একি! দলে দলে মানুষ একখণ্ড চাষের জমির দিকে ধাবমান — প্রত্যেকের মাথায় হাত, আর সেই হাতে একটি করে মাটির ঢেলা। পৌষের কোনও এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে এহেন দৃশ্য দেখে হতচকিত হলে চলবে না। গ্রামবাংলায় বহুবিচিত্র সব পরবের মধ্যে এটিও একটি। লোকমুখে এই আরাধ্য দেবতা পরিচিত ‘ঢেলাই চণ্ডী’ নামে, যাঁকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ ধরনের সংস্কার। বাংলার লোকসংস্কৃতির এযেন এক ব্যতিক্রমী আঙ্গিক।
প্রথম পরিচয়ে বিষয়টি অদ্ভুত বলে মনে হলেও, নদিয়া জেলার কোতোয়ালি থানা এবং হাঁসখালি থানার সংযোগস্থলে ফিবছর পৌষ মাসে এমনই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের অনতিদূরে রয়েছে যাত্রাপুর গ্রাম। সেই গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এক বিশাল বড় চাষের ক্ষেত, যার ঠিক মধ্যিখানে রয়েছেন মা ঢেলাই চণ্ডী। তাঁকে সন্তুষ্ট করতেই পৌষ মাসের প্রত্যেক শনি-মঙ্গলবার মাথায় মাটির ঢেলা নিয়ে সেখানে মানুষের ঢল নামে। সেই দুই দিন তাঁকে ঘিরে চাষের ক্ষেতে একটি মেলাও বসে। ভক্তরা সেখানে মাটির ঢেলা ফেলতে আসেন বলে, লোকমুখে সেই মেলার নাম হয়েছে ‘ঢেলা ফেলার মেলা’। আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম, যেমন — জয়পুর, দোগাছি, ইছাপুর, জয়নগর, চিত্রশালী, মানিকতলা থেকে পায়ে হেঁটে বহু মানুষ ঢেলা ফেলার মেলা দেখতে আসেন। আর ঢেলাই চণ্ডীকে সন্তুষ্ট করতে প্রত্যেকেই নিজেদের সঙ্গে একখণ্ড মাটির ঢেলা আনেন। ছোট, বড় হরেক রকমের মাটির ঢেলা নিয়ে অগণিত মানুষ হেঁটে চলেছেন মাঠের দিকে।

মাটির ঢেলা দিয়ে তাঁকে তুষ্ট করতে হয়, তাই তো তিনি ‘ঢেলাই চণ্ডী’। মা মনসা সেখানে বিরাজমান। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন বাবা মহাদেব। ভক্তদের আনা মাটির ঢেলা জমতে জমতে চাষের জমির মাঝখানে উঁচু ঢিবি তৈরি হয়েছে। মা ঢেলাই চণ্ডী সেই ঢিবির উপরেই বিরাজমান। সেখানেই ভক্তরা পুজো দেন এবং সাথে আনা মাটির ঢেলা রেখে যান। জমির আল ধরে এগিয়ে চলা জনতার কারও কারও মাথায় এত বড় মাটির ঢেলা, যে বোঝাই যায় সেটি দুই হাতে চাগা করে তুলতে হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগলেও ঢেলাই চণ্ডীকে নিয়ে এলাকার মানুষের উন্মাদনা এমনই!

শীতকাল হলেও, পৃথিবীর এই গোলার্ধে পৌষ মাসে সূর্যের অনুসুর অবস্থান থাকে। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নিরলস ভাবে মাথায় সূর্য নিয়েই মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন। চারিদিকে ফাঁকা চাষের জমি। চাষি ভাইয়েরা আমন ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। আর কোথাও কোথাও সর্ষের চাষ হয়েছে। তাই বছরের এই সময়টি নদিয়ার যাত্রাপুরের ঢেলাই চণ্ডী মেলার জন্য হয় অনুকূল। মেলায় আগত দোকানদারেরা ফাঁকা শস্যক্ষেতে তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন। মনোহারী সামগ্রীর দোকান থাকে বেশ কয়েকটা। ছোটদের খেলনার দোকান, ট্যাটুর দোকান, কাঠের সামগ্রী, ছবি পোস্টারের দোকান, জিলাপি, চিনা বাদাম, পাঁপড় ভাজা, চপের দোকান আরো কত কী! বর্তমানে ঢেলা ফেলার মেলায় খাবার-দাবারের দোকানই সম্ভবত সব থেকে বেশি থাকে। শনি-মঙ্গলবার সারাদিন ব্যাপী মেলা চলে। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে পর্যন্ত দোকানিরা তাদের পসরা সাজিয়ে রাখেন। ঢেলাই চণ্ডীর ভক্তদের সেখানে আনাগোনা লেগেই থাকে।

একেবারে গ্রাম্য মেলা বলতে যা বোঝায়, ঢেলা ফেলার মেলা হল ঠিক তাই। সেখানে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। ভুঁইয়ের মধ্যেই আউল, বাউল, ফকিরেরা তাবু খাটিয়ে তাঁদের আখড়া গড়েন। এক ভক্তিমূলক উন্মাদনা দেখা যায়, যখন পূজার্থীরা হরির লুট করে বাতাসা বিতরণ করেন। অনেক ভক্ত আবার মেলা প্রাঙ্গণেই জনগণকে খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। বিগত কয়েক বছর ধরে ঢেলাই চণ্ডী মেলার পরিধি এবং প্রসার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মেলার স্বতন্ত্রতা বহু মানুষকে আকৃষ্ট করছে। ঢেলাই চণ্ডীর টানে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসছেন।

কৃষ্ণনগর রেল স্টেশন থেকে সড়কপথে ঢেলাই চণ্ডীর মেলায় যেতে হলে প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। কৃষ্ণনগর রেল স্টেশন থেকে দুটি পথ ধরে এই মেলায় যাওয়া যেতে পারে। একটি পথ হল – শক্তিনগর পাঁচমাথা মোড় হয়ে কবিগুরু রোড ধরে বৈকুণ্ঠ সড়ক খেয়াঘাটের মোড় পর্যন্ত গিয়ে, সেখানে থেকে বাঁহাতে পিচের রাস্তা ধরে ইছাপুর-জয়পুর গ্রামের মধ্যে দিয়ে ঢেলাই চণ্ডীর মেলায় যাওয়া যায়। আরেকটি পথ হল – কৃষ্ণনগর রেল স্টেশন থেকে আনন্দময়ী তলা হয়ে বগুলা রোড ধরে ঢেলাই চণ্ডীর মেলায় যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে বগুলা রোড ধরে কলতলা, কালীনগর পণ্ডব পাড়া মোড় ছাড়িয়ে ভূতপাড়া, যাত্রাপুর বাজার পার করে ডানহাতে মানিকতলা গ্রামের ভেতর দিয়ে ঢেলাই চণ্ডীর মেলায় যেতে হয়।

মেলা মানেই বহু মানুষের সমাগম। ঢেলা ফেলার মেলাতেও বহুদূরান্ত থেকে মানুষেরা আসেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলা থেকে এপার বাংলায় চলে আসা বিমল বিশ্বাস এসেছিলেন ঢেলা ফেলার মেলায়। বর্তমানে তিনি হাঁসখালি থানার অন্তর্গত প্রভাতনগর গ্রামের বাসিন্দা। ঢেলাই চণ্ডীর ক্ষেত্র থেকে দক্ষিণ দিকে সেই প্রভাতনগর গ্রাম। মেলার মাঠেই তার সাথে পরিচয় হল। বিমল বিশ্বাসের কথায়, “যেখানে দশজন যায়, সেখানে ভগবান আছে কিছু। সেজন্য মনে আকর্ষণ হয়, যাই একটু… সাধু গুরুর চরণ দর্শন করে আসি। আজ এখানে সবাই সাধু। সবাই এসেছে এই মেলায়, এক মনে।” অনেকে আবার বললেন, ঢেলা ফেলার মেলা হল সাধু গুরুর মেলা।

ঢেলাই চণ্ডীকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে একাধিক লোকশ্রুতি রয়েছে। যেমন একটি লোকশ্রুতি হল এই মেলায় আগত কোনও দর্শনার্থী নাকি মা ঢেলাই চণ্ডীকে সন্তুষ্ট না করে অর্থাৎ সেখানে মাটির ঢেলা না দিয়ে প্রস্থান করতে পারেনা। ঘুরেফিরে তাদের সেখানে ফিরে আসতেই হয়। ঢেলাই চণ্ডীকে একটি মাটির ঢেলা নিবেদন করতেই হয়। তাঁকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে এক প্রকার ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা রয়েছে। আবার এমনও লোকবিশ্বাস রয়েছে যে, ঢেলাই চণ্ডীর কাছে নিষ্ঠার সাথে কোনও কিছু মানত করা হলে, তিনি সেটি অবশ্যই পূরণ করেন। অর্থাৎ ঢেলাই চণ্ডী হলেন ভালোর ভালো, খারাপের খারাপ। বাংলা সনের নবম মাস এবং ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শকাব্দের দশম মাস পৌষে আরাধ্য ঢেলাই চণ্ডী সম্পর্কে বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটি তাই কেমন যেন মিলে যায় – ‘কারও পৌষ মাস, তো কারও সর্বনাশ!’
লেখক: অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।
Khub valo laglo…ato notun kichu jene????????
তোমার ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো
বাঃ,বেশ তো..
দারুন ।এই মেলার কথা জানতাম না।
আসছে বার ঢেলা ফেলে আসবো।দেখি মা চণ্ডী নেন কিনা..
হেঁটেই কি যেতে হবে??
মা গো??
ধন্যবাদ দিদি। খুবই অনালোচিত মেলাটি। আর হ্যাঁ, হেঁটেই যেতে হবে মেলায়। ক্ষেতের মধ্যে মেলা বসে যেহেতু।
সম্পূর্ণ অজানা ছিল। মেলার এই বিবরণ খুব ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ
একেবারেই আজানা তত্ত্ব ????
ধন্যবাদ
খুব ভালো লাগল। একেবারেই জানতাম না মেলাটির কথা।কোনো mediaতে কখনো দেখি নি। খুব ভালো করলে লিখে। লেখার ভাষাটিও ভারী ঝরঝরে।
আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগলো ম্যাডাম
আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগলো ম্যাডাম। ভালো থাকবেন।