| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

‘দেড়শো গজে জীবন’ এবং উপন্যাসের চাল চলন : মুম রহমান

Reporter
মুম রহমান / ৫৫৩ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬

উপন্যাস কী?

সচারাচর যে সব সংজ্ঞা পড়ি তা থেকে ধারণা করি, উপন্যাস হলো গদ্যে লেখা বিস্তৃত কাহিনি, যা মূলত বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে প্রকাশিত আর কাহিনি মানেই স্থান, কাল, পাত্র বিচার্য। মুশকিলটা হলো এ সংজ্ঞায় ওয়াল্টার স্কট, জেন অস্টিন, চার্লস ডিকেন্স, আয়ান ফ্লেমিং, হেডলি চেজ থেকে শুরু করে বঙ্কিম, মানিক, বিভূতি, কমলকুমার এমনকি প্রণব ভট্ট, আনিসুল হকরাও ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠেন। অথচ আর যাই হোক একজন প্রণব কিংবা আনিসুলকে তো তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতি, মুরাকামি, উমবার্তো ইকো’র কাতারে ফেলা যায় না। এইখানেই উপন্যাসের চলতি সংজ্ঞার সঙ্গে উপন্যাস ধারণার বিভেদ।

আয়তনে ছোটগল্প কিংবা বড় গল্পের চেয়ে বড়, একাধিক চরিত্র, জমজমাট কাহিনি, নির্দিষ্ট সময় বা স্থানের দীর্ঘ বর্ণনাই নেহাত উপন্যাস নয়। গল্প বলা, দীর্ঘ গল্প বলা সে তো আরব্য রজনী কিংবা রামায়ণ মহাভারতেও আছে। কিন্তু নেহাতই গল্প আর রচনার দৈর্ঘ্য দিয়ে কি উপন্যাস হয়? যদিও ‘Aspects of the Novel’ গ্রন্থে ই এম ফস্টার বলছেন, ‘উপন্যাসের মৌলিক বিষয় হলো গল্প। অর্থাৎ কাহিনি বয়ানই হচ্ছে উপন্যাসের প্রধান উপাদান যা না থাকলে উপন্যাসের অস্তিত্বই থাকে না।’ আধুনিক পাঠক কিন্তু জানেন, উপন্যাসের কাহিনি বয়ানের চেয়েও এর কাহিনি বয়ান কৌশল, এর বিষয় এবং মৌল ভাবনাটি আজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামুর ‘আউটসাইডার’, কাফকার ‘ট্রায়াল’, মানিকের ‘চতুষ্কোণ’, কমলকুমারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ অবশ্যই কাহিনি বয়ানের চেয়ে বেশি কিছু তুলে ধরে।

এইসব কথাই মনে পড়ল পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একটি উপন্যাস পড়তে গিয়ে। সসীমকুমার বাড়ৈ রচিত ‘দেড়শো গজে জীবন’ নামক উপন্যাসটি আলোচনার আগে উপন্যাসের চাল-চলন, গতি-প্রকৃতি নিয়ে খানিকটা ভাবতে ইচ্ছে করল। কারণ প্রচলিত সংজ্ঞা দিয়ে যাদেরকে উপন্যাস বলব তারা যথার্থ উপন্যাস নয়। যথার্থ উপন্যাসের রূপটি এই সময়ে এসে উপলব্ধি করা জরুরি বিবেচনা করি। কারণ উপন্যাসের ছদ্মবেশে ইতোমধ্যেই অনেক একঘেয়ে দীর্ঘ গদ্য ঢুকে গেছে বাংলা ভাষায়।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে, প্রচলিত সংজ্ঞার কয়েকটা নমুনা নেয়া যাক আগে। এখানে প্রথমেই আমি বিখ্যাত কয়েকটি অভিধানে উপন্যাস বিশেষ্য পদের যে সংজ্ঞা দেয়া হয় তা নিয়ে একটা চর্চা করছি। ম্যারিয়ম ওয়েবস্টার ডিকশনারির মতে, উপন্যাস হলো : ‘an invented prose narrative that is usually long and complex and deals especially with human experience through a usually connected sequence of events’।

এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যাচ্ছে উপন্যাস হচ্ছে একটা উদ্ভাবিত গদ্য, সে- দীর্ঘ এবং জটিল, বিশেষত উপন্যাস মানুষের অভিজ্ঞতাকে ধারাবাহিক ঘটনার আলোকে তুলে ধরে। এই সংজ্ঞা আধুনিক অনেক উপন্যাসেই খাটে না, যেহেতু ধারাবাহিক ঘটনা বয়ানের দিন শেষ প্রায়, এমনকি বেকেটের মতো ঔপন্যাসিক পারলে ঘটনাকেই বাদ দিতে চেয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘ ব্যাপারটি বেশ জটিল। মার্কেজের বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড’ (১৯৬৭) কম বেশি সব সংস্করণেই ৪০০ পৃষ্ঠার। অন্যদিকে মার্কেজের আরেকটি বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘মেমোরিস অব মাই মেলানকোলি হোর্স’ (২০০৪) কম বেশি সব সংস্করণেই ১০০ পৃষ্ঠার। ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’ মার্কেজের দ্বিতীয় উপন্যাস আর ‘আমার বিষণ্ন পতিতাদের স্মৃতি’ তাঁর শেষ উপন্যাস। উল্লেখ্য নিজের রচিত ‘ইন ইভিল আওয়ার’ (১৯৬২) উপন্যাসটিকে মার্কেজ পরবর্তীতে অস্বীকার করেছিলেন এবং এই উপন্যাসের একাধিক চরিত্র, কাহিনি ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতায়” ঠাঁই পেয়েছে। সেই বিবেচনায় অনেক সমালোচকই ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’কে মার্কেজের প্রথম উপন্যাস বলেন। এখন, প্রতিপাদ্য হলো, প্রথম উপন্যাস ৪০০ পাতা দৈর্ঘ্যের আর শেষটি ১০০ পাতা দৈর্ঘ্যের, দুটিই মার্কেজের কালজয়ী উপন্যাস। প্রসঙ্গত, একটি তথ্য হয়তো কারো কাজে লাগবে, প্রথম উপন্যাস থেকে শেষ উপন্যাস নাগাদ আসতে (১৯৬৭-২০০৪) মার্কেজ পৃষ্ঠা সংখ্যা ক্রমশ কমিয়ে এনেছে। অন্যদিকে তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, জেন অস্টিন, ডিকেন্স প্রমুখরা একাধিক ঢাউস আকারের উপন্যাস লিখেছেন। আবার জয়েসের ‘ইউলিসিস’ আকারে বিশাল, তুলনায় ‘আ পোট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট এজ আ ইয়ং ম্যান’ অনেক ক্ষুদ্রাকৃতি। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ ঢাউস উপন্যাস, অন্যদিকে ‘শেষের কবিতা’ বেশ কৃশকায়। তাহলে উপন্যাসের আকার সে অর্থে উপন্যাসে সংজ্ঞায়নে খুব কাজে দেয় না। কাজেই ক্যামব্রিজ ডিকশনারি উপন্যাসের সংজ্ঞাকে আমরা বাদ দিতে পারি অনায়াসেই। কেননা, তারা বলছেন, উপন্যাস হলো : ‘a long, printed story about imaginary characters and e vents’। বিশেষত দীর্ঘ শব্দটিই দ্বিধান্বিত। অন্যদিকে ছাপা হলেই তা যে কেবল উপন্যাস হবে তাও তো নয়। আর একদম বাস্তব ঘটনা ও চরিত্র নিয়েও উপন্যাসের নজির কম নয়। ঐতিহাসিক উপন্যাসের কথা বাদ দিলাম, সাধারণ উপন্যাসেও আমরা ঘটনা ও চরিত্রের বাস্তবতা নিরিখ করি প্রায়শই।

আরেকটি বিশ্বখ্যাত অভিধান অক্সফোর্ড ডিকশনারি বলছে : ‘A fictitious prose narrative of book length, typically representing character and action with some degree of realism.’ এখানেও বইয়ের সীমায় উপন্যাসকে ধরা হচ্ছে। সৈয়দ শামসুল হক একবার হুমায়ূন আহমেদকে বলেছিলেন, “আপনি এতো ফর্মা মেপে উপন্যাস লেখেন কেন?’ এর একটা মোক্ষম জবাব হুমায়ূন দিয়েছিলেন। কিন্তু আলোচ্য বিষয় সেটি নয়, বিষয় হলো বইয়ের মাপ, উপন্যাসের মাপ, মনে রাখতে হবে ভিক্টর হুগো’র ‘লা মিজারেবল’ যেমন একটি উপন্যাস, তেমনি হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ একটি উপন্যাস। হুগোর বিখ্যাত মোটা উপন্যাসের পাশে হেমিংওয়ের বিখ্যাত উপন্যাসটি আকারে যথেষ্ট চিকন-চাকন। আবার অক্সডোর্ড অভিধানে চরিত্র এবং ঘটনার খানিকটা বাস্তবতার কথা বলা হয়েছে, এটাও জানা কথা এইসব বাস্তবতার দিনও ফুরিয়েছে।

তবে বাকি রইল কী!

আমি বলব, বাকি যা যা রইল তা-ই উপন্যাস। স্বার্থক উপন্যাস রচনার দৈর্ঘ্য, কাহিনি বিস্তার, আর কথিত বাস্তবতার সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। তারাশঙ্কের ‘কবি’ উপন্যাসে চোরের বংশের ছেলে কবি হয়ে যায় তা কোনো প্রচলিত বাস্তবতা নয়। অন্যদিকে মানিকের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে যে ময়না দ্বীপ তা প্রচলিত জগতের বাইরের কোনো স্বপ্নময় কিংবা আদর্শিক স্থান। আমার উপন্যাস সেই গদ্য যেখানে স্থান-কাল-পাত্র ক্রমশ মহাকালের দিকে, মহাবিশ্বের দিকে ধাবিত।

আদতে অভিধানের এই সব সংজ্ঞার প্রতিধ্বনিই পাওয়া যায় প্রাতিষ্ঠানিকদের কাছেও। তাত্ত্বিকরাও খুব বেশি এগুতে পারেননি। বরং খোদ উপন্যাস লিখে যারা বিশ্ব জয় করেছেন তাদের কাছে যাওয়া যায়। ডোরিংস লেসিং বলেছেন : ‘উপন্যাসের কোনো সূত্র নেই। কখনোই ছিল না, এবং কখনোই হবে না।’ আর ডি এইচ লরেন্স বলেছেন আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা, ‘উপন্যাস হলো জীবনের একটা উজ্জ্বল বই।’ কোনো সূত্র ছাড়াই বলা যায়, বর্ণনা, কাহিনি, ঘটনা ইত্যাদির চেয়ে এই উজ্জ্বল বই হয়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ। এই উজ্জ্বলতাকে প্রাণ প্রাচুর্যও বলতে পারি। ক্যামু অবশ্য আরো একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘উপন্যাস আর কিছুই নয় কেবল দর্শনকে চিত্রের আকারে প্রকাশ করা।’ এলবায়ার ক্যামুর ‘আউটসাইডার’ পড়লে এ কথাটি পরিষ্কার হয়ে যায়। জীবনকে, পৃথিবীকে দার্শনিক একটা বীক্ষায় উপস্থাপন করতে পারাও উপন্যাসের বড় বৈশিষ্ট্য। হেমিংওয়ের পাতলা উপন্যাস ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ মানুষ ও মানব সভ্যতা এবং জীবনের নিগূঢ় দর্শককে চিত্রায়িত করে। কত কম পরিসরে কত গভীরতর কথা বলা যায় ‘আইসবার্গ’ তত্ত্বের জনক হেমিংওয়ে তা জানতেন। এইখানে এসে আমরা উপন্যাসের একটু গভীরতর দায়ের কথা ভাবতে পারি। স্রেফ একটা কাহিনি বর্ণনা করলে সেটা উপাখ্যান হয়। মহৎ কোনো উপন্যাসই নিছক উপাখ্যান নয়। একটা দর্শন তুলে ধরে ক্যামু, কাফকা কিংবা জয়েসগণ। মার্কেজ, কুন্দেরাগণ ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, সমকালকে তুলে ধরেন। হিলারি ম্যান্টেল তো বলেন, একটি উপন্যাস হবে একটি প্রশ্নের বই, উত্তরের বই নয়।’ সোজা কথা, উপন্যাস ভাবাবে। নিছক গল্প বয়ানের জাদু, চরিত্রর চাকচিক্য, ঘটনার ঘনঘটা নয়, উপন্যাস চেতনা আর বোধে হাওয়া দেবে। এইখানেই স্বার্থক আধুনিক উপন্যাসের বাহাদুরি।

এই বাহাদুরি আমি খুঁজে পেয়েছি সসীমকুমার বাড়ৈ রচিত ‘দেড়শো গজে জীবন’ উপন্যাসে। শুরুতেই উপন্যাসের শিরোনাম দিয়ে শুরু করা যাক। ‘দেড়শো গজে জীবন’ শিরোনামের মধ্যেই একটা শ্লেষ, একটা তীব্র সত্য এবং কৌতূহল বিরাজমান। আধুনিক স্কটিশ ঔপন্যাসিক ম্যুরিয়েল স্পার্ক বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় একটা শিরোনাম দিয়ে শুরু করি… আর তারপর নানা অর্থ করে কাজ এগুতে থাকি। একটি উপন্যাস, আমার জন্যে সদাই শিরোনামকে বর্ধিত করা।’ আদতে শিরোনাম তো শুধু শিরোনাম নয়। এটি ঔপন্যাসিকের বিষয় এবং ভাবনার সূতিকাগার। এই শিরোনামই একটা বেসিক কোডের মতো কাজ করে কোনো কোনো মহৎ উপন্যাসে। যেমন আউটসাইডার, মেটামরফসিস, ইউলিসিস—তাদের শিরোনামেই পুরো উপন্যাসের অনেকটা আদল তুলে ধরে। সসীমকুমারের ‘দেড়শো গজে জীবন’ তেমনি স্বার্থকনামা। শিরোনাম থেকে বিষয়টা ধরা যায়।

সসীমকুমার বাড়ৈ-এর উপন্যাসের বিষয় বস্তু হলো রাষ্ট্রবিহীন মানুষের জীবন। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী অংশে যেখানে আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা আইন অনুযায়ী তৈরি হয়েছে নো-ম্যান্স ল্যান্ড। অর্থাৎ দুই দেশের সীমান্তের নির্দিষ্ট এলাকা জুড়ে কোনো মানুষ বাস করতে পারবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এইখানে কিছু মানুষ বাস করে। এই সীমান্তরেখা তৈরির আগ থেকেই তাদের ভূমি এইখানেই। এইসব মানুষের পাশবিক জীবনের আনন্দ-বেদনার চিত্রায়ণ পাই ‘দেড়শো গজে জীবন’ উপন্যাসে।

ব্রিটিশ মানব-ভূবিদ্যা বিশেষজ্ঞ আলসডেয়ার পিঙ্কার্টনের মতে, এগারো শতকের ‘ডুমসডে বুক’-এ নো ম্যান্স ল্যান্ডের কথা জানা যায়। সেখানে লন্ডন শহরের সীমান্ত দেয়ালে বাইরের অংশই ছিল মনুষ্যহীন ভূমির অংশ। রাজা উইলিয়াম দ্য কনকুরারের আদেশে ‘গ্রেট সার্ভে’র অংশ হিসাবেই ১০৮৬ খ্রিস্টাব্দে ‘ডুমসেডে বুক’ রচিত। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ১৩২০ সালে বৈধ সীমারেখার বাইরের অংশকে বোঝাতে ‘nonesmanneslond’ শব্দের বুৎপত্তির কথা জানতে পাই। লন্ডন শহরের বাইরের নির্বাসিত এলাকাকেই এমন বলা হতো। দুই বিশ্বযুদ্ধের পর সাধারণত বিবাদমান শত্রু আর মিত্রপক্ষের সীমারেখার মধ্যবর্তী স্থানকে নো-ম্যান্স ল্যান্ড বলা হতো। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে শত্রু-পক্ষ আর মিত্র-পক্ষ বলে কোনো আনুষ্ঠানিক বিভাজন নেই। কিন্তু তবুও আজও এখানে নো-ম্যান্স ল্যান্ড আছে, আছে সেখানে আটকে পড়া কিছু মানুষ। রাষ্ট্র নামের যে রাজনৈতিক ভূখণ্ড তার মধ্যে আটকে পড়া মানুষদের জীবন এখানে মানবেতর।

এই মানবেতর জীবনযাপন আর সীমান্তরেখার টানাপোড়েন দেখতে পাই সসীমকুমার বাড়ৈ-এর ‘দেড়শো গজের জীবনে’। সে জীবন কেমন আর উপন্যাসের বিষয়, বোধ কেমন তার নমুনা দিতেই কয়েকটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক :

‘দেড়শো গজের মানুষেরা শুনে আসছে, নো ম্যানন্স ল্যান্ডে বসবাস বে-আইনি। বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষের জন্ম ভিটা এখানে, দেশভাগের পর এক সাহেব এলেন বাড়ি ঘর রান্নাঘরের উপর দিয়ে লাইন দাগিয়ে বলল—জিরো লাইন, শূন্যরেখা। তখন থেকে শোনা, তারা নো ম্যানন্স ল্যান্ডের অধিবাসী। নব্বই-এর দশকের গোড়ায় কাঁটাতারের এপাশে বন্দি করে দায় সেরেছে নিজেদের দেশ। এ বাদে তারা কিছু জানে না।’

অন্যদেশের এক মানুষ হুট করে এসে কেমন হাস্যকর ভাবে এই আকস্মিক সীমারেখা টানলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। ‘কার বাড়ি, কার টাট্টির উপর দিয়ে রাডক্লিফ সাহেব লাইন টেনে দিলেন, এটা জিরো লাইন, কবে থেকে অর্থবহ হয়ে মাথাচাড়া দিল দেড়শো গজ, কাঁটাতার?’

সসীমকুমার বাড়ৈ প্রকারান্তরে এই বর্ডারকে সাপের মতোই দেখেছেন। তার বর্ণনায় পাই, ‘বর্ডারটা সাপের মতো বাঁকাত্যাড়া। জিরো লাইনে পোঁতা পিলারের একদিকে বাংলাদেশ অন্য দিকে ইন্ডিয়া লেখা। আন্তর্জাতিক আইনে জিরো লাইন থেকে দেড়শো গজ ছেড়ে কাঁটাতার, ভিতর পাশে বর্ডার রোড। কাঁটাতার-রাস্তা বর্ডার লাইনের সমান্তরাল নয়, মোটামুটি সোজা, কাঁটাতার আর পিলারের খাঁজে ঢুকে আছে কোথাও পাঁচশো গজ, কোথায়ও হাজার গজ। খাঁজে আটকে থাকা ভুখণ্ডে মৃতপ্রায় মানুষেরা পেলিকান পাখির মতো নিজেদের রক্ত সিঞ্চন করে বাঁচে।’

এই পেলিকান পাখির মতো কিংবা ইঁদুরের মতো অসহায় মানুষের গভীরে যেতে পারি ‘দেড়শো গজে জীবন’ উপন্যাসের মাধ্যমে। ‘হামারা না পারম ঐত্তিকেনা যাইতে, হামরা খাঁচাত পড়া নেংটি ইন্দুর। বুঝছং নেংটি ইন্দুর। হামাগো কি হবে?’ এই অসহায় মানুষগুলো কখনোবা জীবনমৃত। ‘মোরা এত্তি সব বেওয়ারিস লাশের মতন। মোগো জমা-জমি, বউ সব এজমালি সম্পত্তি। বাংলাদ্যাশের যে কেউ আমাগ সম্পত্তি নুট করি নিতে পারে আবার মাইয়াগো চদন দিতে পারে। বিএসএফ মোগো ছাড়ি কথা কয়? মাইয়ে- ছেইলে ধরে টানে সুযোগ পাইলে। হিপারের বিজিবিও তক্কে তক্কে থাকি। কোনঠে জাইম জানি নাই, হুপারে মোগো কিছু নাই নিমাইদা।’ এই মানুষগুলো দুই দেশের বর্ডারের মাঝখানে পড়ার অপরাধেই নিত্য অবহেলা, গঞ্জনা আর অত্যাচার সয়ে যায়। তারা যেন দুইধারি তলোয়ারের মাঝখানে বসবাস করে। বিজিবি কিংবা বিএসএফ কেউই তাদের মিত্র নয়। বিস্তির ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টা আলাদা। ‘দেড়শো গজ তাকে এড়িয়ে চলে।’ সেই আলাদা সুবিধা পাওয়ার কারণটা অবশ্য ক্ষুব্ধ বিস্তির কণ্ঠেই শুনতে পাই, ‘কাঁচা মাংসু লোভে দ্যাশের কাঁটাতারের গেটও রাইতে খোলে কাকা। আর ওদ্যাশের কুন বেড়া নাই কাকা। মোর হিপারেও জাইতে বাধা নাই হুপাওর খোলা। মাংসু খাদক উপাসী কত লকলা থাকে বর্ডারের দুই ধারে। থানা পুলিশ, বিএসএফ, বিজিবি আর বর্ডার সোগোল করবারি কাঁচা পইসার মালিক। রাইতে কত খদ্দের।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিস্তিকে নিজের মানুষের মধ্যেই বিপদে পড়তে হয়। কুড়িয়ে পাওয়া একটি মেয়েকে বাঁচাতে তাঁর নিজের সংগ্রামের অন্ত নেই। যেখানে নিজের জীবন বিপন্ন, নিজের স্বামীর খোঁজ নেই, বেঁচে থাকতে শরীর বিক্রি করতে হয়, আদিম প্রবৃত্তি তাড়ানো জীবন; সেখানেও বিস্তির মতো মানুষেরা অন্য আরেকটি প্রাণের জন্যে লড়াই করে। লড়াইটা ‘দেড়শো গজে জীবন’-এর অন্যতম অংশ।

একজন ফরিদা আর ছেলে নাজিবকে খুঁজতে একত্র হয় অন্যেরাও। ‘দেড়শো গজ, দুই গজ, আড়াইশো গজ… সাড়ে সাতশো গজের বাসিন্দারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে কায়েতের বাড়ি গেটে। সন্ধ্যা নামছে দিনের চেয়ে দ্রুত বেগে। ভারত-বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। অন্ধকারে ঢেকে আছে কাঁটাতার, দেড়শো গজ। গেট প্রহরীশূন্য। লোকগুলি বন্ধ গেট ধরে খাঁচাবদ্ধ প্রাণীর মতো গোত্তা দিতে লাগল। পারলে লোহার গেট ভেঙে ফেলে। তারা সমবেতভাবে পাগলের মতো চিৎকার করে ডাকতে শুরু করল—ফরিদা, ও ফরিদা ফিরি আয় রে। নাজিব বাপরে ফিরি আয়৷’ কিন্তু নিয়তি এই দেড়শো গজের সীমানায় বড় নিষ্ঠুর। ‘বর্ডারে ঝুলে থাকা গাঢ় অন্ধকারে ধাক্কা খাওয়া শব্দ প্রতারিত হয়ে ফিরে আসছিল একে একে। কিন্তু মা ছেলে ফিরল না।’ এক পোটলা লবণ পাচারের অপরাধে নাজিবকে হেনস্থা হতে হয়। সে জান নিয়ে ফিরে আসে। কিন্তু তার মা ‘ফরিদার দেহ মিলল ধুমের খাতার দিকে পাটক্ষেতে। অনেক মানুষে খুবলে খাওয়া উদলা যোনির রক্তাক্ত-মুখে মাছি ভনভন করছিল। চোখ দুটি যেন অবিশ্বাসে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ভারী বুটের চাপে লণ্ডভণ্ড পাট গাছ লজ্জায় মাথা নত করে আছে।’

পাট গাছ লজ্জাবনত হয়, কিন্তু বিএসএফ বা বিজিবি’র প্রাণে কেনো দোলা লাগে না। সীমান্ত রক্ষার নামে তারা নিয়মের দাস হয়ে ওঠে। অচেনা যক্ষপুরীর মতো এখানে মানুষ নেই, কেবল আছে সংখ্যা। কেন জানি এটুকু পড়তে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরীর কথা মনে পড়ছিল, সেখানে মানুষ কেবলই সংখ্যা চিহ্ন।’ হয়তো মানুষের চেয়ে কাগজ আর আইনের অনুশাসন বড় বলেই এমন মনে হয়। ভোটার কার্ড থাকলে জোনাকুর মতো মানুষরা এখানে একটু স্বস্তিতে বাঁচে। ‘কার্ডটাই তো বর্ডার এলাকায় আসল, মানুষ এখানে শুধু রক্ত মাংসের ডেলা। কার্ড একটা জীবিত সত্তা।’

তাই মৌলু আর অরার পুত্রের নামকরণ এবং নাগরিকত্বের কাগজ নিয়ে একসময় পুরো এলাকার মানুষ লড়াই করে। মৌলু আর অরার নবাগত পুত্রের নাম রাখা হয় রুদ্র প্রতাপ বর্মন। পরিবারের সবাই মিলে এই নাম ঠিক করে। দাদা খরু বলেছিল, ‘মুই খরার বছর জন্মাইছিনু বলি নাম হৈল খরু। সারাটে জীবন যেনং খরায় পুড়িয়া গেইছি। মঙ্গলবাবে জন্মান মাইয়া মঙ্গলিরে ঘরে আনছি তেঁও মোর খরা কাটল না। হামাগে রাজবংশি নিয়ম মানং পোলা মাইয়ার ভাল্ ভাল নাম রাখিনু নাকিন খরা কাটল কই? নাতিটা আসে আন্ধার রাইতে, হামাক নিয়ম আনুসারে উয়ায় নাম হয় আন্ধারু নাকিন উয়ায় নামত্ দুখ লাগতে দিবা নাই। জন্মান থাকি নাতিটা কত দুখ পাইছে। উয়ায় আর দুখ কষ্টের নামের বান্ধিয়া রাখবা না।’ বর্মন পাড়ায় বিবাহই হয়নি, এখন দীর্ঘ পঁচিশ-ত্রিশ বছর পর শিশুর জন্ম হয়েছে, অরা আর মৌলুর এই সন্তান রুদ্রকে ঘিরে হিন্দু-মুসলিম পরিবার একসাথে স্বপ্ন দেখে। রাতের অন্ধকারে অরার ব্যথা ওঠে। যথাবিহিত ডাক্তার, দাই না- পাওয়ায় রাতের আঁধারে বর্ডার পার করে বাংলাদেশের এক হাসপাতালে জন্ম হয় রুদ্রর। কিন্তু সেই জন্ম সনদ নিয়ে চলে লড়াই। বাবা হিন্দু, ভারতীয় নাগরিক আর মা মুসলমান, বাংলাদেশের নাগরিক। বাবা-মা বাস করে না-বাংলাদেশে, না-ভারতে—এমন সন্তানের জন্মের স্বীকৃতি দেয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যে বিব্রতকরই বটে। কিন্তু মৌলু, মুকুল, অরা, কাজলি, বিস্তিরা লড়াই করে একজন রুদ্রের বৈধ পরিচয়পত্রের জন্যে। প্রধানের মুখের উপর কাজলি বলে, ‘নদিয়া থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর পর্যন্তই প্রায় সত্তর হাজার লোক থাকে দেড়শো গজে, দূরে না হলে তারা সবাই আসত। পারলে পুরা দেড়শো গজে থাকা দেড় দুই লক্ষ লোক ঝেঁটিয়ে এসে দুঃখ কষ্টের জবাব চাইত। আপনি তো রাষ্ট্রের চোখ, আপনার চোখে ওঁরা বে-আইনিভাবে থাকে ওপারে, আপনি পারবেন ওদের এপারে বসতি গড়ে দিতে, ওদের বৈধ মালিকানায় থাকা জমিজমার সমান জমিজমা দিতে? ওদের জীবিকা দিতে? ওঁরা চলে এলে নোম্যান্স ল্যান্ডের জমির মালিক কে হবে? না অন্য দেশকে দিয়ে দেবেন?’ কাজলির এ কথার উত্তর দিতে পারে না পঞ্চায়েত প্ৰধান ৷

শুধু কাজলি নয়, উপন্যাসের শেষে এসে রুদ্র’র নাগরিকত্বের সার্টিফিকেটের সূত্রে সীমান্তের দুই কাঁটাতারের মাঝখানে আটকে থাকা মানুষগুলোর সব ক্ষোভ-প্রশ্ন ঝরে পড়ে। ‘অনন্ত প্রশ্নের তির কাঠ পাথর জানালার গ্রিল ভেদ করে আছড়ে পড়ছে প্রধানের কর্ণকুহরে। প্রশ্ন কোলাহল থাকলেও লোকগুলি সংযত।’ উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে এসে দেখি, ‘সবাই কৈফিয়ত চায় বুকের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা প্রতিকারহীন ব্যথার। সবার ব্যথা মিষে যাচ্ছে অদৃশ্য আবেগে। কেউ আর একা নয়, মৌলু থেকে হাজার বিস্তি, আজমিরা, নাজিব, সুকুমার যেন অনন্তকাল শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে আছে।’

কিন্তু সসীমকুমার বাড়ৈ হতাশায় শেষ করেন না। যদিও শেষের দিকে এসে কিছুটা নাটকীয় বা সিনেমাটিক হয়ে গেছে তবুও শেষ পর্যন্ত ‘অচলায়তন’ ভাঙার একটা ইঙ্গিত তো থাকেই। ‘তাদের কোষে কোষে হাজার জোনাকের বিচ্ছুরণ—আয়রে আয় পাঁচিল ভাঙা উড়ো হাওয়া। আয়।’ এই আহ্বানেই শেষ হয় ‘দেড়শো গজে জীবন।’

উপন্যাসের একটা বড় অংশ তো বর্ণনা। সেই বর্ণনার দিক থেকে সসীমকুমার পাঠ যথেষ্ট সুমধুর। ছোট ছোট বাক্যে তিনি তীব্রতা আর সরসতা আনেন।

‘তার মাথার কোষে কোষে আনন্দ কণার অকল্পিত বিচ্ছুরণ হচ্ছে’—এমন বাক্যে করোটির ভেতরে উৎপন্ন আনন্দের ধ্বনির অনুবাদ শুনতে পাই। আবার, ‘কাঁটাতারের ফাঁক-ফোকর গলে আঁচড় খেতে খেতে তার হাঁকডাক খরুর বাড়ি পৌঁছাল কিনা সে বুঝতে পারল না।’ এই বাক্যের ধ্বনিগত বৈচিত্র্য মুগ্ধ করে। একবার সজোরে পড়ে দেখুন, চন্দ্রবিন্দুগুলো কী সুন্দর নাসিক্য ঐকতান তৈরিই না করে।

অন্যদিকে কোনো কোনো বাক্যে সসীমকুমার ভীষণ কাব্যিক। কবিতার মতোই উপমা-উৎপ্রেক্ষার ঝিলিক রয়েছে তার গদ্যভঙ্গিমার আড়ালে।

‘কে বলবে গাঢ় সবুজের নিচে গভীর ঘাপটি মেরে আছে অমন লাল। দিল্লিতে লোক বলে, বাংলায় সবুজের নিচে লাল তরমুজ নেতা ফলে।’ এই বাক্য পূর্ণেন্দু পত্রীর তরমুজের বাইরেটা সবুজ, ভেতরটা লাল মনে করিয়ে দেয়।

মৌলু একটা রাত আশ্রয় নেয় তরমুজ ক্ষেতে এসে সুখের ক্ষেতে। তরমুজ চাষি সুখ গান শোনায় আর বলে, ‘ন্যালটেং নিভাইয়া দিয়া তরমুজ লতাগো গান শুনাই। সুর ভাসতি ভাসতি কোনঠে যায় মুই জানি না, তেঁও সকালি উঠি দেখি গান শোনা গাছেরা ফুল ফুটাইয়া হাসছে। কী যে ভাল লাগে, তোরে কি করিয়া বুঝাম। গিটে গিটে কচি জালি ধরে। চর ঢাকি যায় তরমুজে। যেই গাছগুলা বুড়া হয়ে যায়, সকালে আর হাসে না। যত গরম পড়বে আগা চলি যাবার সমায় হবি। অরা কাউকে বলে না দুক্কের কথা, তরমুজ সব ব্যথা বুকের মধ্যি নাল করি জমাইয়া রাখে।’ এই বর্ণনা যেন তরমুজ চাষের সুখ-দুঃখের কাব্যিক বয়ান। সেই রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকের দৈঅলা যেমন অমলকে বলেছিল, ‘দই বেঁচতে যে কী সুখ তা তোমার কাছ থেকে জেনে নিলুম।’ আমরাও তেমনি তরমুজের লাল-সবুজ সুখ-দুঃখ শিখে নিতে পারি সসীমকুমারের ‘দেড়শো গজ জীবন’ থেকে।

কিছু কিছু চিত্রকল্প আর দৃশ্যকল্প নির্মাণে সসীমকুমার অসীম মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ইতঃপূর্বেই পাটক্ষেতে পরে থাকা ফরিদার দেহ আর বুটের চাপায় অবনত পাটক্ষেতের লজ্জার কথা বলেছি। চকিতে আরো কিছু দৃশ্যকল্পের উদ্ধৃতি দেই :

‘নিজের প্যাটের চাইতে কোনা বড়ো পৃথিবী নাই।’

‘বিসমিল্লার সানাই কাঁটাতার পেরয়ই না। বাচ্চারা বড় হয় ভারী বুটের শব্দে।’

‘বাইরে আজান মেখে সন্ধ্যা নামছে।’

‘সবাই এক মুহূর্তে যেন পাল্লায় চিপা খাওয়া টিকটিকি বনে গেল। লেজ নড়ছে মাথা অচল।’

‘রুটি একখানা, প্রত্যাশী হাজার।’

‘শালার সারা সময় খুজলির মতো খিচখিচ করে চুলকাবে।’

বড় লেখক সব সময়ই তাঁর লেখার অলিতেগলিতে এমনই ছোট ছোট হিরকখণ্ড রেখে দেয়। সসীমকুমার সীমান্তরেখা আর নোম্যান্স ল্যান্ডের গল্প বললেও এক রৈখিক গল্প তিনি বলেননি। এখানেই ঔপন্যাসিক হিসাবে নিজেকে বহুমাত্রিক করে তুলেছেন তিনি। তার উপন্যাসে এসেছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কথা—’ঢাকার গার্মেন্ট কারখানায় দর্জির কাম করইগ্যা মাসে পাঁচ সাত হাজার টেকা কামায়। যে মোটে কামাইতে পারত না হ্যার কাছে পাঁচ সাত হাজার কোম কথা না। যদিও গিরগিটির মতন রক্ত শুষয্যা নেয় মালিকরা, মালিক-এর ঘরে যায় হাজার হাজার ডলার।’

গরু চোরা চালান আর গোমাংসের রাজনীতির মতো বিষয়কে তিনি গভীরতর করে দেখেছেন। মুকুলের জবানিতে পাই, ‘হ্যাঁ কাকা, আমরা দাঁড়িয়ে আছি কত ভুলভাল আবেগের উপর। পৃথিবীর সব চাইতে বেশি গোমাংস রপ্তানি করে ভারত। শুনে আপনাদের অবাক লাগবে দক্ষিণ ভারতের অনেক হিন্দুও গোমাংস খায়। আগে মুনি ঋষিরা খেত। দেশের অর্থনীতির একটা বড়ো অংশ আসে গবাদি পশু থেকে। গরুর সন্তানেরা এ সব বোঝে না।’ মুকুল বলে, ‘আমি বলি কী, বাংলাদেশে গরু রপ্তানি আইনি পথে হওয়া উচিত। তাহলে চাষিরা আরও বেশি আয় করতে পারবে। চাষিদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। সরকারেরও আয় বাড়বে, রপ্তানির উপর কত টাকা ট্যাক্স হবে ভাবুন। কিন্তু এ সব হবে বলে তো মনে হয় না। ধর্মের জিগিরে সব বন্ধ হয়ে যাবে।’

নাগরিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুকুল আর তার বন্ধুবান্ধবরা এ উপন্যাসে এসেছে প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবেই। অন্যদিকে মুকুল আর মৌলু এখানে একাকার। মৌলুর মা মঙ্গলি ভাবে, ‘আমের মুকুলের সময় মৌলু জন্মাল, সংসারে প্রচলিত নিয়ম অনুসারে নাম হওয়া উচিত ছিল মৌল কিন্তু ডাকতে ডাকতে হয়ে গেল মৌলু। দু’জনেই তো মুকুল।’

দেশ বিভাগ তো বটেই, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার দরুন বিশ্লেষণ পাই ‘দেড়শো গজে জীবন’ উপন্যাসে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় দুই চরিত্র মৌলু আর আরা। হিন্দু মৌলু আর মুসলমান আরার বিয়েটাও একটা প্রতিবাদ। লোকমান শেখ যখন বলে ‘হামরা মুসলমান আরা হিন্দু, পান্তি আর তেলে মিশ খায়। জবাবে জরিনা বেওয়ার স্পষ্ট উত্তর, ‘সুনো লোকমান, দাঙ্গাবাজগো কোনো জাত আছে কি? যারা দাঙ্গাবাজ হ্যেরা দাঙ্গাবাজ। পাকিস্তানের দাঙ্গবাজরা কি মুসলমানগো ছাইয়্যা দিছে। আমাগো মতন গরীবের ভেদাভ্যাদ কোনো কালে আছিল নাকি। আমাগো লোকে পুতুলের মতন নাচায়। হিন্দি সিনেমার নায়ক নাইকাগো দ্যাখো, উমুরা হিন্দু মুসলমান মানে? কি রে আরা তুই ক’ দেখি কার বউ কেডা’।

মুকুলের কথায় দেশভাগের ক্ষতের পোড়া ঘ্রাণ যেমন থাকে তেমনি অনেকের মতো সে স্বপ্নও দেখে, ‘কত বড় শত্রু ছিল দুই জার্মানি, কিন্তু দেখেন দুই দেশ, আবার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। অত বড় পাঁচিল মানুষ গুড়িয়ে দিল। কে বলতে পারে দুই দেশ আবার কোনোদিন এক হয়ে যাবে না। তখন এই বেড়া এক ফুৎকারে উড়ে যাবে।’

বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ এমনকি বঙ্গবন্ধু, ইন্দিরা গান্ধীর কথাও উপন্যাসে একাধিকবার এসেছে। এক বিবেচনায়, ধর্ম, জাতি এবং রাজনৈতিক সচেতনতার বহু অনুষঙ্গই তুলে ধরা হয়েছে ১১৭ পৃষ্ঠার কৃশকায় আকারের এ উপন্যাসে। জরিনা বেওয়া নিচু স্বরে বলে, ‘দুই মাসের পোয়াতি প্যাট নিয়াও সাহীদরে যুদ্ধে পাঠাইতে দোমনা করি নাই। মুইও বীরাঙ্গনা। সইত্য কথা কইতে ভয় পাই না। আপনেরা সঙ্গী না থাকলি আরও কত জীবন যাইত, পাক কুত্তাগুলারে হঠাইতে পারতাম মোরা একারা? মায়ের জাত ইন্দিরা গান্দি, সাক্ষাৎ দুগ্‌গার মতইন খাড়াইছিল বলি বাংলাদেশ হছি। নলি কত ত্রিশ লক্ষ মানষি যে মরত।’ জরিনার এই বক্তব্য নিচু স্বরে বলা হলেও এর সততা আর উচ্চতা নিয়ে তো কোনো প্রশ্ন তৈরি হয় না। মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর কবর হয়েছে ভারতের মাটিতে। মুসলমানের সেই কবরে শবে বরাতের রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয় হিন্দুরা। এমন সম্প্রীতির ঘটনা পাঠকমাত্রই আলোড়িত করে।

আবার বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে তেতো অংশের কথা এ উপন্যাসে এসেছে। ‘হালার পো একটা জাল মুক্তিযোদ্ধা। সবাই জানে, আছিল রাজাকার হইয়া গেল মুক্তিযোদ্ধা। জিয়ার মিলিটারি শাসনের কালে অমন কত খুনি যে জাল মুক্তিযোদ্ধা গজাইছে দ্যাশে। সাটিফিকেট বানাইয়া মহান দ্যাশপ্রেমী সাজছে।

এ উপন্যাসে এসেছে বাংলাদেশের লোকজ দার্শনিক আরজ আলি মাতব্বরের কথাও। ‘ওই কী যেন নাম… হ মনে পড়ছে, আরজ আলি মাতব্বর, তাঁর বই। মাতব্বর চাচা তাঁর মরা মা’র ছবি তোলায় কাটমোল্লারা নাকি দাফন করে নাই। লোকটা ল্যাখাপড়া জানত না, পরে পড়াশুনো শিখ্যা দ্যাখছে বেদ-কোরাণে কোথাও ল্যাখা নাই মরা মাইনসের ছবি তোলা যাবে না।’

তামাক চাষ উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য। কিন্তু এই ঐতিহ্যের সবটাই সুখময় নয়। তামাক চাষের ভালো-মন্দ উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। ‘চিটাগুড় মাখানো নিজের ক্ষেতের মতিহারি তামাক পুড়তে পুড়তে ধোঁয়া যখন ব্রহ্মতালু ছোঁয় তখন নেশায় যেন পূর্ব পুরুষেরা জেগে ওঠে। যোগ হয় সিলিমের মধ্যে জল গড়ানো গুড়গুড় শব্দ, দুইয়ের যুগলবন্দিতে মৌতাত মৌজে রূপান্তরিত হয়ে যায়৷ এই নিগূঢ় বর্ণনা আমাদেরকে হুক্কার দিকে টানে। অন্যদিকে ধূমপান আর তামাক চাষের ভয়াবহতার ছবিও এ উপন্যাসে আছে, ‘সবাই জানে ধূমপানে বছরে দু’টো বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের চেয়ে বেশি মানুষ মরে। তবু তামাক চাষ হয়। কাঁটাতারের ওপারে ফড়ে মহাজনরা দাদন দিয়ে তামাক চাষ করতে উৎসাহিত করে। জানেন জ্যেঠু, বাংলাদেশে নাকি রংপুর জেলা থেকে আশপাশের সব জেলায় তামাক চাষ ছড়িয়ে পড়ছে। ওখানে কোম্পানি চুক্তিতে তামাক চাষ করায় চাষিরা জড়িয়ে যাচ্ছে জালে। ইচ্ছা হলেও অন্য চাষে যেতে পারে না।’ এ যেন আরেক নীলচাষের কাহিনি।

তামাকের পোড়া গন্ধের আড়ালের লুকিয়ে থাকে সংগ্রাম ও বঞ্চনার কাহিনি।

শেষ পর্যন্ত ‘দেড়শো গজে জীবন’ উপন্যাস মাটির কথা বলে, শেকড়ের কথা বলে, ঐতিহ্যের কথা বলে। নোম্যান্স ল্যান্ডে বসবাস করা মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা নেই। তবু তারা গানের কথা ভাবে। দুলাল বলে, ‘তামান লোকগান, লোকবাদ্য যন্ত্র গিলি নিছে। দুই চাইরডা যদি বাঁচাইতে পারি। আর মাঝে মাঝে দুই চাইরটা আসর বসাই।’

‘কলকাতায় বন্ধুদের সঙ্গে কোচবিহারের লোকসংগীত, লোকাচার নিয়ে কথা হয়। কেউ আগ্রহ দেখায়, কেউ পিছনে প্যাক দেয়। মুকুলের বেশি খারাপ লাগে শহুরে বাবুদের মুখে লোকসংগীত। চুরি করা সুর তাল কথা মিলিয়ে মিশিয়ে বকচ্ছপ বানায়। তাকে এক গবেষক বলেছিল, এরা সব ফোক-কে ফাঁক করছে।’

ফোক গানকে ফাঁক করার নির্মম রসিকতা, ফিউশনের নামে কনফিউশন মিউজিক তৈরির ভয়াবহতা আমরা মুকুলের মাধ্যমে জানতে পাই। অন্যদিকে, মৌলুকে নাচতে দেখে, অষ্টক গান গাইতে দেখে মুকুল বলে, ‘তাছাড়া কে কারে শিখায়, কোচবিহার, বাংলাদেশের পুরোনো রংপুর জেলায় ভাওয়াইয়া শিল্পী মাটি থেকে এমনি এমনি গজায়।’ মাটির গান আসলে মাটির সংস্পর্শ থেকেই আসে। প্রথাগত প্রশিক্ষণ নয়, প্রাণের টানেই মৌলুরা ভাওয়াইয়া কিংবা অস্টক গায়।

খরু আর দুলালের কথোপকথনে লোক গান, লোক ঐতিহ্য, লোকজ খানাদানার প্রসঙ্গও চলে আসে আলগোছে। ‘ছ্যাকা, সিদল, পেলকা, শুকাতি, ফোকতোই, জলত্যালানি, খাটাশাক, নাতারি পিতারি শাকের মতো কত সব উত্তরবঙ্গের সুস্বাদু খাবার ছিল, শহুরে খাবার আর বয়লার মুরগি দখল করে নিচ্ছে সব লোকখাদ্য। সিদল খেতে খেতে জিভের স্বাদ সঞ্চারিত হয়েছিল দুলালের মনে। তার পেটের মধ্যে গুঁড়গুঁড় করে উঠেছিল সিদলের ভাওয়াইয়া গান—’ও মুই সিদল ভকি কতয় থুনুরে—/ অরে কতয় যতন করি রে/ মনের সুকে ঐ সিদল মুই খাং ভত্তা করি ৷’

শুধু দেড়শো গজ নয়, আরো সীমান্ত এলাকার তথ্য পাওয়া যায় এই উপন্যাসে। পদ্মার সীমান্তবর্তী পদ্মার চরের কথা শুনতে পাই গরু পাচারকারী হাতেমুলের বয়ানে, ‘দুই দ্যাশ মিল্যা একটা চর, হেউডাই তো আজব ঘটনা। চরে রহস্য পোহরে পোহরে বদলায়। রাইতে বিড়ির বান্ডিলের মধ্যে আনা সুতার বাঁধা গাঁজা বিড়ি, ফেন্সিডিল, পোস্তো নৌকার খোল ভরয়্যা যায়। আমাগো দ্যাশটাও এক বিচিত্র দ্যাশ মাইরি, দ্যাশটায় নেশাভাঙ নিষিদ্ধ কিন্তু মদখোর, গাঁজাবাবাগো ওলি-গলিতে আস্তানা। সবাই জানে, আবার কেউ জানে না। বার্মা থাইক্যা আহে ইয়াবা। নৌকা কী আর খালি প্যাটে ফেরে, ইয়াবা সোনার বাট আসে চর হইয়া ইন্ডিয়ায়। সব চাইতে খারাপ লাগে কচি মাইয়াগুলানরে পাচার হইতে দ্যাখলে।’

এ প্রসঙ্গে খরুর উক্তি, ‘যে দ্যাশে মাইয়া জন্মান পাপ, সিখানে বর্ডারে মাইয়া জন্মান কুত বড়ো পাপ বোঝো ভাইগ্নে?’

ভাগ্যবঞ্চিত, অসহায় মানুষগুলোর পাশে এই উপন্যাসে যেমন এসেছে কিছু আধুনিক তরুণ তেমনি নয়া ডিজিটাল মিডিয়ার দৌরাত্ম্যের কথাও এসেছে।

‘তিনটি মানুষ একটি মোবাইল ঘিরে খুশি মনে বসে আছে, কেন্দ্রে হোয়াটস্যাপে আসা একটি ভিডিও ক্লিপ। ‘

‘হোয়াইট আপ, ফেসবুক করি দিলা বাইরের থাকিও তা চেনাসুনা লুকলা আসতে পারে। হামরা বল ভস্যা পাই। ‘

‘কাজলিরা কয়েক দিন ধরে ফোনাফোনিসহ হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে নিরন্তর জমায়েতের প্রচার করে গেছে। কোথাও কোথাও কাঁটাতার ভেদ করে খবর পৌঁছেছে জিরো লাইনের বহু ঘরে। কিছু লোক দূরত্বকে অস্বীকার করে চুটে এসেছে বুকে জমানো কথা বলতে।’

উপন্যাসের শেষে যে আন্দোলন, রুদ্র’র পরিচয়কে কেন্দ্র করে দানা বাঁধে তার সঙ্গে আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তিও উদ্ভাসিত হয়। মানুষ এখন সংযোগের দুনিয়ায় নতুন করে ভাবতে ভাবাতে পারে— শেষ পর্যন্ত ‘দেড়শো গজে জীবন’ সেই ইঙ্গিতও দেয়।

শুরুটা করেছিলাম উপন্যাসের সংজ্ঞা বা প্রকৃতি নিয়ে। শেষটা করি ‘দ্য টার্ন অব দ্য স্ক্রু’ উপন্যাসের লেখক হেনরি জেমসেরর একটা কথা দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘উপন্যাসের একমাত্র শ্রেণিকরণ বলতে আমি যা বুঝি তা হলো একটায় জীবন আছে আরেকটায় নেই।’ সসীমকুমার বাড়ৈ-এর ‘দেড়শো গজে জীবন’ উপন্যাস জীবন আছে, গভীরভাবেই আছে। আর জীবনের সাথেই অনিবার্যভাবে আছে মৃত্যু, বিবাহ, বিষাদ, প্রেম, চকিত আনন্দ, অস্তিত্বভাবনা, জাদুবাস্তবতা এমনি আরো অনেক অনুষঙ্গ।

লেখক পরিচিতি : জন্ম ১৯৭১, ২৭ মার্চ। তিনি মূলত কবি ও কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক হিসেবে তার আলাদা পরিচিতি রয়েছে পাঠক সমাজে। এর পাশাপাশি তিনি শিল্প সমালোচক, নাট্যকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ ৫০-এর অধিক। বর্তমানে পূর্ণকালীন লেখক।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev