলেও কিন্তু বুধবার দিল্লি পুরনিগমের ভোটের ফল বলছে অন্য কথা। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের দিল্লি বিধানসভা ভোটে দিল্লিবাসী ৭০টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৬৭টি আসন দিয়েছিল আম আদমি পার্টির পক্ষে কিন্তু তার দু’বছর পর হওয়া পুরভোটে সেই দিল্লিবাসী ঢেলে ভোট দিয়েছিল বিজেপিকে। তাহলে কোন জাদুতে এদিনের ভোটের ফলে এমন জয় পেলেন কেজরিওয়াল, সিসৌদিয়ারা?
রাজধানীর শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দিল্লি বিধানসভার গুরুত্ব যতটা কেজরি কেজরিওয়ালের কাছে ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল দিল্লি পুরনিগম নির্বাচন। কারণ, রাজধানীর প্রায় ৯৪ শতাংশ এলাকাই দিল্লি পুরনিগমের আওতাধীন। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টি ২০১৫ সালে ক্ষমতায় এলেও দিল্লি পুরনিগম তাদের হাতে ছিল না, সেখানে টানা ১৫ বছর ধরে বিজেপির শাসন ক্ষমতা রাজ করছিল। কেবল প্রশাসনিক দিক থেকেই নয়, দিল্লি পুরনিগম নির্বাচনের এই লড়াইটা অনেকাংশেই বিজেপির জন্য ছিল প্রেস্টিজ ফাইট। কারণ দিল্লি পুরনিগম নির্বাচনেও খোদ প্রধানমন্ত্রীকে বিজেপি প্রচারের মুখ হিসাবে তুলে ধরেছিল। কেবল তাই নয়, গেরুয়া শিবির পুরনিগম নির্বাচনেও একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে দিল্লিতে প্রচারে নামিয়েছিল। কিন্তু বিজেপির সব প্রচেষ্টা কার্যত ঝাড়ুঝড়ে উড়ে গেল। আপ দেড় দশকের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির হাত থেকে দিল্লি পুরনিগমের রাশ কেড়ে নিল। দিল্লি পুরনিগমে আপের দখলদারির মানেটা দাঁড়ালো রাজধানীর শাসনব্যবস্থায় আর কোনও স্তরেই বিজেপির অস্তিত্ব থাকলো না। আপের ঝাড়ুঝড়ে বিজেপির মতোই কংগ্রেসও ধাক্কা খেয়েছে। রাজধানী থেকে কংগ্রেসও কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেল। দিল্লি থেকে কংগ্রেসের কোনও প্রতিনিধি সংসদে নেই, বিধানসভাতেও নেই, পুরনিগমেও মাত্র জনা দশেক কাউন্সিলর অবশিষ্ট রইলেন।
গত পুরভোটের তুলনায় এবারের পুরভোটে আপ তাদের আসন সংখ্যা অনেকটাই বাড়িয়েছে। তুলনামূলকভাবে বিজেপির আসন কমেছে। গত পুরভোটে ২৭০ আসনের মধ্যে আপ পেয়েছিল ৪৮টি আসন। এ বার ২৫০ আসনের মধ্যে আপ জিতেছে ১৩৪টি আসন। অর্থাৎ ২০১৭ সালের তুলনায় আপ ৮৬টি আসন বেশি পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, আপ এই পুরভোটে পেয়েছে ৪২.২ শতাংশ ভোট। যেখানে ২০১৭ সালের পুরভোটে আপ পেয়েছিল ২৬.২৩ শতাংশ ভোট। যদিও শতাংশের বিচারে বিজেপিরও ভোট বেড়েছে। তারা ২০১৭ সালে পেয়েছিল ৩৬.০৮ শতাংশ ভোট। এবার পেয়েছে ৩৯.১২ শতাংশ ভোট। তবে ২০১৭-এর তুলনায় এবার ভোট শতাংশে বাড়লেও, বিজেপির জেতা ওয়ার্ড ১৮২ থেকে নেমে হয়েছে ১০৪।
বিধানসভা ধরে রাখার পাশাপাশি পুরনিগম দখল করতে আপ নতুন করে কৌশল সাজিয়েছিল। আপ বিজেপির সামগ্রিক হিন্দুত্বের নীতির সমালোচনা না করে প্রচারের মূলমন্ত্র করেছিল, রাজ্যের পাশাপাশি পুরনিগমেও থাকুক আপ। তা হলেই দিল্লির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কেজরীওয়ালের জন্য সহায়ক হয়েছে দিল্লি সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্যের প্রচার। বিজেপি গোটা দেশে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রচার করে। অর্থাৎ, কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যেও বিজেপির সরকার। দিল্লি পুরনিগম ভোটে কেজরীওয়াল বিজেপির সেই স্লোগানকেই নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে পাল্টা প্রচার চালিয়েছিলেন। এ বারের দিল্লি পুরনিগমের ভোটে অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল জঞ্জাল সাফাই। বিজেপি যখন জঞ্জাল নিয়ে আপকে বিঁধেছে। আপ তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো জরুরি পরিকাঠামোর কিভাবে আমূল উন্নতি করেছেন কেজরিওয়াল সেই কথা বলেছে। পাশাপাশি পুরনিগমের ভার পেলে জঞ্জাল সাফাই পরিকল্পনা কী হবে, সেকথাও বলেছে আপ নেতারা। এছাড়া বিজেপির পরাজয়ের অন্যতম কারণ পুরসভায় দুর্নীতি, বুলডোজার অভিযান, সর্বোপরি কেন্দ্রে আসীন শাসকদলের প্রতি মোহভঙ্গ।