ক্ষুদে দস্যিদের সহজে বাগে আনতে হাঁসের মাংসের সসেজ, কাটলেট ও অন্যান্য সুস্বাদু খাবার মায়েদের কাছে এখন অস্ত্র। যত দিন যাচ্ছে হাঁসের মাংসের চাহিদা বাড়ছে। কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারা ভারতবর্ষ জুড়ে হাঁসের চাহিদা বাড়ায় তৈরি হচ্ছে চাষের খামার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর থেকে সম্প্রতি হাঁস চাষের জন্য অনেকগুলো প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার আর্থিক অনুমোদনও দিয়েছে। সরকার ফার্মিং টেকনলজিকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। যার ফলে বহু বেকার ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রসঙ্গত, হাঁস চাষ বাড়াতে রাজ্য প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, সাধারণত দেখা যায় হাঁস ডিম পাড়া বন্ধ করে দিলে গৃহস্থ অথবা খামারের মালিক তা বিক্রি করে দিচ্ছেন। এটা ঠিক নয়। যে টাকায় হাঁস বিক্রি হয়, সেটা যদি মাংস প্রক্রিয়াকরণে করা যায়, তাহলে দ্বিগুণ দাম পাওয়া যেতে পারে। গবেষকরা আরও জানান, হাঁসের মাংসের বিজ্ঞানসম্মত উৎপাদন ও তা থেকে বিভিন্ন রকম খাদ্য পণ্য তৈরি করা যায় এবং তা বাজারে এনে বিক্রি করাই হবে লক্ষ্য। এ নিয়ে একটি সমীক্ষাও করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই এ রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা পড়বে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। আর তা যদি হয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়বে।

উল্লেখ্য, রাজ্যের ইতিমধ্যে নদীয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় গ্রামের মহিলাদের একটি দলকে হাতে করে এর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে পরবর্তী জেলাগুলিতেও মহিলাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ‘নিউ ডায়মেনশন ইন এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং অ্যান্ড রুরাল এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন থ্রু ভ্যালু অ্যাডেড মিট প্রোডাক্টস’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, হুগলি, বর্ধমান ইত্যাদি জেলায় হাঁসের খামার তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে চাষ। গ্রামের কর্মসংস্থানের একটা ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এদিকে হাঁসের মাংসকে সরকারের লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের মাধ্যমে বাজারজাত করা হচ্ছে এর অন্যতম লক্ষ্য। ভবিষ্যতে হাঁসের সঙ্গে মুরগির মাংস মিশিয়ে পদ বানানো। এছাড়া মাংসে প্রয়োজনীয় ভিটামিন মিশিয়ে তাকে স্বাস্থ্যপোযোগী করে তোলা। কেবল সুস্বাদু মাংস নয়, পর্যাপ্ত ডিম পাওয়া যায়, যা সুস্বাদু হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বর্তমানে কেবল বাড়িতেই হাঁস পোষা হচ্ছে না, এ রেওয়াজ থেকে বেরিয়ে খামারে কিংবা পোল্ট্রি তৈরি করে বিভিন্ন জাতের হাঁস চাষ হচ্ছে। পুকুর-ডোবার দরকার নেই। ডাঙাতেই বেশকিছু জাতের হাঁস চাষ করা হচ্ছে। সেখান থেকে ডিম ও মাংস দুটোই ঘরে আসছে। যা থেকে মোটা অঙ্কের মুনাফা করছেন বেকার যুবক-যুবতীরা। কেবল দেশী হাঁস বা পাতি হাঁস নয়, কিছু বিদেশী জাতের হাঁসেরও চাষ সম্ভব হচ্ছে। কেবল জলে চাষ হয় এ ধারণাটা একেবারে ভুল। পোলট্রি তৈরি করেও চাষ করা সম্ভব। কম খরচ, স্বল্প পুজি। সব ধরনের পরিবেশে এই চাষ হতে পারে। প্রতিদিন দানাশস্য হাঁসের প্রিয় খাদ্য।

পোলট্রি বা খামারে যে সমস্ত প্রজাতির হাঁস চাষ করা যেতে পারে তা হল- পিকিং, আয়লেসবারি, মসকোডি, রুয়েল কাণ্ডয়া, সুইডেন ডাক, আমেরিকান পিকিন, ইন্ডিয়ান রানার ডাক, খাকি ক্যাম্পবেল ইত্যাদি। এই সমস্ত হাঁসের মাংস সুস্বাদু এবং পর্যাপ্ত ডিমও পাওয়া যায় এবং জনপ্রিয়। খাকী ক্যাম্পবেল হাঁসের মাংস বাজারে সুস্বাদুরূপে চাহিদা রয়েছে। ২ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হাঁসের ওজন হতে পারে। ইন্ডিয়ান রানার হাঁস বছরে ১৫০-২০০ টি ডিম পাড়ে। দেড় থেকে আড়াই কেজি মাংস পাওয়া যায় প্রতিটি হাঁস থেকে। প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ সরকার হাঁস চাষ নিয়ে যেমন পরিকল্পনা করেছে এবং এর কর্মসংস্থানের দিকটাও ভাবছে। হাঁসের মাংসের চাহিদা বাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি করে আর্থিক উপার্জনের কথাও ভাবছে। জাপান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইনস, ভিয়েতনামে অসংখ্য হাঁসের খামার ও পোলট্রি রয়েছে। যেখান থেকে তারা বৈদেশিক উপার্জনের একটা পথ বের করেছে। তাই বাকি দেশগুলিতে হাঁসের মাংস ও ডিম রপ্তানি করে এ দেশেও যাতে মোটা অঙ্কের অর্থ আমদানি হতে পারে সেটাও ভাবছে। এজন্য ফার্মিং টেকনলজিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে কলকাতায় ই-গোসারি, গুরগাঁও, ভুবনেশ্বর, হাদরাবাদ, ব্যাঙ্গালোরে বাজার তৈরি হয়েছে।