বাংলার রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত নতুন ঘটনা নয়। তিনি এ রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই সরকারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে তিনি নিজেকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন। শুরু থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে তিনি রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর নামে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে জড়িয়েছেন। কিন্তু এ বারের বিষয়টি মনে হয় আগের সব বিতর্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছে। কারণ, এই বিতর্কের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতির প্রসঙ্গ। সেই বিষয়টি হল জৈন হাওয়ালা মামলা এবং সেই মামলায় জড়িত ব্যক্তিত্ব। যা নিয়ে এখন উত্তাল রাজ্য রাজনীতি।
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালে কাশ্মীর থেকে ধরা হয়েছিল এক হিজবুল জঙ্গিকে। সেই জঙ্গির নাম আশফাক হুসেন লোন। সেই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা যায় যে, হিজবুল জঙ্গি সংগঠনের হাতে টাকা আসত হাওয়ালার মাধ্যমে। আশফাককে জেরা করে এও জানা যায় যে, সেই টাকা আসত সুরেন্দ্র কুমার জৈন নামক এক শিল্পপতির কাছ থেকে। এমনকি জৈনের আত্মীয়রাও হাওয়ালায় জড়িত ছিল বলে জানায় আশফাক।
হিজবুল জঙ্গি আশফাক হুসেন লোনের সেই বয়ানের ভিত্তিতেই গোয়েন্দারা বহুদিন ধরে তল্লাশি চালিয়ে যান। গোয়েন্দাদের তল্লাশিতে জৈনের দুটি ডায়েরি আর দুটি নোটবুকের খোঁজ পাওয়া যায়। যে ডায়েরি ও নোটবুকে জৈন কবে, কাকে, কত টাকা দিয়েছেন, তা বিস্তারিতভাবে লিখে রেখেছিলেন। সেখানে যতজনের নাম পাওয়া যায় সেই তালিকা যেমন লম্বা তেমনি অনেক নামও ছিল বিস্ফোরক। তদন্তে জানা যায়, ৪২ জন হেভিওয়েট রাজনীতিবিদের নাম রয়েছে সেই ডায়েরিতে। হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯১ এই তিন বছরে একাধিক রাজনৈতিক হেভিওয়েট নেতাকে মোট ৫২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। টাকা দেওয়ার পাশাপাশি যে নেতাদের নাম উল্লেখ ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলার বর্তমান রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়।
৩০ বছর পর সেই মামলার কথাই তুলে আনেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জৈন হাওয়ালা মামলার চার্জশিটে রাজ্যপালের নাম থাকার কথা উল্লেখ করেন। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, বাংলার বর্তমান রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় জৈন হাওয়ালা কাণ্ডে জড়িত ছিলেন। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওই মামলা হয়েছিল বিদেশে অর্থ পাচার এবং বিদেশ থেকে অবৈধ ভাবে অর্থ আনার উপর। সারা দেশ সেই মামলায় তোলপাড় হয়, তবে সেই মামলার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। এরপরই মমতা অভিযোগ করে বলেন, ওই মামলায় জড়িত ছিলেন জগদীপ ধনখড়।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের পরেই রাজ্যপাল বিবৃতি দিয়ে জানান, ওই মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সংযোগ নেই। রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী তথ্য দিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করুন।
তারপরেই সেই বিতর্কে মুখ খোলেন সাংবাদিক বিনীত নারায়ণ। তিনি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে হাওয়ালা মামলার তদন্ত চেয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর আবেদন রীতিমতো আলোড়ন ফেলেছিল। পরবর্তী কালে তার দাবি মেনেও নেওয়া হয়েছিল। বিনীত হাওয়ালা কাণ্ড নিয়ে একাধিক তথ্য হাজির করেছিলেন। সেই সব তথ্য তিনি জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন এবং আইনি লড়াইও লড়েছিলেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ধনখড়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পর বিনীত একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, জৈন ভাইদের থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরিতে প্রাক্তন মন্ত্রী জগদীপ ধনখড়ের নামোল্লেখের পাশাপাশি লেখা আছে তিনি সুরেন্দ্র কুমার জৈনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। একই অভিযোগ আছে কেরালার রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খানের বিরুদ্ধেও। তিনি ৭ কোটি টাকা নিয়েছিলেন বলে লেখা আছে।
রাজ্যপাল ধনখড় মুখ্যমন্ত্রীকে তথ্য দিয়ে অভিযোগ প্রমান করার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। অন্যদিকে সাংবাদিক বিনীত নারায়ণ পালটা বলেছেন, বাংলার রাজ্যপাল যে বলছেন, ওই মামলার সঙ্গে তিনি কোনো ভাবেই যুক্ত নন, সেই তথ্য মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। তাঁর প্রশ্ন, ‘সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে চলা জৈন হাওয়ালা মামলায় অভিযুক্তদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনও প্রমাণ জগদীপ ধনখড় দিতে পারবেন কি?’
ধনখড়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি মামলা থেকে প্রথমেই নাম সরিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে রিট পিটিশন হয়। অতএব জৈন হাওয়ালা মামলায় যে ধনখড়ের নাম নেই, এ কথা বলা যায় না। বিনীতের বক্তব্য, ‘ধনখড় এ বিষয়ে নিজেই ‘মিথ্যাচার’ করছেন। হাওয়ালা মামলায় যে তাঁর নাম নেই, সেটা আগে তাঁর প্রমান দেওয়া উচিত’।
এর রেশ না কাটতে না কাটতেই তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ, বেআইনিভাবে আবাসনের জমি বরাদ্দের সুবিধেভোগী ছিলেন জগদীপ ধনখড়৷ যদিও পরে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট সেই বরাদ্দ খারিজ করে দেয়৷ পাশাপাশি তৃণমূলের চিফ হুইপ সুখেন্দুশেখর রায় নথি নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেন, জৈন হাওয়ালা কেলেঙ্কারিতে জনৈক জগদীপ ধনখড়ের নাম পাওয়া গিয়েছে। জৈন ডায়েরির একটি পাতা দেখিয়ে তাঁর দাবি, সেখানে জগদীপ ধনখড়ের নামের পাশে ৫ লেখা আছে। সুখেন্দুশেখর রায় বলেন, এই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। তাহলে কীভাবে নিজেকে অব্যাহতি দিচ্ছেন রাজ্যপাল?
ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।
হাওলা খেল ধনখড়ে।
চলতে থাকুক স্পষ্ট উচ্চারণ।