ধনতেরাস উৎসবে লক্ষ্মীর সঙ্গে কুবেরের পুজো হয়। বাঙালির কাছে কুবের পাত্তা না পেলেও অবাঙালিরা কুবেরের খুব ভক্ত। প্রচলিত মতে “ধনত্রয়োদশী” থেকে এসেছে ধনতেরাস। আসলে মূল কথাটি “ধনদত্রয়োদশী”। কুবেরের আর এক নাম ‘ধনদ’। তাই এই ‘ধনদত্রয়োদশী’ নাম। ধনদত্রয়োদশীই অপভ্রংশে ধনত্রয়োদশী হয়ে ধনতেরস বা ধনতেরাস হয়ে গেছে।
ধন্বন্তরির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই ধনতেরাসের। ইদানীং ধন্বন্তরিকে জোর করে টেনে আনা হচ্ছে চৌদ্দশাক খাওয়াকে কেন্দ্র করে। আয়ুর্বেদের ধ্বজাধারীরা এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন বছর দশেক আগে।
হিন্দুমতে, ধনের দেবতা হলেন কুবের৷ আমরা কোনও সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিকে ‘কুবের দ্বারা তুষ্ট’ বা ধনকুবের হিসাবে উল্লেখ করে থাকি এবং পুরাণ কাহিনীতে সোনার ভাণ্ডার এবং সুবিশাল ধনসম্পত্তি বলতে ‘কুবেরের ভাণ্ডার’ বা ‘কুবেরের ধন’কেই বোঝায়৷ কিন্তু এই কুবের কে? কি কারণেই বা তিনি ধনের দেবতা?
যক্ষ (রাক্ষস) কুবের ছিলেন রাজা। তিনি দক্ষিণ সাগরের মাঝখানে সোনার শহর লঙ্কা তৈরি করেন৷ বলা হয় যে, তিনি সাধারণত তাঁর পুষ্পক বিমানে করে ভ্রমণ করতেন, সেটি এক প্রাসাদতুল্য উড়ন্ত যান ছিল৷ তবে, কুবেরের লঙ্কার গৌরবময় দিন শেষ হয়ে যায় যখন কুবেরের সৎ ভাই রাবণ, ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে তাঁকে উচ্ছেদ করে৷ উৎপীড়িত ও বিতাড়িত কুবের লঙ্কা ছেড়ে কৈলাশের কাছে অলকাপুরীতে থাকতে শুরু করে৷
বৈদিক পাঠে কুবেরকে রাক্ষস আখ্যা দেওয়া হয়৷ যদিও, রামায়ণ এবং মহাভারতের মত অন্যান্য হিন্দু পুরাণে, তিনি ধনের দেবতা এবং সবথেকে ধনবান দেব (হিন্দু ভগবান)৷ মজার বিষয় হল, কুবের শব্দের অর্থ হল — সংস্কৃততে ‘বিকলাঙ্গ’ বা ‘ভয়ঙ্কর’৷ হিন্দু লিপি এবং ভাষ্কর্যে কুবেররে চিত্রায়ণ করা হয় বিরাট বপু এবং পদ্ম পাতার গাত্রবর্ণ সমেত খর্বাকৃতি ব্যক্তি হিসাবে৷
হিন্দু পুরাণে, ‘কুবেরের ভাণ্ডার’ বা ‘কুবেরের ধন’ প্রচলিত শব্দ যা ধনী ব্যক্তিদের সোনার ভাণ্ডার বা সম্পত্তির জন্য ব্যবহৃত হয়৷ বর্তমানে কুবেরের শিল্পকলা এবং ছবি বলতে মূলত সোনা সমেত দেবী লক্ষ্মীকে বোঝায়৷ ‘সোনার দাতা’ হিসাবে পরিগণিত হওয়ার পর, কুবের প্রায়ই সমৃদ্ধি ও সাফল্যের জন্য লক্ষ্মীর সাথে পূজিত হয়, বিশেষত বাড়ির সাথে সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দিওয়ালির সময়৷ এটা বিশ্বাস করা হয় যে কুবেরের যে ভক্তরা তাঁর ‘ওম শাম কুবেরায় নমঃ’ মন্ত্রটি একশ আটবার জপ করে তাদের তিনি তাঁর ভাণ্ডার থেকে সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতু দান করে৷
কুবেরের অস্তিত্ব হিন্দুধর্মের বাইরেও উপস্থিত, যেহেতু তিনি জৈন এবং বৌদ্ধ পৌরাণিক কাহিনীতেও রয়েছেন৷ বৌদ্ধ পাঠে, কুবের হলেন ভইশ্রবন, চার জন স্বর্গীয় রাজার একজন, যারা চারটি প্রধান দিকের সাথে সংশ্লিষ্ট৷ অন্যদিকে জৈনধর্মে, কুবের হলেন উনিশতম তীর্থঙ্কর মল্লিনাথের সহায়ক যক্ষ এবং তার নাম সর্বানুভূতি বা সর্বাহনা৷
তাঁর বিশাল ব্যাপ্তি সমেত, কুবের একাধিক উপাসক সম্প্রদায়ের একনিষ্ঠতা উপভোগ করে থাকেন৷ এটা বিশ্বাস করা হয় যে, তাঁর ভক্তদের তাঁর প্রতি নিবেদিতপ্রাণা হয়ে উপাসনা তাদের সোনার সাফল্য এনে দেয়৷
হিন্দুশাস্ত্রে জগতের কোষাধ্যক্ষ রূপে কুবেরকে পূজা করার বিধান দেওয়া হয়েছে। কথিত আছে, বেঙ্কটেশ্বর (বিষ্ণুর এক রূপ) পদ্মাবতীকে বিবাহ করার জন্য কুবেরের থেকে কিছু ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। এই কথা স্মরণ করে ভক্তেরা তিরুপতি মন্দিরে বেঙ্কটেশ্বরের “হুন্ডি”তে (দানপাত্রে) দান করেন, যাতে বেঙ্কটেশ্বর কুবেরের ঋণ শোধ করতে পারেন।
কুবের এখনও ধনসম্পদের দেবতা হিসেবে পূজিত হলেও প্রজ্ঞা, সৌভাগ্য ও বিঘ্নহরণের দেবতা হিসেবে কুবেরের ভূমিকাটি প্রধানত গণেশ নিয়ে নিয়েছেন। গণেশের সঙ্গে কুবেরের একটি সম্পর্কের কথাও হিন্দুশাস্ত্রে কথিত হয়।
ড. হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, “কুবের পুরাণ প্রসিদ্ধ দেবতা। যদিও পুরাণের যুগেও কুবের অপ্রধান দেবতা, তাঁর পূজাও সচরাচর দেখা যায় না, তথাপি বাঙ্গালাদেশে অন্নপূর্ণা পূজায় অন্নপূর্ণার সঙ্গে কুবেরের মূর্তিও পূজিত হয়ে থাকে। লক্ষ্মীপূজার সময়েও লক্ষ্মীর সঙ্গে ধনাধিপতি কুবেরের পূজা হয়। …হিন্দুর নিত্য-নৈমিত্তিক কর্মে দশদিকপালের অন্যতম হিসাবে কুবেরও পূজা পেয়ে থাকেন। কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে ধনাধিষ্ঠাতা হিসেবে কুবেরের পূজা প্রচলিত নেই।”
বাগেশ্বর ভ্রমণের সময় কুবেরের বিরাট মূর্তি দেখেছিলাম বছর দশেক আগে। সেখানে, মন্দিরচত্বরে তাঁর নাম খাজাঞ্চিবাবা। কু অর্থাৎ খারাপ বের অর্থাৎ শরীর যাঁর, তিনিই কুবের। কুবের কুৎসিতদর্শন।তিনি উত্তমকুমার নন। বাঙালি তাঁকে পূজা করতে তাই যাবেই বা কেন?
অবাঙালিদের দেখাদেখি তাঁর পূজার চল হয়েছে এ বঙ্গে। তাও বছর কুড়ির বেশি হবে না।