| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী : দেবজ্যোতিনারায়ণ রায়

Reporter
দেবজ্যোতিনারায়ণ রায় / ১৬৫০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। ১৪৯০ থেকে ১৫২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ত্রিপুরার রাজা ছিলেন ধন্যমাণিক্য। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁদের কুলদেবতা বিষ্ণুর জন্য একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এই সময় তিনি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন—“রাধাকৃষ্ণ স্থাপিবারে মঠ আরম্ভিল।/ চট্টেরী দেবী আসি স্বপ্ন দেখাইল।।” দেবী তাঁকে বললেন, তিনি চট্টগ্রামে একটি গাছের নীচে আছেন। সেখানে মগেরা তাঁকে পুজো করে। তিনি যেন শীঘ্র তাঁকে এখানে এনে প্রতিষ্ঠা করেন—“চট্টগ্রামে সদরঘাটে এক বৃক্ষমূলে।/ পুজয়ে আমাকে সদা মগধ সকলে।।/ সেই স্থান হৈতে শীঘ্র আনহ আমায়।” দেবী তাঁকে আরও বললেন, তিনি যদি এই মন্দিরে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত না করেন তবে তাঁর নিস্তার নেই—“এই মঠে যদি আমা স্থাপন না কর।/ তবে জান রাজা তোমার নাহিক নিস্তার।।” (ত্রিপুর বংশাবলী) স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে রাজা তাঁর বিচক্ষণ ও উদ্যমী সেনাপতি রসাঙ্গমর্দনকে চট্টগ্রামে পাঠালেন দেবীমূর্তিকে নিয়ে আসার জন্য—“রসাঙ্গমর্দন নারায়ণ পাঠায় চট্টলে।/ স্বপ্নে যেই স্থানে দেখে মিলিকে ভালে।।” (‘রাজমালা’ ‘ধন্যমাণিক্য খণ্ড) গভীর বনজঙ্গল ও হিংস্র জীবজন্তুকে উপেক্ষা করে রসাঙ্গমর্দন পৌঁছোলেন চট্টগ্রামে। সেখানে মগ উপজাতিরা বাধা দেওয়ায় শুরু হলো যুদ্ধ। যুদ্ধে মগেরা পরাজিত হলে বহু খোঁজাখুঁজির পর দেবীর প্রস্তরমূর্তি পাওয়া গেল। মূর্তিকে নিয়ে সেনাপতি রসাঙ্গমর্দন দ্রুত রওনা দিলেন রাজধানীর দিকে। রাজবাড়িতে পৌঁছোনোর কিছুটা আগে সৈন্যরা সামান্য বিশ্রাম করতে চাইল। মায়ের ছলনায় তখন সকলেই গভীর নিদ্রামগ্ন হলেন। প্রত্যুষে যখন ঘুম ভাঙল তখন তারা মাকে দ্রুত রাজবাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। যে মাকে তারা এতটা দীর্ঘ পথ সহজেই বয়ে নিয়ে এসেছিল, সেই মাকে তখন তারা এতটুকুও নড়াতে পারল না। রাজা প্রত্যুষে পুনরায় দৈববাণী শুনলেন—এক রাত্রের মধ্যেই দেবীমূর্তিকে নিয়ে যেতে হবে। আর যেখানে ভোর হবে সেখানেই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে—‘মহারাজা না করিও ভয়, পীঠস্থান যথায়, তথা ভোর হইবে নিশ্চয়’। খবর পাওয়া মাত্র রাজা অনুচরদের নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছোলেন। মাকে নিয়ে রাজার সৈন্যরা যেখানে নিদ্রামগ্ন হয়েছিল সেটি ছিল কচ্ছপের পিঠের মতো একখণ্ড ছোট্ট টিলাভূমি। তন্ত্রমতে এই ভূমিই দেবীর উপযুক্ত স্থান। রাজা ধন্যমাণিক্য যে মন্দিরে বিষ্ণুকে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, দৈববাণীর ফলে তিনি সেখানে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং নারায়ণের শালগ্রাম শিলাকেও সঙ্গে রাখলেন। সেই থেকে এই মন্দিরে আজও ত্রিপুরাসুন্দরী মায়ের সঙ্গে ভগবান বিষ্ণুর নিত্য পুজো হয়। শাস্ত্রমতে, বিষ্ণু ও মহামায়াতে কোনও পার্থক্য নেই। চট্টগ্রামে এই মূর্তি ‘চট্টেশ্বরী’ বা ‘মগধেশ্বরী’ নামে পূজিতা হতেন।

পুরাণে আছে, ব্রহ্মার মানসপুত্র দক্ষরাজা এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। যজ্ঞস্থলে পিতা দক্ষের মুখ থেকে স্বামী শিবের নিন্দা শুনে সতী সেখানে দেহত্যাগ করেন। সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে ক্রোধান্বিত শিব তখন প্রলয়নৃত্য শুরু করলেন। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার অনুরোধে পালনকর্তা বিষ্ণু তখন শিবকে শান্ত করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে রক্ষার জন্য সুদর্শনচক্র দ্বারা সতীর পবিত্র দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করে ভারতবর্ষের ৫১টি স্থানে ছড়িয়ে দিলেন। এই ৫১টি স্থান সতীপীঠ হিসেবে পরিচিত। সতীর মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য শিবও বিভিন্ন নামে এই সকল পীঠস্থানে ভৈরবরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। ত্রিপুরাসুন্দরীমন্দির ভারতবর্ষের ৫১ পীঠের অন্যতম। ‘পীঠমালা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে :“ত্রিপুরায়াং দক্ষপাদো দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী।/ ভৈরবস্ক্রিপুরেশশ্চ সর্বাভিষ্ট প্রদায়কঃ।।” এই গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, ত্রিপুরায় সতীর ডান পায়ের একাংশ (মতান্তরে বুড়ো আঙুল) পড়েছিল। এই পবিত্র প্রস্তরীভূত অংশটি দেবীর আসনের পেছনে গোপনে সংরক্ষিত আছে। এখানকার দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী এবং ভৈরব ত্রিপুরেশ। দেবী সকল প্রার্থনা ও সকল সম্পদ প্রদানকারিণী। দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল—এই ত্রিলোকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম—এই পঞ্চভূতেরও তিনি অধিষ্ঠাত্রী।

পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী ছিল উদয়পুর। এর প্রাচীন নাম ‘রাঙ্গামাটি’। ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা গোপীপ্রসাদ উদয়মাণিক্য নাম ধারণ করে এই স্থানের নাম রাখেন ‘উদয়পুর’। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা কৃষ্ণমাণিক্য পার্শ্ববর্তী কুকি রাজ্যের আক্রমণ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার আশায় উদয়পুর থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন পুরোনো আগরতলা বা বর্তমান হাওড়ানদীর তীরবর্তী খয়েরপুর অঞ্চলে। তিনি এই স্থানের নাম রাখেন হাভেলি। এই সময় থেকেই উদয়পুরের গুরুত্ব কমে যায় এবং ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরও অনেকটা অবহেলিত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এই সমস্যা এখানেও দেখা দেওয়ায় পরবর্তী রাজা কৃষ্ণকিশোরমাণিক্য ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে পুরোনো হাভেলি থেকে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে এলেন নতুন হাভেলি বা বর্তমান আগরতলায়। ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে উদয়পুরের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। আর উদয়পুর শহর থেকে ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীর মন্দিরের দূরত্ব মাত্র ৪ কিলোমিটার।

দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর মূর্তির মধ্যে বেশকিছু স্বকীয়তা দেখা যায়। মূর্তিটি কষ্টিপাথরে তৈরি। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট। শিবের বুকের উপর দুই পা দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। দেবীর চার হাত। ডান দিকের উপরের হাতে বরমুদ্রা, নিচের হাতে অভয়মুদ্রা। বাঁ দিকের উপরের হাতে খড়গ, নীচের হাতে নরমুণ্ড। দেবীর মাথায় সোনার মুকুট। ডান দিকে রুপোর ত্রিশূল। ত্রিপুরার শেষ স্বাধীন মহারাজা বীরবিক্রম কিশোরমাণিক্য বাহাদুর মৃত্যুর আগে দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এটি তৈরি করে দিয়েছিলেন। দেবীর গলায় সোনার অলংকারের সঙ্গে তেরোটি নরমুণ্ডের মালা। দেবীর ত্রিনেত্র। দু-চোখ গোলাকার ও ছোটো। উপরের নেত্রও একইরকম। অনুচ্চ নাকে একটি বড়ো নথ রয়েছে। মুখ সামান্য খোলা। একটুখানি জিভ বেরিয়ে আছে। দেবীকে এখানে ষোড়শীরূপে পুজো করা হয়। দেবীর সর্বাঙ্গ কাপড়ে ঢাকা। শুধু মুখ ও দু-পায়ের সামনের অংশ দেখা যায়। দেবীর মুখমণ্ডলে বিরাজ করছে এক অপূর্ব কান্তি। কালীপ্রসন্ন সেন তাঁর ‘শ্রীরাজমালা’ (প্রথম লহর) গ্রন্থে বলেছেন ‘ত্রিপুরায় আনয়নের কতকাল পূৰ্বে এই বিগ্রহ নির্মিত হইয়াছিল, ‘মঘ-গণ’ কর্তৃক অর্চিতা হইবার পূৰ্ব্বে, কোথায়, কোন্ বংশ কর্তৃক কতকাল অর্চিতা হইয়াছেন, এবং চট্টগ্রামেই বা কতকাল ছিলেন, সেই সকল অতীতের কুহেলিকাচ্ছন্ন তথ্য জানিবার উপায় নাই।’

ত্রিপুরাসুন্দরীমন্দিরে দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী ছাড়া আরও একটি পাথরের মূর্তি আছে। তিনি ‘ছোটমা’ নামে পরিচিত। মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ না করলে এই মূর্তিকে দেখা যায় না। মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ২ ফুট। কথিত আছে, ত্রিপুরার মহারাজারা যখন যুদ্ধক্ষেত্র বা মৃগয়ায় যেতেন তখন সাফল্য লাভের আশায় ছোটমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। ছোটমার মূর্তিটিই এই মন্দিরের প্রাচীনতম মূর্তি। ছোটমার মূর্তিটি ঠিক কোন সময়ের তা অনুমান করা বেশ কঠিন। কারণ, এঁর চোখ-মুখ, বেশভূষা প্রভৃতি প্রায় সবকিছুই রয়ে গেছে। মন্দিরের পুরোহিতরা এঁকে চণ্ডীরূপে পুজো করেন।

ত্রিপুরা একটি ছোটো পাহাড়ি রাজ্য। ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এই রাজ্যের অর্থনীতি বেশ দুর্বল। কারিগরি দক্ষতার দিক দিয়েও এই রাজ্যের শিল্পীরা অনেকটাই পিছিয়ে। তাই ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের মন্দিরের মতো এই রাজ্যের মন্দিরগুলিতে তেমন প্রাচুর্য ও শিল্পনৈপুণ্য চোখে পড়ে না। তবে এখানকার মন্দিরগুলির মধ্যে একটি স্বতন্ত্রতা লক্ষ করা যায়। ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরের গঠনশৈলীর মধ্যে ত্রিপুরার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। একটি কূর্মাকার ছোটো টিলার উপর মন্দিরটি নির্মিত। এর উচ্চতা প্রায় ৭৫ ফুট। পোড়া ইট দিয়ে তৈরি এই মন্দিরের ভিত্তিভূমি বেশ উঁচু। মন্দিরের চারকোণে চারটি অর্ধগোলাকৃতি স্তম্ভ মিনারের মতো রয়েছে। মন্দিরটি বর্গাকার। বাইরের দিকের পরিমাপ ২৪ ফুট বাই ২৪ ফুট। ভেতরের পরিমাপ ১৬ ফুট বাই ১৬ ফুট। দেওয়াল ৮ ফুট চওড়া। চার দেওয়ালে সমান্তরালভাবে কতগুলি রেখা আছে। গবেষকদের মতে, মন্দিরটি হয়তো একসময় দুর্গ ছিল। শত্রুরা যাতে সহজে মন্দিরের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য মন্দিরের দেওয়াল এত চওড়া করে তৈরি করা হয়েছে। মূল দরজা পশ্চিমমুখী। এই দিক দিয়েই দেবীকে দর্শন করতে হয়। কাঠের তৈরি এই দরজায় বহু পুরোনো মুদ্রা লাগানো রয়েছে। উত্তর দিকেও একটি দরজা আছে। তবে এই দরজা পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। মায়ের দু-দিকে দুটি কুলুঙ্গি আছে। ডান দিকের কুলুঙ্গিতে রাখা প্রদীপ সর্বদা প্রজ্বলিত থাকে। বাঁ দিকের কুলুঙ্গিতে রাখা আছে বিভিন্ন দেবতার ছোটো ছোটো মূর্তি। মন্দিরের চার দেওয়ালে কোনও জানালা নেই। তবে বেশ কিছু ঘুলঘুলি আছে যেখান থেকে বাইরের সব কিছু দেখা যায়, কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরের কোনও কিছু দেখা যায় না। মন্দিরটি গ্রামবাংলার চারচালার আদলে তৈরি। মন্দিরের চূড়া বৌদ্ধস্তূপের মতো উপরদিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। চূড়াতে রয়েছে সপ্তকলসীর পতাকাদণ্ড। আর এতে আছে পেতলের স্থির পতাকা।

কালীপ্রসন্ন সেন সম্পাদিত ‘শ্রীরাজমালা’ গ্রন্থের ‘কল্যাণমাণিক্য খণ্ড’ (তৃতীয় লহর) থেকে জানা যায় যে, মহারাজা কল্যাণমাণিক্য স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে মায়ের সেবা কাজের জন্য মন্দিরের পূর্বদিকে একটি বিশাল জলাশয় খনন করান—“আমা সেবা কষ্ট হয় জলের কারণে।/ জলাশয় দেও রাজা আমা সন্নিধানে।।” মহারাজার নামানুসারে এই দিঘির নামকরণ করা হয় কল্যাণসাগর। এই গ্রন্থ থেকে আরও জানা যায় যে, এর দৈর্ঘ্য ২২৪ গজ এবং প্রস্থ ১৬০ গজ। এই দিঘির বড়ো বড়ো মাছ ও কচ্ছপ দর্শনার্থীদের বিশেষ আকৃষ্ট করে। এগুলিকে জলের মধ্যে স্পর্শ করা যায়। কিন্তু কেউ এদের জল থেকে তুলে এনে হত্যা করে না। এই দিঘিতে শতবর্ষজীবী কচ্ছপও আছে। ভাবলে অবাক হতে হয়, মৃত্যুর সময় এরা জল থেকে উপরে উঠে আসে এবং মায়ের মন্দিরের নীচে আশ্রয় নিয়ে মারা যায়। মায়ের চরণাশ্রিত কচ্ছপদের জন্য মন্দির প্রাঙ্গণে কয়েকটি সমাধি বেদি নির্মাণ করা হয়েছে। ত্রিপুরাসুন্দরী মায়ের মন্দিরের সম্মুখে আছে একটি ছোটো নাটমন্দির। এর অনতিদূরে আছে ‘বলিঘর’। কালীপ্রসন্ন সেনের শ্রীরাজমালা’ থেকে জানা যায় যে, প্রতিদিন অন্নব্যঞ্জন, লুচি, মিষ্টান্ন প্রভৃতি দেবীকে নিবেদন করা হয়। তা ছাড়া প্রতিদিন একটি পাঁঠা এবং প্রতি অমাবস্যায় পাঁচটি পাঁঠা ও একটি মোষ বলি দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। শুধু দশমী তিথিতে এখানে কোনও বলি দেওয়া হয় না। প্রাচীনকালে এই মন্দিরে নরবলি হতো বলে জনশ্রুতি আছে।

ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, মহারাজা উদয়মাণিক্যের রাজত্বকালে (১৫৬৭-১৫৭৩) এবং কল্যাণমাণিক্যের রাজত্বকালে (১৬২৬-১৬৬০) এই মন্দিরের সংস্কারসাধন করা হয়েছিল। ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দে রামমাণিক্যও একবার মন্দির সংস্কার করেন। এছাড়া ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে দুর্গামাণিক্যের মহিষী সুমিত্রা জগদীধরী এবং ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে রাধাকিশোরমাণিক্য মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করেন। বর্তমানে রাজ্য সরকার ত্রিপুরাসুন্দরীদেবীর মন্দিরের দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং সংস্কারমূলক কাজ তদারকি করেন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে ত্রিপুরার ‘ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির’ আদিশক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত। কলকাতার কালীঘাট মন্দির (১৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) এবং কামরূপের কামাখ্যা মন্দির (১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ) প্রতিষ্ঠার বহু পূর্বেই এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। প্রতিবছর কালীপুজো উপলক্ষে এই মন্দিরে লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আগমনে মন্দির প্রাঙ্গণ তখন হয়ে ওঠে মানুষের মিলনতীর্থ। ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরকে ‘মহামিলনের প্রতীক’ বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev