পেশওয়ারের ফল ব্যবসায়ীর ছেলে ইউসুফ খান সিনেমার শুটিং দেখতে প্রায়ই বোম্বে যেতেন। সেখানেই সুদর্শন ইউসুফ দেবিকা রাণীর চোখে পড়েন। দেবিকা রাণী তখন ভারতীয় সিনেমা সাম্রাজ্যের রাণী। তিনি নিজেই ইউসুফকে ডেকে কথা বলেন। তাঁর কাছে জানতে চান যে তিনি উর্দু বলতে পারেন কি-না। যখনি ইউসুফ জানালেন যে হ্যাঁ পারেন; তারপরেই দেবিকা রাণীর প্রশ্নই ছিলো তুমি অভিনেতা হতে চাও?
পাত্র পছন্দ হলেও কিন্তু দেবিকা রাণীর মনে হয়েছিল রোমান্টিক হিরোর নাম ইউসুফ খান নামটি একেবারেই মানানসই হবে না। তখন হিন্দি কবি নরেন্দ্র শর্মা বোম্বে টকিজে কাজ করতেন। দেবিকা রাণীর অনুরোধে তিনি তিনটি নাম প্রস্তাব করেন- জাহাঙ্গীর, ভাসুদেব ও দিলীপ কুমার। ইউসুফ খান নিজের জন্য ওই তিনটির মধ্যে দিলীপ কুমার নামটিই পছন্দ করেন। নিজের নাম বদলে ইউসুফের কোনও আপত্তি ছিল না কারণ, তার রক্ষণশীল বাবা তার এই নতুন পেশার কথা যেন না জানতে পারেন। যদিও খুব অল্প দিনের মধ্যেই সেটা ফাঁস হয়ে যায়। আর দিলীপ কুমার আর ইউসুফ খান যে একই লোক সেটাও তিনিজানতে পারেন। কিন্তু ঘটনা হলো পুরো অভিনয় জীবনে দিলীপ কুমার একবারই মাত্র মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলেন; ‘মুঘল-ই-আজম’ ছবিতে।
সুদীর্ঘ ছয় দশকের অভিনয় জীবন কিন্তু মাত্র ৬৩টি ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। প্রতিটি ছবিতে তিনি নিজেকে কেবল সম্পূর্ণভাবে অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন তাই নয়, তার অভিনয় যে সমসাময়িক অভিনেতাদের থেকে পুরোপুরি আলাদা সেটাও প্রমান করেছিলেন। গত শতকের চারের দশকে দিলীপ কুমার যখন বম্বের সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন তখনকার অধবিকাংশ অভিনেতার অভিনয় রীতি ছিল অত্যন্ত লাউড এবং মেলোড্রামাটিক।সেই ধারা কিন্তু আজও কম বেশি রয়ে গিয়েছে। এই ‘লাউড অ্যাক্টিং’ স্টাইলে অভিনয় আসলে পার্সি থিয়েটারের প্রভাব, যেখান থেকে ভারতীয় সিনেমার পথ চলা শুরু। কিন্তু দিলীপ কুমার শুরু থেকেই সেই রাস্তায় না হেঁটে চরিত্রের মধ্যে ঢুকে নিচু স্বরে পরিশীলিত ভঙ্গীতে যেভাবে সংলাপ উচ্চারণ করতেন তা দর্শকদের হৃদয় স্পর্ষ করতো।

‘কোহিনূর’ ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্রের জন্য, যেখানে একটি গানে তাকে সেতার বাজাতে হয় সেই চরিত্রটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে তিনি ওস্তাদ আব্দুল হালিম জাফর খানের কাছে কয়েক বছর সেতার শিখেছিলেন। ‘নয়াদৌড়’ ছবিতে তাঁকে টাঙা(ঘোড়ার গাড়ি) চালাতে হয়েছিল তার জন্য তিনি টাঙা চালকদের কাছে টাঙা চালানো শিখেছিলেন। সত্যজিৎ রায় দিলীপ কুমার সম্পর্কে বলেছিলেন ‘মেথড অ্যাক্টর’ অর্থাৎ যিনি চরিত্রে অভিনয় করেন তার সঙ্গে মিশে যান। হিন্দি সিনেমা দুনিয়ার ট্রাজেডি কিং দিলীপ কুমার অনেক ছবির চরিত্রে অভিনয় করেছেন যেখানে সেই চরিত্র মারা গিয়েছে। সেই সব ছবিতে তিনি তাঁর মৃত্যুকে বাস্তবিক ও গ্রহণযোগ্য করে ফুটিয়ে তুলতে অনবদ্য অভিনয় করেছেন। একটা সময় ছিলো যখন মৃত্যুর দৃশ্য অভিনয় করতে গিয়ে তিনি বিষন্ন হয়ে পড়তেন। একটা সময় তাঁকে লন্ডন গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছিলো।
একথা তো ঠিকই তাঁর সময়ে রাজ কাপুর, দেব আনন্দও ছিলেন সুপার স্টার। কিন্তু রাজ কাপুরের রোল মডেল ছিল চার্লি চ্যাপলিন আর দেব আনন্দ কখনো গ্রেগরি পেকের প্রভাব থেকে বেরুতে পারেননি। শুধু তাই নয়, দিলীপ কুমারের মতো বহুমাত্রিক অভিনয় দক্ষতা রাজ কাপুর, দেব আনন্দের ছিল না। ‘গঙ্গা যমুনা’-র গ্রামীণ চরিত্রে দিলীপ কুমারের অভিনয় যেমন সাবলীল ‘মুঘল-ই-আজম’-এর প্রিন্স সালিমের চরিত্রেও তিনি ছাপিয়ে যান।
দিলীপ কুমারই প্রথম নায়ক যিনি মুম্বাই সিনেমায় শুরু থেকেই অভিনয় করতেন খুব নীচু স্বরে। তাঁর আগে তো বটেই পরবর্তীতেও অধিকাংশ নায়করা এমনকি অভিনেতারাও তাদের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে প্রায় চিৎকার না হলেও খুব জোরে সংলাপ ছুঁড়ে দিতেই অভ্যস্ত ছিলেন। মনে হত তারা তিনদিক খোলা মঞ্চে অভিনয় করছেন। অনেক দূরের দর্শক যাতে তার কথা শুনতে পান, তাছাড়া চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতেও নাটকীয়তার আশ্রয় নিতেন। নাটকীয় ভঙ্গীমায় সংলাপ উচ্চারণের পাশাপাশি অভিব্যক্তিতেও প্রকাশ পেত চড়া মেজাজ। দিলীপ কুমার সে যুগেও এই মেলোড্রামা থেকে নিজেকে সরিয়ে এনেছিলেন। যে কোনও চরিত্র- রোমান্টিক হিরো থেকে গ্রামের কৃষককে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে হাজির করতে তিনি নিজস্ব স্টাইলেই চলাফেরা করতেন এবং কথা বলতেন।
অশোক কুমারের পর হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকা তিনি। তিনি বলিউডের ট্র্যাজেডি কিং। হিন্দি ছবিতে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দিলীপ কুমারের কোনও বিকল্প ছিল না। হিন্দি সিনেমার স্বর্ণালী যুগের নায়িকা নার্গিস, মধুবালা, নিম্মি, বৈজয়ন্তীমালা, মীনা কুমারী, ওয়াহিদা রেহমান- সবাই দিলীপ কুমারের সঙ্গে অভিনয় করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন।
কেবল যে হিন্দি সিনেমার ইতিহাসেই নয়, দিলীপ কুমারের অভিনয় জীবনের আলোচিত ছবির একটি হল কমরুদ্দিন আসিফের মুঘল-ই-আজম। সম্রাট জাহাঙ্গীর ওরফে প্রিন্স সেলিমের চরিত্রে দিলীপ কুমার দুর্দান্ত অভিনয়ের পর বৃটিশ পরিচালক ডেভিড লিয়েন তাঁকে লরেন্স অব অ্যারাবিয়া ছবিতে শেরিফ আলীর চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু দিলীপ কুমার তা ফিরিয়ে দেন।
দিলীপকুমার নিচু স্বরে সংলাপ বলতেন, এটা যথার্থ উল্লেখ। পৃথ্বীরাজ কাপুরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর অভিনয়টা দেখলেই সব স্পষ্ট হয়ে যায়। দুটো দুই ধারার অভিনয়। একসময় স্টেজ অ্যাকটিংয়ের ধারাটা ফিল্মে বসে গিয়েছিল। দিলীপকুমার, রাজকাপুররা সেখান থেকে অভিনয়কে অন্য ধারায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে আমি আরো একজনকে এই বন্ধনীতে রাখার পক্ষপাতী। তিনি হলেন বলরাজ সাহানি। মঞ্চের এবং ছবির অভিনয়কে তিনি কখনো মিশিয়ে ফেলেননি। চলচ্চিত্রে আধুনিক অভিনয়ের ধারায় বলরাজজির অবদান অনেক। বিশেষ করে সাতের দশকের নিউ ওয়েভ মুভমেন্টের অভিনয় ধারা তাঁকেই অনুসরণ করেছে।
দিলীপ কুমারের প্রথম দিকের কয়েকটি ছবি ব্যবসাসফল ছিল না। ‘মুঘল এ আজম’ দিলীপ কুমারের ক্যারিয়ারের মোড়
ঘুরিয়ে দেয়। শুরুর দিকেই ‘ট্র্যাজিক হিরো’ তকমা জুটে গিয়েছিল দিলীপ কুমারের, কিন্তু পরের সিনেমাগুলোতে কমেডিতেও তিনি কম যাননি।
খুব ভালো লাগলো লেখাটি।
সাগিনা মাহাতো তে ওঁর অনবদ্য অভিনয় এখন ও চোখে লেগে আছে। সুন্দর প্রতিবেদন।
উনি কি লিপও খুব ভালো দিতেন? সেইজন্যই ‘দি লিপকুমার’?