এবারেও জগদ্ধাত্রী পুজোয় বর্ণময় আলোয় আলোকিত চন্দননগর। নদীয়ার কৃষ্ণনগরের শিল্প-নৈপুণ্যে জগদ্ধাত্রীর রূপ আজও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। হুগলির দ্বিতীয় চন্দননগর রাজহাটিতে এবার আর্থিক সমস্যা থাকলেও জগদ্ধাত্রীকে ম্লান হতে দিচ্ছে না এলাকার পুজোকর্তারা। মন্থার বৃষ্টি ভক্তদের আটকাতে পারেনি। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে চন্দননগর, নদীয়ার কৃষ্ণনগর, হুগলির দ্বিতীয় চন্দননগর রাজহাটিতে উপচে পড়া ভিড় নজর কাড়ছে। এদিকে চন্দননগরের পুজোয় দর্শনার্থীদের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে।
রাজহাটির পুজো প্রতি বছর নজর কাড়ে। এখানে অনেকেই সোনার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সোনার বাজার দর হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সোনার কারিগররা। আয় কমে গেছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। তারপরেও পুজোর জৌলুস একটুও কমাতে রাজি নয় খানাকুলের রাজহাটি এলাকার পুজো কর্তারা। এবারেও শুধু রাজহাটিকে কেন্দ্র করে ১৪টি পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। এদের মধ্যে নতুন দিগন্ত, অভিনন্দন, সৃষ্টি, উদয়ন, কল্পতরু, অঙ্কুর, নান্দনিক, দিশারী-১এর পল্লী, রয়াল বুলেট ইত্যাদির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রসঙ্গত, খানাকুল বন্যাপ্রবণ এলাকা। প্রায় প্রতি বছরই দুর্গা পুজোর সময় বন্যায় ডুবে থাকে সমস্ত দিক। বিশেষ করে রাজহাটি এলাকায় তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে হয় মানুষকে। তাই এখানকার ক্লাব বা সংগঠনগুলি দুর্গাপুজোর পরিবর্তে জগদ্ধাত্রী পুজোয় মেতে ওঠেন প্রতিবছর। সাম্প্রতিক ১৫-২০ বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে জগদ্ধাত্রী পুজোর সংখ্যা এবং আকার। ফলে হুগলি জেলার দ্বিতীয় চন্দননগর হয়ে উঠেছে রাজহাটি। অতিথি নিমন্ত্রণ থেকে শুরু করে নতুন জামা কাপড় ও উৎসব অনুষ্ঠান ইত্যাদি শারদ উৎসবের যাবতীয় আয়োজন এখানে করা হয় এবং বর্ণময় হয়ে ওঠে এই এলাকা।
আর্থিক সংকট কাটিয়ে এবারে টাকা দিয়েই প্যান্ডেল করছে ‘সৃষ্টি’ ক্লাব। তাদের থিম, ‘দৃষ্টি সবার সৃষ্টিতে।’ সম্পাদক সন্দীপ সামন্ত ও সভাপতি আশীষ দ্বারীর বক্তব্য, ‘আর্থিক সমস্যা আছে কিন্তু পুজোর মান তো নামিয়ে আনা যাবে না। তাই আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আশা করছি সবার ভালো লাগবে।’ দিশারী একের পল্লীর এবারের থিম ‘মায়াজাল’। এরা প্রতি বছরই অভিনব কিছু ভাবনা তুলে আনেন সমাজ সচেতনতার উদ্দেশ্যে। ক্লাবের পক্ষ থেকে অমিত আঢ্য জানিয়েছেন, ‘সমস্যা আছে। কিন্তু তবুও বাজেট কমছে না। প্যান্ডেল প্রতিমা, সমাজ সেবা প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিবারের মতো এবারেও আমাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকবে।’ অভিনন্দন প্রতিবছরই দর্শনার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এবারই তাদের থিম ‘আদিবাসী’। সম্পাদক কিংকর চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ‘আমাদের ক্লাবের বেশ কিছু সদস্য স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ায় সোনার বাজারে মন্দা চলছে। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি যাতে উৎসবের মান কমে না যায়।’
রাজহাটি ছাড়াও খানাকুলে রেনেসাঁস ক্লাবের পুজো কয়েক বছর ধরে দর্শকদের মন কাড়ছে। পুজো কমিটির পক্ষ থেকে রমেন প্রামানিক জানিয়েছেন, এবারেও ধুমধাম করে পূজা হবে। কোথাও কোন খামতি থাকবে না।
প্রসঙ্গত, জগদ্ধাত্রী পুজো উপলক্ষে হুগলির চন্দননগর, রাজহাটি ও খানাকুলে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করল পুলিশ প্রশাসন। বেড়েছে পুজোর সংখ্যা, বাড়ছে ভিড়ের বহর। ইতিমধ্যে জেলা পুলিশ প্রশাসন বৈঠক করে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে। রাজহাটিতে জগদ্ধাত্রী পুজো উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক বৈঠক হয়েছে খানাকুলে। গত শনিবার খানাকুল থানায় এই বৈঠক হয়। উপস্থিত ছিলেন খানাকুল-২ বিডিও মহম্মদ জাকারিয়া, আরামবাগের এসডিপিও সুপ্রভাত চক্রবর্তী, খানাকুল থানার ওসি সন্দীপ মুখোপাধ্যায় এবং দমকল বিভাগের কর্তারা।
জগদ্ধাত্রী পুজো ঘিরে খানাকুলের রাজহাটিতে প্রতি বছর ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যায়। অনেকে রাজহাটির পুজোকে দ্বিতীয় চন্দননগর বলে থাকেন। আরামবাগের এসডিপিও সুপ্রভাতবাবু বলেন, নিরাপত্তার সবদিক খতিয়ে দেখা হয়েছে। কার্নিভালের রুটটিও এদিন দেখেছি। কোথায় কী ধরনের ব্যবস্থা রাখা হবে, তার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মহিলাদের নিরাপত্তায় উইনার্স টিমও থাকছে। জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে চন্দননগর ও ভদ্রেশ্বরকে নিরাপত্তার বজ্র আটুনিতে মুড়ে দিচ্ছে। হুগলির বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের পাশাপাশি গোটা বাংলার মানুষ মূলত রেলপথেই চন্দননগরে আসেন। তাই হুগলিতে বেনজির নিরাপত্তার ব্যবস্থা। চন্দননগরের ‘লাইফ লাইন’কে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে। পুলিস কমিশনার অমিত পি জাভালগি বলেন, পুজোর সময় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে।
চন্দননগরের আবেগের পুজো এখন আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলার গর্ব হয়ে উঠেছে। পুজোর জন্য মোতায়েন হচ্ছে বাড়তি পুলিশ বাহিনী। এছাড়া এই প্রথমবার বিরাট সংখ্যক সাদা পোশাকের মহিলা ও পুরুষ পুলিশ মোতায়েন করছে চন্দননগর কমিশনারেট। জলপথেও থাকছে কড়া নজরদারি। উৎসবের দিনগুলি শিশু ও মহিলাদের নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা এবং হেল্পডেক্স থাকছে। থাকবে যান চলাচলে বিধিনিষেধ।
হুগলির বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের পাশাপাশি গোটা বাংলার মানুষ মূলত রেলপথেই চন্দননগরে আসেন। পুজোর সুনাম ও ঐতিহ্য রক্ষায় চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না। অনুমোদিত পুজোর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮০টি।