—‘আমি মোহনবাগানে খেলবো না’
বাইরে এসে বন্ধু সুকল্যানকে বলে দিলেন সুভাষ ভৌমিক।
সত্তর সালের গোড়ার দিকের কথা। লিগ এবং শিল্ড হারানোর পর কিছুটা সম্মান পুনরুদ্ধার করেছে ইস্টবেঙ্গল। রোভার্সে মোহনবাগানকে হারিয়ে। দুটো গোল ছিল সুভাষ ভৌমিকের। রোভার্সে যাওয়ার আগেই অভিন্নহৃদয় বন্ধু সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদার বলেছিলেন, ‘সামনের বছর তুই আমার সাথে মোহনবাগানে খেলবি’। রোভার্স খেলে ফেরার পর দুই বন্ধু মিলে গেলেন ১, দেওদার স্ট্রিটে , ধীরেন দে’র বাড়ি। সুভাষ ভৌমিক ভেবেছিলেন ধীরেন দে হয়তো ওনাকে সাদরে অভ্যর্থনা করবেন, জড়িয়ে ধরবেন। কিন্তু কোথায় কি? বিরাট বসার ঘরে কাগজ পড়ছিলেন। মাথার পাকা চুল তুলে দিচ্ছিলেন লক্ষণ। সর্বক্ষণের কর্মী।
পায়ের শব্দ পেয়ে কাগজ থেকে মাথা না তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে?’
—‘আমি। সুকল্যাণ’।
—‘কি ব্যাপার?’
—‘সুভাষকে এনেছি’
—‘কে সুভাষ’?
এবার কিছুটা অপ্রতিভ হলেন সুকল্যাণ।
—‘সুভাষ মানে সুভাষ ভৌমিক। এখন তো সবাই চেনে’।
এইবার কাগজ থেকে মুখ তুলে ধীরেন দে বললেন, ‘সুভাষ নামে একজন বিখ্যাত বাঙালিকেই জানি। তিনি সুভাষ বোস। আর কেউ ওনামে আছে বলে তো জানি না’।
সুভাষ ভৌমিক তখন বছর কুড়ির তরুণ। মাথা গরম হয়ে গেল। এ কি ধরনের কথাবার্তা?
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সুকল্যাণ ফিসফিস করে সুভাষকে বললেন, ‘চুপ করে থাক। ধীরেন দা ঐরকমই’।

সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদার এবার ধীরেন দে-কে বললেন, ‘সুভাষ এসেছে। মোহনবাগানে খেলবে বলে’।
—‘তা তো খেলবেই। মোহনবাগানে না খেললে নাম করবে কি করে? ঠিক আছে তুমি মান্নার সাথে কথা বলো’।
সুভাষ ভৌমিকের মাথা থেকে তখন মোহনবাগানে খেলার ইচ্ছে চলে গেছে। বেশ রাগের সাথে সুকল্যাণকে বললেন, ‘চল চল আমার তাড়া আছে’।
এবার সুভাষ ভৌমিকের সাথে সরাসরি কথা হল ধীরেন দে’র। ‘কোথায় যাবে? ভদ্রলোকের বাড়িতে প্রথম এলে, মিষ্টিমুখ না করে কেউ যায় নাকি? সুকু, তোমার এই বন্ধু তো আদব কায়দাই জানে না। মোহনবাগানে খেলতে হলে এগুলো তো শিখতেই হবে’।
বলতে বলতে ভিতর থেকে বাড়ির মেয়েরা বড় বড় প্লেটে প্রচুর মিষ্টি এবং অন্যান্য খাবার নিয়ে হাজির হল। খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাইরে এসে সুভাষ ভৌমিক বন্ধু সুকল্যাণকে বললেন, ‘আমি মোহনবাগানে খেলব না। যে ক্লাবের সেক্রেটারির এত অহংকার সেই ক্লাবে আমি খেলব না’।
সুকল্যাণ বললেন, ‘ধুর বোকা। ধীরেনদা ঐরকমই। তুই রাগ করিস না। মানুষটার সাথে মিশে দেখবি, এ রকম লোক পাবি না’।
শেষ পর্যন্ত সেবার মোহনবাগানে খেলেছিলেন সুভাষ ভৌমিক। মোহনবাগানে সই করার আগেই একবার ঢুকতে হয়েছিল মোহনবাগান টেন্টে। চেকোশ্লোভাকিয়ার একটি দলের সাথে আই এফ এ একাদশের খেলা উপলক্ষে। তাঁবুতে ঢুকেই সুভাষ ভৌমিকের চক্ষু চড়কগাছ। সেই সময়ের ইস্টবেঙ্গল তাঁবুর তুলনায় মোহনবাগান তাঁবু ছিল স্বর্গ। শুধু দৈর্ঘে ও প্রস্থেই নয়, সাজানো, গোছানোও। দুর্লভ সব ছবি টাঙানো দেওয়ালে, বাথরুমে বাথটাব। যা সেই সময় ভাবাই যেতো না। ড্রেস করে মাঠে যাবার পথে দেখা হল ধীরেন দে’র সাথে। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন লাগল আমাদের টেন্ট? ও মাঠে এসব আছে?’
হেসে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না সুভাষ ভৌমিকের। কিছুদিন পরে মোহনবাগানে সই করলেন সুভাষ ভৌমিক। ধীরে ধীরে পরিচয় হতে লাগল। তখনও সচিব হননি ধীরেন দে। কিন্তু তিনিই সব। কিছুদিনের মধ্যে বুঝতে পারলেন মোহনবাগানই তাঁর কাছে সব। ধীরেন দে ঘুম থেকে ওঠেন মোহনবাগানের কথা ভাবতে ভাবতে। শুতে যান মোহনবাগানের কথা ভাবতে ভাবতে। তাঁর শয়ণে, স্বপনে, জাগরণে শুধুই মোহনবাগান। মোহনবাগানে কাজে দেবে না এমন লোকের সাথে তিনি ভাল করে কথা বলার প্রয়োজন মনে করতেন না। আর যিনি মোহনবাগানের পক্ষে দরকারি তাঁর ছিল জামাই আদর। তাঁর সব আব্দার মেনে নিতেন। প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে পড়তেন মোহনবাগানের খেলা থাকলে। অফিস থেকে বেরিয়ে আউটরাম ঘাটে পায়চারি করতেন। টিম তিন চার গোল করে ফেলেছে শুনলে মাঠে আসতেন। খেলা না দেখলেও মাঠে আসতেন নিয়মিত। খুঁটিনাটি সব ব্যাপারেই নজর ছিল। দক্ষ প্রশাসক বলতে যা বোঝায়। ময়দানে মোহনবাগান মাঠেই একমাত্র কংক্রিটের গ্যালারি, মোহনবাগান মাঠেই প্রথম বসেছিল ফ্লাডলাইট। কৃতিত্বটা তারই। মোহনবাগান টেন্ট বর্তমান জায়গার আনার কৃতিত্বও তাঁরই।

সুকল্যাণ ঘোষদস্তিদার, সুভাষ ভৌমিক
দোষ কি ছিল না তাঁর? ছিল। ক্লাবের স্বার্থেই করতে হত তাঁকে। যেমন কোনও প্লেয়ার টাকা চাইলে ফোন তুলে ডায়াল না ঘুরিয়ে বলে দিতেন, ‘শিবু, অমুক যাচ্ছে। ওকে টাকা দিয়ে দাও’। শিবু ছিল অফিসের কর্মী। প্লেয়ার বেচারা বুঝতে পারত না ওভাবে ফোনে কথা বলা যায় না। সত্তর থেকে বাহাত্তর কোনও টাকা না নিয়েই মোহনবাগানে খেলেছিলেন সুভাষ ভৌমিক। কিন্তু যখুনি টাকার দরকার পড়েছে চেয়েছেন তাঁর কাছে। পেয়েওছেন। একবার রোভার্স চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরেছে মোহনবাগান। এবার দল দিল্লি যাবে। দলের সাথে গেলেন না সুভাষ ভৌমিক। দু-দিন কলকাতায় ঘুরে যাবার পরিকল্পনা। ধীরেন দে’র বাড়ি গেছেন দেখা করতে। একচোট ধমক দিলেন দলের সাথে না যাওয়ার জন্য। তারপর আলমারি খুলে দামি পুলওভার বের করে বললেন, ‘এটা নিয়ে যাও। দিল্লিতে ঠাণ্ডায় কষ্ট পাবে নাহলে’।
প্লেয়ারদের দেখভালের দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে রাখতেন না। ছেড়ে দিতেন প্রাক্তন প্লেয়ারদের উপর। শৈলেন মান্না, করুণা ভট্টাচার্য, রুনু গুহঠাকুরতা, সুশীল গুহ, চুনী গোস্বামীদের এইভাবেই মোহনবাগান ক্লাবের সাথে একাত্ম করে নিয়েছিলেন তিনি।
টিম হারলে ধীরেন দে মাঠে আসতেন না। জিতলে যে বিরাট মাতামাতি করেন তাও না। সত্তর দশকের শুরুর ব্যর্থতার সময়েও তাঁকে কেউ আসন থেকে টলাতে পারেনি। নিজে হাল ধরে আবার সুদিন ফিরিয়ে এনেছিলেন।
মোহনবাগানের সর্বময় কর্তা হলেও দীর্ঘদিন সচিব পদে বসতে চাননি। সহসচিব ছিলেন। বলতেন মোহনবাগানের মতো ক্লাবের সচিবের পদে বসার যোগ্য লোক হলেন বড় ব্যারিস্টার বা বড় ডাক্তাররা। প্ল্যাটিনাম জুবিলির সমারোহ তাঁর জন্যই। তখনও তিনি সহসচিব। সচিব ছিলেন এস এম বসু। সত্তরের দশকের শেষদিকে এসে সচিব হন তিনি।
ধীরেন দে, দেজ মেডিকেলের কর্ণাধার দীর্ঘদিন মোহনবাগানের পরিচালকের ভূমিকায় ছিলেন।
সূত্র : মোহনবাগান লাইব্রেরি