দেবাশিস ভট্টাচার্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ শুরু হয়েছিল ২০০৩-এর শেষদিকে, ২০০৭-এর গোড়া থেকে। প্রধান প্রেক্ষাপট ছিল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন। সেই পর্বে আমি ‘একদিন’ দৈনিক কাগজে রাজনৈতিক কয়েকটি প্রতিবেদন-ভাষ্য লিখেছিলাম। তারপর, ২০০৭ সালে লালবাজার সেন্ট্রাল লক-আপে গ্রেপ্তার হই। কবিতা থেকে মিছিল নয়, মিছিল থেকে গারদে। একদিন অচেনা গলায় ফোন আসে। ক্রমে দেবাশিসদা শুধু পরিচিত অগ্রজ নন, আমার অভিভাবক হয়ে যান। ২০১১ সালে পরিবর্তনের পর হাজরা মোড়ে বহুবার তাঁর কাছে গেছি। কত আলোচনা হয়েছে, কত পরামর্শ-পরিকল্পনা হয়েছে, অন্তরঙ্গ আলাপ হয়েছে। আজ সবই স্মৃতি।
স্মৃতি শব্দটা লিখেই মনে হলো, এ এক অমোঘ শব্দ। দেবাশিসদার ক্ষেত্রে। তাঁর মতো এত তীক্ষ্ণ, নির্ভুল, স্পষ্ট স্মৃতির মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। বিশেষত রাজনৈতিক ইতিহাসে। দীর্ঘসময় তিনি বামপন্থী এবং অতিবামপন্থী রাজনীতির সামনের সারিতে ছিলেন। জেলে গেছেন, আন্দোলনে থেকেছেন, গ্রামে-গ্রামে ঘুরেছেন, ঘাটা-আঘাটায় আত্মগোপন করেছেন, প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে হাতে-হাত মিলিয়ে বেঁচেছেন। ঘনিষ্ঠজনের কাছে, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে অনর্গল সেইসব স্মৃতিচারণ করতেন। প্রতিটি কথা বলতেন ফটোগ্রাফিক মেমারি থেকে। সে ঘটনাই হোক বা ব্যক্তি — দেবাশিসদার ক্ষেত্রে কোনো ভুল-চুক নেই। সেসব রোমাঞ্চকর, অত্যাশ্চর্য, অবিশ্বাস্য ঘটনা-মানুষ-অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কেন যে একটা আত্মজীবনী লিখলেন না তিনি, কে জানে! সে কথা বললে, চাপা হাসতেন। ‘সেই ৩০ বছর’ বইটিতে যা আছে, সে মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্যের চতুর্গুণ ছিল তাঁর বৈঠকী পরিবেশনায়। কত মানুষ, কত দ্বন্দ্ব, কত ইতিহাসের আনাচকানাচ সেসব কথায় জীবন্ত হয়ে উঠত। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, বহু মান্য রাজনীতিবিদ্, বিভিন্ন জনের, তথ্য বা দলিল বা তারিখ জানতে দেবাশিসদার শরণাপন্ন হতেন। এখানেই তিনি অনন্য। আড়ম্বরহীন, চাকচিক্যহীন জীবন যাপন করতেন, শুধু প্রসঙ্গকথায় ঝলসে উঠতো তথ্যের ফুলকি।

দীর্ঘ সম্পাদনাজীবনে লেখালেখির দোষগুণবিচারের অর্ন্তদৃষ্টি অর্জন করেছিলেন। সুন্দর যুক্তিতে বুঝিয়ে দিতেন, লেখার জোর কোথায় আর খামতিই বা কী। ফলে, তরুণ লেখকের কাছে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতেন। মাঝেমাঝেই বলতেন যে সাহিত্য তিনি তেমন বোঝেন না, কিন্তু অনেক সময় বোঝা যেত নিজের মতো করে যথেষ্ট সাহিত্য পাঠ করেছেন।
সবথেকে বড়ো কথা, স্নেহশীল সত্তায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। আমার আজ বলতে আটকাবে না, কেননা সেবিষয়ে তাঁর বারণ ছল কঠোর, সেই বারণ আজ মানবো না — ২০১৪-২০১৭ সময়কালে আমার ব্যক্তিগত, বিশেষত কর্মক্ষেত্রের নানা কঠিন সমস্যায় দেবাশিসদা তাঁর পরামর্শ-সহায়তা-উপদেশের ছায়া অকৃপণভাবে আমার ওপর বর্ষণ করেছেন। আমার সংকটে তাঁর স্নেহ আমাকে উদ্ধার করেছে। পরে তাঁর কাছে গিয়ে যখন কৃতজ্ঞ প্রকাশ করেছি, তিনি একেবারেই উড়িয়ে দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। আমাদের আত্মবিজ্ঞাপন আর আত্মপ্রচারের যুগে তিনি ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্ব।
দেবাশিসদা অসুস্থ ছিলেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু তিনি ছিলেন। তাঁর অস্তিত্বটাই আমাদের কাছে এক পরম আস্থার মতো ছিল। আজকের এই শূন্যতা কেমনভাবে মেনে নেব জানি না।
এ রাজ্যের ইতিহাস, রাজনৈতিক আন্দোলন, বামপন্থী-অতিবামপন্থী স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের এমন শরিক তথা বিশ্লেষক আর হবে না। তাঁর রাজনৈতিক মত কারো ওপর চাপাতেন না। তাঁর মতো প্রখর রাজনৈতিক-নির্বীচনী ভাষ্যকার পাওয়া অসম্ভব।
কিন্তু, ব্যক্তি-আমি ভাবছি, তাঁর মতো অভিভাবক কোথা পাবো, যিনি স্নেহের চোখে শুশ্রূষা করবেন অনুজের ক্ষত?