কলকাতায় সবুজায়নের আরএকটি দৃষ্টান্তের নাম ধাপা। অবাক হচ্ছেন? ই এম বাইপাশের ওপর দিয়ে যেতে গেলে চোখে পড়বে সেই সবুজায়নের দৃশ্য। ‘ধাপায় সবুজায়ন’ — ১০-১১ বছর আগেও ছিল অলীক কল্পনা। আজ তা বাস্তবে পরিণত। বর্তমানে ধাপার বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে সার। বর্জের অপরিষ্কার জল পরিশোধিত করে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন কাজে। কলকাতা পৌরসংস্থার মোট ২৭টি ওয়ার্ডে এখন বর্জ্য পৃথকীকরণের কাজ হয়। ভবিষ্যতে ১৪৪টি ওয়ার্ডেই বর্জ্য পৃথকীকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ভাবছে পৌরসংস্থা। এর ফলে আগামীদিনে ধাপার জঞ্জাল ফেলার পরিমাণ অনেক কমে যাবে। পুরসভার কঠিন বর্জ্য অপসারণ বিভাগ চেষ্টা করছে আগামী ৩ বছরের মধ্যে ধাপা ডাম্পিং গ্রাউন্ডকে পুরনো অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে। বর্তমানে দৈনিক ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন জঞ্জাল ফেলা হয় এখানে। কলকাতা এবং বিধাননগর দুই শহরের আবর্জনা এখানে আসে। বর্তমানে শহরের ভিতরে যে কম্পোজিট প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে, তার মাধ্যমে তিন বছরে ধাপাকে পরিষ্কার করে দেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ মহলের মতে তাতে সফলতা আসবে।

ধাপার পুরনো অংশ
ধাপা মানে যে শুধুমাত্র দুর্গন্ধ আর জঞ্জালের স্তূপ নয় — তার প্রমাণ ধাপার এই অংশটি। এখানে ৭-৮ বছর আগে থেকে বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়ে গেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের সহায়তায় ও ওয়েস্ট বেঙ্গল পলিউশান কন্ট্রোল বোর্ডের মাধ্যমে এখানে গড়ে উঠেছে সবুজে মোড়া এক মনোরম বাগিচা। বাগিটায় বসানো হয়েছে বেশ কিছু গাছ। জায়গাটির আয়তন ১২.১৪ হেক্টর। এর তলার দূষিত জলকে পরিশোধিত করে তোলা হচ্ছে। তার ফলে দূষিত জল মাটিতে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারছে না। মিথেন গ্যাস যাতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাতাসে মিশে যেতে পারে তার জন্য আলাদা চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে কলকাতার একটি নান্দনিক স্থান হয়ে উঠেছে ধাপার এই অংশটি। গড়ে উঠেছে মন-ভোলানো সেলফি স্পট। সবুজ ঢিপির ওপর থেকে কলকাতা বড়োই মনোরম। কী ভাবে সম্ভব হলো এই পটপরিবর্তন? বায়ো রিমেডিয়াস প্রক্রিয়ায় জঞ্জালের পাহাড়ের ওপর এই সবুজায়ন করা হয়েছে। উন্নতমানের জিও টেক্স টাইলস জ্যাকেটের দ্বারা ঢেকে ফেলা হয়েছে ঢিবিটিকে। এর ফলে বৃষ্টির জলে কোনো ভাবেই এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বা এখানে ধস নামবে না। তার ওপরে ঘাসের আবরণ দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে পুরসভার উদ্যোগে এখানে যদি অনুষ্ঠানের জন্য ভবন তৈরি হয়, আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না।

দূষিত জল পরিশোধন
ধাপা ডাম্পিং গ্রাউন্ডের দূষিত জল পিউরিফাইড করা হচ্ছে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে। এর জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। চারটি স্তরে এই জল পরিশোধিত হচ্ছে। এই পরিশোধনাগারটি গড়ে তুলেছে কলকাতা পুরসভা। বর্তমানে এই জল, মিথেন গ্যাসের ফলে ধাপায় যে আগুন জ্বলে ওঠে তা নেভাতে ও ধাপায় গড়ে ওঠা সবুজায়নে কাজে লাগানো হয়। অদূর ভবিষ্যতে আরো একটু অত্যাধুনিক পদ্ধতির সাহায্যে এই জল পিউরিফাইড করলে তা পানীয় জলে রূপান্তরিত হওয়াও অসম্ভব নয়।

প্রতিদিন ৫০০ মেট্রিকটন জঞ্জাল থেকে ধাপায় তৈরি হচ্ছে অর্গানিক সার
ধাপাতে প্রতিদিন ৫০০ মেট্রিকটন জঞ্জাল থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। আগত দিনে এটি ১ হাজার মেট্রিকটনের মাত্রা ছুঁয়ে যাবে। এই সার রবি শস্য, খারিফ শস্য উৎপাদনে ও চা চাষের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ৫০০ মেট্রিকটনের মধ্যে ৩০০ মেট্রিকটন পুরনো জঞ্জাল ও ২০০ মেট্রিকটন নতুন জঞ্জাল থেকে ২০ শতাংশ হারে ৪০ মেট্রিকটন সার তৈরি হচ্ছে। ৫০ কেজির প্যাকেটে এই সার বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যার দাম প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

পুরসভার এক আধিকারিক জানালেন, কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডে সেগ্রিগেশন চালু হয়ে গেলে ধাপায় জঞ্জাল ফেলার চাপ অনেক কমে যাবে, কারণ শুধুমাত্র বায়োডগ্রেবেল মেটিরিয়ালটাই তখন ধাপায় আসবে। পুরসভার আর একটি পরিকল্পনা হলো প্রসেসিং অ্যাট জেনারেশান সাইট। অর্থাৎ যেখানে উৎস সেখানেই জঞ্জাল প্রসেস করে নেওয়া। সেটিকে ল্যান্ড ফিল্ড সাইট পর্যন্ত এর ফলে আর নিয়ে আসতে হবে না।