বৌদ্ধ তন্ত্রও তান্ত্রিক সরস্বতীকে গ্রহণ করেছে, সিততারা, প্রজ্ঞাপারমিতা প্রভৃতির আকারে। বাগিশ্বরীও মহাযান বৌদ্ধঘঙ্ঘের দেবতা। পাল আমলে এই দেবীর পূজার প্রসার ছিল। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙ্গালীর ইতিহাস প্রথম ভাগে দ্বিতীয় গোপালদেবের প্রথম রাজ্যাঙ্কে নালন্দায় প্রতিষ্ঠিত বাগীশ্বরী মূর্তির চিত্র (চিত্র সংখ্যা ১৩) আছে। খুব সম্ভব এই বাগীশ্বরী পরবর্তীকালে বাংলায় লৌকিক দেবী ‘বাসলী’ নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। নানুরে বাসলী নামে চণ্ডীদাস সেবিতা যে দেবী রয়েছেন, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে তিনি ‘বাগীশ্বরী’। তিনি তন্ত্রসম্মত মহাবিদ্যা। পঞ্চদশ শতকেও লৌকিক দেবীরূপে যে তিনি পূজা পেতেন, বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবতে তার উল্লেখ দেখা যায় ‘বাসলী পূজয়ে কেহ নানা উপহারে।’ পরবর্তীকালে পরিবর্তিত আকারে তিনি লৌকিক দেবসঙ্ঘেই পরিবর্তিত আকারে তিনি লৌকিক দেবসঙ্ঘেই রয়ে গিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন কাব্য রচিত হয়নি। শুধু অষ্টাদশ শতকে লেখা দয়ারাম দাসের সারদার পাঁচিলী বা ‘সারদা মঙ্গল’-এ লৌকিক সারদা বা সরস্বতীর মহিমা প্রচার করা হয়েছে। সেখানে দেবীর কৃপায় মূর্খ লক্ষধর সর্ববিদ্যায় পারদর্শী হয়েছে। লৌকিক সরস্বতী বা বাগীশ্বরী বা বাসলীর মধ্যে তান্ত্রিক সরস্বতীর কিছুটা লক্ষণ অবশিষ্ট রয়েছে।
বঙ্গদেশে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন পৌরাণীক সরস্বতী। তান্ত্রিক ‘তরুণশকলমিন্দে’ মন্ত্রে তাঁর ধ্যান করা হলেও তাঁর পূজাপদ্ধতি সম্পূর্ণ পৌরাণিক। তান্ত্রিক ধ্যানের সকল বিশিষ্টতাও তাঁর মূর্তিতে রক্ষা করা হয়নি। ধ্যান যজ্ঞে —
দেবী শুভ্রবর্ণা, তাঁর ললাটে তরুণ চন্দ্রকলা, কুচভরে দেহ আনত। শ্বেত পদ্মে তিনি আসীনা। তাঁর এক হস্তে লেখনী, অপর হস্তে পুস্তক। তিনি বাগদেবতা, সকল বিভবসিদ্ধি রক্ষা করেন। কিন্তু প্রচলিত সরস্বতীর মূর্তি শ্বেতবর্ণা, দ্বিহস্তা হলেও — তিন হংসবাহনা ও বীণা ধারিণী। বাগ্দেবী সরস্বতীর এই মূর্তিই বঙ্গের পরিচিত মূর্তি। বাক্যের স্ফূর্তি, কবিত্বের প্রেরণা, সকল বিদ্যা ও শাস্ত্রের অধিদেবতা, নৃত্যগীতবাদ্যের ঈশ্বরী, এই বীণাপাণি দেবীকেই বন্দনা করেছেন বঙ্গের যাবতীয় কবি। কবিকঙ্কণ, রূপরাম, কেতকাদাস-ক্ষেমানন্দ, ঘনরাম, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ — সকলেই সরস্বতীর বন্দনা করে কাব্য আরম্ভ করেছেন। এমনকি বাংলার পল্লিকবিরাও এই সরস্বতীর বন্দনা করে বলেছেন,
সরস্বতী মায়েরে বন্দুম যোরি দুই কর।
যার হাতে পাইলু এই দেবের আসর ।। (নয়নচাঁদ)
বঙ্গীয় কবিদের বন্দনায় বৈদিক সরস্বতীর নদীরূপ হারিয়ে গিয়েছে। সরস্বতীর পৌরাণিক রূপ ও গুণাবলীই প্রাধান্য পেয়েছে। কোন কোন স্থলে তান্ত্রিকতার ছোঁয়াও লেগেছে। কবিকঙ্কণের সরস্বতী ‘ইন্দু-কুন্দ-তুষার সঙ্কাশা”, তিনি ‘বীণাপাণি’, বিধিমুখে বেদবাণী’, ‘কবিমুখে অষ্টাদশ ভাষা’। কবিকঙ্কণ একটি নতুন কথাও বলেছেন, দেবী সরস্বতীর ‘শুকশিশু শোভে বাম করে।’ কেতকাদাস-ক্ষেমানন্দের বর্ণনাও ‘কবিকঙ্কণের অনুরূপ, তবে তিনি ‘মৃদঙ্গবাদিনী বাক্ দেবী’। কবি সরস্বতীর একটি নতুন নামকরণ করেছেন ‘মধুমতী’ — ‘নাম তব মধুমতী ঊর দেবী সরস্বতী’। ঘনরামের সরস্বতী ‘সাবিত্রী গায়ত্রী’ থেকে অভিন্না। ভারতচন্দ্রের সরস্বতী ‘বাগীশ্বরী বাক্যবিনোদিনী’, তিনিই ‘আগমের নানা গ্রন্থ’, ‘চারি বেদ আঠার পুরাণ’। রামপ্রসাদের সরস্বতী ‘মহাবিদ্যা’, ‘বিদ্যারূপা ব্রহ্মাণ্ডজননী’।
সকল বঙ্গীয় কবির কণ্ঠেই একটি কথা বার বার ধ্বনিত হয়েছে যে, সরস্বতীর কৃপাতেই মূক পাণ্ডিত্যে মুখর হয় —
তুমি যারে কর কৃপা সেই জন মহাতপা বৈসে সেই পণ্ডিত সমাজে। (কবিকঙ্কণ)
তুমি থাক যার ঘটে সেজন পণ্ডিত বটে
সেই বৈসে সভার ভিতর। (রূপরাম)
তোমা বিনে কাব্যব্যয় কাহার শকতি হয়
বোল বোল তোমার প্রকৃতি। (ক্ষমানন্দ)
তব কৃপাদৃষ্টি যারে জগত জিনিতে পারে
ধরাতলে সেইজন ধন্য। (রামপ্রসাদ)
তুমি নাহি চাহ যারে সবে মূঢ় বলে তারে
ধিক্ ধিক্ তাহার জীবন।
তোমার করুণা যারে সবে ধন্য বলে তারে
গুণিগণে তাহার গমন ।। (ভারতচন্দ্র)
সরস্বতী সর্ববিদ্যাদাতা, সরস্বতী যাকে কৃপা করেন তার বিদ্যা হয় এবং যার প্রতি তাঁর অকৃপা, সে মূর্খ , জড়মতি — এই বোধেই সকল বিদ্যার্থী বা যে-কোন পড়ুয়া ভয়ে হোক, ভক্তিতে হোক সরস্বতীর নাম স্মরণ করে এবং সরস্বতী পূজায় উপবাস করে অঞ্জলি দিয়ে থাকে। পুরানো বাংলা কাব্যেও দেখা যায়, ওঝা বা উপাধ্যায় বা পণ্ডিতমশায়রা সরস্বতীর নাম স্মরণ করে পড়ুয়াদের ‘হাতেখড়ি’ দিতেন কিংবা ‘সিদ্ধিরস্তু’ (স্বরবর্ণ মালা) পাঠ আরম্ভ করাতেন।
বিদ্যারম্ভ দিনে বা মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজার বিধান — ‘মাসস্য শুক্লা পঞ্চম্যাং বিদ্যারম্ভে দিনে অস্তি চ’। মাশ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিই সরস্বতী পূজার বিশিষ্ট দিন। এই তিথিকে বলে ‘শ্রীপঞ্চমী’। শ্রী শব্দে সাধারণত লক্ষ্মী দেবীকেই বোঝায়। লক্ষ্মী হলেন ধনের দেবতা, সরস্বতী বিদ্যার। দুই-ই মানুষের কাম্য। কি্ন্তু বাস্তব জগতে দেখা যায় লক্ষ্মী-সরস্বতীর বিরোধ। যে ধন পায়, সে বিদ্যা পায় না — আর যে বিদ্যা পায়, সে হয় দরিদ্র। কবি বিদ্বানের অর্থাভাব যেন স্বতঃসিদ্ধ ও চিরকালীন। বুনো রামনাথ পণ্ডিত ছিলেন, অর্থবান ছিলেন না; তাঁর স্ত্রীর হাতে শাঁখাও জুটত না, জুটত লাল সুতো। কবি রবীন্দ্রনাথও তাঁর ‘পুরস্কার’ কবিতায় কবি-পণ্ডিতের এই অর্থাভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ‘শ্রীপঞ্চমী’ নামটি তাই ভাবিয়ে তোলে — এ তিথিতে কি লক্ষ্মী-সরস্বতীর মিলন ঘটে?
কেউ কেউ বলেন, সরস্বতীরও এক নাম শ্রী। শ্রীপঞ্চমী মানে সরস্বতী পঞ্চমী। আবার কেউ কেউ বলেন, সরস্বতী জড়তা বা জড়িমা দূর করেন। শীতকাল হল জড়তার কাল। মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথি থেকেই শীতের জড়তা কেটে যেতে থাকে, ঋতুতে লাগে প্রথম বসন্তের ছোঁয়া। সরস্বতীর আবির্ভাব সকল জড়তা কাটে — মনেরও। ঋতুরও। শ্রীপঞ্চমী, হল ‘জড়িমা জড়িত মনে’র মুক্তির ইঙ্গিতবাহী।
অর্থ ও ভাব যাই-হোক শ্রীপঞ্চমী তিথিতেই বিদ্যার্থী অথ৪আৎ সকল ছাত্র-ছাত্রী সরস্বতী পূজার নামে উদ্বেল হয়ে ওঠে। এ পুজো গৃহস্থ বাড়িতেও হয়, বিশেষ করে হয় বিদ্যায়তনে। চতুষ্পাঠী, স্কুল-কলেজ, সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্র এবং যাবতীয় কলাভবনেই দেবী সরস্বতীর পূজা হয়। বিদ্যার্থী মণ্ডলে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগে।
মনে প্রশ্ন জাগে — পূজা করলেই কি বিদ্যালাভ হয়? মন্ত্রজপ করলেই কি সিদ্ধি আসে? পুরাণকার (দেবীভাগ, ৩/৯) আশ্বাস দিয়ে বলেন, যে-ভাবেই হোক দেবার্চনায় ফললাভ হবেই — অস্পষ্ট বা বিকৃতভাবে উচ্চিরিত হলেও সরস্বতী মন্ত্র ফলপ্রদ হয়। উদাহরণ দিয়ে তাঁরা বলেন, বাগ্ভব বীজ হল ‘ঐং’। কিন্তু কেউ যদি ব্যাঘ্রাদি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বিন্দুহীন মন্ত্র ‘ঐ-ঐ’ উচ্চারণ করে,তবে তাকে সাহায্য করার জন্য লোক ছুটে আসবেই —
ঐ-ঐ ইতি ভয়ার্তেন দৃষ্টা ব্যাঘ্র্যাদিকংবনে।
বিন্দুহীনমপীত্যুক্তং বাঞ্ছিতং প্রদদাতি বৈ।।
পুরাণকারের সিদ্ধান্ত করতা গ্রহণযোগ্য, তা সুধীজনের বিচার্য। তবে শুদ্ধ ভাবে দেব-আরাধনে ও মননে মনঃসংযোগ হয়। একাগ্রতা বিদ্যার্জনের সহায়ক। বিদ্যা নানা প্রকারের হতে পারে। অবিদ্যাও বিদ্যা। এ সম্পর্কে সাবধান হতে হবে। দেবী সরস্বতী কারও কারও মুখে বিপর্যয়ের কারণও হন। বলদর্পিত কুম্ভকর্ণের মুখে অধিষ্ঠিতা হয়ে তিনি বিপরীত ফল প্রদান করেছিলেন। বিদ্যার্থীর আরাধ্যা সেই সরস্বতী, যিনি ভদ্রা, যিনি কল্যাণ বিধান করেন — ভদ্রম্ ইৎ ভদ্রা কৃণবৎ সরস্বতী।