| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সৌমেন দেবনাথ-এর ছোটগল্প দীর্ঘায়ুর অভিমান

Reporter
সৌমেন দেবনাথ / ৬৬১ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০২২

প্রাপ্তিতে আমাদের সন্তুষ্টি নেই। প্রাপ্তির দিকে নজর থাকে না, অপ্রাপ্তির বড় অংশই পূরণ হয় সেদিকে ভ্রূক্ষেপ থাকে না, বাড়ে তাই আক্ষেপ।

ঐশ্বর্যের প্রতি চিরকালই প্রাপ্তি উদাসীনা। অনুপমের ধন-সম্পদের দিকে তার কোন খেয়ালই নেই। তার বিশ্বাস ভালোবাসাটা থাকলে গাছতলাতেও শান্তি। তার একটাই কামনা-বাসনা অনুপমকেই ঘিরে। অনুপমকে পাওয়া তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। প্রাপ্তির প্রতি প্রাপ্তির এতো গুরুত্বারোপ প্রাপ্তিকে না দেখলে বোঝা যাবে না। বাড়তি আর কোন তৃষ্ণা নেই, বাড়তি আর কোন চাওয়া নেই।

দুটি মানুষের মনের সাথে মনের কি অদ্ভুত মিষ্টি সন্ধি। দুটি মানুষ দুটি মানুষকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। সত্যিকারের ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়। ওদের মধ্যের প্রগাঢ় সম্পর্ক দেখলেও ভালো লাগে। একজন আর একজনকে অনেক বোঝে। একজন আর একজনের কথা শোনে। ভালোবাসার মানুষগুলো এমনই, একজন আর একজনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।

দুজনের মধ্যে যে মতভেদ হয় না তা নয়। মতভেদ জেতে না, জিতে যায় সম্পর্কের সুন্দর সুন্দর অনুভূতিগুলো।

আর তাদের প্রেম ঠুনকো নয় যে, ঝুরঝুর করে ঝরে যাবে। স্বামীর থেকে দুঃখ-কষ্ট পেলেও পুষ্পের হাসি ঠোঁটে রেখে সময় পার করে, কেননা স্বামী তার ভুল বুঝে টেনে নেবে বুকের নিগূঢ় তলে। প্রাপ্তির সব কথাও যে অনুপমের ভালো লাগে তা নয়। কিন্তু অনুপম খারাপ লাগা বুঝতে দেয় না। ভালোবাসার মধ্যে সব ধরনের পরিস্থিতিই উপস্থিত থাকে। চাওয়া-পাওয়া এক হলে বাজে মুহূর্তগুলো কর্পূরের মতো উবে যায়, সুন্দর মুহূর্তগুলো আরও সুন্দর হয়ে ধরা দেয়।

প্রতিটি দিনই অপেক্ষা করে কাটে প্রাপ্তির। বসে থাকে অধীর আগ্রহে মন ভ্রমরকে দেখবে বলে। কর্মযজ্ঞ শেষ করে অনুপম বাড়ি এলেই প্রাপ্তি অনুপমের বুকের পশমে মুখ লুকায়। অনুপম মিষ্টি হেসে বলে, একদম পোষা প্রাণীর মতো আহ্লাদে তুমি।

প্রাপ্তি মুখ তুলে বলে, কত ঘণ্টা তোমাকে না দেখে থাকতে হয়, বলো তো? পথ পানে চেয়ে থাকি এই বুঝি এলে… এই যে তুমি এলে মুহুর্তগুলো আমার রেঙে গেলো।

তা শুনে অনুপম বললো, এখনও এতো দেখার কি আছে! পুরাতন হয়ে গেছি তো!

প্রাপ্তি বললো, স্বামী কখনও পুরাতন হয়? সব সময় নতুন তুমি, প্রতিটি নতুন দিনের মতো উজ্জ্বল। প্রতিটি নতুন দিনের মতো নতুন তুমি আমার কাছে।

অনুপম বললো, এবার না হয় ছাড়ো!

প্রাপ্তি বললো, না। আমার এখনও তৃপ্তি কমেনি। তোমার বুকে লুকালে আমি স্বপ্নে বিভোর হই। আমার একটাই মানুষ তুমি, একান্তই আমার। আমার চাওয়া-পাওয়া তোমার মাঝেই সীমাবদ্ধ।

অনুপম না বিরক্ত না মধুরতার মধ্যে থেকে বললো, আমারও আশা ছিলো এমন একটা তুমি জীবনে আসবে আমার। এখন ছাড়ো। আমি তো ক্লান্ত। কত বার ঘেমেছে শরীর। ফ্রেশ হই।

প্রাপ্তি বললো, তোমার দেহের ঘামের গন্ধের সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে সুগন্ধ পারফিউমের গন্ধের তুলনাও চলে না। তোমার অনুপস্থিতিতে আমি তোমার ঘামের গন্ধে মাখা শার্ট বুকে চেপে তোমার উপস্থিতি উপলব্ধি করি।

অনুপম প্রাপ্তিকে বুকের থেকে তুলে বললো, বেশি বেশি পড়তাম, মা বলতো, পাগল হয়ে যাবো। পাগল হইনি। এবার পাগল হবো, তুমি পাগল করে দেবে।

প্রাপ্তি মুখ গোমড়া করে বললো, তোমার প্রতি আমার অপেক্ষার তোমার কাছে কোন মূল্য নেই? যাও আর পথ চেয়ে থাকবো না!

অনুপম বললো, আমি কি বলেছি কখনও আমার বৌ মন্দ? এমন লক্ষ্মী বৌ কতজনের আছে?

প্রাপ্তি বললো, লক্ষ্মী বৌ না ছাই। লক্ষ্মী বৌকে কদিন আদর দিয়েছো? তুমি তো জানোই না আদর দিতে, মমতায় বাঁধতে। জোর করে ছাগল বাঁধা যায়, মন বাঁধা যায় না।

এই বলে প্রাপ্তি রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো। বেশক্ষণ তাকে ভেবে ভেবে অনুপম ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

অনুপমকে খেতে দিয়ে প্রাপ্তি বললো, তরকারি কুটার সময় তোমার কথা মনে পড়ে, হাতের চুড়ি কিভাবে নড়ে তোমার নজর এড়ায় না। তরকারি রান্নার সময় তোমার কথা মনে পড়ে, রান্নার সময় তোমার খুঁনসুটি খুব মিস করি।

অনুপম বললো, কিন্তু তোমার রান্নার তো আমি প্রশংসাই করি না।

প্রাপ্তি বললো, রান্না খারাপ হয়েছে তাও তো কোন দিন বলোনি। তুমি বলো না, কিন্তু আমি বুঝে নিই। তুমি সহজ না, কিন্তু সহজ করে নিই। তুমি খুব শক্ত, কিন্তু মন্দ না। মানুষটা তুমি শক্ত, কিন্তু সঠিকও।

অনুপম বললো, আমায় ভেবে ভেবে রান্না করো, রান্না কি খারাপ হতে পারে?

প্রাপ্তি আক্ষেপ করে বললো, শুধু রান্না দিয়ে কি স্বামীদের মন জয় করা যায়? নারীরা তো তবে রাজত্ব করতো, দাসত্ব না।

কথাটি বলেই প্রাপ্তি আবার অন্যদিকে চলে গেলো। অনুপম কিছুক্ষণ থমকে থাকলো। এভাবে আঘাত করে কিংবা ইঙ্গিত করে আগে তো কথা বলতো না। তবে আজকের কথা দুটি খুব গুরুত্বের সাথে নিলো না অনুপম।

রাতে ঘুমের দেশে হারানোর জন্য ওরা প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনুপম বললো, তখন বললে, লক্ষ্মী বৌকে কদিনই আদর দিয়েছো? আমি কি সত্যিই তোমাকে আদর দিই না?

প্রাপ্তি বললো, যখন সব কাজ থেকে মুক্তি নিয়ে এই রাতে একটু আমার কাছে আসো, তখন মন ভুলানো দুটো কথা বলো। এটা কি আদর?

অনুপম আশ্চর্য হয়ে বললো, মানে কি? বুঝিয়ে বলো তো!

প্রাপ্তি বললো, পৃথিবীর সব পুরুষ এই রাতের বেলাতেই সবচেয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। ধন-সম্পদ, জমি, টাকা, অলংকার সব দিতে চায়। দিনের আলোয় সব ভুলে যায়। শখের জন্য কাছে আসে, শখ মিটে গেলে সব ভুলে যায়।

অনুপম ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বললো, ধন-সম্পদ, অলংকার তুমি কি চাও? আর আমি তোমাকে কবে প্রলোভন দেখালাম?

প্রাপ্তি বললো, তুমি তোমার ব্যস্ততম সময়ে আমাকে পাত্তাই দাও না। ফোনকল কেটে দাও। বা অনাগ্রহের সুরে কথা বলো। রাখো রাখো করো। মিষ্টি মিষ্টি কথা যখন বলো বুঝতে পারি মুখের কথা, মনের কথা না।

অনুপম এক প্রকার মনোক্ষুণ্ণ হয়ে ঘুমিয়ে গেলো। প্রিয় মানুষের কাছ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত কথা শুনলে মেনে নেওয়া যায় না। চায় মিষ্টি কথা, পায় তিক্ত কথা। চায় মিষ্টি সময়, দেয় দূর্বিষহ সময়। কল্পনাটা সুন্দর, বাস্তবতাটা রুক্ষ্ম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে অফিসে চলে যাচ্ছে অনুপম। প্রাপ্তি বাধা দিয়ে বললো, সকাল থেকে তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছো কেন?

অনুপম বললো, অফিসে কাজের চাপ। এখন তোমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় নেই।

প্রাপ্তি বললো, ও আচ্ছা! খেয়ে যাবে না?

অনুপম বললো, খাবো যে রুচি থাকা লাগে না? তোমার তীক্ষ্ণ কথা শুনে শুনে আমার পেট ভরে গেছে।

প্রাপ্তি আশ্চর্য হয়ে বললো, মানে?

অনুপম বললো, বাড়ি জুড়ে রাজত্ব করো, তাও তোমার মনে হয় দাসত্ব। নিজের ঘরের কাজ করাটা কি দাসত্ব হয়? ছাগল-গরু বাঁধছো, আর আমি ছুটে যাচ্ছি? জানো না তাই বোঝো না, বোঝো না তাই জানো না। কিন্তু বলার সময় কম বলো না।

অনুপম চলে গেলো। বাইরে যেতেই প্রাপ্তি ফোন দিলো, বাইরে খেয়ে নিও, খেয়ে যখন ফোন দেবে তখনই কিন্তু আমি খাবো। নতুবা খাবো না।

অনুপম বললো, আমি খেয়েই গাড়িতে উঠেছি। তুমি খেয়ে নাও।

প্রাপ্তি মন খারাপ করে বললো, তোমার সুন্দর সংসারে আমিই শুধু অসুন্দর মানুষ! ভালো লাগা খুব সহজ, ভালোবাসা খুব কঠিন!

অনুপম বললো, খর গাঙে চর পড়ে জলদি। অতি সুখের সংসারে অতি শীঘ্র দুঃখ নামে।

প্রাপ্তি কান্না করতে করতে বললো, আমি কি তোমার মতো শিক্ষিত? আমার ভুল হতেই পারে। আমার উপর রাগ করবে কেন? আর তুমি আমার উপর রাগ করো কি করে? আমি তো শত চেষ্টা করেও তোমার উপর রাগ করতে পারি না।

অনুপম প্রাপ্তিকে শান্ত করার জন্য বললো, কান্না করো না। আমি রাগ করিনি। বারবার কান্নাকে অস্ত্র করে আমাকে ঘায়েল করবে না।

প্রাপ্তি আর বেশি কথা বাড়ালো না। সারাদিন অনুপমকে ভাবছে। বুকের মধ্যে হুহু করছে। শূন্যতা অনুভব করা যদি ভালোবাসা হয় তবে সে প্রতিটি মুহূর্তেই অনুপমকে ভালোবাসে। কথার লাগাম না টানলে তা যেকোন সম্পর্কে খারাপ প্রভাব ফেলবে বুঝতে পারলো প্রাপ্তি।

রাগ মনে রাখতে নেই, ক্ষোভ মনে রাখতে নেই।

ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসতে হয়, তার মুখের কোন একটা কথাকে বাজে ভেবে ধরে রাখতে হয় না। যে হৃদয়ের অমিয় শক্তি তাকে ক্ষমা করতে জানতে হয়। যার কারণে হৃদয় ও শরীরে শিহরণ জাগে তার কোন একটা মুহূর্তের ভুলের কথা ভুলে যেতে হয়। আর তাই অনুপম সব ভুলে যায় সব ভালো চলবে ভেবে। অফিসে যাওয়ার সময়ের অনাগ্রহটা অফিস থেকে ফেরার পর আগ্রহে রূপ নিলো। সে প্রাপ্তির পাশে পাশে ঘেঁষছে। ইয়ারকির ছলে প্রাপ্তি বলে ফেললো, বাঘ নরমাংসের স্বাদ পেলে ঐ পথেই বেশি বেশি যাতায়াত করে এবং ঐ পথ ছাড়ে না।

অনুপম কথাটি শোনামাত্রই বিব্রত হয়ে কিছুটা সরে গিয়ে বললো, আমি বাঘ? তুমি কি আমার শিকার?

প্রাপ্তি হেসে পরিবেশটাকে হালকা করার চেষ্টা করে বললো, তুমি তো আমার বাঘই, তবে আমি তোমার শিকার না, বাঘিনী।

অনুপম বলে, তুমি মানবী থেকে দেবী হয়েছো যোগ্যতা বলে। যোগ্যতা কী? সংসারমনা, শাশুড়ির প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি, প্রতিবেশীদের প্রতি অমৃত আচরণ। যদিও প্রতিবেশীরা তোমাকে সুন্দর চোখে দেখেন না।

প্রাপ্তি বললো, প্রশংসা রাখো। তোমার প্রশংসার মানে পরিষ্কার। হরিণী দেখলেই উদরপূর্ণ বাঘও ক্ষুধার্ত হয়ে যায়।

বলেই প্রাপ্তি হেসে দিলো। দুই ঠোঁটে দাঁত কেটে অনুপম বললো, আমাকে সর্বক্ষণই ক্ষুধার্ত লাগে?

অনুপম আর কথা বললো না। বাইরে চলে গেলো। নারীর থেকে অল্প একটু প্রেম প্রাপ্তির জন্য পুরুষ কত পাগল, আর পুরুষের গভীর প্রেমেও নারী মজা নেয়। পুরুষের ভালোবাসাকে নারী ভেবে নেয় ভোগের উপলক্ষ। পুরুষের ভালোবাসাকে নারী ভেবে নেয় সামান্য আনন্দ প্রাপ্তির কারণ। কয়েকটি মুহূর্ত উপভোগ করার জন্য পুরুষ নাকি নারীকে ভালোবাসতে যায়!

সেদিন প্রাপ্তির শাশুড়ির সাথে এক প্রতিবেশিনী গল্প করছেন। প্রাপ্তির শাশুড়ী মা বললেন, আমার বৌমাটা খুব লক্ষ্মী। সংসারটাকে সাজিয়ে স্বর্গ করে তুলেছে।

প্রতিবেশিনী বললেন, ঘরের বৌমা যত ভালোই হোক, ভালো বলবেন না। খারাপ হয়ে যাবে। বদলে যেতে সময় লাগে না।

শাশুড়ি মা বললেন, ভালো ভালোর দলে থাকলে খারাপ হবে না। বৌমাকে তো অন্যের মেয়ে না, নিজের মেয়ে করে রেখেছি। আমি তাকে বৌমা বলে ডাকি না, মা বলে ডাকি।

প্রতিবেশিনী নাক সিটকে বললেন, পরের মেয়ে নিজের মেয়ে হয় কখনও? পর পরই, আপন আপনই। পর কখনো আপন হয় না। পর আপন সাজে তখনই যখন তার ভিতর স্বার্থ বাস করে।

নরক থেকে স্বর্গের কাউকে দেখলে নরক যন্ত্রণা আরও বাড়ে। প্রতিবেশিনী ফোঁসফোঁস করতে করতে চলে গেলেন।

প্রাপ্তি শাশুড়ি মায়ের কাছে এলো। মা তাকে ডেকে চুলে তেল মাখিয়ে দিচ্ছেন। যদিও চুলে প্রাপ্তি তেল দেওয়া পছন্দ করে না। তবুও মায়ের আবদার ফেলতে পারলো না। মা বললেন, বাড়ির বাইরে কম যাবে। মানুষ কানে বিষ ঢেলে দেবে। সব হিংসুটে।

প্রাপ্তি বললো, অন্যের কথা শুনে নিজ সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করবো, ভাবলেন কি করে, মা?

মা বললেন, মিথ্যে শুনতে শুনতে একদিন মিথ্যে সত্য হয়ে যায়। পরবুলি শুনতে শুনতে পরবুলি আপনবুলি হয়ে যায়। পরকে তখন আপন মনে হয়, আপন হয়ে যায় পর।

মায়ের কথাগুলো গুরুত্বের সাথে নিলো প্রাপ্তি। ঘরে এসে অনুপমকেই ভাবছে। অভিমান করে আছে স্বামীটা। অভিমান করতে হলেও ভালোবাসার প্রয়োজন হয়। যার তার সাথে অভিমান করা যায় না। আবার যার জন্য অভিমান করা হয় সে যদি সেই অভিমানের মানে না বোঝে তবে তো হয় না। আজ বসে আছে সে স্বামীর অভিমান ভাঙাবে বলে।

বাসায় ফিরলো অনুপম, কিন্তু সরল চোখে প্রাপ্তিকে দেখছে না, দেখছে কৌণিক চোখে চুরি করে করে। ঝিনুক সদৃশ প্রাপ্তির দেহ মাঝে অমূল্য মুক্তার ঝলক। তাক হারিয়ে ফেলে অনুপম। ঐ মুক্তোকণা সাপের মাথার মণি হয়ে অহরহ প্রলোভন দেখায়। শান্ত হৃদয় নদীর জলে ঢেউয়ের পাহাড় হয়। বেপরোয়া না হয়ে পারে না অনুপম। রাগ করে প্রাপ্তি বলে, এটা কি অসভ্যতা?

অনুপম অন্য এক ভঙ্গি করে বলে, মত্ত হয়ে গেছি গো। তুমিও একটু নির্লজ্জ হও না গো, তুমি সহজ হয়ে ধরা দাও না গো, শুধু আমার জন্য।

প্রাপ্তি বললো, তুমি অতৃপ্ত। তোমার তৃষ্ণা আছে, তৃপ্তি নেই। তোমার প্রাপ্তি আছে, তুষ্টি নেই।

অস্থির হয়ে অনুপম বললো, তোমাকে গবেষণা করে করে আমি যে ফল পাই না! গুগল ম্যাপ ঘেটে আমি সারা বিশ্ব চিনে ফেলি, কিন্তু কাটা-কম্পাস টেনেও তোমার রূপের কূল কিনারা পাই না। অদ্ভুত সুন্দর তুমি ও তোমার অবয়ব।

প্রচণ্ড রাগ হলো প্রাপ্তির, সে বললো, শেষ পর্যন্ত তোমার চোখও শকুনের চোখের ভূমিকা নিলো?

অনুপম কিঞ্চিৎ হেসে বললো, তোমার তাঁতানো অঙ্গের ঝাঁঝ চলার পথের এক অলঙ্ঘনীয় পাহাড়। তোমার হাসি দেখলে আমি বিলীন হয়ে যাই। কেন তোমার শরীরের বাঁকে বাঁকে এতো চুম্বকীয় আবেশ? আসো মাতি শরীরবৃত্তীয় ক্রীড়ায়।

প্রাপ্তি দুই কোমরে দুই হাত রেখে কর্কশকণ্ঠে বললো, তোমার প্রতি আমার বিশ্বাসের পাঁচিল ভেঙে গেলো বুঝি! ঠোঁটে এতো লালসার ঝোল কেন? মনের মাঝে এত নীচ ধারণা, এতো কুটিলতা কেন? স্বামী-স্ত্রীর মিলনকে তুমি শরীরবৃত্তীয় ক্রীড়া বলো কি করে!

অনুপম গড়িয়ে যাওয়া জলের মতো খলখলিয়ে বললো, রৌদ্রের রঞ্জণরশ্মির প্রকোপ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছি তোমার যৌবন ঝলমল শরীরকে। বিনিময়ে তোমার যৌবনের পরাগ রেণুতে চঞ্চল অলিটি স্পর্শ করতে চায়।

প্রাপ্তি কথাগুলো সহ্য করতে পারলো না। না পেরে বললো, পুরুষ জাতই এমন। মায়া দিয়ে ভোলানো যায় না। মায়া বোঝে না। ভালোবাসা বোঝে না। সংসারে আছে শতাধিক কাজ, আর পুরুষ আছে একটি কাজ নিয়েই। সব সুখ খোঁজে রতিক্রিয়ায়। এতো অসম্মান আর না। কালই মায়ের কাছে চলে যাবো।

অনুপম বললো, আমি আঙুল চুসবো? তুমি চলে গেলে খরস্রোতা নদী কোথায় পাবো? আমি তো খরস্রোতা নদীর বুকে পাখনা মেলে সাঁতার কাটবো।

অভিমানে, রাগে, ক্রোধে অধর যুগল স্ফূরিত হলো প্রাপ্তির। ও বললো, বিচিত্র সব চিন্তা-ভাবনায় দোলে তোমার মন। ভুল কাননে মন বিলিয়ে পুড়ি তাই দহনে। প্রতারক, হৃদয় হন্তারক, তোমার কথায় আমি উগ্রতার গন্ধ পাচ্ছি। স্বামী হয় ভালোবাসার হীরকখণ্ড, স্বামী হয় না কামুক। স্বামী হয় আবেগের আর এক নাম, স্বামী হয় না ধর্ষক।

প্রাপ্তির রাগ তুঙ্গস্পর্শী। বাঁকা চাহনি। চোখ দুটো রক্তিম। ঘেমে গেছে এক প্রকার। অনুপমের ধূর্ত চোখের মণিযুগল যেন কামুকতার আগুনে রাঙা। নির্বাক নিষ্পলকে চেয়ে আছে ভোরের ঊষার মতো রাগে রাঙা প্রাপ্তির দিকে। দেখে চোখ টাটায়।

প্রাপ্তির রক্তিম চোখে বাঁকা দৃষ্টি, বললো, হিংস্র হায়েনা, তাজা মাংস দেখেও দূরে কেন? তুমি তো মন বোঝ না, মাংস বোঝো। এসো বুকের মৃত্তিকায় হলি খেলো। লালা ঝরাও কুকুরের মতো। আমি কেন বাধা দেবো? আমি তোমার দখলে থেকে কেন বেদখলে থাকবো? এসেছি তো তোমায় আস্বাদন দিতে, তুষিতে। মায়া তো বোঝো না, কায়াই দেখো। আকাশ কাঁপানো বিদ্যুতের চমক।

গোলাপী ঠোঁট দুটো ওর কাঁপছে। চোখ দুটো জলে টই-টুম্বুর হবে বোধ হয়। অনুপম ধরা খেয়ে গেলো, ভাবলো, একটু দুষ্টমিও বোঝো না? স্বামীর থেকে এমন কথা ও ইঙ্গিত স্ত্রীর জন্য আশাতীত, অকল্পনীয়? বুঝেছি, বেশি ধরা দিয়ে ভুল করেছি। হৃদয়ের সবটুকু শক্তি দিয়ে বাঁধলাম, আর আজ এতো কথা বিনিময়ে শুনিয়ে দিলে? বাইরের চোখ অপেক্ষা তোমার ভিতরের চোখটা আরও বেশি দুর্বল। তোমার পাহাড়সম উচ্চ হৃদয়টা, সাগরের মতো গভীর মনটা আর উদার আকাশের মতো বিশালতর ভালোবাসার হৃদয় এই নির্ণয় করলো?

এমন অজস্র প্রশ্ন ওর মনে দানা বাঁধলো। সামনের বাস্তব ওকে বিবর্ণ করে দিলো। বীভৎস যেন ও প্রাপ্তির চোখে। অনুপম ঘুরে বিড়ালের মতো সন্তর্পণে বাইরে চলে গেলো।

ধূসর প্রান্তর। সূর্যের নির্দয় খরতাপে চৌচির ধরিত্রী। শুষ্ক বায়ু। নিষ্ঠুর আকাশ। ধূধূ বিস্তীর্ণ বৃক্ষহীন প্রান্তর। প্রকৃতি মৃতপ্রায়। ধীরে ধীরে সুন্দর ধরিত্রী যে এগুচ্ছে মারাত্মক মরুময় এক অধ্যায়ের দিকে এ তারই চিত্র। লু লু হাওয়া এসে লাগছে অনুপমের শরীরে। অপ্রীতিকর ঘটনা আর বিড়ম্বনায় আজ তার ঝুলি ভরে গেছে।

পিছন থেকে অলসভঙ্গিতে চেয়ে থাকে অনুপমের দিকে প্রাপ্তি। দীপ্ত চেহারা মলিনপ্রায়। হাসির ফোঁয়ারা যার ঠোঁটে থাকতো তার চেহারা আজ একেবারে মলিন। বুকটা হু হু করছে। কেউ যেন পাজড় খালি করে চলে গেছে। মনের কলকল বহমান নদীর সব তরঙ্গ থেমে গেছে। সম্পর্কের যে শ্বেতপত্র সেখানে যেন অবিশ্বাসের কালো দাগ। ছত্রাক আর শ্যাওলা। তবুও নীরব নিরুত্তাপ মানুষ অনুপমের জন্য হৃদয়ে মায়ার উদ্রেক হলো প্রাপ্তির। বুকের পাজড়ে না জানা গুমোট ব্যথাটা ধোঁয়ার মতো ঘুরপাক খাওয়া সত্ত্বেও ও স্বামীর দিকে এগুচ্ছে। যেন রহস্যময়ীর রং ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। অনুপম কাঁধে কোমল হাতের ছোঁয়া পেলো। এ কারোর হাত নয়, মনোরমার হাত। না ফিরেই অনুপম বললো, হাত সরাও।

প্রাপ্তির হাতটি অজান্তেই সরে গেলো। অনুপম বললো, যাও, সরে যাও। শিয়াল-কুকুরের কাছে থেকো না। বিবেককে প্রশ্ন করো তো, তুমি যা বলো আমাকে খুন করার জন্য কি যথেষ্ঠ নয়?

প্রাপ্তি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো। অনুপম আবারও বললো, কত বেশি কার্পণ্য তোমার মাঝে বুঝতে বাকি নেই। উজাড় করে দিয়েও দাও না। জানো বক্রোক্তি। কেন দেখিয়েছিলে পূর্ণিমার আলো, ভালোই তো ছিলো আমার কৃষ্ণপক্ষের অমানিশা। হাড়-মাংস-মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে প্রণয়াশ্রিত কামনার বিষ। গভীর বেদনায় নীলাভ শিখা চোখের সামনে। তোমার তীক্ষ্ণ আর সূচালো কথাগুলো করাতের ফলার মতো হয়ে হৃদয়টাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে। তোমার সাথে সখ্যতা রাখা যায় না। কেবল বৌ তুমি আমার। আর কিছু নও।

প্রাপ্তি পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। কত ভারী ভারী কথা বলছে আজ অনুপম। সর্ব শরীর ওর অবশ হয়ে গেছে। বাক্য বর্ষণে লাগাম টানার কথা থাকলেও টানেনি সে। আর আজ তাই এই পরিস্থিতির সম্মুখীন সে। প্রাপ্তির না যাওয়া দেখে অনুপম নিজেই সরে গেলো। আকাশ ভেঙে পড়লো যেন প্রাপ্তির মাথায়। চোখে জল চলে এলো। কান্না করতে দেখলেই অনুপম বলতো, কান্না আরও করো, কান্না করলে চেহারায় সৌন্দর্য বাড়ে।

তারপর কান্না রেখে অভিমান করতো, অভিমান দেখে অনুপম বলতো, যতই অভিমান করো না কেন আগে ক্ষমা তোমাকেই চাইতে হবে।

আজ ছোট বিষয় অনেক বড় হয়ে গেছে। অভিমান না, রাগ; প্রচণ্ড রাগ। সম্পর্ক থেকে অভিমান, খুঁনসুটি হ্রাস পেয়েছে, সম্পর্কে বিরাজ করছে রাগ, ক্রোধ, ক্ষোভ। যত্ন না জানলে কোন কিছুই ঠিক থাকে না, হোক জিনিসপত্র বা সম্পর্ক।

শাশুড়ি মা বৌমার নিষ্প্রভতা দেখে বললেন, কি হয়েছে, মা?

প্রাপ্তি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললো, না মা, কিছু হয়নি।

মা বললেন, বুঝেছি অনুপ কিছু বলেছে। আমার ছেলের খুব ছেলেমি আছে। আবার রেগে গেলে চেনা যায় না। ওর ছেলেমি সহ্য করতে পারলে খুব ভালো, আর রেগে গেলে খুব খারাপ।

প্রাপ্তি বললো, কিছু থেকে কিছু হলেই যদি রেগে যায় তবে কি করে হবে, মা?

মা বললেন, আগুনে জল দিলে তার সমস্ত দাহ হিমশীতল হয়ে যাবে; যখন সে রেগে যাবে তখন তার কথা শুনবে। বলছি না ওর বশীভূত হয়ে থাকো, তবে সময়ে বশীভূত হলে সময় তোমার হাতেই থাকবে।

কিছুক্ষণ পর অনুপম বাড়ি এলে মা ধরলেন। বললেন, বৌমাকে কষ্ট দেওয়া সহজ বলেই কষ্ট দিবি? ও আমার বৌমা না, মেয়ে।

অনুপম বললো, তোমার বৌমার সাথে আমার কিছু ঘটেনি, মা। আর ওকে কষ্ট দেবো কেন?

মা বললেন, তোদের মাঝে অঘোষিত যুদ্ধ চলছে, আমি সব বুঝতে পারছি। সব মিটমাট করে ফেল্।

অনুপম বললো, যুদ্ধ? যার শুরু নেই তার শেষ কি করে হয়? আমরা ঠিক আছি, মা।

মা বললেন, আমার সংসারে কোন গুমড়া মুখের ঠাঁই নেই। সবার মুখে সব সময় হাসি দেখতে চাই।

সন্ধ্যায় মনমরা হয়ে বসে আছে প্রাপ্তি। কাজের মেয়ে মালিকা এলো। সে বাড়ি দেখাশোনা করে, রান্না করে দেয়। কুঁচিয়ে শাড়ি পরেছে, দেখেই গায়ে জ্বালা দিয়ে উঠলো প্রাপ্তির। মন ভালো থাকলে সবাইকে দেখলেই ভালো লাগে। মন খারাপ থাকলে সুন্দর দেখলেও খারাপ লাগে। প্রাপ্তি বললো, কি জন্য এসেছিস?

মালিকা বললো, বৌদি, মাছ দিয়ে পটল দিয়ে রান্না করবো, না পটল ভাজবো? মাছ দিয়ে বেগুন দিয়ে রান্না করবো, না বেগুন ভাজবো? না, পটল, বেগুন, মাছ একত্রে রান্না করবো?

এতো হিসাব প্রাপ্তির মাথায় খেললো না, বললো, আজ তোর ছুটি। আমি রান্না করবো।

মালিকা নাক সিটকে চলে গেলো। বেশ রাতে ফিরলো অনুপম। প্রাপ্তি তার জন্য প্রিয় প্রিয় খাবার রান্না করে রেখেছে। দেখেও না দেখার ভান করলো অনুপম। প্রাপ্তি বললো, আমি তোমার শখ সাজিয়েছি সামনে। যেন তুমি দেখছোই না, উন্মনা।

অনুপম বললো, শখের খাবারে শখ নেই। শখের জনেও বিতৃষ্ণা। সব বিষ বিষ বোধ হচ্ছে।

প্রাপ্তি বললো, তাকাও, চোখে তাকাও, হৃদয় লুটপাট হয়ে যাবে, তাকাও।

অনুপম বিরক্ত হয়ে বললো, সংযত হও, শরীরী আগুন জ্বেলে আর অঙ্গার করতে পারবে না। নেশা ধরিয়ে লাভ নেই, আমার মাদকতা নেই।

প্রাপ্তি স্থির হয়ে শুনলো। আর বললো, তোমাকে নেশা ধরানোর ইচ্ছা আমার নেই। থাকো তুমি শুল্কাপক্ষের ধবল জ্যোৎস্নায়। কৃষ্ণপক্ষের তারার প্রদীপই আমার যথেষ্ট।

প্রাপ্তির চোখে জল এলো। দেখে অনুপম বললো, একই অস্ত্র বারবার ব্যবহার করলে অস্ত্রের ধার কমে যায়। একই অস্ত্র কারও হৃদয়ে বারবার রেখাপাত করে না।

প্রাপ্তি বললো, কান্না করে জেতার ইচ্ছা আমার নেই। কান্না আমার অস্ত্রও না। তোমার জয় হোক, তোমার জেদের জয় হোক, তোমার হিংসার জয় হোক। আমার ক্ষত, বেদনা, ব্যথা গতকালের পেপার ভেবে কেজি দরে বিক্রি করে দেবো।

প্রাপ্তি ওখান থেকে সরে গেলো। ড্রেসিং টেবিলে সাজতে বসলো। অন্যদিন ও সাজতে বসলে অনুপম পিছন থেকে এসে হাজারও খুঁনসুটি করতো। আজ সাজতে বসা দেখে অনুপম দূর থেকে ভাবলো, ওর মন আজ কত খারাপ, অথচ সাজতে বসেছে। খুব শক্ত মনের ও। সত্যিকারের ভালোবাসার মূল্য বোঝে না। ওর জন্য দরদ দেখাবো না। কাউকে নিজের থেকে বেশি ভালোবাসলে কটাক্ষ আচরণ পেতে হয়।

প্রাপ্তি ভাবলো, একটু সাজলে ও চোখ থেকে চোখ নামাতো না। অথচ আজ চেয়েও দেখছে না। থাক, না দেখুক। হয়েছি না হয় অভাগা, তাই বলে সাজবো না? হয়েছি না হয় একটু কুঁজো, তাই বলে কি চিৎ হয়ে শুতে পারবো না?

কাজ করতে করতে অন্যমনস্ক হয়ে অনুপম বললো, এই রাতে কোথাও যাবে নাকি?

প্রাপ্তি বললো, সাজতে দেখলেই কি মনে হয় ঘুরতে যাবো? আমার কি খুব বিনোদনের দরকার? গাঙচিল মন তোমার, তুমি উড়ে বেড়াও নীলে নীলে।

না খেয়ে অনুপম ঘুমিয়ে গেলো। প্রাপ্তি বললো, মালিকা রান্না করেছে। যত অভিমান তো আমার উপর। আমার হাতের রান্না না। দুটো খেয়ে ঘুমাও।

চোখের কোণে জল জমেছে প্রাপ্তির। তা দেখে অনুপম বললো, বাচ্চা মানুষ? এতো মায়া কান্না কেন?

চোখের জল আর ধরে রাখতে পারলো না প্রাপ্তি। অবাধ্য জল চোখের বাধা অগ্রাহ্য করে পল্লব ডিঙিয়ে বের হতে লাগলো অঝোরে। অনুপম বললো, কি মুশকিল! কান্না করে সাময়িক ভাবে জয় পাওয়া যায়। দীর্ঘ মেয়াদী জয়ের জন্য কান্নার চেয়ে বড় হলো প্রীতি। যা তোমার ভেতর নেই, অর্জনেরও চেষ্টা করোনি।

প্রাপ্তি বললো, এতো শক্ত শক্ত কথা বলো কি করে? এতো শক্ত শক্ত কথা শিখলে কি করে? এমন আচরণ করতে কি তোমার ঠোঁট কাঁপে না?

অনুপম বললো, তুমি শিখিয়েছো। আমার হৃদয়টাকে পাথর করে দিয়েছো। ডিনামাইটেও ফাঁটবে না।

প্রাপ্তি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো, তোমার জীবনে এতোই যদি আমি নিষ্প্রয়োজনের হই, আমি তোমার সাথে আর থাকবো না। কালই মায়ের কাছে চলে যাবো।

অনুপম বললো, যাও, তোমাকে বাধা দেওয়ার সে অধিকার আমি হারিয়েছি। তোমার জন্য হৃদয়ে আমার মায়া নেই। আমার হৃদয় শুকিয়ে মরু হয়ে গেছে।

প্রাপ্তি বললো, সত্যি আমাকে হারাবার ভয় তোমার নেই? আমার শূন্যতা তোমাকে ভাবাবে না?

অনুপম দৃঢ়চিত্তে বললো, না।

প্রাপ্তি এবার বললো, তবে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবে না। আমি ঘুমিয়ে গেলে আমার গায়ে হাত দেবে না। অফিসে যাওয়ার আগে কই তুমি কই তুমি করবে না। আমি কেন হাসি বা মলিন থাকি জানার চেষ্টাও করবে না। আর হ্যাঁ, আমি যখন স্নানাগারে যাবো, পিছ পিছ ঢুকবে না।

সকালে ঘুম থেকে উঠে অনুপম নিজেকে তৈরি করছে। নিজে এতোই ব্যস্ত যে পাশে পাশে যে প্রাপ্তি আছে খেয়ালেই নেই। প্রাপ্তি দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, সারাদিন সুন্দর সুন্দর মেয়ে দেখো তো আমাতে তোমার মন ভরে না। কত অগুরুত্বপূর্ণ আমি। অন্য মেয়ের মাঝে যা দেখো আমার মাঝে তা পাও না তো। এক শার্ট যেমন দুইদিন পরলে ভালো লাগে না। এক নারীতেও পুরুষের মন ভরে না। নতুবা তুমি রাগ করলে আমি রাগ ভাঙাতে পারি না কেন? তুমি অভিমান করলে আমি অভিমান ভাঙাতে পারি না কেন? হতে পারি আমি নারী, কিন্তু আমার ভিতর নারীত্ব নেই। হতে পারি আমি নারী, কিন্তু তোমার জীবনে ফুল হয়ে ফুটতে পারিনি।

অনুপম বললো, মানুষ সুখে থাকলে ভুলে যায় অসুখ কি! মানুষ ভুলে যায় তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি কি! শ্রেষ্ঠ মুকুটের জন্য মানুষ দৌড়ায়। অথচ অনাদরে পাশেই পড়ে থাকে কত শ্রেষ্ঠ সম্পদ। একান্ত ক্ষণে এক মনে ভেবে দেখো, আমি না থাকলে কি তোমার মূল্য, কি তোমার জীবনের মধ্য গগনের মূল্য? জীবনের জন্য জীবন, জীবন্মৃতের জন্য জীবন নয়।

প্রাপ্তি বললো, আমরা কেউ কাউকে উজাড় করে ভালোবাসিনি। আমরা কেউ কাউকে সহ্য দিয়ে গ্রহণ করিনি।

অনুপম বললো, ভুল। আমি তোমাকে যত কাছে করতে চেয়েছি তত তুমি সরে গেছো। যত ধরতে চেয়েছি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ফিরেছি। তোমাকে ভেবেছি সঙ্গিনী, তুমি নিজেকে মনে করেছো দেহবিলাসী।

বিমর্ষচিত্তে প্রাপ্তি বললো, তুমি ধরতে চেয়েছো, আমি ধরতে দিইনি, আমি কী অধরা? তুমি দখল করতে চেয়েছো, আমি দখলদারিত্ব দিইনি, আমি কী বেদখলে?

অনুপম বললো, আকাশটা শূন্য সঙ্গিহীন, আমিও শূন্য সঙ্গিহীন। তুমি আমার সম্মুখে অস্তিত্বসর্বস্ব, নামে নামে।

প্রাপ্তি বললো, বুঝেছি, যত দোষ আমার। আমার মন অসুন্দর। আমি চেহারাতেও তো অসুন্দর। অসুন্দর কখনো কারও কামনার বস্তু হতে পারে না।

অনুপম বললো, তোমার শত্রুও কখনো তোমাকে অসুন্দর বলতে পারবে না। সুন্দরী মেয়েরা সহজে কাউকে কাছের করে না। সহজে কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসাটা দেয়ও না। তাই ভালোবাসাটা কি জানেও না।

এমন মুহূর্তে মা এলেন। এসেই বললেন, তখন থেকে তর্কতর্কি করছিস। আমার সংসারে কোন তর্কতর্কি চলবে না। কোন অশান্তির বাস আমার সংসারে চলবে না। অনুপ, যা বৌমার হাতটা ধর্।

অনুপম বললো, মা, আমাকে আরও সময় দাও, আরও একটু সামর্থ্য হোক, তবেই না হয় ওর হাত ধরবো।

মা বলরেন, বৌমা, তুমি যাও, অনুপের হাত ধরো।

প্রাপ্তি বললো, মা, আরও একটু না হয় নিজেকে উন্নত করি, তবেই না হয় হাত ধরি, যেন সে হাত ধরার অমর্যাদা না হয়।

মা বললেন, পরস্পর পরস্পরকে সহ্য করো। কথাতেও আনো সৌন্দর্য। বৌমা, যাও, ওকে খেতে দাও। অফিসে যাবে।

খেতে বসে অনুপম বললো, গতরাতে বললে তো মায়ের কাছে যাবে, থাকবে না এখানে। মায়ের কাছে কখন যাচ্ছো?

প্রাপ্তি আশ্চর্য চোখে অনুপমের দিকে তাকালো আর বললো, গেলে খুশি হবে তো?

অনুপম বললো, ঘরের পোষা প্রাণীটির প্রতিও মায়া জন্মে। আর তুমি তো বৌ। যেতে চাচ্ছো, বাধা দেবো না। না গেলে বুঝবো আমার মায়ারও দাম আছে।

প্রাপ্তি বললো, আমার জন্য তোমার কোন দরদ নেই। কোন মায়াও নেই। সব নামে নামে। তুমি তুমি করেছি তো, এই তুমিটাই আমার সুখটুকু কেড়ে নিচ্ছে। যাকে নিয়ে গর্ব করেছি, সেই-ই আমার খুশিটুকু কেড়ে নিচ্ছে।

প্রাপ্তি ঘরে চলে গেলো। নিজের জিনিসপত্র সব গোছাতে লাগলো। আর অনুপমের শার্ট, প্যান্ট সামনে এলেই দূরে ছুঁড়ে মারতে থাকলো। যাকে অসহ্য লাগে তার ব্যবহৃত জিনিসও অসহ্য লাগে। পিছন পিছন অনুপম এলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনোরমার রাগাগ্নি মুখটা দেখছে। প্রাপ্তি অনুপমকে না দেখার ভান করে বললো, যাবো তো যাবোই। আর কোন দিন আসবো না। যে বাঁধনে বল নেই সে বাঁধনে মিছে জড়িয়ে থেকে লাভ নেই।

অনুপম প্রাপ্তিকে আরও দেখিয়ে দিচ্ছে, এটাতো নিলে না। ওটা নাও। ঐ যে নিচে একটা শাড়ি থেকে গেলো।

প্রাপ্তি ব্যাগ গুছানো বাদ রেখে বললো, তুমি কত নিষ্ঠুর? একটি বার আমাকে বাধাও দিচ্ছো না, বরং চলে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছো!

অনুপম বললো, তুমি সহজে পালাতে পারবে না, পোষা পাখির মতো তোমাকে পালা যাবে।

প্রাপ্তি বললো, তোমার ধারণা ভুল। আজ অফিস থেকে এসে দেখবে আমি নেই। তখন খালি বাড়িতে মহোৎসব করতে পারবে।

অনুপম বললো, যাও। গেলেই বুঝতে পারবে আমার প্রয়োজনীয়তা।

প্রাপ্তি বললো, যাবই তো। আমাকে আড়ালে রাখতে পারলে তো তোমার যত শান্তি। আর তাই মায়ের কাছে যেতে চাইলেও বাধা পাই না। আমি রাগ করলে আমার রাগ নিয়েই আমাকে থাকতে হয়, আমার রাগ ভাঙাও না। আমি এখন একাই থাকবো। আমার আর সেই তুমিটা নেই, এই তুমিটা নিয়ে আমি থাকতে পারবো না।

এই বলে প্রাপ্তি আবার কান্না জুড়ে দিলো। অনুপম বললো, রাবণের অস্ত্রের চেয়েও বড় অস্ত্র তোমার কান্না নামক অস্ত্র, কিন্তু সে অস্ত্রের ধার আমি সহ্য করা শিখে গেছি।

প্রাপ্তি বললো, ধরে রাখার টানটা শুরু থেকেই দেখেছি তোমার ভিতরে নেই। যখন কেউ বুঝে ফেলে কেউ পালাতে পারবে না, তখন তার উপর কষাঘাত করা সহজ। যখন কেউ বুঝে ফেলে, কোন নারী তাকে খুব ভালোবাসে তখন সেই নারীর প্রতি টান কমে, অসুন্দর মনে হয়, হয়ে যায় চরম অপছন্দের। তখন তার কোন কাজ এমন কি, হাসিও ভালো লাগে না। কাউকে অধিক গুরুত্ব ও ভালোবাসা দিলে মূল্যহীন হয়ে যেতে হয়। আজ মূল্যহীন হয়ে গেছি।

অনুপম বললো, তুমি ভালোবাসাটায় বোঝো না। অতিরিক্ত ভালোবাসা তোমার হজম হয় না।

প্রাপ্তি বললো, তোমার মতো করেই নিজেকে তৈরি করেছি। তোমার অন্যায় আবদারে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। তোমার বাড়াবাড়ির মধ্যেই সুখ খুঁজেছি। তোমার জেদের কাছেই হেরে থেকেছি। তোমার হাসি মুখের জন্য তোমার দোষ না দেখে, তোমার বেখেয়ালিপনাকেই মেনে নিয়েছি। তোমার বাড়-বাড়ন্তকে তুমি কি ভালোবাসা বলো? তোমার অতিরিক্ত ভালোবাসা না, তোমার অতিরিক্ত কর্মকাণ্ড আমি হজম করেই যাচ্ছি।

কথাগুলো শুনে অনুপমের খুব রাগ হলেও চুপ থাকলো। দুটি মনে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সব কিছু উলোট-পালোট করে দিচ্ছে। পরস্পর পরস্পরের কত কাছে অথচ দুই মনে কত দূরত্ব। অনুপম প্রাপ্তির হাত ধরলো। হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো প্রাপ্তি। অনুপম হাত ছাড়লো না। বললো, তুমি না বললে আমার জেদের কাছে হেরে থাকছো, তবে হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছো কেন, আমি হাত ছাড়বো না।

প্রাপ্তি বললো, যে হাত ধরার মধ্যে মাধুর্য নেই, প্রতিশ্রুতি নেই, সে হাত ধরাতে তুমি সুখ পেতে পারো, আমার তাতে সুখ নেই।

অনুপম এ কথা শুনতেই হাত ছেড়ে দিলো। কপালে চিন্তার রেখা। প্রাপ্তি বললো, রশি তো তোমার হাতেই, ঘুড়ির জন্য এতো চিন্তা করে কি হবে?

অনুপম বললো, রশি দিয়ে ঘুড়ি বেঁধে রাখা বীরপুরুষের কাজ না। তুমি ঘুড়িই, আমার আকাশে উড়বে, কিন্তু রশি বাদেই।

প্রাপ্তি বললো, ঘুড়ির উড়ে যাওয়ার ভয়টা যদি মনের মধ্যে থাকতো, তবে ঘুড়ির প্রতি অবিচার কমই করতে।

অনুপম আশাহত হয়ে বললো, যত দোষ আমার, যত অপরাধ আমার। তোমার কষ্টের কারণ আমি। তোমার দুঃখের কারণ আমি। আমার জন্য তোমার চোখে জল আসে। আমার জন্য তোমার চোখের ঘুম চলে যায়। আমি তোমায় পুড়িয়ে অঙ্গার করি। আমার জন্যই যত তোমার অপেক্ষায় দহন। কত কত দোষ আমার মধ্যে! কপাল আমার, মনের মতো মানুষ পেতে ভাগ্য লাগে।

প্রাপ্তি বললো, তোমার দুর্ভাগ্য হয়ে থাকবো না আমি।

অনুপম বললো, যাওয়ার জন্য যে যাওয়া নয়, আসার জন্য যে যাওয়া, সে যাওয়া তো যাওয়া না।

একথা শুনে প্রাপ্তির এতো খারাপ লাগলো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। শুধু চোখ তুলে একবার অনুপমকে দেখলো।

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে দেখে প্রাপ্তি বাসায় নেই। ঘর-বাইর-পাড়ায় কোথাও নেই। একটি মানুষ বাড়িতে নেই, অথচ মনে হচ্ছে বাড়িতে কেউ নেই। মাংস রান্না করা আছে, অথচ একগাল ভাতও ও খেতে পারলো না। রাতে টেলিভিশনে যে অনুষ্ঠানটা সে নিয়মিত দেখে সেটিতেও মন বসাতে পারলো না। তার মা তাকে কড়া ভাষায় বললো, বৌমাকে রাতেই ঘরে ফিরিয়ে আনবি।

অনুপম শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় কত কিছুই সাথে নিতো, আজ একেবারেই খালি হাতে গেলো; নিজেও একটু সাজেনি, দিগভ্রান্তপ্রায়। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ। শ্বশুর-শাশুড়ি দরজা খুলতে চাইলেও প্রাপ্তি দরজা খুলতে দিলো না। বারবার অনুপম বলছে, প্লিজ, দরজাটা খোলো।

দরজা খুললো না তো খুললোই না। কত নারীই বাইরে থেকে এভাবে দরজাতে টোকর দেয় পুরুষ দরজা খোলেই না। এই প্রথম কোন নারী দরজা দিয়েছে, পুরুষ দরজা খোলার জন্য বাইরে থেকে আর্তনাদ করছে।

গদখালী, ঝিকরগাছা, যশোর, বাংলাদেশ থেকে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev