আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারক-বাহক হিসাবে সাময়িক পত্রপত্রিকার অবিসংবাদী ভূমিকা বর্তমান। উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোয় বাংলার কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকায়ও সাময়িক পত্রপত্রিকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ১৮১৮-তে মাসিক ‘দিগদর্শন’-এর (এপ্রিল) পাশাপাশি সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ’-এর (২৩ মে) মধ্য দিয়ে তার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাই সময়ান্তরে অসংখ্য সাময়িক পত্রপত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে জয়যাত্রায় বিস্তার লাভ করে। সেই ধারায় বাংলা সাহিত্যের চারণভূমি হিসাবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মাসিক সাহিত্য পত্রিকা হিসাবে ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২) যে অভিজাত উচ্চতা লাভ করেছিল, তার আদর্শে বাংলা সাময়িক পত্রিকায় সাহিত্যচর্চার ধারা আরও গতি লাভ করে। ‘বঙ্গদর্শন’-এর অনতিকাল পরেই প্রকাশিত হয় ঠাকুরবাড়ির প্রভাবশালী মাসিক পত্রিকা ‘ভারতী’ (১৮৭৭)। বিশ শতকেও সেই ধারা অব্যাহত থাকে। শুধু তাই নয়, বিষয়-বৈভব ও প্রকাশবৈচিত্র্যে বাংলা আধুনিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র হিসাবে সাময়িক পত্রপত্রিকার বনেদি ভূমিকা ক্রমশ উৎকর্ষমুখর প্রাতিষ্ঠানিকতাতেও আন্তরিক হয়ে ওঠে। সেখানে ‘প্রবাসী’ (১৯০১), ‘ভারতবর্ষ’ (১৯১৩), ‘সবুজ পত্র’ (১৯১৪) ও ‘বিচিত্রা’র (১৯২৭)র মতো মাসিক সাহিত্য পত্রিকার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার স্বাভাবিক ভাবেই সমীহ আদায় করে নেয়। বাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী ধারায় সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার আগমন ঘটে। যদিও তা বিশুদ্ধ সাহিত্য পত্রিকা নয়। অথচ বাংলা সাহিত্যের সব শাখাতেই তার প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা নানাভাবেই প্রকাশমুখর। পত্রিকাটি সুদীর্ঘকাল ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তার বাংলা সাহিত্যের ধারক-বাহকের ইতিহাসে ক্রমশ আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। লাভ করেছে সাহিত্য প্রকাশে ঈর্ষণীয় অভিজাত উচ্চতা। শুধু তাই নয়, বাংলা সাহিত্যের মানদণ্ড হিসাবে ‘দেশ’-এর মান্যতাবোধ বাংলা সাহিত্যরসিক জনমানসে নিবিড় হয়ে উঠেছে যা ক্রমশ উতকর্ষমুখর আভিজাত্য লাভ করে। তার মতো বাণিজ্যসফল অথচ সাহিত্যচর্চাতেও সমান সক্রিয় পত্রিকা অতীতেও ছিল না, বর্তমানেও অতুলনীয়। সময়ের দর্পণে সাহিত্যের সর্বাগ্রে সুস্পষ্ট শিল্পরূপ যা উনিশ শতকের আশ্চর্য ফসল হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল, সেই ছোটগল্পের ধারক-বাহক হিসাবে ‘দেশ’-এর ভূমিকা আপনাতেই তীব্র আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে যাঁর মাধ্যমে বাংলা ছোটগল্প শিল্পসার্থকতা পেয়েছিল, সেই রবীন্দ্রনাথও ‘দেশ’-এর গল্পের পাতায় স্বমহিমায় প্রোজ্জ্বল। তাঁর সেই গল্পটির নামও ‘ছোট গল্প’। আবার প্রমথনাথ বিশীর ‘রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প’ (১৯৫৩) অসাধারণ গ্রন্থটি দেশে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকদের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিবান গল্পকারদের প্রায় সকলেই পত্রিকাটির আধারে সোনালি ফসল ফলিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বাংলা ছোটগল্পের প্রকৃতি নিয়ে যেমন গল্পকারদের অভিমত তুলে ধরা হয়েছে, তেমনই ছোটগল্পের মূল্যায়ন, সংকট ও তা থেকে উত্তরণ নিয়ে আলোচনাও উঠে এসেছে নানা সময়ে। সেদিক থেকে বাংলা ছোটগল্পের বিবর্তনের পরিচয়ের আধারেও ‘দেশ’-এর গল্পে গল্পের দেশটি নানাভাবেই বিস্তার লাভ করে। সেই বিস্তারের দিকে দৃষ্টিপাত করার পূর্বে তার আধারটি একবার দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
দৈনিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনাপ্রসূত সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসাবে ‘দেশ’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৩-এর ২৪ নভেম্বর। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন সুরেশচন্দ্র মজুমদার ও প্রফুল্লকুমার সরকার। তৎকালীন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারই ‘দেশ’-এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন। ছ’মাস না যেতেই কাজের সুবিধার জন্য ‘দেশ’-এর দায়িত্ব থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১৯৩৪-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে পত্রিকা সম্পাদনায় সামিল হয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র সেন। কিন্তু ‘দেশ’ পত্রিকা যাঁর সম্পাদনায় আভিজাত্যমুখর বনেদিয়ানা লাভ করেছে তিনি সাগরময় ঘোষ (১৯১২-১৯৯৯)। ১৯৩৯-এর ১ ডিসেম্বর থেকে ‘দেশ’-এর সম্পাদনায় সামিল হয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র সেনের সম্পাদনা শেষ হয় ১৯৫৭-এর ৪ আগস্ট। এরপর ১৯৫৭-এর ১৫ জুন সাগরময় ঘোষ পত্রিকাটির অস্থায়ী সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৭-এর ২২ জুন থেকে ‘দেশ’-এর সম্পাদক হন অশোককুমার সরকার। পত্রিকায় বিশেষ করে সাহিত্যবিষয়ে যে তিনি শুধু নামমাত্র সম্পাদক ছিলেন, সেকথা তৎকালীন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’রও সম্পাদক অশোককুমারই জানিয়েছেন ‘দেশ’ সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা’য় (১৯৮৩): ‘আমি দীর্ঘকাল দেশ-এর সম্পাদক ছিলাম। কিন্তু উপন্যাস, গল্প নির্বাচন ব্যাপারে সমস্ত দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল সাগরময় ঘোষের উপর। আর এখন তো সাগরময় ঘোষ নিজেই সম্পাদক। হস্তক্ষেপের কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমার কাছে সাহিত্যিক বা কবিরা যে আসেন না এমন নয়। তবে আমি তাঁদের সবিনয়ে আমার অক্ষমতার কথা জানাতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা করি না। এক্ষেত্রে সম্পাদকই সর্বেসর্বা।’ শুধু তাই নয়, সেই ‘সর্বেসর্বা’র ভূমিকার জন্যই যে ‘দেশ’-এর স্বদেশে সৌরভ বৃদ্ধি পেয়েছে, তাও অশোককুমার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে ‘দেশ’-এর অর্জন, সাগরময়ের সৌরভ। উল্লেখ্য, ১৯৭৬-এর ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত অশোককুমার সরকার সম্পাদক ছিলেন। তারপর থেকে সাগরময় ঘোষ ‘দেশ’-এর সম্পাদক হিসাবে স্থায়ী হয়েছেন। সেদিক থেকে সাময়িক পত্রিকা সম্পাদনায় সাগরময় ঘোষের সুদীর্ঘকাল (১৯৩৯-১৯৯৭) সক্রিয় থাকার ইতিহাস বিরল নজির স্থাপন করে। তাঁর পূর্বে ‘প্রবাসী’র সম্পাদক হিসাবে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কার্যকাল ছিল বিয়াল্লিশ বছর। ‘দেশ’-এর সুবর্ণ জয়ন্তীতে (১৯৮৩) সাগরময় ঘোষ পয়তাল্লিশ বছর অতিক্রম করেন। অন্যদিকে তাঁর সম্পাদনায় ‘দেশ’-এর অসামান্য সৃষ্টিগুলি সংকলনের মাধ্যমে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ‘দেশ’-এর সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রকাশিত প্রথম সংকলনটি বাংলা ছোটগল্পের। সেই ‘দেশ সুবর্ণজয়ন্তী গল্পসংকলন’ (নভেম্বর, ১৯৮৩)-এ ‘আনুমানিক’ পাঁচ হাজার গল্পের মধ্যে বাছাই করা পঞ্চাশটি গল্প বর্তমান। পাঠকের চাহিদায় অনতিবিলম্বে ‘দেশ’-এর শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত গল্পেরও একটি সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯৯০-এর জানুয়ারি। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, ১৯৪৩-এ প্রথম স্বতন্ত্র ভাবে ‘দেশ’-এর শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেক্ষেত্রে ১৯৮৮ পর্যন্ত দীর্ঘ পয়তাল্লিশ বছর ধরে শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প থেকে ‘পঞ্চান্নটি রত্নকল্প গল্প নিয়ে’ প্রকাশিত হয় ‘দেশ শারদীয় গল্প-সংকলন’। এভাবে সাধারণ সংখ্যার পাশাপাশি শারদ সংখ্যার স্বতন্ত্র গল্প-সংকলন প্রকাশের মধ্যে শুধু সাধারণ ও শারদের পার্থক্যই নেই, গল্পের ধারাতেই রকমফের বর্তমান। পুজো সংখ্যায় যেমন বাছাই লেখকদের গল্প ছাপা হত, তেমনই গল্পকারেরাও নিজেদের সেরা গল্পটি শারদ সংখ্যার জন্য তুলে রাখতেন। এবিষয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘অর্ধেক জীবন’ (জানুয়ারি ২০০২)-এ প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছেন : ‘সেই সময় শারদীয় দেশে উপন্যাস প্রকাশিত হত একটি মাত্র, সেটি লিখতেন কোনও সর্বজনমান্য প্রবীণ লেখক, অন্য বিশিষ্ট লেখকরা লিখতেন ছোট গল্প, তখন ছোট গল্পের বিশেষ গৌরব ছিল। প্রথম সারির লেখকরা তাঁদের সারা বছরের শ্রেষ্ঠ ছোট গল্প জমিয়ে রাখতেন শারদীয় সংখ্যার জন্য।’ সাগরময় ঘোষও ‘দেশ শারদীয় গল্প-সংকলন’-এর ‘প্রাক্কথন’-এ পরোক্ষে সেকথাই উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘বাসনার সেরা বাসা যেমন রসনায় তেমনি বাংলা ছোটগল্পের সেরা বাসা তো শারদীয় সংখ্যাই।’ সেদিক থেকে বাংলা ছোটগল্পের মৌচাক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ‘দেশ’-এর বনেদি ভূমিকা তার ধারাবাহিক প্রকাশের ইতিহাসেই প্রতীয়মান।
‘দেশ’ যেসময়ে প্রকাশিত হয়, সেই সময়ে কোনো সাপ্তাহিক সাহিত্যপত্র ছিল না। অন্যদিকে ‘দেশ’ও সাহিত্য পত্র নয়। সেখানে সাহিত্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অবশ্য সেই সাহিত্যেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। আসলে পত্রিকার মাধ্যমে জাতীয়বাদকে তুলে ধরার প্রয়াস ছিল। এবিষয়ে অশোককুমার সরকার ‘দেশ’-এর সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যাতেই জানিয়েছেন : ‘প্রফুল্লকুমার চেয়েছিলেন সমসাময়িক ঘটনার বিশ্লেষণের মাধ্যমে জাতীয়বাদকে সাহিত্যের সঙ্গে সমাজজীবনে সংহত করতে, আর সেই আদর্শকে সংস্কৃতির রূপ নিয়ে রাজনীতির চিন্তাকে ছড়িয়ে দিতে সমাজ জীবনে। পরবর্তীকালে দেশ পুরোমাত্রায় একটি সাংস্কৃতিক পত্রিকার রূপ লাভ করে।’ স্বাভাবিকভাবেই ‘দেশ’ পত্রিকার বিবর্তনে তার প্রকৃতিতেও পালাবদল ঘটে। তার বহুমুখী চলনের মধ্যে সাহিত্যের আবেদন নিবিড়তাই লাভ করেনি, সমধিক গুরুত্ব লাভ করেছে। ‘দেশ’-এর প্রথম নববর্ষ সংখ্যার বিজ্ঞাপনেই পত্রিকাটির প্রকৃতিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে : ‘দেশ দৈনিকের অভাব পূরণ করে, কারণ দৈনিক পত্রের সকল প্রয়োজনীয় সংবাদই ইহাতে থাকে। দেশ সাপ্তাহিকের অভাব পূরণ করে, কারণ সপ্তাহের প্রয়োজনীয় সংবাদ, সমালোচনা, দেশী ও বিদেশী সংবাদের তথ্যপূর্ণ বিশ্লেষণ ইহাতে পাইবেন। দেশ মাসিকের অভাব পূরণ করে, কারণ বাংলার বিশিষ্ট লেখকদের লিখিত সারগর্ভ প্রবন্ধ গল্প কবিতা সরস আলোচনা ইহাতে সর্বাংশে সমৃদ্ধ করিতে চেষ্টার ত্রুটি করা হয় না।’ সেক্ষেত্রে ‘সারগর্ভ প্রবন্ধ’-এর পরেই শুধু নয়, ‘দেশ’-এ সৃজনশীল সাহিত্যের অভিমুখও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ‘বিশিষ্ট লেখক’দের প্রতি যেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, লেখার ক্ষেত্রেও তার নবদিগন্ত উন্মোচনের অপেক্ষা ছিল। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্তারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে গিয়ে সাহিত্যের নবধারার চেয়ে ঐতিহ্যবাহী নির্বিরোধী ধারাই সেখানে শ্রেয় হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে গল্পের ধারাতেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। অবশ্য প্রথম থেকে গল্পেরই প্রাধান্য ছিল। অনুবাদিত গল্পও সেখানে প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, গল্প প্রকাশেও আসে ধারাবাহিক প্রকাশ। দেশের স্বাধীনতা-উত্তর পরিসরে পরাধীন দেশের জাতীয়তাবাদী চেতনার অস্তমিত পরিসরে ‘দেশ’-এর সাহিত্যের আকাশে বাংলা ছোটগল্পের দিগন্তবিস্তারি আলো ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন প্রায় সব গল্পকারই ‘দেশ’-এর আশ্রয়ে গল্পের সোনালি ফসল ফলিয়েছেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উৎকর্ষমুখর ও আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সফলতা প্রত্যাশী ছোটগল্পের উত্তরণে ‘দেশ’-এর ভূমিকা ক্রমশ আভিজাত্যমুখর হয়ে ওঠে। পবিত্র সরকার ‘দেশ’-এর সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যায় তাঁর ‘ছোটগল্প, উপন্যাস ঃ অর্ধশতকের ধারাবাহিকতা’ প্রবন্ধে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ‘তবু রচনাকুশলতার একটা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছুলে তবেই যে গল্প ‘দেশ’-এ মুদ্রিত হতে পারত সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ফলে এক সময় ‘প্রবাসী’ বা ‘বিচিত্রা’য় গল্প ছাপা হওয়া লেখকের পক্ষে যে রোমাঞ্চকর এবং উত্তেজক অভিজ্ঞতা ছিল কালক্রমে দেশে গল্প ছাপার অভিজ্ঞতাও তারই সমকক্ষ হয়ে দাঁড়াল। আমাদের তরুণ বয়সে যে-বন্ধুর গল্প এ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে আমাদের চোখে তার শারীরিক দৈর্ঘ্য অন্যদের চেয়ে অন্তত ফুটখানেক বেড়ে যেত সন্দেহ নেই।’ সেই ‘দেশ’-এর বুনিয়াদি চেতনায় বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি তার কনিষ্ঠ শাখা ছোটগল্পের আধিপত্যও যে অগ্রাধিকারে চলে আসে, তা তার সুবর্ণজয়ন্তীর সম্পাদকীয়তেই প্রতীয়মান, ‘তারই মধ্যে বাংলার সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে এই পত্রিকার জন্ম।’ সেই সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই উঠে এসেছে, ‘এই রকম অনেক গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-কবিতা বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করেছে, বস্তুত, গত পঞ্চাশ বৎসরের অধিকাংশ মূল্যবান রচনা প্রকাশ করতে পেরে আমরা ধন্য।’ ‘দেশ’-এর গল্পের ধারাও সেকথা বলে।
‘দেশ’ বাণিজ্য পত্রিকা হিসাবেই আত্মপ্রকাশ করে। সেখানে দৈনিক পত্রিকার পাশে সাপ্তাহিক পত্রিকার মাধ্যমে যেভাবে বাংলা সাহিত্যের মেলবন্ধনের প্রয়াস ক্রমশ নিবিড়তা লাভ করে, তার মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই গল্পের প্রকাশ ছিল প্রত্যাশিত। শুধু তাই নয়, সেক্ষেত্রে গল্পের প্রতি ঝোঁক একটু বেশিই লক্ষ করা যায়। তৃতীয় বছর থেকে ‘দেশ’-এ সাহিত্যের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রবন্ধের প্রতি সবচেয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। চতুর্থ বছর থেকে প্রতি সংখ্যায় একটি করে গল্প প্রকাশিত হয়। সেই সঙ্গে একটি করে অনূদিত গল্পও ছাপা হত। তার পূর্বে একেক সংখ্যায় প্রথম দুবছর দু-তিনটি গল্পও প্রকাশিত হয়েছে। তৃতীয় বছরে কোনো কোনো সংখ্যায় চারটি গল্পও বেরিয়েছে। সেদিক থেকে চতুর্থ বছর থেকে যেভাবে একটি করে মৌলিক গল্প প্রকাশের ধারার সূচনা হয়েছিল, তা ‘দেশ’-এর ঐতিহ্য হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পঞ্চম বছরের তৃতীয় সংখ্যায় পাঁচটি গল্পও বেরিয়েছে। গল্পের বিনোদনী পাঠই তার পরিসরকে নানাভাবে বিস্তার করে। সেদিক থেকে ‘দেশ’-এর গল্পের ভাঁড়ার আপনাতেই প্রাচুর্যে ভরে ওঠে। অন্যদিকে সেই গল্পের ধারার মধ্যে কোনো রকম ধারা গড়ে ওঠার অবকাশ ছিল না। সেখানে যেমন প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকদের গল্প প্রকাশিত হয়েছে, তেমনই অখ্যাতদের গল্পও স্থান পেয়েছে। প্রথম সংখ্যাতেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের (১৯০৪-১৯৮৮) তীব্র বিষণ্ণ প্রকৃতির ‘মহানগর’ গল্পটি প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় সংখ্যায় বেরয় প্রবোধকুমার সান্যালের (১৯০৭-১৯৮৩) ‘চিতার আলোয়’। অন্যদিকে ‘দেশ’-এর সূচনা থেকেই গল্পের জন্য সম্মান দক্ষিণা দেওয়া হত। সাধারণ গল্পকারের জন্য ১০ টাকা, প্রতিষ্ঠিতদের জন্য ১৫ টাকা। ১৯৫০-এর পূর্বে স্বনামধন্য গল্পকারের চেয়ে অখ্যাত এবং পরবর্তীতে বিস্মৃত গল্পকারের গল্পের পরিমাণই বেশি সেখানে। এই উদারতা যেমন ছোটগল্পের প্রাচুর্যকে বাড়িয়ে তুলেছে, তেমনই সেগুলো নবদিশার অভাবে চারিত্রিক আভিজাত্যে আলোচনাতেও প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেনি। অন্যদিকে প্রখ্যাতদের মধ্যে অনেকেই ‘দেশ’-এ গল্প লিখেছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রবোধকুমার সান্যাল ব্যতীত রমেশচন্দ্র সেন (১৮৯৪-১৯৬২), জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৯-১৯৭০), বনফুল (১৮৯৯-১৯৭৯), মনোজ বসু (১৯০১-১৯৮৭), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬), বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৮৭), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), অন্নদাশঙ্কর রায়(১৯০৪-২০০২), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) গজেন্দ্রকুমার মিত্র (১৯০৮-১৯৯৪), সুমথনাথ ঘোষ (১৯১২-১৯৮৪), আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯-১৯৯৫), স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য (১৯০৮-১৯৬৪), প্রমথনাথ বিশী (১৯০৯-১৯৮৫) প্রমুখ প্রবীণদের পাশাপাশি বিমল মিত্র (১৯১২-১৯৯১), সুবোধ ঘোষ(১৯০৯-১৯৮০), জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (১৯১২-১৯৮২), নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৭-১৯৭৫), নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৭০), সন্তোষকুমার ঘোষ (১৯২০-১৯৮৫), সমরেশ বসু (১৯২১-১৯৮৮), রমাপদ চৌধুরী (১৯২২-২০১৮) প্রমুখ নবীন গল্পকারেরাও হাজির সেখানে। অন্যদিকে ১৯৫০-এর পর থেকে ‘দেশ’-এর গল্পের ধারায় আভিজাত্য প্রবাহিত হয়। সেখানে বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রধান লেখকদের সংযোগ যেমন নিবিড় হয়ে ওঠে, তেমনই নবীন গল্পকারেরা প্রকাশের আশ্রয় লাভ করে। সেক্ষেত্রে ‘দেশ’-এর ভোল পাল্টানোর জন্য যাঁদের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়, তাঁরা হলেন সতীনাথ ভাদুড়ী (১৯০৬-১৯৬৫, বিমল কর (১৯২১-২০০৩), রমাপদ চৌধুরী (১৯২২-২০১৮), মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬, প্রফুল্ল রায় (১৯৩৪-), মতি নন্দী (১৯৩১-২০১০), শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (১৯৩৫), দিব্যেন্দু পালিত (১৯৩৯-২০১৯), অসীম রায় (১৯২৭-১৯৮৬) দেবেশ রায় (১৯৩৬-২০২০), সৈয়দ মুজতবা সিরাজ(১৯৩০-২০১২), অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১৯), শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০০১), মনি শঙ্কর মুখোপাধ্যায় (১৯৩৩-), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২), সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০০৫), বুদ্ধদেব গুহ (১৯৩৬-২০২১), সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৬), সমরেশ মজুমদার (১৯৪৪) প্রমুখ। অন্যদিকে প্রমথনাথ বিশীর পরে লঘুরসের আভিজাত্যে ‘দেশ’-এ শিবরাম চক্রবর্তীর (১৯০৩-১৯৮০) সংযোজন স্বাভাবিক ভাবেই ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। এছাড়া কমলকুমার মজুমদারের (১৯১৪-১৯৭৯) মতো ব্যাতিক্রমী গল্পকারও ‘দেশ’কে আভিজাত্যকে সুরভিত করে। শুধু তাই নয়, ‘দেশ’-এর আধারেই ছোটগল্পের পরীক্ষানিরীক্ষার ভিন্নধারায় সামিল হওয়া গল্পকাররাও আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেও ‘দেশ’-এর অবিকল্প হাতছানি প্রকট হয়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্যের চর্চায় এমন একটা সময়ে ‘দেশ’ পত্রিকার আগমন ঘটেছে যখন অধিকাংশ প্রভাবশালী সাময়িক পত্রিকা হয় বন্ধ হয়ে গেছে, নয় অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, অথবা প্রভাবে সক্রিয় ছিল না। সেখানে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার পরিসর সাময়িক নিয়মেই ভাটা পড়ে, সর্বজনীন আবেদনেও প্রভাবশালী হতে পারে না। ‘কল্লোল’ (১৯২৩), ‘কালিকলম’ (১৯২৬), ‘প্রগতি’র (১৯২৭) কলরোল থেমে যায়, ‘শনিবারের চিঠি’র (১৯২৪) প্রতাপও অস্তগামী। তবুও তাতে ‘দেশ’-এর পূর্বে বইপত্রের বিজ্ঞাপনের আধিপত্য ছিল। সেদিক থেকে একমাত্র সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ (১৯৩১) বাংলা সাহিত্যের নব পরিচয়ে সামিল হয়েছিল। সেখানে মতাদর্শ বা আদর্শগত স্বতন্ত্রতার বাইরে ‘দেশ’-এর মতো বাণিজ্যকেন্দ্রিক সাপ্তাহিক পত্রিকার ধন-মান এবং জনপ্রিয়তার আধারে ও তার অবাধ উদারতার হাতছানিতে বাংলা সাহিত্যের চর্চার পরিসর আপনাতেই বিস্তার লাভ করে। শুধু তাই নয়, তার নিয়মিত প্রকাশে তার স্থায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই বাংলার লেখককুলেও সহাবস্থানের একটি প্রতীক্ষিত আশ্রয় হয়ে ওঠে। এজন্য সেখানে সাহিত্যের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের আবহ ছিল না, সর্বজনীন আবেশে তার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে প্রায় সকলেরই স্থানসংকুলান হয়েছিল। সেক্ষেত্রে শুধু বাংলা সাহিত্যের মূল ধারার লেখকরাই ‘দেশ’বাসী হননি, বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাঁরা স্বতন্ত্র দেশের কথা ভেবেছিলেন, তাঁরাও বিদেশি তাকেননি। বিশেষ করে বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তার পরিচয় সমুজ্বল হয়ে ওঠে। সেখানে যেমন ‘ভারতী থেকে ‘সবুজ পত্র’-এর গল্পকারেরা এসেছেন, তেমনই কল্লোলীয়ানরাও প্রায় নিয়মিত লিখেছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র, জগদীশ গুপ্ত, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রবোধকুমার সান্যাল, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় প্রায় সকলেই ‘দেশ’-এর প্রথম পর্যায়ে লিখেছেন। শেষোক্ত দুজন তো ঘনঘন লিখেছেন। শুধু তাই নয়, ‘কল্লোলে’র শৈলজানন্দের গল্পের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় ‘দেশ’-এই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সেই গল্পপাঠে পবিত্র সরকারের মনে হয়েছে, ‘শুধু এই ধরনের গল্পগুলির প্রমাণে তাঁকে বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ গল্পকার বলতে ইচ্ছে হয়।’ ‘অতিথি’ (৩বর্ষ/২৭সংখ্যা), ‘প্রতিনিধি’ (৪/৮), ‘সেতুবন্ধন’ (৫/৪৫), ‘মাটির পুতুল’ (২৭/১০) প্রভৃতি গল্প তার পরিচয়। অন্যদিকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নির্বিরোধী লেখকের পাশাপাশি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দুই বিপরীত মেরুর লেখকের গল্পও ‘দেশ’-এ বেরিয়েছে। তারাশঙ্করের ‘নারী ও নাগিনী (১৩৪১-এর শারদ সংখ্যায়), ‘শৈলবালার তাসের ঘর’ (৪/১), ‘কালাপাহাড়’ (৫/১) প্রভৃতি স্মরণীয় গল্প সেখানেই প্রকাশিত। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসরে মানিক লিখেছেন ‘ট্রাজেডির পর’ (৮/৪৬), ‘প্যানিক’ (৯/৩১), ‘বিবেক’ (৯/৪৯) প্রভৃতি গল্প। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ব থেকে সরে আসার পরিচয় সেখানে সমুজ্বল। সেদিক থেকে মত ও আদর্শের ঊর্ধে সকলের অবারিত দ্বার। শুধু তাই নয়, সবাইকে আপন করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তার সদিচ্ছার অভাব প্রকট নয়। রবীন্দ্রনাথের গল্পের পাশাপাশি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প প্রকাশিত না হলেও তাঁর শতবর্ষে ‘দেশ’-এর শারদ সংখ্যায় (১৯৭৫) তাঁর অপ্রকাশিত ‘কোরেল’ নামক ‘হৃদয়দ্রাবী বড়’ গল্পটি সাদরে প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে যে-সব গল্পকার ছোটগল্পের স্বতন্ত্র ধারা সৃজনে ভিন্ন পথে সক্রিয় হয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই ‘দেশ’-এর আশ্রয়কে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেননি। ১৯৫৯-এ বিমল করের ‘ছোটগল্প : নতুন রীতি’ বা ‘এই দশক’ (১৯৬৬)-এর গল্পকাররা (জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও দেবেশ রায়, দিব্যেন্দু পালিত, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ) যেমন রয়েছেন, তেমনই ১৯৬৬-এর শাস্ত্রবিরোধী গল্পকাররাও (রমানাথ রায়, শেখর বসু, সুব্রত সেনগুপ্ত, বলরাম বসাক) তাতে নিবিষ্ট থেকেছেন। শুধু তাই নয়, শেষোক্ত গল্পকারদের মতামতকে হাজির করার ক্ষেত্রেও ‘দেশ’র (সাহিত্য সংখ্যা ১৩৮৪) ভূমিকা বর্তমান। আবার সবাইকে নিয়ে চলাই শুধু নয়, গল্প প্রকাশের ক্ষেত্রেও তার অভিজাত পরিসর গল্প লেখানোতেও সমান সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একটি গল্প ‘একটি দিন’ ‘দেশ’-এ বেরিয়েছিল ১৯৩৮-এর শেষে পঞ্চম বর্ষ পঞ্চাশ সংখ্যায়। এরকম চলচ্চিত্রকার চিদানন্দ দাশগুপ্তের গল্প ‘লালমেঘ’ (৮/৩) বা কবি ও প্রাবন্ধিক নন্দগোপাল সেনগুপ্তের ‘আহত’ (৫/৪৫) প্রকাশিত হয়েছে। বাণিজ্য পত্রিকা হিসাবে ‘দেশ’-এ গল্পের বিস্তারে যে উদারতা বা আভিজাত্যবোধ সক্রিয় ছিল, তার গল্পের বিনোদিনী পাঠের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানানোর প্রয়াস বর্তমান। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের গল্পের ধারাই শুধু নয়, দুই ধারার অপূর্ব সমন্বয়ও উঠে এসেছে। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্র অনুসারী কবিদের চেয়ে রবীন্দ্র অনুসারী গল্পকারদের প্রভাব অনেক বেশি মনে হয়। কেননা বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের কবিতার মোহ কাটিয়ে ওঠার যে সযত্ন প্রয়াস চলেছিল, তাঁর গল্পকে নিয়ে তা হয়নি, বরং তাঁকেই মডেল করে বাংলা ছোটগল্পের ধারা অব্যাহত থেকেছে। সেখানে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধির অন্তর্নিহিত সত্তাকে ইশারা-ইঙ্গিতে গীতিময় ভাষায় ব্যঞ্জনামুখর করে তোলার রাবীন্দ্রিক প্রকৃতি নানাভাবেই বাংলা ছোটগল্পের ধারায় সবুজ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে শরৎচন্দ্রীয় চরিত্র বা কাহিনিকেন্দ্রিক গল্পের ধারা সময়ান্তরে ছোটগল্পের বিবর্তনে স্থায়ী হতে পারে না। গল্পহীন গল্প বা শাস্ত্রবিরোধী গল্পেই তার পরিচয় প্রকট হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র দুজনকেই আপন করে যাপন করার প্রয়াসও তৃতীয় ধারা হিসাবে উঠে এসেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শরৎচন্দ্রের গল্পের জনপ্রিয়তাই তার মূলে। তাঁর গল্পে রমাপদ চৌধুরীর ভাষায় ‘গপ্পো’র ঢঙ তখনও সচল ছিল। সেখানে বিনোদনী পাঠের পাশাপাশি ভাবনালোকে নবদিগন্তের হাতছানিতে তৃতীয় ধারাটিও সমাদর লাভ করে। ‘দেশ’-এর গল্পের প্রথম পর্যায়ে তিনটি ধারাই লক্ষণীয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রথম পর্যায়ে অজস্র অখ্যাত গল্পকারের গল্পেই তা প্রতীয়মান। পবিত্র সরকার সেই গল্পের মধ্যে প্রচলিত ধারার পরিচয়ের বেশি কিছু লক্ষ করেননি। তাঁর মতে : ‘সে লেখাকে স্মরণীয় লেখা থেকে আলাদা করা খুব কঠিন নয়। সাধারণ চিত্তাকর্ষক ঘটনা, কিংবা কোনো অতিরিক্ত দুঃখের গল্প—ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Sob story, কোনো অভিনব অভিজ্ঞতা বা বিচিত্র মানুষ—এদের কথা বলতে প্রথানির্ভর গল্প উপন্যাসের প্রায় সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে যায়। হয়তো শেষে কোনো একটা সহজবুদ্ধির দার্শনিকতা থাকে, কিন্তু তার বেশি আর কিছুই থাকে না।’ স্বাভাবিক ভাবেই সেই সব গল্পের মধ্যে শরৎচন্দ্রীয় ছায়া কায়া বিস্তার করে। শুধু তাই নয়, প্রথম পর্যায়ে গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সুমথনাথ ঘোষের গল্পেও শরৎচন্দ্রের গল্পের ধারা উঠে এসেছে। অন্যদিকে গল্পের সেই ধারা তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ থেকে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, মনোজ বসু, প্রবোধকুমার সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, নারায়ণ গঙোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, বিমল মিত্র ও শংকর প্রমুখের মধ্যেও নানাভাবে প্রবাহিত হয়েছে। সেখানে রাবীন্দ্রিক গল্পের ধারার চকিত প্রকাশও দুর্লভ নয়। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গল্পের অনুসরণ অন্নদাশঙ্কর রায়, নরেন্দ্র মিত্র থেকে ছোটগল্পে নতুন রীতির প্রবক্তা বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী প্রমুখের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। শুধু তাই নয়, ছোটগল্পের নতুন রীতি বা গল্পহীন গল্পের ধারণার মধ্যেও সেই রাবীন্দ্রিক প্রকৃতিই আন্তরিক হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের অনুসারী গল্পের ধারাটি নানাভাবেই অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (‘দেশ’-এই ‘নাথ’ বিযুক্ত), মহাশ্বেতা দেবী প্রমুখদের স্বতন্ত্র ধারাও বর্তমান। এছাড়া ‘দেশ’-এও হাসির গল্পের ধারাও নতুন মাত্রা লাভ করে। প্রমথনাথ বিশী, শিবরাম চক্রবর্তী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, গৌরকিশোর ঘোষ প্রমুখ তার পরিচয়বাহী। সেদিক ‘দেশ’-এ ছোটগল্পের বহুমুখী প্রকাশই শুধু নয়, বহুমাত্রিক পরিচয়ও তার বনেদিয়ানায় আভিজাত্য বয়ে এনেছে। বাণিজ্যনির্ভর পত্রিকায় পরীক্ষানিরীক্ষার অবকাশ কম হলেও তার মধ্যেই বাংলা সাহিত্যের সেরা গল্পকারদের পরিচয় নানাভাবেই প্রকাশমুখর। সেক্ষেত্রে তার ধারক-বাহক প্রকৃতিটি যে নবীন-প্রবীণে চির সবুজ, তা তার প্রগতিশীল অবিচ্ছিন্ন অবিরল ধারাতেই প্রতীয়মান। কয়েকজন প্রতিনিধিস্থানীয় গল্পকারের পরিচয়ে বিষয়টি ফিরে দেখা যেতে পারে।
বাংলা ছোটগল্পের ধারায় জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭) কল্লোলীয়ান হলেও ব্যতিক্রমী গল্পকার। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা ছোটগল্পের ধারায় তাঁর প্রতিষ্ঠার মূলেই তাঁর অভিনব গল্পের আয়োজন। কোনো রকম পূর্বজ গল্পকারদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে আকাঁড়া বাস্তব জীবনের চিত্রে পৌঁছানোর গল্পে তাঁর অসাধারণ সিদ্ধি মননশীল পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতা ও কাব্যিক ব্যঞ্জনা তাঁর গল্পে ছিল না। আবার শরৎচন্দ্রের রোমান্টিক ভাবলুতাও জগদীশের স্বভাববিরুদ্ধ। তাঁর গল্পে চরিত্রের সাদা বা কালোর বিভাজন স্পষ্ট। সেখানে দোষেগুণে মানুষের বড় অভাব। এই একদেশদর্শিতা তাঁর গল্পে বিরূপ সমালোচনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অন্যদিকে তাঁর বাস্তববাদী মনের চলনে নিয়তিবাদের সহজ প্রকাশ। সেদিক থেকে তাঁর গল্পে মানবিক অস্তিত্বে অদৃষ্টের প্রভাবও সমান সক্রিয়। অন্যদিকে তাঁর গল্পের ভিন্নধর্মী জীবনদৃষ্টি তাঁকে সহজেই বিরূপতার মধ্যেও আবেদনক্ষম করে তুলেছে। জীবনের নির্মম বাস্তবতার পরিচয়ে জগদীশ গুপ্তের গল্পগুলি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ‘দেশ’-এ প্রকাশের পূর্বেই তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাড়া জাগানো গল্পগ্রন্থ ‘বিনোদিনী’ (১৯২৭), ‘রূপের বাহিরে’ (১৯২৯), ‘শ্রীমতী’ (১৯৩০), ‘পাইক শ্রীমিহির প্রামাণিক’, ‘শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী’ (১৯৩৫) প্রভৃতি। ‘দেশ’-এ তিনি বেশি লেখেননি। সেখানে তাঁর ‘দেশ’-এর তৃতীয় বর্ষের তেইশ সংখ্যায় (১৯৩৬-এর ২৪ এপ্রিল) প্রকাশিত ‘সুলভ মৃত্যু’ গল্পটি তাঁর গল্পকার সত্তার পরিণত ফসলে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। এরকম গল্প তাঁর পক্ষে আর লেখা সম্ভব হয়নি। বয়সের কারণে তাঁর এরকম পরিণতিকে জগদীশ গুপ্ত অকপটে সাগরময় ঘোষকে জানিয়েছিলেন। সাগরময়ের ‘সম্পাদকের বৈঠক’-এ প্রকাশিত চিঠিতে তিনি লিখেছেন : ‘সাহিত্যকর্ম হইতে অনেকদিন বিদায় লইয়াছি। পুঁজি ফুরাইয়াছে, দৃষ্টিশক্তিও হারাইয়াছি। ভগবান যাহা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।’ সেই ‘মঙ্গল’কামনার বিচিত্র প্রকৃতি নিয়েই ‘সুলভ মৃত্যু’ গল্পটি দুর্লভ মহার্ঘ হয়ে উঠেছে। দ্বিজদাসের বড় গৃহস্থবাড়ি, ধনে-জনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে উপচীয়মান সংসার। দুই ছেলে বিবাহিত। শাশুড়ি-পুত্রবধূতে সোনায় সোহাগা। কিন্তু শাশুড়ির মুখে অশুভ মুদ্রাদোষ, ‘মরণ হলেই বাঁচি’। সর্বমঙ্গলার এই মুদ্রাদোষের বিপত্তি নিয়েই গল্পটি জমে উঠেছে। ভিখারিনীও তার কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। এত সুখ থাকতেও তার মৃত্যু কামনায় সেও বিস্মিত। সেই ভিখারিনী অসুস্থ রুগ্ন শরীরে জ্বরে পুড়ে নিয়ে লাঠি আর বাটি নিয়ে ভিক্ষা করেও সে বাঁচতে চায়। অনেকদিন সে ভিক্ষে নিতে না আসায় সর্বমঙ্গলার মুখে সেকথা যখন উঠে আসে, তখন তার ব্যঞ্জনা অন্য মাত্রা লাভ করে। এভাবে মুদ্রাদোষের বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় গল্পটি অসাধারণ মাত্রা লাভ করেছে। এরকমই একটি গল্প বনফুলের (১৮৯৯-১৯৭৯) ‘জাগব’। এটি ‘দেশ’-এর ৭ বর্ষ ৪৭ সংখ্যায় তথা ১৯৪০-এর ৫ অক্টোবরে প্রকাশিত। পেশায় চিকিৎসক, প্রকাশে আদ্যন্ত সাহিত্যিক বনফুল স্বকীয় প্রতিভায় বাংলা সাহিত্যে গোলাপের ন্যায় আভিজাত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। ‘দেশ’-এ গল্প প্রকাশের পূর্বেই তিনি রীতিমতো সাড়া জাগানো সাহিত্যিক।
১৩২৯-এর ভাদ্র সংখ্যার ‘প্রবাসী’তে বনফুলের প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘পাখী’। আর তার পরের মাসে বেরয় তাঁর ‘চোখ গেল’ (১৩২৯-এর আশ্বিন)। ১৯২৬-এই তাঁর গল্প-সংকলন ‘বনফুলের গল্প সংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়। শুধু তাই নয়, সাহিত্যমহলেও জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৩৩-এ ‘শনিবারের চিঠি’র তৎকালীন সম্পাদক তথা কলেজজীবনের বন্ধু পরিমল গোস্বামীর প্রেরণায় তাঁর নতুন করে সাহিত্যচর্চা শুরু হয়েছিল। সেক্ষেত্রে ‘দেশ’-এ বনফুলের সাহিত্যজীবনের দ্বিতীয় পর্বের পরিচয় শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাঁর গল্প ‘দেশ’-এর শারদীয়া সংখ্যায় (১৯৩৭) প্রথম বেরিয়েছে। গল্পটি নাম ‘ঐরাবত’ (৪/৪৭)। এছাড়া পরবর্তীতে তাঁর ‘বর্ণে বর্ণে’ (৭/১৮), ‘লাল-কালো’ (১৯/৪), ‘প্রেরণা’ (১৯/৭), ‘অলক্ষ্যে’ (১৯/১৭), ‘সর্বন গোয়ালা’ (২৯/৯), ‘বৈকুণ্ঠ বাগল’ (২৯/১৯), ‘ক্ষীর’ (২৯/২৯), ‘কুমারসম্ভব’ (২৯/৪৮) প্রভৃতি গল্প প্রকাশিত হয়। বনফুল ক্ষুদ্রাকারে গল্প লেখায় পথিকৃত। তাঁর সেই অনুগল্পে তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক এবং একমেবাদ্বিতীয়ম। পবিত্র সরকার তাঁর বিখ্যাত ‘এক মিনিটের গল্প’ ধরনের আঙ্গিকেই সব গল্প লেখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তবে ‘দেশ’-এ প্রকাশিত গল্পে বিশেষ করে শেষের দিকে লেখাগুলোতে একটু শিথিলতার কথাও সমালোচকের মনে হয়েছে। অন্যদিকে পরিমল গোস্বামী বনফুলের গল্পকে মাছরাঙার ছো মেরে জলে ডুব দিয়ে মাছ ধরার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর সেই দৃষ্টি ও দক্ষতা কত প্রখর ছিল, তা তাঁর ‘দেশ’-এর গল্পেই প্রতীয়মান। ‘বর্ণে বর্ণে’ গল্পের মধ্যে জ্যোতিষী লেখকের অর্থনাশের কথা অব্যর্থ করে তোলেন যখন তাঁর অনুপস্থিতে বৈঠকখানা থেকে মানিব্যাগ হাতিয়ে নেয়। ঘটনা সন্নিবেশে এধরনের গল্পে বনফুলের কল্পনাও বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে, অসাধারণ উৎসার লাভ করে। অন্যদিকে চরিত্র ও ঘটনার বৈচিত্র্য ও চমৎকারিত্বে ও মননদীপ্ত উপসংহারে বনফুলের অনুগল্পের অতুলনীয় বিস্তার। প্রায় ছশো গল্পের কথা জানা যায় তাঁর। ‘দেশ’-এ প্রকাশিত (১৯৪০-এর ৫ অক্টোবর) তাঁর সেই অসাধারণ গল্প ‘জাগব’। নামজাদা বয়স্ক উকিল শশী হাজরার কাছে সদ্য সদ্য ওকালতি পাশকরা ত্রিলোচন সরকার কিছুতেই পেরে ওঠে না। অবশেষে লোভে পড়ে সে চড় মেরে কাজের ছেলে মেরে জেলে গিয়ে নির্বাক হয়ে যাওয়া জগুকে বাঁচানোয় মরীয়া হয়ে ওঠে। তাকে বাঁচানোর পরে টাকা পাওয়ার শর্তেও ত্রিলোচন রাজি হয়ে যায়। পাগল সাব্যস্ত করে ফাঁসীর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার পর নিরালায় গিয়ে জগুকে সে যেই টাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, সেই তার শিখিয়ে দেওয়া বুলি আওড়ায় সে, ‘অয় অয় অয়’। যে ফাঁক দিয়ে জগুকে বাঁচিয়ে দেয়, সেই ফাঁকে সেও শিকার। ফলে ত্রিলোচনের শেষ রক্ষা না হলেও বনফুলের গল্পের শিল্পরূপের সুরক্ষা অনন্য হয়ে ওঠে। অথচ তা নিছক হাসির গল্পে নিঃস্ব হয়ে পড়ে না, জীবনসংগ্রামের গল্পেও অনন্যতা লাভ করে। অন্যদিকে শিবরাম চক্রবর্তী (১৯০৩-১৯৮০) হাসির গল্পেই সিরিয়াস জীবনে মুক্ত হাওয়া বইয়ে দিয়েছেন। অবশ্য ‘দেশ’-এ গল্প প্রকাশের পূর্বেই তিনি হাসির গল্পে শিবরাম চক্রবর্তী থেকে শিব্রাম চক্কোত্তি বা চকর্বরতিতে কিংবদন্তী হয়ে উঠেছেন।
১৯৩৫-এ ‘মৌচাক’ পত্রিকায় শিবরাম তাঁর ‘পঞ্চাননের অশ্বমেধ’ গল্পের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের হাসির গল্পে হাজির হয়ে আর পিছনে ফিরে তাকাননি। পঞ্চাননের ঘোড়াটি মড়ে গিয়েছিল, শিবরাম নতুন করে বেঁচে উঠেছিলেন। শব্দকে নিয়ে খেলা তথা ‘পানিং’(punning) তাঁর সহজাত প্রতিভা। ‘পান’প্রিয় শিবরাম ক্রমশ ‘পান’সম্রাট হয়ে ওঠেন। কথার মারপ্যাঁচে বা কথাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে, শব্দকে ভেঙে বা নিঙড়ে, শব্দের একাধিক অর্থের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে বা শব্দের জাগলারি করে বহুমুখী অর্থের প্রাণসঞ্চার করে লিখেছেন একের পর এক গল্প, প্রকাশিত হয়েছে অবিরল গল্পের বই। ‘পঞ্চাননের অশ্বমেধ’ (১৯৩৫), ‘শুঁড়ওলা বাবা’ (১৯৩৫), ‘কাকাবাবুর কাণ্ড’ (১৯৩৭), ‘কালান্তক লালফিতা’ (১৯৩৭), ‘মন্টুর মাস্টার’ (১৯৩৭) প্রভৃতি গল্পের বইয়ের মাঝেই ১৯৩৬-এ গল্পের সিরিজ ‘কলকাতার হালচাল’-এ তাঁর হাসির গল্পের অমর চরিত্র হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধন চলে এসেছে। সেই বর্ধন ভাতৃদ্বয়কে নিয়ে শিবরাম অসংখ্য গল্প লিখেছেন। সেদিক থেকে ‘দেশ’-এ জনপ্রিয় ‘হাসির রাজা’ হিসাবে শিবরামের রাজকীয় আবির্ভাব। সেখানে প্রায় নিয়মিত লিখেছেন শিবরাম। হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধনের পাশাপাশি তাঁর বিনি, প্রিসিলা, জবা, ইতু সকলেই প্রায় হাজির। তাঁর হাসির গল্পের বিপুল জনপ্রিয়তাও ‘দেশ’-এর শ্রীবৃদ্ধির সহায়ক হয়ে ওঠে। বিশুদ্ধ কৌতুকের আমদানিতে শিবরাম তাঁর শিব্রামকে স্বমহিমায় হাজির করেছেন। সেখানেও একের পর এক গল্প প্রকাশের মাধ্যমেও তাঁর আবেদন নিবিড় হয়ে ওঠে। ‘অবাঞ্ছিত আবির্ভাব (১৯/১৭), ‘রহস্যময়ী’ (২০/৫), ‘তস্য ভ্রাতা’ (২৯/৪), ‘কাকস্য পরিবেদনা’ (২৯/১৩), ‘আরাম সিটারাম’ (২৯/১৫), ‘ঘাটশিলার শিলালিপি’ (২৯/১৬), ‘ভগবৎ প্রেরণা’ (২৯/২১), ‘বিনি প্রত্যয়’ (২৯/২৩), ‘যৌবন-জ্বালআ’ (৩১/২) প্রভৃতি গল্পে তাঁর বিশুদ্ধ কৌতুক রস রসিক পাঠককে আমোদিত করে তোলে। তাঁর শিব্রামীয় ভাষার অপূর্ব খেলা ও মনোহারি চারুত্বে এবং ঘটনার সন্নিবেশের দক্ষতায় গল্পগুলি হাসির ফোয়ারা তৈরি করে। অন্যদিকে ‘দেশ’-এও শিবরাম হাসির গল্পের সিরিজ লিখেছেন। ১৯৫০-এ তাঁর একটি গল্পের সিরিজ ‘আপনি কী হারাইতেছেন আপনি জানেন না’। শিব্রামীয় ভাষায় গল্পগুলি উপাদেয় হয়ে উঠেছে। তারই একটি গল্প যেটি ১৯৫১-এর ১৬ জুন ‘দেশ’-এ প্রকাশিত হয়েছিল তার ঘটনার বিবরণের মধ্যেই হাস্যরসের ফোয়ারা ছড়িয়ে পড়ে। আসলে শিবরামের হাস্যরসের মূলাধার তাঁর স্বকীয় ভাষা। সেখানে সামান্য ঘটনাও উপস্থাপনা প্রকৌশলে হাসির ক্ষরণকে অনিবার্য করে তোলে। প্রবীণ উকিল পাকড়াশীর কাছে নবীন মক্কেল শ্রীমতী এণাক্ষী দেবী তেলেবেগুনে জ্বলে এসেছে পাশের ফ্ল্যাটে কুকুর নিয়ে থাকা পড়শির বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য। সেই প্রবীণ ও নবীনের আলোচনা নিয়েই গল্পটি। অথচ তার শুরু থেকে শেষ টানটান উত্তেজনা ও কৌতূহল জিইয়ে রেখে গল্পটি অসামান্য দীপ্তি লাভ করে। এনাক্ষী বাথরুমে থাকার সময় না বলে শোবার ঘরে ঢুকে রান্না ঘরে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তার নিরাবরণ শরীরের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার বিবরণ উত্তেজনামুখর হতেই গল্পের শেষে জানা যায় সেই আগুন্তুক পড়শি নয়, তার সেই কুকুরটি। অথচ উপস্থাপনার স্বকীয়তায় ও শিব্রামীয় ভাষায় শিবরাম তাঁর গল্পটির পরতে পরতে হাসির বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে দিয়েছেন। এরকম জনপ্রিয় হাস্যরসে ধারার জন্যই শিবরাম সুদীর্ঘকাল ‘দেশ’-এ লিখেছেন। অন্যদিকে কমলকুমার মজুমদার(১৯১৪-১৯৭৯) মাত্র কয়েকটি গল্পেই তাঁর জাত চিনিয়ে দিয়েছেন।
‘দেশ’-এ গল্প লেখার পূর্বে কমলকুমার মজুমদার ব্যতিক্রমী লেখক হয়ে ওঠেননি। তখনও তাঁর ভাষার স্বকীয়তা প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত হয়নি তাঁর ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র (১৯৫৯) বা ‘গোলাপসুন্দরী’র (১৯৬১) বিতর্কিত গদ্য। এদিকে ১৯৫৮-তে ‘দেশ’-এ তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘মতিলাল পাদর্তহা (২৫/২৪) ও ‘তাহাদের কথা’ (২৫/৪৫) প্রকাশিত হয়। দুটি গল্পই চলিত গদ্যে লেখা। তবে শেষেরটি কমলকুমারীয় ভাষার আভাস মেলে। অন্যদিকে ‘মতিলাল পাদরী’র ভাষা প্রচলিত সাহিত্যের ভাষা। অথচ সেখানেও কমলকুমারের গল্পকার পরিচিতির স্বকীয়তা নানাভাবেই প্রকাশমুখর। তাঁর গল্পের শৈল্পিক প্রকাশই শুধু নয়, বিষয়ভাবনাতেও স্বতন্দ্রতা বর্তমান। সেখানে তাঁর শৈল্পিক সত্তার সঙ্গে লেখকসত্তার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। দেখানোর দৃষ্টিতেই তার পরিচয় অনন্যতা লাভ করে। ‘মতিলাল পাদরী’তে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মানবিকতাবোধের দ্বন্দ্ব অসাধারণ ভাবে ফুটে উঠেছে। শুধু তাই নয়, গল্পের শেষে ধর্মীয় সংস্কারের বাইরে গিয়ে মানবতাবোধকেই জাগিয়ে তোলা হয়েছে। হাঁসদোয়ার গির্জার পাদরী মতিলাল। তাঁর শুধু ‘পূর্ণাঙ্গ ক্রিশ্চান’ হওয়ার আশা ছিল। বর্ষার রাতে হঠাৎ করে একদিন সেই গির্জাঘরে সেই এলাকার ভামরের গর্ভজাত সন্তান প্রসবের মধ্যে যে ঐশ্বরিক অস্তিত্বে পবিত্রতা খুঁজে পেয়েছিলেন মতিলাল, তা অচিরেই শিশুটির পিতৃপরিচয়ের অভাবে দিন কয়েকের মধ্যেই তা অশ্রদ্ধেয় মনে হয়। প্রতিবেশীদের সন্দেহ থেকে ভামরে অসংখ্য পুরুষসঙ্গে বিতৃষ্ণ মতিলাল সেই বেড়ে ওঠা শিশুটির প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠেন। শেষে তাকে জঙ্গলে ছেড়ে পালিয়ে আসতে গিয়েও পারলেন না। জঙ্গলের মধ্যে শিশুটির কান্নায় তাঁর পিতৃত্বের ক্ষরণ ঘটে। ছুটে গিয়ে শিশুটিকে তুলে নিয়ে সজল চোখে মতিলাল তাঁর প্রকৃত ক্রিশ্চান না হওয়ার জন্য অনুশোচনা ব্যক্ত করেন। আর সেখানেই গল্পটির অসাধারণ বিভূতি ছড়িয়ে পড়ে। সেদিক থেকে ব্যতিক্রমী ছোটগল্পের পরিচয়ে ‘দেশ’-এ কমলকুমার মজুমদারের ভূমিকাও বিশেষ ভাবে স্মরণীয় মনে হয়। অন্যদিকে নতুন রীতির ছোটগল্পে বিমল করের (১৯২১-২০০৩) অবদান ‘দেশ’কেও সমৃদ্ধ করেছে। আবার ‘দেশ’-এ গল্প প্রকাশের মাধ্যমেই তাঁর গল্পকার পরিচিতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাঁর প্রথম গল্প-সংকলন ‘বরফ সাহেবের মেয়ে’-র (১৯৫৪) নাম গল্পটিই ‘দেশ’-এ প্রকাশিত হয় ১৯৫২-এর ২২ নভেম্বরে। এর পূর্বে তাঁর প্রথম গল্প ‘অম্বিকানাথের মৃত্যু’ বেরিয়েছে ১৯৪৪-এ ‘প্রবর্তক’ পত্রিকায়। অন্যদিকে ‘দেশ’-এ প্রকাশিত তাঁর ‘আত্মজা’ (১৯৫৪-এর মার্চ) গল্পে যেমন বিরূপ সমালোচনা নেমে এসেছিল, তেমনই সাগরময় ঘোষের পূর্ণ সমর্থনে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই ১৯৫৪ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত বিমল কর ‘দেশ’-এ বিভাগীয় সম্পাদকের দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন। ‘দেশ’-এ গল্প নির্বাচনের মাধ্যমে তার অভিমুখ রচনার ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তাভাবনা সক্রিয় ছিল। উল্লেখ্য, তাঁর ‘ছোটগল্প : নতুন রীতি’তে প্রচলিত গল্পের ছকবন্দি পরিসর থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান ছিল। তত্বের মধ্য আবদ্ধ না থেকে গল্পকারের প্রকাশভঙ্গিতে স্বাধীন চিন্তার প্রতিফলনে বিশ্বাস ছিল সেই রীতিতে। সেদিক থেকে বিমল করের গল্পে বস্তুবিশ্বের চেয়ে মননবিশ্বের প্রাধান্য ছিল প্রথমাবধি। তাঁর ‘দেশ’-এ প্রকাশিত গল্পের মধ্যেও তার পরিচয় বর্তমান।
বিমল কর গল্প অতিপ্রজ গল্পকার নন। সেখানে তাঁর সংযম লক্ষ্যভেদী, সংরূপ শিল্পভাবনা। ‘দেশ’-এ প্রকাশিত গল্পের মধ্যে তাঁর স্বকীয় গল্পকার সত্তাটি নিবিড়তা লাভ করেছে। ‘মানবপুত্র’ (২০/২৩), ‘অশ্বত্থ’ (২৩/১০), ‘যক্ষ’ (২১/৩), ‘পাপ’ (২৩/৩৯), ‘শূন্য’ (২৪/৪), ‘অবিশ্বাস্য’ (২৯/৫), ‘গুণেন একা’ (৪৭/১) প্রভৃতি গল্পে মনস্তাত্বিক মনোভঙ্গি প্রকট হয়ে উঠেছে। তাঁর ‘মানবিক বক্তব্য’ই সেখানে উঠে এসেছে। মানুষের নিঃসঙ্গতা সেখানে নানাভাবে প্রকাশমুখর। ছোটগল্পের নতুন রীতির সমর্থক গল্পকার শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ‘দেশ’-এর পৃষ্ঠাতেই বিমল করের চরিত্রগুলিকে ‘নিঃসঙ্গ, আত্মজনহীন, একাকী, বিষণ্ণ’বলে অভিহিত করেন। সেখানে অবশ্য বিষাদময় জীবন নয়, জীবনের বিষাদ থেকে উত্তরণে দিশা আলো ছড়ায়, আত্মসমীক্ষায় আন্তরিক করে তোলে। বিমল করের এরকমই একটি অসাধারণ গল্প ‘সুখ’। সেটি ‘দেশ’-এর ১৯৭৫-এর ১ নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। আত্মত্যাগ ও দায়বদ্ধতা এবং পারস্পারিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে দাম্পত্য জীবনের সুখের ঠিকানায় গল্পটির রসক্ষরণ শুধু ভাবিয়ে তোলে না, জাগিয়েও দেয়। যেমনটা জাগিয়েছে ‘সুখ’ গল্পে শোভেনের মনে। ছকবন্দি জীবন ছেড়ে অবশেষে কোনোরকমে ঘুরতে বেরিয়ে অন্তঃসত্বা স্ত্রী মীনাকে নিয়ে সাঁওতাল পরগণায় এক বাংলোয় উঠে এসে কাছের বাংলোয় এক বৃদ্ধ দম্পতিকে দেখতে পায়। তাতে প্রথমে বয়সের দূরত্বে আলাপের অনীহা তীব্র হলেও শেষে সৌজন্যের বশে আলাপ করতে গিয়ে শোভেনের ভুল ভাঙে। যৌবনের মাদকতায় যে সুখের হদিশ পেতে চেয়েছিল শোভেন, সে পেল বৃদ্ধ-বৃদ্ধার পারস্পারিক ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার অন্তহীন দাম্পত্যপ্রেমের মধ্যে যেখানে সে পৌঁছাতে পারব কিনা তা নিয়ে তার ভাবনায় থই পায় না। তার মনে হতে থাকে, ‘সারা জীবন ধরে এত ভালবাসা বয়ে নিয়ে যাবার সাধ্য কি তার আছে ?’ শোভেনের কাম কান্না হয়ে নামে, পাঠকের চোখও জেগে ওঠে। মননের ক্ষরণে বিমল করের গল্প আপনাতেই বিনোদনী পাঠ ছেড়ে মননশীলতার পাঠে পাঠককে দীক্ষিত করে চলে। সেখানে ‘দেশ’ পত্রিকায় গল্পের প্রাচুর্য ও আভিজাত্যই বাড়েনি, গল্পের দেশও দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। আর তার যাত্রা অভিযানে সামিল হয়েছিল ‘দেশ’-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে। সেই দশকেই ‘দেশ’ ক্রমশ নিজের দেশের পরিচয় ও বিস্তৃতি লাভ করে। পঞ্চাশের দশকেই ‘দেশ’-এর চাহিদা বেড়ে যায়। ১৯৫১-৫২ পর্যন্ত যেখানে তার প্রচার সংখ্যা পাঁচশো বা একহাজার করে বেড়েছে, সেখানে ১৯৫২-৫৩ তে তিন হাজার করে বাড়তে শুরু করে। ‘দেশ’-এ শ্রীবৃদ্ধিতে যে তার গল্পের দেশের ভূমিকা বর্তমান, তা তাঁর বনেদি আভিজাত্য ও উৎকর্ষমুখর বিস্তৃতি লাভের মধ্যেই প্রতীয়মান।
লেখক, প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
অসাধারণ গবেষণাধর্মী রচনা।