আবিভক্ত দিনাজপুর
মোটামুটি পুরনো বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন হিসেবে যে অঞ্চলটি আমরা জানি সেটির একটি অংশ হল দিনাজপুর। বাংলার পুরনো যে কটি জনপদ রয়েছে, যার জন্য বাংলা আজ গর্ব করতে পারে, তা হল পুণ্ড্রবর্ধন আজকের দিনাজপুর। একদা কালিদাসের বিরহী যক্ষ যখন উড়ে যাচ্ছিল মেঘের রূপ ধরে তখন এই বাংলায় দেখেছিল মেয়েরা আখের রস বার করে সেই রসের গুড় জাল দিচ্ছে সেই গুড়ের নামে গৌড়ি যদিও, কিন্তু এই আখকে সারা ভারত আজও যে নামে চেনে, সেটি হল পুণ্ডী আখ। বিপুলাকৃতি সব দিঘী রয়েছে এএ জেলায়। রায়গঞ্জের সাংবাদিক সুনীল চন্দ বলেছিলেন, রাজবংশী শব্দভাণ্ডারে ইটা শব্দের অর্থ দীঘি আর হার মানে মালা। গোটা দিনাজপুর জুড়ে বিপুলা সব দিঘী। স্থানীয় মানুষেরা ৪০-৫০ বিঘার জলা ভূমিকে দিঘী বলেন না। এই এলাকাই পাল পাজ বংশের এলাকা। এখানেই রয়েছে মহীপাল দিঘী। কিচ্ছু নেই, একটি ঘাট আর কচুরিপানাওয়ালা একটি মস্ত জলাশয় ছাড়া, কিন্তু এখানেই ঘটেছিল পাল রাজাদের আমলে কৈবর্ত বিদ্রোহ – ভীম আর দিব্যোক লড়ে হেরেছিলেন পাল রাজবংশের কাছে।
প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন ছিল উত্তরবঙ্গ তথা বাংলার এক প্রাচীন নগরী। শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে এই নগরী প্রাচীন বিদিশা ও শ্রাবস্তীর চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না। করতোয়া নদীর তীরবর্ত্তী এই নগরীর তীর্থ মাহাত্ম্য ছিল। পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এই নগরীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অধুনা বাংলাদেশের বগুড়ার নিকটবর্তী মহাস্থানগড়ই ছিল এই সুপ্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন নগরী। কোটিবর্ষ ছিল প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত প্রসিদ্ধ নগর। এই কোটিবর্ষেরই অন্য নাম ‘বানগড়’। বর্তমানে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলর পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী গঙ্গারামপুর থানার (বর্তমানে গঙ্গারামপুর একটি মহকুমা) বানগড়ই সেই প্রাচীন কোটিবর্ষ। মুসলমান শাসনকালে এর পরিচিতি ছিল ‘দেবীকোট’ নামে। সুপ্রাচীন কোটিবর্ষের শিক্ষা, সাহিত্য, কৃষ্টি-কালচারের খ্যাতি ও মর্যাদা কৌশাম্বী, প্রয়াগ, মথুরা, উজ্জয়নী, কান্যকুব্জ ও পাটলীপুত্রের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। এই ‘বানগড়কে’ ঘিরে বহু কাহিনী প্রচলিত আছে।

কুনরের পড়ামাটি
দিনাজপুরের রায়গঞ্জ থেকে ইটাহারের দিকে এসে দুর্গাপুর হয়ে কুনর আর রায়গঞ্জ কালিয়াগঞ্জ হয়ে কুনুর যাওয়া যায়। গ্রামে গেলে নতুন ধরণের পোড়া মাটির কাজ দেখতে পাবেন। কুনরের কারুকার্যময় মাটির ঘোড়া আর হাতি এককালে খুব কলকাতায় বিক্রি হয়েছে। এখন আর সেই অপূর্ব সুন্দর মাটির ঘোড়া কোনও কুমোর তৈরি করেন না। অথচ পীরের দরগায় মানতেরর জন্য ছলন ঘোড়া কিন্তু ভালই বিক্রি হয়। স্থানীয় এলাকায় আছেন জন্ডি পীর, ঘটা পীর, এন্ডিয়া পীর, মাণিক পীর। হিন্দু মুসলামান উভয়ের আরাধ্য পীরবাবারা। ধনকৈল হাটে ঘোড়া বিক্রি করতে যাওয়ার আগে পীরের দরগায় ঘোড়া চড়িয়ে যান কুনরের শিল্পীরা। ইতিহাস বলছে সম্ভবত বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় স্মরণীয় করতে এই ঘোড়া তৈরির কাজ শুরু। গবেষক শিশির কুমার মজুমদারের ভাষায় ঘোড়াগুলি ত্রিভূজাকৃতি। সাম্নের পা আআর বুকে রক্ষণশীল ভঙ্গী। বুকের মধ্যে যেন কোনও আদিমতা লুকিয়ে রয়েছে।
একই সঙ্গে খোদাই করা পিরিচ আর পেয়ালা বেশ বিকোয়। এ ছাড়াও নানান ধরণের মাটির আলোসাজ, আপূর্ব পিদিমদানিও রয়েছে। বাজার বুঝে কেউ কেউ গয়নার কাজ করছেন। ১৯৮২ সালে প্রয়াত লক্ষ্মীকান্ত রায় জাতীয় পুরস্কার পান। এছাড়াও মা-মেয়ে পুতুল, পেচি (তেল রাখার পাত্র) ধুনুচি, বরুয়া (দুধ দোয়ার পাত্র) ইত্যাদি তৈরি করেন। স্থানীয় হাটে মেয়েরাই উৎপাদন বিপণনের জন্য নিয়ে যান।
কুনরের পোড়ামাটির কাজ দু ধরণের সমাজ করেন, একটি পালেরা পরম্পরা আর বাংলার ঐতিহ্য মেনে। আর বেশকিছু রাজবংশী ঘরও মাটির কাজ করেন। কয়েক বছর আগেও এই দুই সম্প্রদায় অন্য ধরণের সামগ্রী উৎপাদন করতেন, সম্প্রতি কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নতুন ধরণের নানান জিনিসপত্র তৈরি করতে শিখিয়েছেন। সেগুলি আদৌ বেশিদিন বাজারে চলবে কি না তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল সন্দিহান।
এছাড়াও রায়গঞ্জের লাগোয়া সুভাষগঞ্জএও মাটির কাজ হয়। সুদৃশ্য হাঁড়ি, কলসি, বড় ফুলদানি ইত্যাদি তৈরি করছেন তাঁরা।

ধোকড়া
দিনাজপুরের আরও আকর্ষণ ধোকড়া। রাজবংশী সম্প্রদায়ের মেয়েরা করেন। মহানন্দার অববাহিকা জুড়ে যে পাট উতপন্ন হয় সেই সোনালী পাটে একমাত্র রাজবংশী মেয়েরা ছোট্ট মণিপুরি তাঁতে শহুরে ভাষায় জুট ম্যাট বা ধোকড়া বানান। দেড় ফুট চওড়া আর পাঁচফুট লম্বা পাটের বুননকে বলে ফাটি। তিনটি ফাটি একসঙ্গে জুড়ে তৈরি হয় ধোকড়া। রাজবংশী সমাজে ধোকড়ার ব্যবহার বহুবিধ। বাঘ পালানো মাঘের শীতে গায়ে দেওয়া থেকে জিনিসপত্র শোকানো থেকে অতিথি এলে পেতে বসতে দেওয়াসহ নানান কাজে ব্যবহার হয় ধোকড়া। প্রত্যেক রাজবংশী মহিলা ধোকড়া বুনতে জানেন। পুরুষেরা তাঁতে হাত দেন না। বোনাতে মহিলাদের একচ্ছত্র অধিকার।
ইটাহার-খুনিয়াডাঙ্গি-ফতেপুর-কালিয়াগঞ্জ রাস্তায় মহিষবাথান একাকায় রাজবংশী মেয়েরা একজোট হয়ে তৈরি করেছেন স্বনির্ভর গোষ্ঠী। এঁরা সক্কলে বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সঙ্ঘের সদস্য। এদের নিজেদের ৬টা চিত্তরঞ্জন তাঁত রয়েছে, আর রয়েছে পারম্পরিক ঠকঠকি তাঁতও। এদের সঙ্গে রয়েছেন প্রায় এক হাজার দক্ষ বুনকর নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রৌঢ়া আকুলবালা সরকার আর যশোদা সরকার এবং আকুলবালার জামাই মাধব। আকুলবালা নিজে দারুন খন শিল্পীও বটে। মাধব নিজে খুব ভাল মুখোশ শিল্পী।
পরম্পরা বজায় রেখে এঁরা তৈরি করছেন নানান ধরণের পরিধান দ্রব্য এবং নতুন ধরণের খেস – যা শান্তিনিকেতনের আঙ্গিক থেকে এক্কেবারে আলাদা, নিজেদের ঐতিহ্যে দাঁড়িয়ে থেকে কী করে নতুনকে বরণ করতে হয় তা দেখিয়েদিলেন আকুলবালাদের স্বনির্ভর দল। ধোকড়ার শান্তিনিকেতনী থলে তৈরিতে এঁরা মাহির হলেও এঁরা কয়েক বছর ধরে তৈরি করছেন পাটের জ্যাকেট, পশমের চাদর, রেশমের নানান জিনিস ইত্যাদি।
একটু অন্য ধরণের পাটের কাজ করছেন — সত্যেন আর তাঁর স্ত্রী। সঙ্ঘ একবার গ্রামীণ বাজারের অবস্থা বুঝতে সাত দিনের মেলা আয়োজন করেছিল দিনাজপুরের ফতেপুরের চান্দোল হাটে। সেই মেলায় রবাহূতের মত এসে হাজির হয়েছিলেন এই দম্পতি। তাঁর পর থেকে সঙ্ঘের নানান কাজে এঁরা জড়িয়ে পড়েছেন নিজেদের সামর্থ্যে। পরম্পরার নানা পাটের কাজের সঙ্গে বাজার বুঝে নিজেরা তৈরি করছেন নতুন নতুন জিনিস। প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। প্রচুর শিল্পী তৈরি করছেন। একটা দারুন জিনিস তৈরি করেছেন সেটি হল পাটের সুতলির জ্যাকেট। দুর্দান্ত দেখতে, বেশ ভাল পরতেও।

কলাগাছের তন্তুর দ্রব্য
ফতেপুরের ক্ষীরোদাবালা সরকার তৈরি করছেন কলা গাছের আঁশ দিয়ে তৈরি নানান ধরণের থলে। ক্ষীরোদার মেয়েও একবেলা স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে কাজ করে সেই কাজে হাত পাকিয়েছে। কেরলের শিল্পীরা আড়াই ফুটের বেশি তন্তু তৈরি করতে পারেন না, কিন্তু ক্ষীরোদার নেতৃত্বে বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সঙ্ঘের শিল্পীরা যত বড় গাছ তত বড় তন্তু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। দাম বেশি। তাঁরা চাইছেন আরো বেশি ক্রেতা তাহলে আরোবেশি উৎপাদন হয়, দামটা আরও একটু কমে।
রাজবংশী পুরুষেরা অপূর্ব কাঠ আর বাঁশের কাজ করেন। প্রত্যেক রাজবংশীরা যেন মায়ের পেট থেকে পড়েই যেন দক্ষ তক্ষণ শিল্পী হয়ে ওঠেন। উষাহরণ, কুশমণ্ডি, হরিরামপুর, কালিয়াগঞ্জ ইত্যাদি ব্লকে কয়েক হাজার রাজবংশী সারা দেশে চড়িয়ে রয়েছেন শুধু বাঁশ আর কাঠের কাজের দক্ষতার জন্য। কলকাতায় নানান পুজো মণ্ডপে এই এলাকার কয়েক শ মানুষ কাজ করেন নানান ধরণের শৈল্পিক বাঁশের কাজের জন্য। জোট বেঁধে প্রচুর পুরষ্কারও পেয়েছেন। বিশেষ করে দার্জিলিং আর জল্পাইগুড়ি এলাকার মোটা বাঁশ দিয়ে এঁরা নানান জিনিসের মধ্যে তৈরি করছেন বাতিদানি, মুখোশ ইত্যাদি। তবে শিল্প রসিকদের আনুরোধ করব এলাকায় গেলে অবশ্যই কিন্তু রাজবংশীদের চিড়ে কোটা ঢেঁকি সংগ্রহ করবেন। অপূর্ব তার নির্মাণ শৈলী। অপূর্ব তার দর্শনী।
এক ব্যতিক্রমী মহিলার কথা বলা দরকার এখানে। এক সময় লৌকিক বাঙলায় প্রবাদ ছিল চাষ করতে আর তাঁত চালাতে না পারলে বাঙালির মেয়ের বিয়ে হয় না। মালদার গঙ্গা পেরিয়ে দিনাজপুরে, এই বাক্যটাই ঈষদ পাল্টে বলা হয়, ধোকড়া বোনা, চাষের কাজ আর বাঁশের শিল্পকর্ম না জানলে গ্রামীণ মেয়ের বিয়ে হওয়া মুশকিল।বাঙলার পারম্পরিক বাঁশের কাজের শিল্পী শান্তি বৈশ্য নিজের জীবন সংগ্রামে শুধু এই প্রাচীণ বাঙালি প্রবাদটি সত্যি প্রমাণ করেন নি, বাঁশের কাজ করে আজও নিজের সংসার প্রতিপালন করেন অপরিসীম প্রাত্যহিকতায়।
বিবাহসূত্রে স্বামী সেল্টু বৈশ্য থাকতেন শ্বশুর বাড়িতে, স্ত্রী শান্তির ভিটেতেই। বিশ্বায়ণ আর শহুরে রাজনীতির প্রভাব যখন মহামারীরমত ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম সমাজে, তখন দুই দিনাজপুরে এই ভঙ্গুর সময়েও বাঙলার সাম্যবাদী তন্ত্র সভ্যতার নানান রেশ জড়িয়ে রয়েছে সমাজের স্তরেস্তরে। ঘরজামাই কথাটির চল থাকলেও, কথাটিতে শহুরে পুরুষতান্ত্রিকতার মরণ কামড় নেই।শান্তির স্বামী সেই এলাকায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যবহার হওয়া নানান ধরণের বাঁশের দ্রব্য তৈরি করতেন। বাল্যাবস্থা থেকেই শান্তি বাঁশের কাজ করতেন। দুজনে মিলে তৈরি করতেন বিয়ের ডালা, বিয়ের ফুল রাখার রঙিন বরণ ডালা, সাদা ও রঙিন কুলো, মুড়ি ভাজার চালন, ভাত গড়ানো আর তরকারি রাখা ঝুড়িরমত বাঙলার নিজস্ব গড়নশৈলীওয়ালা অসংখ্য দ্রব্যাদি।
শান্তির জীবন চমক বিহীন। শহুরে ভেজালময় জীবনযাত্রার পক্ষে বড্ড বেশি নিস্তরঙ্গ শান্তির জীবনযাত্রা। শান্তি তাঁর শিল্পদ্রব্য জেলা অথবা রাজ্য অথবা জাতীয় স্তরে প্রতিযোগিতার জন্য পাঠান নি। শান্তির খেদ নেই।অথচ তাঁর কাজে এতটাই শান্তি যে কলকাতার মেলায় তাঁর গতানুগতিক কাজ বিকিয়ে যায় চট করে।
শান্তি নিভৃতে পুজোরমত আজও বয়ে নিয়ে চলেন বাঙলার পারম্পরিক শিল্প সম্ভার, নিজেরমতকরে পারম্পরিক শিল্পীদের বিনম্রতায়, মাথা নিচু করে কাজ করে চলেন শ্রীমতী নদীর ধারে ফতেপুর-কালিয়াগঞ্জ রাস্তার ধারেই ঊষাহরণে, নিজের ভিটায়। এধরণের হাজারো শান্তির প্রাত্যহিকতায় এই লুঠেরা সময়ে বিশ্রান্তিহীনভাবে বয়ে চলেছে অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুরের নানান সাংস্কৃতিক প্রবাহমানতা। সন্ধ্যের টিভির ফর্সা হওয়ার বিজ্ঞাপন থেকে মোবাইলের নীল ছবি কোনোটাই বদলাতে পারেনি রাজবংশী সমাজের আক্ষদণ্ডকে।
এছাড়াও রাজবংশীদের সমাজে নানান আচার আচরণে কাঠের আর শোলার মোখা বা মুখোশ আজও প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন উপাচারে এদের ব্যবহার করা হয়। কখনও মুখোশ পরে নাচের কাজে – যার নাম গমীরা নৃত্য আর কখনো মুখোশ উতসর্গ করার কাজে। অপূর্ব সব আকারের দেবতার, দেবীর মুখোশ তৈরি করেন রাজবংশীরা। কিছু কিছু হয় এক রঙা, কিছু কিছু হয় বহু রঙা। দেবতাদের থেকে দেবীদের রমরমা বেশী। মনসা, কালী, চামুণ্ডা, তারা, উগ্রতারার মূর্তির সঙ্গে নতুন সময়ের বৈষ্ণব ধর্মের হনুমানের মুখোশ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। মুখোশ যেমন প্রাচীন আকারের তেমনি প্রাচীন মুখোশ দেখলে মনে হবে যেন এক্কেবারে আধুনিক মুখোশ দেখছেন।

শোলার কাজ
কালিয়াগঞ্জের সুনীল মালাকার আর হরিরামপুর ব্লকের মুস্কিপুরের মধুমঙ্গল মালাকার জেলার শোলার কাজের পতাকা উর্ধে তুলে ধরে রেখেছেন। মধুমঙ্গল তার শোলার মুখোশ, বাঁশের ঘোড়া, আর শোলার মেল্লি, ফুলসহ নানান উপকরণ নিয়ে অন্তত এগার বার বিদেশ গিয়েছেন। বিশ্বের ১১টি প্রখ্যাত জাদুঘরে তার কাজ রয়েছে। তার শোলার মুখোশ বাংলায় খুব একটা প্রচলিত না হলেও বিদেশে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করছে। পুরুষানুক্রমে মুখোশ তৈরি করে আসছেন চাকলা সংলগ্ন মুস্কিপুরের মালাকার পরিবার। বড় ছেলে মধুমঙ্গল মোখা আর শোলার কাজ নিয়ে গিয়েছেন লন্ডন, সানফ্রান্সিসকো, ফিলাডেলফিয়া আর্ট মিউজিয়ামে। শোলার ঘোড়া রয়েছে মাদ্রিদে। বার্সিলোনায় কালীমূর্তি। পূর্ণেন্দু পত্রী মুখোশ তৈরি শেখেন মধুমঙ্গলের হাতে।
তিনি তৈরি করেন মুসলমান পরব আর সাঁওতালদের বিয়ের নাচের ঘোড়া। সে এক অপুর্ব সৃজন। মনসা পুজোয় ব্যবহার হওয়া মেল্লি – তা দিয়ে একবার কলকাতার পুজোয় মণ্ডপ তৈরি হয়েছিল। সুনীল মালাকার তৈরি করেন টোপর আর ডাকের সাজ। সত্তরোর্ধ এই মানুষটি আজও অপরূপ দক্ষতায় তৈরি করেন দুর্গা প্রতিমার ডাকের সাজ।

জনরা
আজ আর পাওয়া যায় না দিনাজপুরের আদিবাসী গয়না জনরা। শুধু কয়েকজন মানুষ আজ টিকে রয়েছেন। কিন্তু গ্রামে আর রূপোর গয়না পরার মানুষ বোধহয় নেই। রায়গঞ্জে গেলে অবশ্যই খোঁজ করবেন।

তেলিগ্রামের মাদুর
গাজোল-বালুরঘাট রাস্তায় হরিরামপুরে নেমে পূর্ব দিকে যেতে হয়। মাদুরটি বেশ উপাদেয়।

মালগাঁর কার্পেট
কুনরের পাশেই মালগাঁ। সেখানে উদ্যমী আবুতাহের কয়েক বছর আগে শুরু করেছিলেন পাটের সঙ্গে পশম বা উল মিশিয়ে কার্পেট। এত সূক্ষ্ম বোনা যে সেটিকে ব্যবহার করা যাবে সুজনি হিসেবে। কলকাতার হস্তশিল্প মেলায় আবুতাহেরের মালগাঁর কার্পেট গরম চায়েরমত বিক্রি হয়। মনে আছে ২০১২য় দিনাজপুরের ফতেপুরের কাছে চান্দোল হাটে সঙ্ঘ মেলা বসিয়েছেল সাত দিন। প্রথম সদস্য হয়ে এসেছিলেন আবু তাহের। প্রথমেই যায়গা দেখে খুব আসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। শেষ দিন যখন তাঁর দোকান গোটানোর পালা চলছে, তখন তাঁর মোট বিক্রি ১ লাখ চার হাজার টাকা – বললেন কলকাতার হস্তশিল্প মেলাতেও সাত দিনে এত বিক্রি হয় না।
আজ আবু তাহেরের উদ্যমে জুড়ে গিয়েছে গোটা গ্রাম। গ্রামের অর্থনীতি আবর্তিত হচ্ছে আবু তাহের প্রতিষ্ঠিত কার্পেট শিল্পের উতপাদনে। এই কার্পেট এত্ত সুন্দর যে সে তার শিল্প শৈলী নিয়ে পাল্লা দিতে পারে কাশ্মীরের আর বেনারসের গালিচার। দিনাজপুরে গেলে নিশ্চয় ঘুরে আসবেন মালগাঁ।

খনগান
দিনাজপুরে যখন যাচ্ছেন, তখন খন গান শুনবেন না তা কী হয়? এই উষাহরণ, খুনিয়াডাঙ্গি, মহিষবাথান, দিলালপুর অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে খন দল।
‘খনগান’ : উত্তর দিনাজপুর জেলর কিছু কিছু অঞ্চলে ‘খণগান’ খুবই প্রচলিত ও জনপ্রিয়। জেলার বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন লোকনাট্যের মধ্যে এই ‘খণগান’ বা খ্যেনের গান নানান কারণেই বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে। সাধারণতঃ পারিবারিক বা সামাজিক কোন রোমান্টিক কাহিনী, সংঘর্ষ বা প্রেমবিষয়ক কোন কেচ্ছা কাহিনীকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়ে থাকে এই ধরনের লোকনাট্য। গোপন প্রণয়, কুলত্যাগ, অসবর্ণবিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, তালাক, কেস, মামলা-মোকদ্দমা প্রভৃতি সামাজিক বিষয়কে কেন্দ্র করেই জমজমাট হয়ে ওঠে এই নাটক। সাধারণতঃ মুক্ত মঞ্চেই এইসব রসাÍক, কৃষি কাজের নানান উপমা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, মস্করা, তামাসা, হাসিঠাট্টা, অবহেলিতা-বঞ্চিতা-লাঞ্ছিতা ও নির্যাতিতা রমনীদের আকুলতা-ব্যাকুলতার জ্যান্ত ছবি প্রভৃতি এই জনপ্রিয় লোকনাট্যের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। এই ধরনের নাটকে যেমন সংলাপ আছে, তেমনই প্রতি বছরই নতুন নতুন বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত হয় বলে নাটকের উপর মানুষের প্রচুর আগ্রহ জন্মায়। এইসব পালাগানে নারীচরিত্রে সাধারণতঃ পুরুষরাই (ছাক্রা বা ছুকরি সেজে) অভিনয় করে থাকে কোন কোন পালা গানে। আমাদের জেলায় এই গানের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্চ, হেমতাবাদ, ইটাহার প্রভৃতি অঞ্চলের আশেপাশে এই লোকনাট্যের ব্যাপক প্রচলন আছে। স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে যেসব ‘খণগান’ অত্যধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ভাসুর-ভাউসান, বুধাশরী, দইফেলা সেহারী, সাইকেল সেহারী, সতী-হেলা, হ্যাজাক সেহারী, ডিপ্টিকল, লালু-সোহাগী, হালুয়ান-হালুয়ানী, চোর-চূর্ণী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
গণেশ রবিদাসের উতসাহে – দলটি আজ দিনাজপুরের অন্যতম প্রধান দল।

গম্ভীরা
নাট্যের কোন কোন অংশে একক নৃত্যের অবকাশ থাকে। নিজস্ব অঙ্গভঙ্গীতে সাধারতঃ নায়ক-নায়িকারা নাচের আসর জমায়। তাছাড়া উদ্দাম নৃত্য দেখানো হয় মুখোশের নাচে। গম্ভীরা ও জিতিয়া অষ্টমী উপলক্ষ্যে মুখোশ নাচের পৃথক আসর বসে। দলে দলে সুসজ্জিত হয়ে ঢোল ও বাজানার তালে তালে কখনও ধীরে আবার কখনও উত্তেজিতভাবে নৃত্য চলতে থাকে। স্থানীয়ভাবে একে মুখা নাচ বলে। ঢোল বাদক ও নৃত্যকারী শেষ পর্যন্ত বাহ্যিকজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মোখা আমাদের জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।