তিনিই চেয়েছিলেন পরিবর্তন, বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ পদ থেকে অপসারিত হয়ে এমনটা জানালেও মেয়াদ ফুরনোর অনেক আগেই তাঁকে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি পদে বসানো হয়েছে। পরিবর্তে রাজ্য সভাপতি করা হয়েছে ড. সুকান্ত মজুমদারকে। জানা গিয়েছে খুব শীঘ্রই রাজ্য এবং জেলা কমিটিতেও ঘটতে চলেছে বদল৷ ইতিমধ্যেই তা নিয়ে চর্চ্চাও শুরু হয়েছে বিজেপির অন্দরে৷
সোমবারই দিলীপ ঘোষ তাঁর দলের রাজ্য সভাপতির পদটি খুইয়েছেন। যদিও রাজ্য থেকে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির পদে বসানো হয়েছে তাঁকে। কিন্তু রাজনৈতিক মহল মনে করছে, একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখার পর থেকে পদ্ম শিবিরে যে ভাঙন শুরু হয়েছিল তার স্রোত যেন প্রতিদিন বাড়ছে। ভাঙন কেবল রাজ্যস্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, পাশাপাশি জেলাস্তরেও বিজেপির ঘর ভাঙছে। বিজেপির ছোট-বড় বহু নেতা-কর্মীই পদ্ম শিবিড় ছেড়ে চলে যাচ্ছেন জোড়াফুলে। অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষের কথাবার্তা নিয়েও দলের একাংশ কিছুকাল ধরেই ‘আপত্তি’ তুলেছিলেন। তাঁদের অনেকের মতে, দিলীপ ঘোষের একের পর এক বক্তব্যে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই এরাজ্যে বিজেপি এখনও পর্যন্ত শিক্ষিত সমাজের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হয়নি।
প্রসঙ্গত একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই রাজ্য তথা জেলায় জেলায় বিজেপির অন্দরেই গড়ে উঠেছিল দুটি সমান্তরাল গোষ্ঠী৷ রাজনৈতিক বিশেষংগদের মতে, দিলীপ ঘোষের রাজ্য সভাপতির পদের আয়ু ছিল আরও কয়েক মাস। তার আগেই জেলার একটা অংশের বহু কর্মীরাই ধীরে ধীরে হলেও গেরুয়া শিবির ছাড়তে শুরু করেছিল৷ কেউ কেউ আবার অবস্থা বুঝে মধ্যপন্থী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন৷ এবার হয়ত সেই অংশ সক্রিয় হয়ে উঠবে বলেই মনে করা হচ্ছে৷
কারণ রাজনীতিতে আনুগত্য চিরকালীন নয়। প্রত্যেকেই সব থেকে আগে নিজের ভালটা বুঝে নিতে চায়৷ ফলে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে কট্টর দিলীপ ঘোষপন্থী কাল অন্য কারও প্রিয় পাত্র হয়ে উঠবেন না৷ মোদী-শাহের ঘনিষ্টবৃত্তে থাকা বাবুল সুপ্রিয় বুঝিয়ে দেয় যে রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছুই হয় না৷ সবটাই সম্ভবনাময়৷ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, বিজেপির সাংগঠিক যে নিয়মনীতি তাতে আর মাত্র কয়েক মাস পরে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে তাঁকে সরে যেতে হতোই৷ তাহলে কেন এত তাড়াহুড়ো করে রদবদল? আর ঘটনাটি ঘটানো হল এমন একটা সময় যার ২৪ ঘণ্টা আগে মোদী-শাহের ঘনিষ্ঠবৃত্তে থাকা বাংলার তরুণ নেতা বাবুল সুপ্রিয় জার্সি বদল করে ফেললেন। অবশ্য তিনি মন্ত্রিত্ব খোয়ানোর পর থেকেই গেরুয়া শিবির থেকে অনেকটাই দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। তাছাড়া তাঁর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করাটা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদ থেকে দিলীপ ঘোষকে সময়ের আগে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে চর্চা চলছে দিলীপ ঘোষ অনুগামীদের মধ্যে৷ কেউ বলছেন, দিলুদা কিন্তু খড়গপুরের চাচা, জ্ঞানসিং সোহন পালের মতো কংগ্রেসের অপরাজেয় বিধায়ককে হারিয়েই বিধানসভার অলিন্দে প্রবেশ করেছিলেন৷ পরে মেদিনীপুর থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন সিপিআইয়ের পৈত্রিক সম্পত্তিতে পরিণত হওয়া মেদিনীপুরের সাংসদ আসনটি৷ আবার এইসব মতামতের পাল্টা মতও উঠে আসছে দিলীপ ঘোষের বিরোধী শিবির থেকে। তাদের কেউ বলছেন, কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছেন, সেটা স্মৃতি হতে পারে, বাস্তব নয়৷
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা মনে করছেন, বালুরঘাটের বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদারকে রাজ্য সভাপতির পদে বসিয়ে বিজেপি একই সঙ্গে দুটি বার্তা সামনে আনলেন। প্রথমত, একুশের ভোটে দক্ষিণের তুলনায় উত্তর ভাল ফল করেছে৷ সেদিক থেকে উত্তরবঙ্গে দলকে আরও সুসংবদ্ধ করার বার্তা দেওয়া পাশাপাশি বয়সে তরুণ, শান্ত স্বভাবের সুকান্ত যার সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর কোনও বিরোধ নেই৷ যে দলের ভিতর ঐক্যবদ্ধ পরিবেশ রক্ষা করতে পারবে। তাই তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত বলে দলেরই একটি অংশের অভিমত৷
এছারাও সুকান্ত মজুমদারকে রাজ্য সভাপতি করে বিজেপি বুঝিয়ে দিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরে বাড়তি নজর থাকবে গেরুয়া শিবিরের। এক অর্থে সুকান্তই প্রথম উত্তরবঙ্গ থেকে রাজ্য সভাপতি। তপন শিকদার আদতে মালদহের হলেও তাঁর রাজনীতি ছিল কলকাতা-নির্ভর। পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্যের প্রতিশ্রুতি বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে না থাকলেও কিন্তু ভোটের পরে পরেই সেই দাবি তুলে দেন দলের সাংসদ জন বার্লা। পরে তিনিই নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। উত্তরবঙ্গকে বিজেপি আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে, তাই একা বার্লা নন, মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিকও। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে কোচবিহারে পাঁচটি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল বিজেপি। সেখানে এ বার বিধানসভায় তারা জিতেছে ছ’টিতে। অতিরিক্ত জয়টি এসেছে সিআরপিএফের বুলেট-দীর্ণ শীতলখুচি আসনে।
উত্তরবঙ্গকে বেশি গুরুত্ব দিতে আরও দু-জনকে বিজেপি পুরস্কৃত করেছে। প্রথম জন দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তাকে সম্প্রতি বিজেপি যুব মোর্চার সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। তুফানগঞ্জের বিধায়ক মালতি রাভা রায়কে করা হয়েছে মহিলা মোর্চার সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি। উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্রীয় বিজেপি বেশি গুরুত্ব দিতে ইংরেজবাজারের বিধায়ক শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরীকে মহিলা মোর্চার সর্বভারতীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বার রাজ্য সভাপতিও করা হল উত্তরবঙ্গ থেকেই। দিলীপ ঘোষকে তাই সরে যেতে হয়েছে। উত্তরকে ছেড়ে দিতে হয়েছে জায়গা।