করোনা অতিমারী সারা বিশ্বে অভূতপূর্ব সঙ্কট ডেকে এনেছে। শারীরিক কারণে তো বটেই, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও যেন একটা আমূল পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। সমস্ত দেশে সরকার ও প্রশাসন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কারণ, করোনা ভাইরাসের পূর্বাভাস বা ব্যাপ্তি সম্বন্ধে কোনও দেশেরই কোনও ধারণা ছিল না। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এত বড় সঙ্কট একসঙ্গে সারা বিশ্ব জুড়ে কখনও ঘটেনি। ফলে প্রত্যেক দেশকে এই সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি গড়ে তুলতে সময় লেগেছে। তার আরও একটি কারণ হলো, এই রোগের চিকিৎসারও বিশষ কোনও পদ্ধতি জানা নেই। সুতরাং এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়।
এই প্রেক্ষিতে যদি বিচার করা যায়, তাহলে আমাদের দেশে কিন্তু আরও আগে প্রস্তুতি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। যে সুযোগ আমরা অবহেলায় হারিয়েছি। চিনের উহান শহরে প্রথম করোনা সংক্রমণজনিত মৃত্যুর খবর প্রকাশ পায় গত বছর ৩১ ডিসেম্বর। যদিও নভেম্বর মাস থেকেই সেখানে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়। তাহলে আমাদের উচিত ছিল, জানুয়ারি মাস থেকেই কোভিড-১৯ সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দেখা যাচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই চীন থেকে করোনা সংক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে, এমনকি কানাডা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। দিনে দিনে, সংক্রমিত রোগী ও সংক্রমিত এলাকার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই সময় ভারতবর্ষের সমস্ত রাজ্যের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম মুখ খুললেন। কেন্দ্রকে আবেদন জানালেন, অবিলম্বে বিদেশ থেকে ভারতীয়দের ফিরিয়ে নিয়ে এসে আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হোক। এছাড়া সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের অভ্যন্তরে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা রাজ্যগুলির সঙ্গে আলোচনা করে কেন্দ্রীয় সরকার স্থির করুন। দলের নির্দেশে লোকসভা ও রাজ্যসভায় তৃণমূল সাংসদেরা করোনা সংক্রমণের বিষয়টি উত্থাপন করেন, এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আবেদন জানিয়েছেন তা তুলে ধরেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি সাদামাটা সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কোনওভাবে সাংসদদের আশ্বস্ত করতে পারেন নি।
এরপর কেরল, জন্মু-কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র ইত্যাদি রাজ্য থেকে সংক্রমণের খবর আসতে শুরু করে। অথচ কোথাও কোনও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নেই যা করোনাকে রুখতে পারে। তখনও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিমান পরিষেবা যথারীতি চলছে। মেডিকেল কিট পর্যন্ত নেই। একবার বলা হচ্ছে মাস্ক পরার দরকার নেই, আবার বলা হচ্ছে মাস্ক পরতে হবে। হঠাৎই জনতা কার্ফু। থালা, ঘণ্টা বাজানোর পরামর্শ, তারপরেই আচম্বিতে লকডাউন। অথচ, এই চকিত তালাবন্দির আগে বিভিন্ন রাজ্যে যে পরিযায়ী শ্রমিক এবং চিকিৎসা ও শিক্ষার কারণে যাঁরা নিজ রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গেছেন, তাঁরা সবাই আটকে পরলেন। ২৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত (২৯ এপ্রিল) অর্থাৎ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা ভিন রাজ্যে তালাবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছেন। রাস্তায় বেরোলে লাঠির আঘাত অথবা হামাগুড়ি দিয়ে শাস্তি পেতে হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বাংলার শ্রমিক এবং এই রাজ্যের আটকে পড়া অন্যান্য মানুষের জন্য যেন থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয় তার আবেদন জানান। ফলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শত শত মাইল হেঁটে যারা ঘরে ফেরার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা আপাতত বন্ধ হলো। ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজ্য সরকার বিদেশ থেকে মেডিকেল কিট আমদানি করার ব্যবস্থা নিল, যেমন ৪০০ টাকা দামের কিট আসলো দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ছত্তীসগঢ়ে। সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার ফতোয়া জারি করলো কোনও রাজ্য সরাসরি কিট আমদানি করতে পারবে না। ফলে রাজ্যগুলোর হাতে যে সামান্য কিট ছিল তা দিয়েই কাজ শুরু হলো। কেন্দ্রের কাছ থেকে কোনও সরবরাহ নেই। অথচ কে কোথায় রেনকোট পরে নাকি ডিউটি করছেন তা নিয়ে পশ্চিমবাংলায় হইচই শুরু হয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী ছ-মাসের জন্য যাদের রেশনকার্ড আছে অথবা কার্ডের জন্য আবেদন করেও এখনও পাননি এমন সমস্ত পরিবারকে ৬ মাস বিনামূল্যে চাল, গম দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। আরকেএসওয়াই-২ কার্ডেও তিন মাস মাথাপিছু বিনামূল্যে চাল দেওয়া হবে। সবমিলিয়ে যাতে কেউ অভুক্ত না থাকেন সেজন্য প্রয়োজনে জিআরের চাল বিতরণ করার নির্দেশও তিনি দিয়েছেন। চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সবার বিমার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া অন্যান্য প্যাকেজ তো আছেই।

কিন্তু দেখা গেল লকডাউনের বিধিনিষেধ মানুষজন গোড়ার দিকে তেমন মানছেন না। তাই বাধ্য হয়ে কিছু পুলিশি ব্যবস্থা নিতে হলো। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং বাজারে বাজারে গিয়ে, রাজপথে খড়ি দিয়ে এঁকে বোঝালেন কীভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাবেচা করতে হবে। এমনকি ঝাঁটা হাতে সাফাই কর্মীদের উৎসাহ দিতে তাদের পাশেও রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালেন। চারিদিকে ধন্য ধন্য পরে গেল। কেননা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অতি সক্রিয়তা অন্য কোনও রাজ্যে চোখে পড়েনি।
ব্যাস! বিরোধীদের চোখ থেকে ঘুম উবে গেল। কখনও রেনকোট, কখনও চাল-গম নিয়ে দলাদলি, মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে নাকি গোপনীয়তা, করোনা অডিট কমিটি ইত্যাদি বুনো অভিযোগ তাঁরা তুলতে শুরু করলেন। টিভির পর্দায়, সাংবাদিক সম্মেলনে তো বটেই, তাঁদের অতিপ্রিয় রাজপ্রাসাদে গিয়েও অবিরাম নালিশ জানাতে থাকেন। হঠাৎ দেখা গেল মাননীয় রাজ্যপালও বিরোধীদের মতো একই অভিযোগ তুলতে শুরু করলেন। কখনও টুইট করে, কখনও বিবৃতি প্রকাশ করে, কখনও বা মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে। মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে মুখ্যসচিব ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যক্তিরা রাজ্যপালের কাছে গিয়ে করোনা উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা সত্বেও না রাজভবন থেকে, না বিরোধী নেতাদের কণ্ঠ থেকে অবিরাম বৃন্দগান বন্ধ হলো। অনেকেই বলছেন, এই সঙ্কটকালে যখন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির সমবেতভাবে চিকিৎসা ও ত্রাণের বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার তখন কোনওমতেই কোনও রাজনৈতিক দূরভিসন্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নয়। এখন মুস্কিল হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে আগামী বছর গোড়ার দিকে বিধানসভা নির্বাচন। সুতরাং, করোনা যেভাবে সবাইকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে তার সমস্ত দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এটাই যেন বিরোধীদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ। সোজা কথায়, ঘোলা জলে মাছ ধরা আর কি!
কিন্তু রাজ্যবাসীর মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন্দ্র এখনও করোনা মোকাবিলায় এই বিশাল খরচ বহন করার ক্ষেত্রে রাজ্যকে যথেষ্ট অর্থ সাহায্য করছে না কেন? এফসিআই-এর গোডাউনে প্রচুর চাল, গম মজুত আছে। তা দিয়ে ইথানল তৈরি হতে পারে কিন্তু গরিব মানুষের জন্য এই খাদ্যশস্য বরাদ্দ করা যেত না? আর মেডিকেল কিটের কেলেঙ্কারি তো এখন সামনে এসেই পড়েছে। চীন থেকে আমদানি করা এই মেডিকেল কিট অত্যন্ত নিম্নমানের তা প্রথম থেকেই পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান ইত্যাদি রাজ্য উল্লেখ করেছিল। যখন বিজেপি শাসিত রাজ্য থেকে একই অভিযোগ আসলো, তখন কয়েকদিনের জন্য এই কিট ব্যবহার বন্ধ রেখে পরীক্ষা করে দেখা গেল অভিযোগ সঠিক এবং আমদানি করা সমস্ত কিট বাতিল করা হলো। এই ৫ লক্ষ টেস্ট কিটের দাম ছিল ১২ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা। অথচ আইসিএমআর তা কিনেছে ৩০ কোটি টাকায়। বিমান থেকে নামার পরে যে কিটের দাম ছিল ২৪৫ টাকা তা মধ্যস্বত্তভোগীদের কল্যাণে আইসিএমআর-এর কাছে গিয়ে পৌঁছলো ৬০০ টাকায়। অর্থাৎ অতিমারীর সংকটের সুযোগ নিয়ে একেবারে ১৪৫ শতাংশ মুনাফা। এটি প্রথম করোনা স্ক্যাম। এমন আরও কিছু অচিরেই জানা যাবে। সরকার মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবসাকে চাঙ্গা করতে ৫০ হাজার কোটি টাকা যোগান দিয়েছে। অন্যদিকে ব্যাঙ্কের আমানতে সুদ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরফলে চরম দুর্দশায় পড়েছেন সাদারণ মধ্যবিত্ত সমাজ বিশেষত পেনসন ভোগীরা।
গরিব মানুষের হাতে টাকা নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বার বার রাজ্যের ঋণের ওপরে এক বছরের জন্য মোরাটোরিয়াম জারির কথা বলেছেন, কেন্দ্র নীরব। অর্থ কমিশনের সুপারিশ যা করোনা সংক্রমণের আগে পেশ করা হয়েছিল, তা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংশোধিত করার জন্য মমতা আবেদন জানিয়েছেন। এছাড়া করোনা মোকাবিলায় ২৫ হাজার কোটি টাকার অর্থ সাহায্য পশ্চিমবাংলার জন্য বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকার নির্বিকার, নিরুত্তর। অথচ দেখা যাচ্ছে, ইতিমধ্যে পরিকল্পিত ঋণখেলাপিদের ৬৮ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মকুব করে দিয়েছে। আর এই ঋণখেলাপিদের কালো তালিকায় পলাতক মেহুল চোকসি ও যতীন মেহতার মতো গুজরাতের হীরে ব্যবসায়ীদের নাম জ্বলজ্বল করছে। এমনকী যোগগুরু তথা মাল্টিব্র্যাণ্ড ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বাবা রামদেবও আছেন। থাকবেনই তো। কারণ যাঁরা জয়হিন্দ বলার পরিবর্তে জয় শ্রীরাম বলতে বেশি আগ্রহী তাদের পছন্দসই লোকদের ঋণ মকুব হবে না তো কি ছোট ব্যবসায়ীর হবে? তো এসব চলছে।

এর মধ্যে ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব হলো কেন্দ্রীয় দলের। তারা নাকি করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এসেছে। রাজ্য সরকার তাদের আগমন সংবাদ পাওয়ার আগেই এই কেন্দ্রীয় দল (যার মধ্যে কোনও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই) কলকাতার আধাসামরিক বাহিনীর অতিথি নিবাসে পৌঁছে গেছেন। আর একটি দল বাগডোগরা হয়ে জলপাইগুড়ি, কালিম্পংয়ের পথে রওনা দিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ তথা মৃত্যুর তালিকায় মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাডু, মধ্যপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্য শীর্ষে রয়েছে। তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ অনেক নীচে ১০ নম্বরে। অথচ শীর্ষস্থানে যে রাজ্যগুলো রয়েছে তার মধ্যে বিরোধী শাসিত মহারাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনও রাজ্যে এমন কোনও কেন্দ্রীয় দলের দরকার পড়লো না কেন? রাজ্য সরকার যখন এই প্রশ্ন তুললো তখন মাননীয় রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে এই বিষয়ে কি কোনও খোঁজ খবর নিতে পারতেন না? তিনি তো তা করলেনই না, উপরন্তু কেন্দ্রীয় দলের সঙ্গে রাজ্য সহযোগিতা করছে না, এমন ভুরি ভুরি অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালাতে থাকলেন। খবরের কাগজের সাধারণ পাঠকও দেখেছেন, যে উত্তরবঙ্গ প্রায় করোনা মুক্ত তার মধ্যে জলপাইগুড়ি, কালিম্পং সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্বেও কেন সেখানে কেন্দ্রীয় দল গেল? এতেই বোঝা যায়, যে পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে তাদের কোনও গোপন এজেন্ডা রয়েছে। কলকাতার দলটি এখানে ওখানে ঘুরে কিছু না পেয়ে বাঙুর হাসপাতালে মৃতদেহ দেখে প্রশ্ন তুললেন এই মৃতদেহ দু-তিন ঘণ্টা ধরে পড়ে রয়েছে কেন, আর কেনই বা মর্গে পাঠানো হয়নি? এমন হাস্যকর প্রশ্ন যে এ বিষয়ে সামান্যতম যাঁদের অভিজ্ঞতা আছে তাঁরাও শুনে চমকে উঠেছেন। বলাবাহুল্য, চিকিৎসা শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী মৃতদেহকে ৪ ঘণ্টা রাখতেই হয়। কারণ এই সময়সীমার মধ্যে হঠাৎই কোনও রোগী যাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে তিনি বেঁচে উঠতে পারেন। যদিও এমন ঘটনা খুবই সামান্য ঘটে। তবু সারা পৃথিবীজুড়ে এটাই নিয়ম। মর্গে পাঠিয়ে দিলে এইভাবে বেঁচে ওঠার ক্ষীণতম সম্ভাবনাও ফুরিয়ে যায়।
প্রশ্ন তোলা হলো করোনার আবার অডিট কমিটি কেন? গোমূত্র প্রচারক বিরোধী নেতাও বললেন, অডিট কমিটি তো হিসাবপত্র দেখার জন্য করতে হয়। না। গোমূত্র দলের লোকেরা জানেই না যে এই অডিট কমিটি তৈরি করার জন্য রাজ্যগুলির কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের অধীনস্থ আইসিএমআর। অতএব বোঝা যাচ্ছে এই কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক দলের উদ্দেশ্য করোনা সংক্রমণের বিষয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা তৈরি করা নয় বরং একইভাবে নবান্নকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা। আর তাই ২৪ এপ্রিল থেকে রাজ্য সরকারের কাছে লম্বা লম্বা চিঠি পাঠিয়ে চলেছে। দুর্যোগ মোকাবিলা আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলির পরিস্থিতি জানতে দল পাঠাতে পারে, কোনও কোনও বিষয়ে ‘অ্যাডভাইসরিও’ পাঠাতে পারেন। কিন্তু তা কোনও মতেই খবরদারি করা বা রাজ্য প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলার জন্য নয়। বরং রাজ্যে রাজ্যে করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলায় কী অসুবিধে হচ্ছে তা জেনে উপযুক্ত পরামর্শ ও সাহায্য পাঠানোই কেন্দ্রীয় সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্য ও কর্তব্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর অন্যথা ঘটলেই অন্য দূরভিসন্ধির দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। তাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবিনয়ে আগাম ঘোষণা করেছিলেন, এই সংকটকালে পারস্পরিক সহযোগিতা কাম্য। কোটি কোটি মানুষের প্রাণের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবেই করোনা ভাইরাসকে মোকাবিলা করা যাবে। যে কোনও মূল্যেই হোক, সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক ভাইরাস ছড়ানো থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। গোমূত্র দলের লোকেরা এমনকি যাত্রাদলের ভাড়া করা লোক দিয়ে কেঁদে কেটে অভিনয় করিয়ে অ্যান্টিসোশ্যাল সাইটে ভিডিয়ো তুলে ধরলেন। তাতে বলা হচ্ছে, না খেতে পেয়ে নাকি মানুষ মারা পড়ার যোগাড়। যে পশ্চিমবাংলায় ভিখিরি-ভবঘুরেদের পর্যন্ত মাথা গোঁজার ঠাঁই ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে এই ধরণের পরিকল্পিত উস্কানিমূলক অপপ্রচার বন্ধ হোক। এটাই সবার কাম্য। আবার আর এক দলকে দেখা গেল, রেড রোডে রেড ফ্ল্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁরাও নানা অব্যবস্থার অলীক অভিযোগ আনলেন। একটা জিনিস লক্ষ্য করার বিষয়, সারা রাজ্য জুড়ে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, বাজার সমিতি, এমনকি পাড়ার ছোট ছোট ক্লাব সাধ্যমতো ত্রাণ বিলি করে চলেছেন। কিন্তু কোথাও বিরোধী দলের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। রাজ্যের মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, পুরপিতা, পঞ্চায়েত সবাই ত্রাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তা নিয়েও কটাক্ষ!
ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে মাননীয় রাজ্যপালের এবং মুখ্যমন্ত্রীর কিছু চিঠি-পত্র এবং বিবৃতি চোখে পড়েছে। কেন কে কোন উদ্দেশ্যে চিঠি দিলেন বা বিবৃতি দিলেন তা ব্যাখ্যা করার এক্তিয়ার আমার নেই। কিন্তু আইন ও সংবিধানের ছাত্র হিসেবে এই প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরতে চাই। এটা ঠিকই যে রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতি দ্বারা নিযুক্ত হন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করলেও রাজ্যপালের নাম মনোনীত করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এবং মন্ত্রিসভার সুপারিশে রাজ্যপালকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। সুতরাং আসল নিয়োগ কর্তা কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যপালের নাম মনোনয়ন করাও তাঁদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। সুতরং এই নিয়োগ মনোনয়নের ভিত্তিতেই হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই পদ কোনও মতেই নির্বাচিত পদ নয়। রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যামন্ত্রীরাও নির্বাচিত হয়ে আসেন মানুষের ভোটে। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত বিধানসভা কিংবা সংসদ এবং রাজ্য সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় সরকার সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপাল শুধুমাত্র নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। দু-একটি বিবেচনামূলক ক্ষমতা (ডিসক্রিসনারি পাওয়ার) ছাড়া রাজ্যপাল ও রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত মন্ত্রিসভার সুপারিশ ও পরামর্শেই কাজ করতে হয়। এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের দু-একটি ঐতিহাসিক রায়ের কিছু অংশ তুলে ধরছি।
১। শমসের সিং বনাম স্টেট অব পাঞ্জাব (এআইআর ১৯৭৪/এসই২১৯২) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যপালের ভূমিকা প্রসঙ্গে যা বলেছেন :
a) ‘For a centrally appointed constitutional functionary to keep a dossier on his Ministers or to report against them or to take up public stances critical of Government policy settled by the Cabinet or to interfere in the administration directly – these are unconstitutional faux pas and run counter to parliamentary system.’ [Paragraph 7 (c)]
b) “The omnipotence of the President and of the Governor at State level is euphemistically inscribed in the pages of our Fundamental Law with the obvious intent that even where express conferment of power or functions is written into the Articles, such business has to be disposed of decisively by the Ministry answerable to the Legislature and through it vicariously to the people, thus vindicating our democracy instead of surrendering it to a single summit soul whose deification is incompatible with the basics of our political architecture”. [Paragraph 7 (e)]
২। বিপি সিংহল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (রিট পিটিশন নং ২৯৬/২০৪) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যপালের ভূমিকা প্রসঙ্গে যা বলেছেন :
In the early days of Indian democracy, the same political party was in power both at the Centre and the States. The position has changed with passage of time. Now different political parties, some national and some regional, are in power in the States. Further one single party may not be in power either in the Centre or in the State. Different parties with distinct ideologies may constitute a front, to form a Government. On account of emergence of coalition politics, many regional parties have started sharing power in the Centre. Many a time there may not even be a common programme, manifesto or agenda among the parties sharing power. As a result, the agenda or ideology of a political party in power in the State may not be in sync with the agenda or ideology of the political parties in the ruling coalition at the Centre, or may not be in sync with the agenda or ideology of some of the political parties in the ruling coalition at the Centre, but may be in sync with some other political parties forming part of the ruling coalition at the Centre. Further the compulsions of coalition politics may require the parties sharing power, to frequently change their policies and agendas. In such a scenario of myriad policies, ideologies, agendas in the shifting sands of political coalitions, there is no question of the Union Government having Governors who are in sync with its mandate and policies. Governors are not expected or required to implement the policies of the government or popular mandates. Their constitutional role is clearly defined and bears very limited political overtones. We have already noted that the Governor is not the agent or the employee of the Union Government. As the constitutional head of the State, many a time he may be expressing views of the State Government, which may be neither his own nor that of the Centre (for example, when he delivers the special address under Article 176 of the Constitution). Reputed elder statesmen, able administrators and eminent personalities, with maturity and experience are expected to be appointed as Governors. While some of them may come from a political background, once they are appointed as Governors, they owe their allegiance and loyalty to the Constitution and not to any political party and are required to preserve, protect and defend the Constitution (see the terms of oath or affirmation by the Governor, under Article 159 of the Constitution). Like the President, Governors are expected to be apolitical, discharging purely constitutional functions, irrespective of their earlier political background. Governors cannot be politically active. ( Paragraph 26)
৩। নাবাম রেবিয়া এবং বামাং ফেলিক্স বনাম ডেপুটি স্পিকার এবং অন্যান্য (সিভিল অ্যাপিল নং৬২০৩/৬২০৪, এসএলপিসি নং ১২৫৯/১২৬০) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যপালের ভূমিকা প্রসঙ্গে যা বলেছেন :
It was pointed out, that in the Justice Sarkaria Commission report, Chapter 5 was attributed to the role of the Governor. And in the Justice M.M. Punchhi Commission report, Chapter 4 was ascribed to the role of the Governor. It was asserted, that reference to both the reports would be repetitive, inasmuch as, the conclusions drawn in the Justice Sarkaria Commission report, had been substantially affirmed and reiterated in the Justice M.M. Punchhi Commission report. It was therefore, that learned counsel placed reliance only on the Justice M.M. Punchhi Commission report. He invited our attention to paragraph 4.1.03, of the report, wherein the Commission adopted the reasoning expressed during the proceedings of the Constituent Assembly for arriving at its conclusions. Reference was also made to paragraphs 4.2.09 to 4.2.15 highlighting the fact, that the Governor in exercise of his functions, cannot act in his individual capacity, especially when the function sought to be discharged (by the Governor), is in the realm of executive dispensation. Reliance was also placed on paragraph 4.3 of the report (in its entirety), which expounds the proposition, that it is not expected of the Governor to embroil himself in day-to-day activities of rival political parties, and that, Governors are expected to be independent, and to act in a manner devoid of any political consideration. It was pointed out, that independence of such actions would include, keeping the State Legislature and the political executive, shielded from the political will of the Union Government. Especially when the concerned State and the Union were not being governed by the same political party/conglomerate. Last of all, reliance was placed on paragraph 4.5, and more particularly, on sub-paragraph 4.5.03, to demonstrate, that a reading of the constitutional provisions had resulted in the two Commissions very clearly expounding, that the Governor was bound to act in consonance with the aid and advice tendered to him, by the Council of Ministers and the Chief Minister. It was pointed out, that the aforesaid mandate was also applicable to situations, where provisions of the Constitution had used expressions like “he thinks fit”. It was pointed out, that only in situations, where a constitutional provision expressly requires the Governor to exercise his functions in his own discretion, it is open to the Governor to do so. Only then, the exercise of such discretion, will be deemed to have been constitutionally exercised. (Paragraph 48)
উপরিলিখিত সর্বোচ্চ আদালতে রায়ের অংশবিশেষ রাজ্যপালের ক্ষমতা এবং ভূমিকা সম্পর্কে যে ব্যাখা দিয়েছে তা গভীরভাবে অনুধাবন করা উচিত। কারণ এর মধ্যে সংবিধান সভার বিতর্ক এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের বিষয়ে গঠিত দু-দুটি কমিশন যথাক্রমে সারকারিয়া কমিশন ও এমএম পু়ঞ্চি কমিশন রাজ্যপালের ভূমিকা ও ক্ষমতা কি হওয়া উচিত তার গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ রয়েছে। এর থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, রাজ্য মন্ত্রিসভার পরামর্শ ও সুপারিশ ছাড়া রাজ্যপাল কোনও কার্যকরী বা প্রশাসনিক ক্ষমতা (একজিকিউটিভ পাওয়ার) ব্যবহার করতে পারেন না। শুধুমাত্র সংবিধান নির্দিষ্ট বিবেচনামূলক ক্ষমতা (ডিসক্রিসনারি পাওয়ার) সামান্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন। যেমন, কোনও প্রাণদন্ডে দন্ডিত ব্যক্তি বা অন্য অপরাধীর শাস্তি মকুব বা রদ করতে পারেন। তবে সেটিও তিনি করবেন সরকারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। সারকারিয়া ও পুঞ্চি কমিশন কেন্দ্র ও রাজ্যের ভিন্ন দলের সরকার থাকলে রাজ্যপাল যেন কোনোমতে লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম না করে তার উল্লেখ করেছেন। একইভাবে সুপ্রিম কোর্টেরও নির্দেশ রাজ্য সরকারকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার কোনও অধিকার বা ক্ষমতা সংবিধানে রাজ্যপালকে দেওয়া হয়নি। অথচ এই সঙ্কটকালে পশ্চিমবাংলায় সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ প্রতিনিয়ত পদদোলিত করা হচ্ছে। করোনা আক্রান্ত দেশে সমস্ত বিতর্ক দূরে সরিয়ে রেখে আদালত ও কমিশনের এমন গুরুত্বপূর্ণ নিদান মনে রাখলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের রাস্তা প্রশস্ত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দেয়।
সংবিধান প্রণেতারা বিভিন্ন আইনী প্রতিষ্ঠান এবং সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষকে যে ক্ষমতা বা পদমর্যাদা দিয়েছেন তা জনহিতে ব্যবহার করার নির্দেশ রয়েছে। নিজ স্বার্থে কিংবা দলীয় প্রভুদের নির্দেশে ব্যবহার করার জন্য নয়। সুতরাং ঢাল নেই তরোয়াল নেই অথচ নিধিরাম সর্দার রাজ্য সরকারের সাংবিধানিক অধিকার ও কর্তৃত্বকে খর্ব করতে চাইছে। তাই নিয়মিত সলতে পাকানোর কাজ চলছে। কিন্তু সমস্ত বিঘটনকারী অপশক্তির মনে রাখা দরকার যে এমন কর্তৃত্ববাদী মনোভাব বাংলার মানুষ অতীতে মানেননি, আজও মানবেন না।