‘অন্ধকারে লুকিয়ে আপন মনে
কাহারে তুই পূজিস সঙ্গোপনে
নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে
দেবতা নাই ঘরে’
বেঁচে থাকলে, তাঁর বয়স হ’ত ১৬২ বছর। আমরা, বঙ্গভাষীদের একাংশ তাঁকে দেবতা করে তুলেছি, প্রায়! বিগত দেড়শো বছর ধরে, আমরা দুই বঙ্গের বাঙালিদের অতি ক্ষুদ্রাংশ, তাঁর কাছ থেকে দু-হাত ভরে শুধু নিয়েই গিয়েছি। কতটুকু নিতে পেরেছি? আমবাঙালির সকলেই কী তা পেরেছেন? আমাদের যাপনে, জীবনে তিনি প্রকৃতার্থে কতটুকু জুড়ে থাকেন? অবরে-সবরে গুটিকয় রবীন্দ্রসংগীত শোনা ব্যতীত, তাঁকে কী সংখ্যালঘু-বাংলাভাষীরা মাঝেমধ্যে বা নিয়মিত স্মরণ করে? বঙ্গভাষীদের সংখ্যাগুরু অংশ ঠিক কতটুকু তাঁকে নিয়ে মাথা ঘামায়? তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ডের কতটুকু খোঁজখবর আমবাঙালি রাখতে পেরেছে? কতটুকুই বা আত্মস্থ করে, প্রয়োগ করতে পেরেছে আপন জীবনচর্যায়? তাঁর নানান বিষয়ের সুগভীর ভাবনাকে কতটা কার্যকর করতে পেরেছে, জীবনে?
স্বাধীনোত্তর এই ভঙ্গ বঙ্গদেশে, শান্তিনিকেতনের তপোবনাদর্শের প্রাচীন শিক্ষার্জন পদ্ধতির ‘পাঠভবন’ কী আমরা প্রতিটি জেলায়, অন্তত একটি করে স্থাপন করতে পেরেছি? কবি প্রদর্শিত পথে, পল্লীউন্নয়নের সমবায় পদ্ধতি, কৃষি উন্নয়নের প্রয়াস, গ্রামীণ চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতিসাধন, জনস্বাস্থ্যের যত্ন, পরিবেশ রক্ষা, দূরশিক্ষার বিস্তার, কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ এবং স্বনির্ভরতার পাঠ, সুস্থ সাংস্কৃতিক ভাবনার প্রসার, প্রভৃতি কবির বিবিধ বিষয়ভাবনাগুলিকে কী আমরা আমাদের বঙ্গজীবনের অঙ্গ করে নিতে পেরেছি?
স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের বাইরে, তাঁকে নিয়ে আমরা কতটুকু চর্চা করি? কীভাবে করি?
উপরিউক্ত যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ আমজনতার কাছে, নেতিময়। তবু, তিনি আছেন। আবিশ্বের বঙ্গভাষীদের এক শতাংশের মননলোকে হলেও, তিনি আছেন। থাকবেন।
তাঁকে, তাঁর সৃষ্টিকে, তাঁর কীর্তিকে ভিন্নতর কৌণিকে জানার ইচ্ছে আমাদের অন্তহীন। গবেষণা চলতেই থাকবে। চলুক। কিন্তু গবেষণার অনেক উপাদান যে নষ্ট হতে বসেছে। সে বিষয়ে যত্নশীল হবে কে? কোন প্রতিষ্ঠান? বিশ্বভারতী, রবীন্দ্রভারতী, জাতীয় গ্রন্থাগার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, জয়কৃষ্ণ-বাগবাজার-চৈতন্য-রামমোহন লাইব্রেরির মত কিছু প্রতিষ্ঠান, এশিয়াটিক সোসাইটি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারগুলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য বইপত্তর আছে ঠিকই। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট একটি গ্রন্থাগারে রবীন্দ্র-গবেষণার যাবতীয় উপাদান সাধারণের কাছে, গবেষকদের কাছে সহজলভ্য নয়!
এতাবৎ তাঁর জীবন-সৃষ্টি-কীর্তি বিষয়ে প্রকাশিত হয়েছে কয়েক হাজার গ্রন্থাদি। ততোধিক পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য মূল্যবান প্রবন্ধাদি। কিন্তু সেসব গ্রন্থ ও প্রবন্ধাবলীর সম্পূর্ণ তালিকা কোথায়? সূচি কোথায়? লেখকের নাম, প্রকাশক, গ্রন্থ বা পত্রিকার প্রকাশকাল, সংস্করণের সালতামামি কোথায়? কেন একটি ছাদের নীচে সহজে তা পাওয়া যাবে না? রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক এতাবৎ যত গ্রন্থাদি ও প্রবন্ধাবলী প্রকাশিত হয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি পরিমাণ, বাজারে পাওয়া যায় না। আউট অফ প্রিন্ট! অথচ তা অধিকাংশ লাইব্রেরিতেও নেই। বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। কলকাতা থেকে ১৬৩ কিলোমিটার দূরে। রাজ্য সরকারের তরফে কেন এতদিনেও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘রবীন্দ্রচর্চা গবেষণাকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলো না? যেখানে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক যাবতীয় দুষ্প্রাপ্য বই-সহ, এযাবৎ প্রকাশিত যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপাদান সহজলভ্য হবে। যেগুলি এখন আউট অফ প্রিন্ট, সেগুলির ফটোকপি বা ডিজিটাল সংরক্ষণ, বা পিডিএফ ফর্ম্যাটে পড়া যাবে, এমন ব্যবস্থা কে করবে? সহস্রাধিক সাময়িকপত্রে অসংখ্য মূল্যবান প্রবন্ধাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেগুলি সংগ্রহ করে, একত্রিত করে ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা কে করবে? ১৯ খণ্ড ‘চিঠিপত্র’-এর বাইরে, আরও ১৯ খণ্ডে প্রকাশের মত চিঠিপত্র বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেগুলি একত্রিত করে, খণ্ডে খণ্ডে দুই মলাটে প্রকাশের দায়িত্ব কে নেবে? বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ উদাসীন! তাঁদের প্রকাশন বিভাগ প্রায় অবলুপ্তির পথে!
বিভিন্ন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক পুরনো বইগুলোর উল্লেখ ক্যাটালগে থাকলেও, বাস্তবত তা নানা কারণে পাঠকের হাতে এসে পৌঁছয় না! কর্তৃপক্ষ উদাসীন! আগ্রহী গবেষকদের তা না পেয়ে হতাশ হতে হয়! অথচ রবীন্দ্রনাথ আমাদের, বাঙালির গর্ব! আন্তর্জাতিক পরিচিতি তাঁর। আমরা বাঙালিরা তাঁর মহাপ্রয়াণের ৮২ বছর পরেও রবীন্দ্রচর্চা গবেষণার ফসল সংরক্ষণে উদাসীন!
বাংলা ভাষায়, দুই বাংলায় রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক আনুমানিক ছয়-সাত হাজার গ্রন্থ আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। দেশে-বিদেশে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক সহস্রাধিক থিসিস পেপার জমা হয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেফাজতে। দেশেবিদেশের বিশিষ্ট গবেষকদের কয়েক হাজার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠায়। দেশ-বিদেশের অসংখ্য শিল্পীদের কন্ঠে রেকর্ড হয়েছে রবীন্দ্রসংগীত, গীতিনাট্য নৃত্যনাট্যের গান, রবীন্দ্র-কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। অন্যান্য ভারতীয়, তথা শতাধিক বিদেশি ভাষায় রবীন্দ্র-রচনা অনূদিত হয়েছে। আমাদের কবির বহুমুখী প্রতিভার বহুকৌণিক বিশ্লেষণ হয়েই চলেছে, কালে কালান্তরে। লেখ্যরূপে, দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে। এই সমস্ত অমূল্য সম্পদ কী আমরা যথোপযুক্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারি না? কপিরাইট উঠে যাওয়া বই এবং প্রবন্ধগুলি ডিজিটাইজ করার ব্যবস্থা করতে পারি না, রাষ্ট্র, রাজ্য বা কোনও সহৃদয় সংস্থার ব্যবস্থাপনায়? চর্চাপোযোগী উপাদানের হার্ডকপি এক ছাদের তলায় এবং আইন মেনে তার সফট কপি রবীন্দ্র-চর্চা গবেষণা-কেন্দ্রের রিপোজিটরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে, আগ্রহী টেকস্যাভি-পড়ুয়াদের কাছে সহজলভ্য করে তুলতে পারি না?
রাজ্যে একটি নজরুল গবেষণা কেন্দ্র আছে। খুব ভালো। সাধু উদ্যোগ। কিন্তু রবীন্দ্র-চর্চা গবেষণা কেন্দ্র নেই কেন? অন্তত একটি ‘রিপোজিটরি’। যেখানে একটি ক্লিকেই রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক যাবতীয় লেখাপত্তরের হদিস পাওয়া সম্ভব। যে বইগুলি বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলি পাঠাগারে রেখে, যেগুলি পাওয়া যায় না, কপিরাইট মেনে, লেখক বা তাঁর পরিবারের, প্রকাশকের অনুমতিসাপেক্ষে সেগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থা কী করা যায় না? অন্তত এটুকু তথ্য তো দেওয়া সম্ভব — বইটি বা প্রবন্ধটির লেখক কে, কোন পত্রিকার কোন সংখ্যায় তা প্রকাশিত হয়েছিল, কোন প্রকাশনী সংস্থা, গ্রন্থাকারে কবে প্রকাশ করেছে, সংস্করণ হয়েছে কী না, প্রকাশক পাল্টেছে কী না, ওই বইগুলি কোন কোন লাইব্রেরিতে পাওয়া সম্ভব, গ্রন্থের সূচি, কল নং, তা ব্যবহারযোগ্য কি না, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যাদি।
একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ প্রায় অতিক্রান্ত। কালের নিয়মে, ভারচ্যুয়াল জগতের হাতছানিতে একালের বৃহদংশের পড়ুয়ারা পাঠাভ্যাসে অলস, পাঠ-বিমুখ। গবেষক, শুধুমাত্র ডিগ্রি প্রত্যাশী। তাঁদের মুখ্য উদ্দেশ্য চাকুরী-লাভ এবং অর্থউপার্জন! শিক্ষক-অধ্যাপক সিলেবাসের বাইরে, রবীন্দ্র চর্চায় অনাগ্রহী! প্রকৃত বিদ্যানুরাগীর সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান! বঙ্গভাষী জনসংখ্যার নিরিখে তাঁরা অত্যল্প হলেও, তাঁরা আছেন। তাঁরা থাকবেনও।
২০২৩-এ, রবীন্দ্রচর্চাকে যুগোপযোগী করতে সত্যিই একটি অনলাইন রিপোজিটরি এবং অফলাইন রবীন্দ্র-চর্চা গবেষণা-কেন্দ্র খুব প্রয়োজন। যেখানে এক ছাদের তলায় কবির যাবতীয় সৃজনশীলতার তথ্যাদি উভয় ফরম্যাটে সংরক্ষিত থাকবে। দেশ-বিদেশের প্রকৃত-আগ্রহী অনুসন্ধিৎসুরা ব্রিটিশ লাইব্রেরির মত, কিছু অর্থের বিনিময়ে, কিছু বিনামূল্যে, অনলাইনে বা অফলাইনে প্রয়োজনীয় উপাদান বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রয়োজনে, কপিরাইট মেনে, লেখক-প্রকাশকদের রয়েলটি বাবদ কিছু অর্থ রিপোজিটরির তরফে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।
দরকার সরকারের তরফে সদিচ্ছা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং রূপায়ণ। কেন্দ্র এগিয়ে না এলে, রাজ্যকেই সে উদ্যোগ এবং দায়িত্ব নিতে হবে। আর, রাজ্য সরকারও যদি সে দায়িত্ব নিতে না চায়, তাহলে, কলকাতারই বড়ো কোনও প্রকাশন সংস্থা, অথবা গিল্ডকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগের গবেষণাকে পুরস্কৃত ক’রে উৎসাহিত করা হয়, কোনও কোনও বড়ো প্রকাশনার তরফে। কিন্তু বৃহৎস্বার্থে, রবীন্দ্র-চর্চাকে আরও আধুনিকতম যুগোপযোগী করে তুলতে এগিয়ে না এলে, অচিরেই অনেক অমূল্য লেখ্য-সম্পদ আমাদের হারাতে হবে। সেই সম্পদ রক্ষা করা রবীন্দ্রপ্রেমী বঙ্গভাষীদের আশু কর্তব্য। কারণ, তিনি বাঙালিদের একমাত্র রবীন্দ্রনাথ!
নইলে, শুধু পঁচিশে বৈশাখ, আর বাইশে শ্রাবণে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো ক’রে নম নম করে সাম্বৎসরিক রবীন্দ্র-পুজো ‘কবিপ্রণাম’ সারা হবে। প্রণাম, কবির চরণ পর্যন্ত পৌঁছবে না!
লেখক : ড. শুভাশিস মণ্ডল, ‘বাংলা’র সহ-শিক্ষক, কসবা চিত্তরঞ্জন হাই স্কুল, কসবা, কলকাতা
????????
অত্যন্ত সঠিক ও গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন। আমাদের রাজ্যে অনতিবিলম্বে একটি রবীন্দ্র গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হোক, যেখানে ইচ্ছুক পাঠকেরা রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় সৃষ্টি কর্ম একজায়গায় পড়তে পারবেন। শুধু তাই নয় রবীন্দ্রনাথের সমস্ত লেখা ও তাঁকে ঘিরে সব গবেষণা ও প্রবন্ধের একটি ডিজিটাল রিপোজিটারি তৈরি হোক যাতে ঘরে বসেও আগ্রহী ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে সর্বতোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। ধন্যবাদ লেখককে এ বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য।
আমরা যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসি, তাঁকে আরও গভীরভাবে জানতে চাই, তাঁদের যুগোপযোগী প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্ট করে না তুলে ধরতে পারলে, কেউই এগিয়ে আসবে না! সেই প্রয়োজনীয়তা নিজে অনুভব করে, আরও অনেক সমমনস্ক রবীন্দ্রপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই আমার এই লেখা।
এই বাস্তব ছবি তুলে ধরার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। রবীন্দ্রনাথ আমরা এমনি এমনি পেয়েছি। এটা আমাদের লড়ে আদায় করতে হয় নি।সেজন্য মূল্য বুঝিনা। আমরা বড্ড অকৃতজ্ঞ তাঁদের প্রতি যাঁদেরকে নিয়ে আমরা বড়াই করি। সবই যেন ওপর-চকচকে ব্যাপার।
খুব ভালো লিখেছেন।
এক সময়, রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক গবেষণাকর্ম শুরু করার সময়ে, প্রথম প্রথম অনুভব করি, ঠিক কী কী পড়বো? অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থাদি, প্রবন্ধাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কলকাতা এবং শান্তিনিকেতনের অনেকগুলি লাইব্রেরিতে। তা থেকে, প্রয়োজনীয় উপাদান খুঁজে নিতেই আমার দীর্ঘ দু-তিন বছর সময় চলে যায়! অথচ, যাবতীয় রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থাদির বিষয় ভিত্তিক সম্পূর্ণ তালিকা, তার সূচি, সাময়িকপত্রে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক প্রবন্ধাবলীর তালিকা, তার সূচি, কোন সংখ্যায় তা প্রকাশিত হয়েছিল, কোন কোন লাইব্রেরিতে তা প্রাপ্তব্য, সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যাদি কোনো গ্রন্থাগারেই নেই! এমনকি রবীন্দ্রভবন, শান্তিনিকেতনেও নেই! কাজটি খুব কঠিন! এবং একক প্রয়াসের নয়। অনেকের সাহায্য ছাড়া, একক ভাবে কেউ করতে চাইলে, অবশ্যম্ভাবী-ভাবে তা অসম্পূর্ণ হবেই-হবে! যুগের প্রয়োজনে, আর এত বড় উদ্যোগ কোনো ভাবেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে নেওয়া সম্ভব নয়। সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা ছাড়া। আমরা যদি আমাদের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরতে পারি, তাহলে হয়তো একদিন তা সফল হবে। সময় এসেছে, সরব হওয়ার।
তোর কথাগুলো খুবই বাস্তবোচিত এবং প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরী হিসাবে আমরা তাঁকে স্মরণের জন্য কয়েকটি দিন নির্দিষ্ট করেছি আর বাকি সময় তাঁকে চর্চা বা আমাদের যাপনে তাঁকে সম্পৃক্ত করার কোন আগ্রহ দেখাইনি । আর সবচেয়ে যন্ত্রণাকর বিষয় হলো তাঁকে নিয়ে কদর্য রাজনীতি । তাঁর সম্পর্কে কিচ্ছু না জেনেও জোকার রাজনীতিকদের নির্লজ্জ , ভক্তিহীন আবেগ দেখে তীব্র হতাশা জন্মায়।
প্রকৃত রবীন্দ্রপ্রেমীদের রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। সমাজ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন, প্রভৃতি তাঁর সুদূরপ্রসারী ভাবনা গুলিকে বাস্তবায়িত করতে, দেশের এবং রাজ্যের সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। উভয় সরকারকে রবীন্দ্রভাবনার পাঠ বোঝানোর দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। প্রতি বছর জন্ম-মৃত্যুদিনে, দু-চারটে কবিতা-গানে তাঁকে স্মরণ করে রবিপুজো করার কোনও মানে হয় না! তাঁর কর্মপথের অনুসরণেই প্রকৃত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সম্ভব।
খুব ভালো লিখেছো। যথার্থ লেখা।
আসলে পণ্য সর্বস্ব জগতে রবীন্দ্রনাথ যে saleble commodity এ নিয়ে আর সন্দেহ কি❓ মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথ জীবদ্দশায়ও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কম আঘাত সহ্য করেননি। আজও সহ্য করছেন। কিন্তু এর মধ্যেও কাজ হচ্ছে। যেমন সুকান্ত চৌধুরীর নেতৃত্বে রবীন্দ্রনাথের রচনা digitalization এর কাজ। রাজনৈতিক প্রয়োজনে সরকার উদ্যোগ নেবে, নচেৎ নয়। শ্যামা – শাপমোচনের অশ্রু মোচন চলতে থাকবে। তবুও যাঁরা কাজ করবার, তাঁরা করবেনই, বাধা উপেক্ষা করে।
রবীন্দ্রনাথের মোটামুটি যাবতীয় লেখা, পাণ্ডুলিপি যাদবপুরের ‘বিচিত্রা’য় রয়েছে ঠিকই। তাতেও অসংখ্য ভুল। বানান, যতি চিহ্নের!
রবীন্দ্রনাথের লেখা বিভিন্ন জনকে প্রায় দশ হাজার চিঠিপত্র রয়েছে। সেগুলি বিচিত্রায় নেই!
রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সৃষ্টির উপর লেখা অন্যদের যাবতীয় বইপত্তর, পত্রপত্রিকা যেগুলি এখন সহজলভ্য নয়, সেগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে
দারুণ লিখেছিস! এভাবে ক ‘ জনই বা ভাবতে পারে! আর তার জন্যই তো এমন প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। এটার প্রচার করতে হবে দিকে দিকে, যাতে কাজে আসে ভবিষ্যত প্রজন্মের। তারাও যেন সঠিক ভাবে চিনতে ও জানতে পারে কবিকে।আর আমরাই বা কত টুকু জানি তাঁকে ! এগিয়ে এসো সবাই…. রবিঠাকুর কে দেবতা বলে নয়, তাঁর চিন্তাধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি আমরা চিরকালীন নিজেদের অন্তরে ও সমাজে তারই চেষ্টা করতে হবে আমাদের হাতে হাত রেখে। লোক দেখানো প্রচার নয়, কাজে পর্যবসিত করাই হবে যাদের মূল লক্ষ্য।
রবীন্দ্রচর্চাকে যুগোপযোগী করে তুলতে অসংখ্য মানুষের, সংস্থার, সরকারের প্রত্যক্ষ সাহায্য প্রয়োজন।
ছোট্ট একটি উদাহরণ :
রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত সাময়িকপত্রের সংখ্যা পাঁচ। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত চার বছরের তত্ত্ববোধিনীপত্রিকা পাওয়া যায়।
কিন্তু, রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত সাধনা, ভারতী, নবপর্যায় বঙ্গদর্শন এবং ভাণ্ডার পত্রিকা, নয় বছর দুই মাস ধরে প্রকাশিত হয়েছিল। ৩/৪টি লাইব্রেরিতে তার প্রাচীন কপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু তা আর ব্যবহারযোগ্য নয়। ওই পত্রিকাগুলির পুনঃপ্রকাশ এর দায়িত্ব নেবে কে? তাহলে কী ওই অমূল্য সম্পদ চিরতরে হারিয়ে যাবে? ভবিষ্যতের গবেষক তা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে?
অথচ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অনায়াসে তা সংরক্ষণ করা সম্ভব। দরকার উদ্যোগ আর সদিচ্ছা।
ঠিক এইরকম কিছু ভাবনা আমাকে সম্প্রতি কালে বেশ পেয়ে বসেছিল।। একদম মনের কথা গুলি লিখেছেন স্যার।। আপনাকে কুর্নিশ জানাই।।
আপনাকেও ধন্যবাদ।
আমার ভাবনার সঙ্গে আরও যদি কিছু সংযোজন করার থাকে, আরও আধুনিক, আরও যুগোপযোগী সে গুলিও জানাতে পারেন। বা নিজেও লিখতে পারেন।
অন্যান্য অনেক বিষয়ের পড়াশোনা যদি নেট নির্ভর হয়ে থাকে, যুগোপযোগী ফরম্যাটে রবীন্দ্রচর্চা নয় কেন?
এই দাবি, রবীন্দ্র-প্রেমীদের তরফে জোরালো করতে হবে। নিশ্চয়ই কোনও না কোনও সংস্থা এগিয়ে আসবে।