বাংলা ও বাঙালির দুই গর্ব, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে বিভাজন তৈরির চক্রান্ত করছে বিজেপি। রবিবার কলকাতার প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই দাবিতে সোচ্চার হল দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ। গণমঞ্চের পক্ষ থেকে পূর্ণেন্দু বসু বলেন, বিজেপির আসল উদ্দেশ্য হল বাংলা এবং বাঙালিকে অপমান করা, ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করা।
বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের জাতীয়তাবোধের যে শিকড়কে প্রোথিত করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাকে ডালপালা মেলে গাছ হতে সাহায্য করেছিলেন। ভারতবর্ষের গণতন্ত্র এই ডালপালার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। বিজেপি যতই বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথের মধ্যে লড়াই লাগাতে চেষ্টা করুক, তা সফল হবে না। আরএসএস এবং বিজেপি যেমন গান্ধি-নেহরুকে অপছন্দ করে, তেমনই আমাদের জাতীয়তাবোধের শিকড়কে উপড়ে ফেলতে চায়। কিন্তু মনে রাখবেন, নিউ ইয়র্কের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি যেমন নির্বাচন জেতার পর নেহরুর কথা মনে করিয়ে দেন, তেমনই তিনি প্রচারের জন্য সারাক্ষণ বাংলায় ভিডিও তৈরি করেছেন। গণমঞ্চের প্রতিনিধি ডঃ দেবাশিস বক্সি স্পষ্ট ভাষায় জানান, বিজেপি বাঙালি বিদ্বেষী হতে পারে, কিন্তু গোটা পৃথিবী বাংলা এবং বাঙালিকে সম্মান করে। আমরা বরাবরই জানি, বিজেপি দলটাই দাঁড়িয়ে আছে ভাগাভাগি বা বিভাজনের উপরে। সেই বিভাজন কখনও হিন্দু-মুসলমান, কখনও ব্রাহ্মণ বনাম মতুয়া বা দলিতের মধ্যে, আবার কখনও বাঙালি বনাম অবাঙালিতে বিভাজন বাধাতে চায়।এরই বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার প্রতিবাদ। বাসুদেব ঘটক বলেন, ইদানিং বিজেপি যেটা শুরু করেছে, সেটা হল দুই বরেণ্য বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চাইছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিজেপি কোনওদিনই পছন্দ করে না। মূলত তিনটি কারণে তাদের এই মনোভাব। বিজেপি হিন্দু বলে যাদের দাগিয়ে দিতে চায়, রবীন্দ্রনাথ সেই শ্রেণিতে পড়েন না। রবীন্দ্রনাথ সব সময় তাঁর সাহিত্য ও কর্মের মধ্যে দিয়ে হিন্দু এবং মুসলমানের পাশাপাশি সহাবস্থানের কথা বলে গিয়েছেন, সম্প্রীতির কথা বলে গিয়েছেন। এটা বিজেপির একেবারেই পছন্দ নয়। রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনা তারা পছন্দ করে না। আমাদের এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য বিজেপির রাজনৈতিক চিন্তার পরিপন্থী, অথচ রবীন্দ্রনাথ গোটা জীবনে এটাই বলতে চেয়েছেন।
এদিন গণমঞ্চের অন্যান্য প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শামিম আহমেদ, সুশান রায় , বর্ণালী মুখার্জি, সৈয়দ তানভীর নাসরিন, সুমন ভট্টাচার্য, সিদ্ধব্রত, সোমা চক্রবর্তী, রাহুল চক্রবর্তী, নাজমুল হক, বিভান ঘোষ, অমিত কালী ও বীরেশ চক্রবর্তী প্রমুখ। এঁরা সকলেই তাঁদের বক্তব্যে একমত যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা জাতীয় কংগ্রেস নামের দলের আদি পুরুষ সেই মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ পছন্দ করতেন। তাই বলে কংগ্রেসের সঙ্গে জনসংঘ, বিজেপি বা আরএসএস-এর যে ঝামেলা, তার দায় তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিতে পারেন না। নেহরু, সুভাষচন্দ্র বা গান্ধিজি তাঁকে শ্রদ্ধা করবেন, সেই কারণে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খারাপ কথা বলা – এটা চরম নিন্দনীয় অপরাধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বাংলা বা ভারতবর্ষের নন। রবীন্দ্রনাথ সারা পৃথিবীর। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’-এর ১৫০ বছর উদযাপন করছে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই মঞ্চকে ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে চাইছেন। কিন্তু তিনি জানেন না বাঙালি এতে বিভাজিত হবে না।
মঞ্চ থেকে পরিষ্কার জানানো হয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তো ‘বন্দেমাতরম’-এর ১৫০ বছরের উদযাপনের জন্য সবাইকে নিয়ে একটা কমিটি তৈরি করেছেন। যে কমিটিতে কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা রয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রকে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করতে হবে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যাঁরা বলবার চেষ্টা করছেন, রবীন্দ্রনাথ পঞ্চম জর্জের আগমন উপলক্ষ্যে ‘জনগণমন অধিনায়ক’ লিখেছিলেন, তাঁরা জানেনও না কংগ্রেসের প্রথম কোন অধিবেশনে ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গাওয়া হয়েছিল। ২৬ ডিসেম্বর ১৯১১ তারিখে কংগ্রেসের ২৬ তম অধিবেশনে ‘জনগণমন’ গানটি প্রথম গাওয়া হয়।
ঐতিহাসিকভাবে এটাও সত্যি, ‘বন্দেমাতরম’ও প্রথম কংগ্রেসের অধিবেশনেই গাওয়া হয়েছিল এবং সেই বিষয়ও উদ্যোগী হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ‘বন্দেমাতরম’ গানটির শুধু প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার সুপারিশ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, সুভাষ ও নেহেরু উভয়কেই। সুভাষ ও নেহেরু এই সুপারিশ মেনে নিয়েছিলেন। এটাই ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিজেপির এই যে বিদ্বেষ, তার প্রমাণ সম্প্রতি আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য আসামে ‘আমার সোনার বাংলা’ রবীন্দ্রনাথের লেখা এই গান গাওয়ার জন্য বিধুভূষণ দাস নামে ৭৪ বছর বয়সি এক রাজনীতিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমার সোনার বাংলা ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে। বাউল গগন হরকরার গান ‘কোথায় পাব তারে’র সুর অনুসরণ করে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সুর তৈরি হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সুর বেঁধে দিয়েছিল এই গান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন জন্ম নেওয়া দেশটি এই গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘আমার সোনার বাংলা’তেও রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “মা তোর বদনখানি মলিন হলে/ আমি নয়ন জলে ভাসি।”
আমাদের লড়াই অসাম্প্রদায়িক ভারতের পক্ষে আমরা, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয়রা, এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমাদের লড়াই কেবল একটি গানকে বাঁচানোর লড়াই নয়, এটি ভারতের মূল সংবিধানের আদর্শকে রক্ষা করার লড়াই, রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে জিইয়ে রাখার লড়াই। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ‘জনগণমন’ থাকবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে। আর ‘বন্দেমাতরম’ থাকবে আমাদের জাতীয় গান হিসেবে। দেশের এই দুটি মহান সঙ্গীতের প্রতিই আমরা সমান সম্মান জানাব। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ‘জনগণমন’-এর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার এবং ‘বন্দেমাতরম’-কে অকারণে বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে এনে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির প্রচেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।
ভারতীয় সংবিধান এবং তার ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শই আমাদের সর্বোচ্চ পাথেয়। বিজেপির ইতিহাস বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে।