আজ দিব্যেন্দু পালিতের জন্মদিন। ১৯৩৯-এ দূর পশ্চিমের শহর ভাগলপুরে দিব্যেন্দু পালিতের জন্ম। ভাগলপুর বহু কৃতি ও শ্রেষ্ঠ মানুষের বাসস্থান ছিল একসময়। বিভূতিভূষণ ভাগলপুরেই গঙ্গাতীরে বড় বাসায় থাকতেন। ওখানে বসেই লিখেছিলেন পথের পাঁচালি। ভাগলপুরে থেকেই তিনি খেলাত ঘোষ মশায়দের জমিদারির নায়েবি করতেন। এদিকের জমি বন্দোবস্তর অভিজ্ঞতাই তাঁকে দিয়ে আরণ্যক লিখিয়ে নেয়। ওই দ্যাখো শরৎচন্দ্রের মামার বাড়ি, এইটা সেই বাংলা স্কুল যেখানে শরৎবাবু পড়তেন। এই হল বনফুলের বাড়ি। তাঁকে আমি জেঠামশায় বলতাম। আরো কত কী আমাদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন দিব্যেন্দুদা। দূরপশ্চিমের এই শহর থেকে গল্প পাঠিয়েছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয়তে। ১৯৫৫-র ৩০শে জানুয়ারি ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে সেই গল্প, ছন্দপতন, ছাপা হয়েছিল। শুনলে কেমন রূপকথার মতো লাগে যেন।
পিতৃ বিয়োগের পর ভাগ্যান্বষণে তিনি কলকাতায় আসেন। অভাবী যুবকের মনে লেখার বাসনা আর মা ভাইবোনদের জন্য ভাবনা, হাতে কানাকড়ি নেই, শিয়ালদা স্টেশনে না খেয়ে দিন কেটেছে, অন্ধ হতে হতে বুদ্ধদেব বসুর স্নেহময়তা তাঁর চোখ ফিরিয়ে দিয়েছিল — কত কথা শুনেছি এই আত্মমগ্ন মানুষটির কাছ থেকে। জীবন গেছে নির্মম সত্যকে স্পর্শ করতে করতে। তিনি আদ্যন্ত নাগরিক মননের লেখক। আর তিনি মধ্যবিত্তকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন এমন এক আয়নার সামনে যে আয়নায় সে তার অন্তরাত্মা দেখে মুখ নিচু করে থাকে। তাঁর কন্ঠস্বর উঁচু নয়। নিম্নস্বরে কথা বলা তার গল্প থেকে শেখা যায়। যিনি দেখেছেন অনেক, তাঁকে উঁচু গলায় কথা বলতে হয় না। অনুচ্চ কন্ঠস্বর যে কত তীব্র হতে পারে, মিতভাষণ যে কত কঠিন সত্যকে উচ্চারণ করতে পারে, তা দিব্যেন্দু পালিতের গল্প আর উপন্যাস পড়লে শেখা যায়। নগর সভ্যতা মানুষের মনের যে জটিলতা যে অসহায়তা যে নিরূপায়তাকে ধারণ করে তা দিব্যেন্দু পালিতের গল্প আর উপন্যাসে রয়ে গেছে। সহযোদ্ধা, আমরা, অনুভব, ঘরবাড়ি, সোনালী জীবন, ঢেউ-এর মতো উপন্যাস আর জেটল্যাগ, গাভাসকার, হিন্দু, জাতীয় পতাকা, ত্রাতা, ব্রাজিল, আলমের নিজের বাড়ি, মাইন নদীর জল, মুখগুলি, গাঢ় নিরুদ্দেশে — গল্পের পর গল্পের কথা মনে পড়ে। আমি পঁচিশ বছরেরও আগে প্রকাশিত তাঁর মুখগুলি গল্পটির কথা বলছি।
দিব্যেন্দুদার সঙ্গে প্রথম পরিচয় আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয়র ঘরে। সম্পাদক রমাপদ চৌধুরী। দুজনেই খুব গম্ভীর মানুষ। আমাকে বললেন, পড়েছি লেখা, ভালো। এই পর্যন্ত। রমাপদ চৌধুরীর ঘরে যে-আড্ডা হতো তা ছিল শুধুই সাহিত্যের। আমি চুপ করে অগ্রজ বড় লেখকদের কথা শুনতাম। অনুধাবন করতে চাইতাম তাঁদের কথা। কথা শুনতে শুনতে শেখা। দিব্যেন্দুদা আলব্যের কামু ও ফ্রান্জ কাফকার কথা বলতেন। আউটসাইডার, প্লেগ, মেটামরফোসিসের কথা বললেন একদিন। তিনি অনুজপ্রতিম তরুণ লেখকদের বলতেন, বিশ্বসাহিত্য বদলে দিয়েছেন এই দুই লেখক, এঁদের পড়ো। পড়েছি তখন, খুব বেশি নয়, সামান্য; কিন্তু সামান্য পড়ে কথা বলার চেয়ে শোনাই ভালো। ১৯৮২-৮৩ হবে। তাঁর ঘরবাড়ি উপন্যাসটি বেরিয়েছে তখন। একটি আত্মহত্যার কাহিনি ছিল তা। বহুতল থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল বধূটি। পড়ে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। এরপর পড়ি ঢেউ। তারপর সহযোদ্ধা। সহযোদ্ধা আগেই লেখা, পরে পড়া। যা লিখেছেন এই কলকাতাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সে-লেখা কখনোই নিরুপায় মানুষকে বাদ দিয়ে নয়। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাগলপুর নিয়ে লেখেননি কেন কোনো উপন্যাস? হেসেছিলেন। জবাব দেননি। ভাগলপুরে জন্ম। কলকাতায় এসেছিলেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। লেখক হবেন।
কোনো কোনো গল্প পাঠকের হৃদয়কে এমন ভাবে ছুঁয়ে যায় যে সে ভোলে না ভোলেনা কিছুতেই। আর দিব্যেন্দু পালিত যেন সময় থেকে সব সময়ই এগিয়ে ছিলেন কয়েক পা। ‘মুখগুলি’ গল্প যখন বেরোয়, তখন কিন্তু ওল্ড এজ হোমের ধারণা তেমন স্বচ্ছ ছিল না আমাদের কাছে। সবে তা আসছে এই শহরে, শহরতলীতে। মা গেলেন ওল্ড এজ হোমে। বাবার মৃত্যুর পর মা তাঁর ছেলে মেয়েদের ভিতরে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন একটু একটু করে। ভাগ হয়ে কখনো বালিগঞ্জ, কখনো ভবানীপুর, কখনো বাগবাজার কখনো রিষড়ায় ঘুরে ঘুরে আশ্রয় পায়। কিন্তু তারপর ও মা হয়ে যাচ্ছিলেন ভার। মায়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছিল যে তা টের পেয়েছিল তাঁর পুত্র কন্যারা। তাই গোল টেবিলে বিচার হয়ে গিয়েছিল মা সুধার। সুধা ওল্ড এজ হোমে যাবেন। মা সুধা কোনো অনুযোগ করেন নি। গভীর রাতে দিবাকরের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, সে মায়ের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি কুঁকড়ে শুয়ে আছে মা। মিলিত সিদ্ধান্তে মা সকাল হলে চলে যাবে। মা গিয়েছিল। মাকে সেখানে রেখে দিয়ে আসতে পেরে সবাই নিশ্চিন্ত। দিবাকর মাকে কিছু খাম পোস্ট কার্ড আর ড্রাইভারের কাছ থেকে চেয়ে তার সস্তার ডট পেনটি দিয়ে এসেছিল। সুধা চিঠি লিখবে। সুধার চিঠি আসে। সেই চিঠির কথা দিয়েই গল্প আরম্ভ। পরম কল্যাণীয় স্নেহের বাবা দিবাকর…, মা সকলের কুশল জানতে চেয়েছে, নাতি, নাতনি, বৌমা। মা খবর দিয়েছে হোমের কৌশল্যাদি নামের একজন মারা গেছে। তাঁর ছেলে থাকে বিলেতে, মেয়ে বাচ্চা হবার জন্য হাসপাতালে। কেউ আসেনি। হোমের ওরাই তাকে কালো গাড়ি করে শ্মশানে নিয়ে গেছে। মা খবর দিয়েছে, রানি পরমেশ, মেয়ে জামাই, তাকে দেখতে এসেছিল। কমলালেবু আর আপেল এনেছিল। ছোট ছেলে ভাস্কর এসেছিল মাকে দেখতে। মায়ের ওল্ড এজ হোমে আর এক কন্যার চিঠি এসেছে। মা সেখানে বসেই বড়ছেলে দিবাকরকে অনুনয় করে, ছোটছেলে ভাস্করকে একটা ভাল চাকরি জুটিয়ে দেওয়ার জন্য। মায়ের চিঠি পড়েই ধরা যায় মা ভাল আছে। হোমে সকলেই গিয়ে যোগাযোগ রাখছে মায়ের সঙ্গে আগের চেয়ে বেশিই। দিবাকর গিয়েছিল হোমে মাকে দেখতে। সারি সারি বেতের চেয়ারে বসে আছেন যাঁরা বেশিরভাগই বৃদ্ধা। বৃদ্ধও আছেন দু-একজনা। তাদের একজনকে মা বলে ভুল করেছিল দিবাকর। পরে ভুল ভাঙল। মায়ের ভিজিটর হয়ে সে বসেছিল ভিজিটরস রুমে। মায়ের সঙ্গে তার যে তেমন কোনো কথা ছিল না তা টের পেয়েছিল দিবাকর। মা বলেছিল, ‘খুব ভাল আছি আমি, আমার জন্য ভাবিস নে’।
দিব্যেন্দু পালিতের এই গল্প ক্রমশ ডুবিয়ে নিতে থাকে আমাকে তাঁর মগ্নতায়। মায়ের সঙ্গে বেশি কথা বলতে পারে না দিবাকর। মায়ের অনেক জিজ্ঞাসা, হুঁ, হাঁ করে উত্তর দিয়েই সে হোম ছেড়ে আসে। কদিন আগে কারা যেন মাকে কমলালেবু আপেল দিয়ে এসেছে। দিবাকর তাই কিছু নিয়ে যায় নি। মা একা আর কত খাবে। ফলগুলো পচবে। মায়ের চিঠি আবার আসে। এই চিঠিতেও হোমের আর একজনের মৃত্যু সংবাদ, গিরীনবাবু মারা গেছেন। অজ্ঞান হয়ে আর জ্ঞান ফেরেনি। তাই দেখে চারুদি এসে খুব কাঁদল। দুজনে একই দিনে এসেছিল হোমে। একদিন দিবাকরের স্ত্রী বিনীতা দিবাকরকে বলল, তার শাশুড়ির বোধ হয় মাথা খারাপ হয়েছে। কেননা চিঠিতে যা লেখে তার অনেকটাই বানানো। রানি পরমেশ যায়ই নি হোমে মাকে দেখতে। তারাই ফোন করে জানতে চাইল বিনীতার কাছে, মা কেমন আছে। দিবাকরের মনে হয় চিঠির জোগান আছে বলেই মা লেখে। ওই সব লেখে। লিন্তু বানিয়ে লিখবে কেন? কমলালেবু আপেল চমচম নিয়ে প্রিয়জনরা যাবে আশা করে মানুষ। মানুষই শ্মশানে যায়, মানুষের অভাবে মানুষই কাঁদে। মায়ের চিঠির কিছুটা সত্য। আর কিছুটা মায়ের বাসনা ছিল সত্য। দিবাকরের মনে হয় খাম পোস্ট কার্ড আর দেবে না মাকে। চিঠিগুলোই ফ্যাঁসাদ। মা পড়ে আছেন হোমে।
দুপুরে বিনীতার ফোন এসেছিল অফিসে দিবাকরের কাছে। হোম থেকে বাড়িতে যোগাযোগ করেছিল। রানি চলে এসেছে তাদের ফ্ল্যাটে, পরমেশ ফোন পেয়ে হোমে দৌড়েছে। বিনীতাও যাচ্ছে হোমে। দিবাকরকে যেতে বলল। ভাস্কর এল দিবাকরের কাছে। ভাস্কর যায় নি মায়ের হোমে কোনোদিনও। তার দেয় টাকাটাও সে পাঠিয়েছিল অফিস পিওনের হাত দিয়ে। অথচ মা জানিয়েছিল ভাস্কর গেছে।
গল্প তো এই। গল্পের দিবাকর, ভাস্কররা হোমের দিকে যেতে থাকে। সেখানে পরমেশ দাঁড়িয়ে আছে গেটের মুখে। উদাসীন ভঙ্গীতে সিগারেট টানছে সে। বলল, দুপুরের খাবার পর বুকে পেন হয়েছিল তারপর…। এই গল্পে যেন দিবাকরও এক নিরূপায় মানুষ। মা নিরূপায় হয়েও সব কিছু মেনে নিয়েছে। ছেলেদের কথা ভেবেছে, পুত্র কন্যাদের নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করেছে। আড়াল করে নিজের কল্পিত সুখ আহরণ করেছে। গল্পটি যতবার পড়ি আর্দ্র হয়ে পড়ি। গল্পের মুখগুলি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ভেসে ওঠে সারি সারি বেতের চেয়ার, অস্পষ্ট মুখগুলি তাকিয়ে আছে গেটের দিকে। গেট পেরিয়ে রাস্তা। ধুলো উড়লে মেঘ ঘনাত, সন্ধে হত তাড়াতাড়ি। ওখান থেকে মায়ের মুখটি মুছে গেছে আজ। এই গল্প আমার স্মৃতি থেকে মুছবে না এক বিন্দুও। এখন খুব মনে পড়ে তাঁর কথা। কলকাতা নগরে প্রেম করতে করতে বুড়ো হয়ে যায় এমন যুবক-যুবতীর আখ্যান, শুধু ঘর নেই, তেমন আয় নেই, পরিবারের দায় শেষ করে তারা মিলতে পারে না।
মৃত্যুকে অমান্য করবে কে? কিন্তু লেখকের তো মৃত্যু নেই। দিব্যেন্দুদা আপনাকে বারবার পড়া হবে। আপনি সহযোদ্ধাই ছিলেন আমাদের। সহযোদ্ধার প্রয়াণ হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধটা তো শেষ হয়নি। দিব্যেন্দুদা থাকবেন আমাদের সাহিত্যে।