করোনা মোকাবিলায় সকলে যখন একজোট হয়ে কাজ করছেন তখন বাংলায় দেখা যাচ্ছে অন্য চিত্র। কিছু ফেক নিউজ আর গুজবে ভর করে রাজ্য সরকারের সমালোচনায় আদা-জল খেয়ে নেমেছে বঙ্গ বিজেপি। কেন্দ্রীয় সরকারের বড়ো মন্ত্রী বা বড়ো নেতারা এমন কিছু না করলেও বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের বাংলার নেতাদের আচরণ রীতিমতো নিন্দনীয়। আবার তাঁদের এ সব থেকে বিরত থাকতেও বলছেন না বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব, যা রীতিমতো হতাশাজনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন। বাকিটা বুঝে নিতে অসুবিধা নেই।
তা কী সেই অপপ্রচার? ১) করোনা মোকাবিলায় রাজ্যগুলিকে সরকার দেরি করে কাজে নেমেছে। ২) বাংলা এই অতিমারী রুখতে প্রস্তুতি নেয়নি। ৩) করোনা রোগী চিহ্নিত করতে পরীক্ষা ঠিকমতো হচ্ছে না। ৪) মৃতের সংখ্যা গোপন করা হচ্ছে। এই চার অপপ্রচার রুখতে তথ্য সামনে এনেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন।

আমরা ডেরেকের কথা শুরু করছি শেষ পয়েন্ট থেকে।
রাজ্যে করোনায় মৃত্যু হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে প্রথিতযশা চিকিৎসকদের নিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বিশেষজ্ঞ অডিট কমিটি গড়েছেন। এতে না আছেন কোনও রাজনৈতিক নেতা, না আছেন কোনও আমলা। বাংলার বিজেপি নেতারা এই কমিটির দিকে সংশয়ের আঙুল তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত না করে একটু তাঁদের দলের শাসনে থাকা হরিয়ানার দিকে তাকান।
সপ্তাহ খানেক আগে ইতালি থেকে আসা এক মহিলা পর্যটক গুরুগ্রামে এক হাসপাতালে মারা যান। তিনি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ছিলেন। হরিয়ানার স্বাস্থ্য দফতর জানায়, তিনি করোনা থেকে সেরে উঠলেও মারা গিয়েছেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। চিকিৎসকদের কথা আমরা বিশ্বাস করছি। তাহলে হরিয়ানার মতো এ রাজ্যের প্রথিতযশা চিকিৎসকদের কথা বিশ্বাস করতে কোথায় আপত্তি? মৃত্যুর সঠিক কারণ খতিয়ে দেখে অতিমারীতে মৃত্যুর হার সঠিকভাবে জানালে মানুষ বিভ্রান্ত বা আতঙ্কিত কোনওটাই হবেন না। তাই রাজনীতিবিদদের অপপ্রচারকে পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই।

এবার আসি আগের পয়েন্টগুলোতে।
করোনা মোকাবিলায় বাংলা দেরিতে নেমেছে এটা সর্বৈব মিথ্যা। বরং কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক আগেই তৎপর হয়েছে রাজ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে প্যানডেমিক ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে, ৬ মার্চ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠকে করোনা মোকাবিলায় কুইক রেসপন্স টিম গঠনের কথা বলেছিলেন। বাংলার সঙ্গে তিনটি দেশের সীমান্ত ও অনেক রাজ্যের সীমানা থাকায় মুখ্যমন্ত্রী চেকপয়েন্টগুলিতে নজরদারি বাড়িয়ে কিছু বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানান। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে তৈরি রাখা হয় আইসোলেশন ওয়ার্ড।
বাংলায় যখন এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তখনও কেন্দ্রীয় সরকার একে সিরিয়াসলি নেয়নি। বিজেপির ফোকাস তখন মধ্যপ্রদেশে সরকার দখল। ডেরেক জানান, করোনার প্রভাব কী হতে পারে সেই বিষয়টি আমরা ৫ মার্চ সংসদে উত্থাপন করি। কয়েকদিন বাদে রাজ্যসভাতে জিরো আওয়ার নোটিশ দিয়ে বলি, ডাক্তারদের পরামর্শমতো ২০ সেকেন্ড হাত কীভাবে ধুতে হবে তা দেখানোর অনুমতি দিন। অনুমতি দেওয়া হয়নি। মার্চের মাঝামাঝি তৃণমূল সাংসদরা মাস্ক পরে সংসদে গেলে তা খুলে ফেলতে বলা হয়। কটাক্ষ করা হয় গিমিক বলে।
আর এই সময়ের মধ্যেই বাংলা অনেক ব্যবস্থা নেওয়াতে সংক্রমণ বেশি ছড়ায়নি। মার্চের মাঝেই বাংলায় ৫৮২টি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন গড়া হয়েছিল। সম্ভাব্য রোগী ও পরিজনদের আলাদা রাখার সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যে ৬৮ হাজার মানুষকে কোয়ারেন্টিন বা হোম আইসোলেশনে রাখা হয়, হয় তাঁরা বিদেশ থেকে এসেছেন বা করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন।

এবার আসা যাক নমুনা পরীক্ষা নিয়ে। কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল, রাজ্য সরকার টেস্টিং কিটের অর্ডার নিজে থেকে দিতে পারবে না। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অধীনে থাকা আইসিএমআর তা আমদানি করে রাজ্যগুলিকে দেবে। যেহেতু সাপ্লাই কম, তাই যেখানে অবস্থা বেশি খারাপ সেখানে আগে বেশি করে কিট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় আইসিএমআর। বাংলা যেহেতু আগে থেকেই তৎপর ছিল তাই ওই রাজ্যগুলির তালিকায় বাংলা ছিল না। অন্য রাজ্য কিট বেশি পেয়ে পরীক্ষা করেছে, আক্রান্তদের সংখ্যা সেসব রাজ্যে বেশি। ৩১ মার্চ অবধি বাংলায় পাঠানো হয় ৪০টি কিট। বাংলা তাহলে প্রস্তুতি নিয়ে যে অবস্থা খারাপ হতে দেয়নি সেটা কি অপরাধ?
আইসিএমআর প্রথমে বলেছিল, কিট যেহেতু কম তাই উপসর্গ নেই এমন ক্ষেত্রে নমুনা পরীক্ষার দরকার নেই। সেই নির্দেশ মেনে কাজ হচ্ছিল। এখন বিদেশ থেকে কিট আসছে। অনেক পরে আইসিএমআর বলছে, উপসর্গ ছাড়াও নমুনা পরীক্ষা করতে হবে। রাজ্য সেই নির্দেশ পালন করছে। আরও বেশি করে পরীক্ষা চলছে।

লকডাউনে বহু মানবিক পদক্ষেপ করেছে মা-মাটি-মানুষ সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার যেসব জায়গায় নজরদারি বাড়াতে বলেছে তার বাইরেও মাইক্রো প্ল্যানিংয়ে জোরকদমে নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার। কেন্দ্রের কাছে ৫ লক্ষ পিপিই চেয়ে ৩ হাজার হলুদ পিপিই মিলেছে। আর্থিক সাহায্য মেলেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শ মেনে কেন্দ্র বিমান চলাচলে আগে বন্ধ করলে এত খারাপ অবস্থা দেশে হতো না। তবু রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কেন্দ্র-রাজ্য একসঙ্গে কাজ করছে। স্বাস্থ্য রাজ্যের বিষয়, তবে এই অতিমারী জাতীয় বিষয় বলে। তা সত্ত্বেও বাংলার বিজেপি নেতারা হাওয়া গরম করে কুৎসা, অপপ্রচারের মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। রাজ্য সরকারের বদনাম করতে চাইছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ডেরেকের এই বক্তব্য প্রচার করে তা রুখে দিন তৃণমূলের সৈনিক ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিরা।