হনুমান জয়ন্তীর দিন দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরী এলাকায় একটি শোভাযাত্রা ঘিরে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধল আর তার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ওই এলাকার বেআইনি দখল উচ্ছেদ করতে ন’টি বুলডোজার এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ৪০০ পুলিশ নামিয়ে দিল উত্তর দিল্লি সিটি করপোরেশন। এরপরই শুরু হয় বুলডোজারের তাণ্ডব অভিযান। তবে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই শীর্ষ আদালত অবিলম্বে অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই স্থগিতাদেশ অগ্রাহ্য করেই চলতে থাকে ভাঙাভাঙি। এমনকি মসজিদের সামনে থাকা কাঠামোও ভেঙে দেওয়া হয়। এদিকে জাহাঙ্গিরপুরীর দাঙ্গায় ৩ নাবালক-সহ ২৪ জন গ্রেফতার হয়েছে।
প্রশ্ন, দাঙ্গার পরই হঠাৎ করে জাহাঙ্গিরপুরীতে নির্মাণ ভাঙা শুরু হল কেন? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, বুলডোজার দিয়ে দোকানপাট ভাঙা বা গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করা যাবে না। কিন্তু তা স্বত্বেও উত্তর দিল্লি সিটি করপোরেশন আদালতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালালো? মেয়রকে আদালতের নির্দেশিকা পাঠানো স্বত্বেও কীভাবে তা অমান্য করে উচ্ছেদ অভিযান জারি রাখা হল?

অনেকেরই বক্তব্য, ওই দিন দিল্লি সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সেখানকার মুসলমানরা। মুসলমানদের নিপীড়ন ও হয়রানি করতেই সেদিন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। কারণ হিসেবে তাঁরা দিল্লি বিজেপির সভাপতি আদেশ গুপ্তার বক্তব্যের উল্লেখ করছেন, তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, জহাঙ্গিরপুরী মসজিদের পাশাপাশি থাকা সব ‘বেআইনি নির্মাণ’ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। কেবল তাই নয়, আদেশ গুপ্তা এমন উচ্ছেদ অভিযানের প্রশংসা করে বলেন, আমি এই উচ্ছেদ অভিযানকে স্বাগত জানাই। দিল্লি বিজেপি সভাপতির হুঁশিয়ারির মতো একই রকম ঘোষণা ছিল দিল্লি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। এরপরই উত্তর দিল্লি সিটি করপোরেশন থেকে ন’টি বুলডোজার এবং প্রায় ৪০০ পুলিশ জাহাঙ্গীরপুরীতে পৌঁছায়।
প্রসঙ্গত; হনুমান জয়ন্তীর দিন দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরী এলাকায় যে শোভাযাত্রা ঘিরে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা বেঁধেছিল সেই শোভাযাত্রা অনুমতি ছাড়াই যে পথে নেমেছিল তা দিল্লি পুলিশ (কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক) সূত্রেই জানা যায়। কেবল তাই নয়, হনুমান জয়ন্তী উপলক্ষ্যে সেই শোভাযাত্রা পথে নামার পিছনে প্রত্যক্ষ মদত ছিল সংঘ পরিবার এবং সংঘের শাখা সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের। এরপরই সেই শোভাযাত্রা মসজিদের কাছে পৌঁছনোর পর দু-পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ শুরু হয় এবং সংঘর্ষের আকার নেয়। অথচ সেদিনের দাঙ্গার সম্পূর্ণ দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হয় মুসলমানদের কাঁধে। বুঝতে অসুবিধা হয়না জাহাঙ্গিরপুরী এলাকার বাঙালি মুসলিমদের নিশানা করতেই এই দোষারোপ।

যথারীতি বিজেপি-সংঘ পরিবার-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং সংবাদ মাধ্যম ঝাঁপিয়ে পড়ে মুসলমানদের যাতে ওই ঘটনায় পুরোপুরি দোষী করা যায়। ইতিমধ্যে দিল্লি প্রদেশ বিজেপি সভাপতি আদেশ গুপ্তা চিঠি দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট করেই বিজেপি পরিচালিত পুরসভাকে মুসলিমদের দোকান বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য জানিয়ে দেন। সেই আদেশ মাথায় নিয়েই উত্তর দিল্লি পুরসভার মেয়র রাজা ইকবাল সিং বুলডোজার এবং পুলিশ নিয়ে উচ্ছেদ অভিযানকে তদারকি করবার জন্য নেমে পড়েন।
আসলে জাহাঙ্গীরপুরীতে হনুমান জয়ন্তীর দিন যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ লেগেছিল তা সম্পূর্ণভাবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর পিছনে যে সংঘ পরিবার এবং সংঘের শাখা সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রত্যক্ষ মদত ছিল তা আগেই বলা হয়েছে। পরবর্তীতে দিল্লি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা এবং সাময়িকভাবে তা থামানোর ঘটনা কিন্তু আমাদের সামনে আরও একবার সেই প্রশ্ন হাজির করে যে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি দেশটাকে একটা হিন্দু রাষ্ট্র তৈরি করতে চাইছেন? হনুমান জয়ন্তীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষ হল তা দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে, কিন্তু সেই সংঘর্ষের জন্য দায়ী করা হল মুসলমানদের। কেবল তাই নয়, মুসলমানদের নিশানা করে শুরু হয়ে যায় তাঁদের ঘরবাড়ি দোকানপাট গুড়িয়ে দেওয়ার অভিযান। সংখ্যালঘুরা যদি রাজধানীর বুকেই বুলডোজারের নিশানা হয় তাহলে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশে বিজেপি সরকার তাদের প্রতি কতটা যত্নশীল তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়।

অন্যদিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তিনি যে দেশের সংবিধান, শীর্ষ আদালত, কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন করবেন বলে বদ্ধপরিকর হয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর যাবতীয় পীড়ন চালিয়ে যাবেন, এই ঘটনায় তা আরও একবার প্রমাণ হল। তা না হলে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে রমজানের মাসেই চালাতে হল উচ্ছেদ অভিযান আর তাতে নিশানা হল সংখ্যালঘুরা। এরপর হিন্দু রাষ্ট্র গঠনে যে তারা কোনও নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করবেন না, সেটা জাহাঙ্গীরপুরীর ঘটনা থেকেই তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা জানিয়ে দিল যে তারা এমন একটি কট্টরপন্থী হিন্দু দল, যাঁরা অন্য কোনও ধর্মের মানুষকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নয়।