বেড়াতে যেতে কে না ভালবাসে। আমরা সকলেই বেড়াতে যাই, আনন্দ করি ছবি তুলি, আজকাল অবশ্য সেলফি তুলি তারপর একসময় ফিরেও আসি। এসে বন্ধু বান্ধবদের সাথে সে সব নিয়ে গল্প করি, রিল বানাই ইনষ্টাগ্রাম আঁক ফেবুতে আপলোড করি তারপর একসময় সেই স্মৃতি ফিকে হয়ে আসে। আবার নতুন কোথাও যাওয়ার চিন্তা ভাবনা — নতুন প্লান। এভাবেই চলে। কিন্তু ভাবুন তো বেড়াতে গিয়ে যদি কোন যায়গা দেখে সেটা আপনার এতটাই ভাললেগে যায় যা আপনার চিন্তার জগতে আলোড়োন তোলে আর সেই আলোড়োন এতটাই প্রবল যে ফিরে এসে আপনি নিজেকে সেই ধর্ম পথের পথিক করে তোলেন। সেখানেই শেষ নয়। পরবর্তী সময়ে সেই ধর্ম যা আপনার স্বধর্ম থেকে আলাদা তার একটি অনুপম সৌধ নিজের বাড়ীতে গড়ে তোলেন আর বাকি জীবন সেই চর্চাতেই কাটিয়ে দেন তাহলে সেটা বোধহয় একটা মাইলফলক হয়ে যায়।

এরকমই ঘটেছিল এই বৌদ্ধ বিহারের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত তারকচন্দ্র বাইরির জীবনে। বেড়ানো থেকে ফিরে এসে তিনি তারকেশ্বরের কাছে পুরশুড়ায় গাছগাছালিতে ভরা শান্ত মনোরম গ্রাম্য পরিবেশে এই বৌদ্ধ মন্দির গড়ে তোলেন।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সস্ত্রীক উত্তর ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তারকবাবু সেখানে এক বুদ্ধমন্দির দেখে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। সেই দর্শন তাঁর চিন্তার জগতে এক বিশাল আলোড়ন তোলে। শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৮৫ সালে দলাই লামার হাতে এই বিহার উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে সে বৃত্ত সম্পুর্ণ হয়। জনপ্রিয় ধর্মস্থান তারকেশ্বরের কাছেই দেউলপাড়া আজ হুগলি জেলার পর্যটন মানচিত্রে এক অবশ্য দ্রষ্টব্য।এরমধ্যে কেটে গিয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর। তারকবাবু প্রয়াত হয়েছেন ওনার পুত্র প্রতাপ বাইরি বর্তমানে দেখাশোনা করেন। কোলকাতা থেকে গাড়িতে বা ট্রেনে তারকেশ্বর আর সেখান থেকে এগিয়ে কাঁড়ারিয়া — দেউলপাড়া দামোদর ব্রীজ পার হয়ে এখানে পৌঁছে যাবেন। ব্রীজের উপর থেকেই এই সৌধ নজরে পড়ে। আর একটু এগোতেই মন্দিরের ফটক। ন’ বিঘা জমির এই মন্দির প্রাঙ্গন একসময় নানা ফল ও ফুলের গাছ দিয়ে সুন্দর করে সাজানো ছিল। মূল মন্দিরের ডান দিকে পাথরের ফলকে লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৮৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দলাই লামা এই ‘ত্রিরত্ন সংঘ শান্তিবন বুদ্ধবিহার’-এর উদ্বোধন করেন। ভিতরে প্রশস্ত উপাসনাকক্ষ। বেদীর উপর শান্ত সমাহিত শ্বেত পাথরের ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি। বেদীর নীচে মোমবাতি জ্বলছে। হলঘরের দেওয়ালে তথাগতের জীবনকথা নিয়ে বড় বড় তৈলচিত্র।এক অনাবিল শান্তির পরিবেশ। মাঝে মাঝে হনুমানের প্রবল প্রতাপে এগাছ থেকে অন্যগাছে উল্লম্ফন বোধহয় শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় সারা গ্রামে একজনও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ নেই। অথচ রয়েছে বৌদ্ধমন্দির। গ্রামে কমপক্ষে পাঁচশো পরিবারের বসবাস। এমনকী সারা পুরশুড়া ব্লকে প্রায় ২ লক্ষ মানুষের মধ্যেও কোন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবুও প্রায় ৪০ বছর ধরে এই মন্দিরটি সারা বছরের বিভিন্ন সময় ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের অন্যতম আকর্ষণ।শোনা যায় কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক নাকি এটিকে পর্যটন কেন্দ্রের স্বীকৃতি দিয়েছেন কিন্তু কোথাও কোন বোর্ড দেখতে পেলাম না। মন্দিরটি যদিও ইতিমধ্যেই স্থানীয় সাহিত্যিকদের গল্প, প্রবন্ধে স্থান করে নিয়েছে। কয়েকবার এখানে সিনেমার শুটিংও হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের দৌলতে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পরেছে বিশ্বজুড়ে, তা সত্বেও বলবো এটির গরিমা আজ অনেকটাই অস্তিমিত। মন্দিরের দেওয়ালে জলের ছাপ, এক সময়ের বাগান আজ প্রায় জঙ্গলে ঢাকা। সব যায়গায় কেমন একটা অযত্নের ছাপ। একটু নজর দিলে এটি সহজেই আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে যায়গা করে নিতে পারে। মনেহয় বৌদ্ধ সঙ্ঘের নিয়ম মেনে তারকবাবু এখানে পঠনপাঠনের জন্য উপযুক্ত যায়গার সংস্থানও রেখেছিলেন। দুপাশের দুটি দোতলা বাড়ী দেখে সেইরকমই মনে হয়। আজ তা অব্যবহৃত রয়েছে বলে মনে হয়। যেখানে উচ্চমানের গবেষনা কেন্দ্র গড়ে উঠতেই পারে।

প্রনাম শেষে বেড়িয়ে আসতে আসতে বারবার মন্দিরের প্রতিষ্ঠিতা তারকবাবুর কথা মনে পরে যাচ্ছিল। কি ছিল সেই অমোঘ আকর্ষণ যা ওনার চিন্তার জগতে বিপ্লব এনেছিল। তার প্রভাব এতটাই প্রবল এতটাই সর্বগ্রাসী ছিল যা তার বাকী জীবনটাই পালটে দিল? এরকমই এক রুপান্তর হয়তো সম্রাট অশোকের জীবনেও হয়েছিল। যা তার সব অহঙ্কার, দম্ভকে নিমেষে চুরমার করে এক নতুন জগতের দরজা খুলে দিয়েছিল। দেউলপাড়ার নবীন এই বৌদ্ধ মন্দির আমাদের আরেকবার বুঝিয়ে দেয়, ভারতবর্ষের আবহমান ধারা বিভেদের মাঝে দেখি মিলন মহান। বুদ্ধপূর্ণিমায় বহু দূর-দূরান্ত থেকে বহু পর্যটক আসেন ধ্বনীত হয় : —
“বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি — আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম।
ধম্মং শরণং গচ্ছামি — আমি ধর্মের শরণ নিলাম।
সংঘং শরণং গচ্ছামি — আমি সংঘের শরণ নিলাম”।
চমৎকার বিবরণ কমলবাবু। এখনও বাংলায় নতুন করে এ মন্ত্রে দীক্ষিত হন জেনে ভালো লাগল। অনায়াসে যাওয়া যায় এমন বৌদ্ধক্ষেত্র আমাদের ধারেকাছে নেই।
একদমই। আসার পথে দারহাটটা আর আটপুর দেখে নেওয়া যেতে পারে।
Good description, interesting, will visit the place definitely to enjoy the peace and serenity.
Yes we can plan a day trip.
নতুন জায়গার সন্ধান পেলুম।যেতে পারলে ভালো লাগবে
একদমই। Google search করলে location পেয়ে যাবে।
লেখাটা আমি সেভ করে রাখলাম।
To visit list.