ঝাড়ু বা ঝাঁটার তৎসম নাম সম্মার্জনী। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণদাস লিখেছেন, ‘কিন্তু ঘটসম্মার্জনী বহুত চাহিয়ে’। বঙ্কিম চাটুজ্যে ১৮৭৪-এ লিখলেন, ‘তাহাকে সম্মার্জনী প্রহার করিতেছে।’ দীপিকানাম্নী এক লেখিকা ১৮৮৭-এ লিখেছেন, ‘কতই সম্মার্জনীর ব্যবস্থা করিবেন।’
রবীন্দ্রনাথ তো মহাবৈশ্বিক উপমা প্রয়োগের শিরোমণি। লিখেছেন, ‘কিন্তু, বাইরে থেকে আসে যখন উল্কাবৃষ্টি, সম্মার্জনী হাতে আসে ধূমকেতু, উপগ্রহের উপসর্গ, তখন মাথা চাপড়ে বলি, এ যে মারের উপরি-পাওনা’। ১৯২৯-এ লিখেছেন এই কথা। অন্যত্র লিখেছেন, ‘সেখানে ক্রমাগতই ধ্বংসধূমকেতুর সম্মার্জনী কাজ করেছে…।’
অর্থাৎ ধূমকেতুর সঙ্গে ঝাড়ু তথা সম্মার্জনীর বিরাট মিল। দৃশ্যগত ও ভাবগত, দুটি মিলই খুঁজেছেন রবীন্দ্রনাথ।
ধনতেরাসের দিন সোনাদানার সঙ্গে ঝাড়ু কেনার হিড়িক পড়ে যায়। ঝাড়ু নাকি মা লক্ষ্মীর প্রিয় মোটিফ। অলক্ষ্মীকে ঝাড়ু মেরে বিদেয় করে ধনের আবাহন।
আবার কুবেরের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ঝাড়ুরূপ ধূমকেতুর প্রতীক। কুবের ছিলেন রাবণের বৈমাত্রেয় ভাই। তিনি ব্রহ্মার কাছ থেকে পেয়েছিলেন বিশ্বকর্মা নির্মিত পুষ্পকরথ। দুষ্ট রাবণ ছলেবলেকৌশলে সেটি হাতিয়ে নেয়। কুবেরকে আক্ষরিকভাবেই ঝাড়ু মেরে স্বর্ণলঙ্কা থেকে বিদায় করে। কুবের তখন উত্তরের দিকপাল হয়ে অলকাপুরীতে বাস করা শুরু করেন।
পরে রামের হাতে রাবণের মৃত্যু হলে রাম সীতা, লক্ষ্মণ ও হনুমান সমভিব্যাহারে ওই পুষ্পকরথে চেপে অযোধ্যা ফেরেন। কুবেরের পুষ্পকরথ কুবেরকেই ফিরিয়ে দেন। রাবণের পুষ্পক রথ কুবেরের হাতে এইভাবেই ফিরে গিয়েছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। মাঝের অংশটি সনাতনীপ্রক্ষেপ কিনা জানি না অবশ্য। তবে মহাজাগতিক এই পুষ্পকভ্রমণের সময় ধূমকেতুর সংস্পর্শে আসতে হতে পারে। ব্ল্যাকহোলের ফাঁদ পাতা থাকতেই পারে। তবে রাম তো! তাই সেসব হেলায় অতিক্রম করে যান!

পরে খ্রিস্টীয় সাহিত্যসংস্কৃতিতে দেখা যায়, ঝাড়ু বা ঝাঁটার পিঠে চড়ে ডাইনি বা উইচরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। হ্যালোইনের দিনেও ঝাড়ু কেনে লোকে।
হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে কে রাউলিং ঝাড়ুকে জাদুবাহন হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। আকাশে ঝাড়ু চেপে উড়ে যাওয়ার দৃশ্য হ্যারি পটারের সব সিনেমায় সহজলভ্য। হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন, হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য চেম্বার অফ সিক্রেটস, হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য গবলেট অফ ফায়ার্স, আরও সব সিনেমাতে।
ঝাড়ু স্বমহিমায় হাজির হয় ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযানে নেতাদের হাতে নতুন সম্মার্জনী শোভা পাওয়া থেকে শুরু করে কেজরিওয়ালের দলীয় প্রতীক হওয়া, সর্বত্রই ঝাড়ুর জয়গান।
দক্ষিণ ও পশ্চিমবিশ্বে ঝাড়ু ডিঙিয়ে বিয়ে করতে হয়। এখানে যেমন পায়ে কটোরা বা ভাঁড় ভাঙতে হয়, জাঁতাতে চাপতে হয়।
কলকাতার বড়বাজারে খ্যাংরাপট্টি নামে একটি জায়গা আছে। সেটি ছিল পুরনো কলকাতার ঝাড়ুবিক্রির মোকাম।
এখনও সেটি আছে বহাল তবিয়তে।
ধনতেরাসের জন্যে তৈরি শৌখিন ঝাড়ু সেখানে পাওয়া যায় কিনা তা অবশ্য জানি না। তবে গৃহিণীদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই, নানা সুদৃশ্য ব্র্যান্ডের ঝাড়ু বাজারে অ্যাভেলেবল। অনলাইনেও পাওয়া যাচ্ছে। ধনতেরাস ও ঝাড়ু যেন সমার্থক এখন। সোনাদানার কথা পরে।