| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মাস্টারদাকে আমরা মনে রেখেছি কি?

Reporter
পেজ ফোর, বিশেষ প্রতিনিধি / ৫০৮ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৩

বিয়ের রাত, মাস্টারদা এসেছেন বিয়ে করতে। বিয়ের মন্ত্র পড়া হবে, এমন সময় হঠাৎ পাশ থেকে একজন মাস্টারদার হাতে গুঁজে দিল একটু চিরকুট। চিরকুট পড়ে খুবই চিন্তিত ও গম্ভীর হয়ে গেলেন মাস্টারদা। গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এসেছে কলকাতার দলের উচ্চমহল থেকে। ফুলশয্যার রাতে নির্জন কক্ষে সহধর্মিণী পুস্পকে বললেন “তোমার কাছে আমার অপরাধের সীমা নেই। তুমি আমার অগ্নি সাক্ষী করা স্ত্রী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তুমিই আমার স্ত্রী থাকবে। দলের গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমার ডাক এসেছে। আজ-ই তোমার কাছ থেকে আমাকে বিদায় নিতে হবে।” অশ্রুসিক্ত নয়নে মাস্টারদাকে বিদায়  দিয়েছিলেন নব বিবাহিতা স্ত্রী পুস্প। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন মাস্টারদার চিঠি পাবে কিনা।

কথা রেখেছিলেন মাস্টারদা। চিঠি আসতো পুস্পর কাছে, খুব গোপনে। সে চিঠি শুরু হতো “স্নেহের পুস্প” দিয়ে আর শেষ হতো  “তোমার-ই সূর্য” দিয়ে।

আর দেখা হয়নি স্বামী স্ত্রীর? হয়েছিল, পুস্প যখন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, মৃত্যু পথযাত্রী, সূর্য তখন জেলে। প্যারোলে কয়েক ঘণ্টার জন্য ছাড়া পেয়ে স্নেহের পুস্পকে দেখতে এসেছিলেন মাস্টারদা। কিন্তু তার আগেই জীবনদীপ নিভে গেছে পুস্পর।

একটা ঘটনা মনে পড়ছে। যদিও বইতে পড়া। তবুও তা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়! মুঠো ফোনের দৌলতে অনেকের চোখেও হয়তো পড়েছে ঘটনাটি। কীন্তু অনুধাবন করেছি কি? চিটাগং জেল, ১১ জানুয়ারি ১৯৩৪ সাল। এক কয়েদি সন্ধে সাতটার সময় চিঠি লিখছেন। আর ৫ ঘণ্টা পরেই তাঁর ফাঁসি। কী লিখছেন? — ‘ফাঁসির রজ্জু মাথার ওপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলেছে। এইতো ‘সাধনা’র সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতির এই তো সময়। চলে যাওয়া দিনগুলোকেও স্মরণ করার এই তো সময়।’

১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩

পলাতক সূর্য সেনকে গৈরালা গ্রামে নিয়ে এসেছেন বিপ্লবী ব্রজেন সেন। মাষ্টারদার সাথে রয়েছেন তার একান্ত অনুগত শান্তি, কল্পনা দত্ত, সুশীল ও মণি দত্ত। তাঁরা ছিলেন গ্রামের বিশ্বাস বাড়িতে, পরম যত্নে আগলে রেখেছিলেন সে বাড়ির বড়বধূ ক্ষিরোদপ্রভা ।

বেশ ছিলেন কিন্তু বিপদ এলো অন্য দিক দিয়ে। প্রতিবেশী নেত্র সেনের সন্দেহ হলো কারা আছে বিশ্বাস বাড়িতে? কিসের এত ফিসফাস গুঞ্জন। খবর লাগাতে বললেন নিজের গিন্নিকে ।

গ্রাম্য বধূটি সরল মনে এসে বললো ও বাড়িতে সূর্য সেন লুকিয়ে আছে গো! অমন লোককে খাওয়ালেও যে পূণ্যি লাভ!

শুনে লাফ দিয়ে উঠলো নেত্র। খবর দিলেই যে কড়কড়ে দশ হাজার টাকা! বউকে আশ্বস্ত করে ব্যাগ হাতে তখনই বেরিয়ে পড়লো, সোজা উঠলো গিয়ে থানায়।

সেদিন রাতে ঘুম ভাঙতে চমকে উঠলো ব্রজেন , জানলা দিয়ে লণ্ঠন দেখিয়ে কি করছে দাদা নেত্র সেন? এক মিনিটও লাগলো না বুঝতে, ছুট লাগালেন বিশ্বাস বাড়ির দিকে। দেরী হয়ে গেছে ততক্ষনে, ক্যাপ্টেন ওয়ামসলের নেতৃত্বে গোটা বাড়ি ঘিরে ফেলেছে গোর্খা সেনার দল। রকেট বোমার আলোতে সবকিছু দিনের মতো স্পষ্ট।

পরদিন সমস্ত সংবাদপত্রের হেডলাইন… গৈরালা নামক গ্রামে সূর্য সেন গ্রেফতার। এনাকে ধরবার জন্য সরকার দশহাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করিয়াছিলেন। ( অমৃতবাজার পত্রিকা ১৭.২.১৯৩৩)

শোনা যায়, শেষ দিনগুলোতে জেলে থাকার সময় মাস্টারদা সূর্য সেন এর একদিন গান শোনার খুব ইচ্ছা হলো। সেই সময় জেলের অন্য এক সেলে ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। রাত ১১টা-১২টার দিকে কল্পনা দত্ত তাঁকে চিৎকার করে বলেন, “এই বিনোদ, বিনোদ, দরজার কাছে আয়। মাস্টারদা গান শুনতে চেয়েছেন।” বিনোদ বিহারী গান জানতেন না। তবুও সূর্য সেনের জন্য রবি ঠাকুরের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ গানটি গেয়ে শোনালেন।

১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মমভাবে অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা হাতুড়ি দেয় তাঁদের দাঁত ভেঙে দেয় এবং তাদের হাড়-ও ভেঙে দেয়। এরপর তাঁরা অজ্ঞান হয়ে গেলে, নিষ্ঠুরভাবে অর্ধমৃত দেহ দুটি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের দেহ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি। হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী দাহ করাও হয়নি। ফাঁসির পর তাঁদের মরদেহ জেলখানা থেকে ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে বুকে লোহার টুকরো বেঁধে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন কোনো এক জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়।

এবার ফিরে যাচ্ছি এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগের পরিস্থিতিতে। মাস্টারদা তখন লিখছেন চিঠি। অনুরোধ জানাচ্ছেন আগামী প্রজন্মের কাছে — “চট্টগ্রাম বিপ্লবের কথা কোনো দিন ভুলো না। জালালাবাদ, জুলদা, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সবসময় স্পষ্টভাবে স্মরণ করো।” মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আরও নিজেকে ব্যক্ত করছেন এভাবে — ‘কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। প্রিয় ভাইবোন আমার, প্রিয় দেশবাসী;’ হায় বিপ্লবী!

দুই

১২ জানুয়ারি। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। ২০২৩ সালে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হলো দিনটি। কলকাতায় একাধিক ওয়ার্ড থেকে মিছিল বের হলো, ছোটো শিশুরা স্বামীজির সাজে সুসজ্জিত হয়ে রাস্তায় হাঁটলো, বিবেকানন্দের নামাঙ্কিত পার্কগুলি আলোয় সেজে উঠল। ত্যাগের প্রতিক ‘গেরুয়া’ রং নিয়ে বেশ জোরে দড়িটানাটানিও হলো। ‘নরেন’ নামের সঙ্গে শ্রুতিমাধুর্যে যোগ আছে বলে কর্মক্ষেত্রও “তাঁরা” একই গোত্রীয় বলে বেশ প্রচারও হলো। কিন্তু আমরা ভুলে গেলাম আর এক ১২ জানুয়ারিকে। আমরা ভুলে গেলাম যে দেশপ্রেমের ধ্বজা উড়িয়ে আজ ভোট রাজনীতি অনেকাংশে আবৃত সেই দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিঃস্বার্থভাবে শহীদের বলিদানকে।

১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় এক গরিব পরিবারে সূর্য সেনের জন্ম। পিতা ছিলেন রাজমণি সেন এবং মাতা শশী বালা সেন। রাজমণি সেনের দুই ছেলে আর চার মেয়ে ছিল। সূর্য সেন ছিলেন চতুর্থ সন্তান। খুব শৈশবে পিতা-মাতাকে হারিয়ে তিনি কাকা গৌরমণি সেনের কাছেই মানুষ হন। সূর্য সেন ছেলেবেলা থেকেই খুব মনোযোগী ভালো ছাত্র ছিলেন এবং ধর্মভাবাপন্ন গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। চট্টগ্রামে স্কুল জীবনের পাঠ শেষ হবার পর তিনি ন্যাশনাল হাই স্কুলে ভর্তি হন। চট্টগ্রামের নন্দনকাননে অবস্থিত হরিশ দত্তের ন্যাশনাল স্কুল থেকে ১৯১২ সালে প্রবেশিকা পাশ করে চট্টগ্রাম কলেজে এফ.এ-তে ভর্তি হন। এরপর তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ পাশ করে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের প্রধান আচার্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দেওয়ানবাজারে বিশিষ্ট উকিল অন্নদা চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত অধুনালুপ্ত ‘উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়’-এ অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এ সময় বিপ্লবী দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীরতর হয় এবং শিক্ষকতা করার কারণে তিনি ‘মাস্টারদা’ হিসেবে পরিচিত হন।

১৯১৬ সালে বহরমপুরে কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সূর্য সেন সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। বিপ্লবীদের গোপন ঘাঁটি এই কলেজে তিনি অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে আসেন। তিনি ‘যুগান্তর’ দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুর্য সেনকে তিনি বিপ্লবীর মন্ত্রে দীক্ষা দেন। ১৯১৮ সালে সূর্য সেন শিক্ষাজীবন শেষ করে চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন। এই সময়েই তাঁর সঙ্গে অম্বিকা চক্রবর্তী ও চারুবিকাশ দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর ‘যুগান্তর’ দলের সভাপতি হন মাস্টারদা। সহ-সহাপতি হন অম্বিকা চক্রবর্তী। সংগঠনের দায়েত্বে ছিলেন গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ।

১৯২০ সালে গান্ধিজির অনুরোধে বিপ্লবীরা তাঁদের কর্মসূচি এক বছরের জন্য বন্ধ রাখেন। সূর্য সেনও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯২২ সালে আন্দোলন প্রত্যাহার হলে বিপ্লবী দলগুলি-সহ সূর্যসেন আবার সশস্ত্র আন্দোলণে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সূর্য সেন বুঝেছিলেন ব্রিটিশ মিলিটারির সঙ্গে লড়াই করতে হলে অস্ত্র চাই। তাই তাঁর পরিকল্পনা ছিল চট্টগ্রাম শহরের অস্ত্রাগার লুঠ করা, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করা এবং তারপর সরকারি ও সামরিক বাহিনীর অফিসারদের ক্লাব ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলা চালানো। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের অস্ত্র-শস্ত্র লুঠ করা এবং রেলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পুলিশ অস্ত্রাগারে এবং লোকনাথ বাউলের নেতৃত্বে দশজনের একটি দল সাহায্যকারী বাহিনীর অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কিন্তু সেখানে শুধু অস্ত্রই ছিল, কার্তুজ ছিল না। এর মধ্যে ব্যারাক ভেঙে সৈন্যরা বেরিয়ে পড়ে। ফলে বিল্পবীরা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরাক্রমশালী ব্রিটিশ শক্তির হাত থেকে চট্টগ্রামকে স্বাধীন করার অসম্ভব এক স্বপ্ন বুকে নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিলেন সেদিনের বিপ্লবীরা। ভারতবর্ষের তুলনায় চট্টগ্রাম খুবই ক্ষুদ্র অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এখানের বিপ্লব নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা ব্রিটিশরাজকে। ভারতীয় সকল বিপ্লবীদের বিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগিয়ে সেদিন চট্টগ্রামে উড়েছিল ভারতীয় পতাকা। এ সময় মাস্টারদা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং অস্থায়ী সামরিক সরকার গঠন করেন। সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করা হয়। রাত ভোর হবার আগেই বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করেন এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা করেন।

কয়েকদিন পর পুলিশ বিপ্লবীদের অবস্থান চিহ্নিত করে। জানতে পারে তারা জালালবাদ পাহাড়ে অবস্থান করছে। জালাবাদ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন ১৪ বৎসর বয়সী টেগরা বল। এরপর আগে পরে একে একে বিপ্লবীরা যুদ্ধে প্রাণ হারাতে থাকেন। জালালাবাদের যুদ্ধে শহীদ হন মোট ১১জন বিপ্লবী। এঁরা হলেন।  টেগরা বল, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন, বিধু ভট্টাচার্য, মতি কানুনগো, প্রভাশ বল, শশাঙ্ক দত্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাস, মধু দত্ত জো পুলিন ঘোষ। এই দিনের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী জালালাবাদ পাহাড় দখল করতে পারে নি। তবে অবশিষ্ট বিপ্লবীদের নিয়ে সূর্যসেন রাতের অন্ধকারে জালালাবাদ পাহাড় ত্যাগ করেন। সূর্য সেনের নেতৃত্বে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিপ্লবীরা পার্শ্ববর্তী গ্রামে লুকিয়ে পড়েন ও কিছু জন কলকাতায় চলে আসতে সক্ষম হন।

১৯৩৪ সালে তারকেশ্বর দস্তিদার-সহ সূর্য সেনকে ব্রিটিশ সরকার ফাঁসি দেয়। মাষ্টারদা সূর্যসেন কে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়েছিল। আঘাতে আঘাতে মাষ্টার দা’র সব দাঁত সেদিন উপড়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ওরা ফাঁসি দিয়েছিল মাষ্টার দা’কে নয়, তাঁর রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত অচৈতন্য দেহটাকে। সাম্রাজ্য বাদী ব্রিটিশ সরকার তার মৃত দেহ ১৫ মন পাথর বেঁধে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়েছিল। সভ্য দেশের ফাঁসির আসামির লাশ আত্মীয় স্বজনদের কাছে ফেরত দেয়া হয়। সে সময়ের ব্রিটিশ গর্ভনমেন্টকে সভ্য জাতি হিসেবে না অন্য কিছু হিসেবে অভিহিত করা যেতেই পারে। বাংলাদেশে চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় কারাগারে সূর্য সেনের ফাঁসির মঞ্চটি স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

কিন্তু আমাদের কর্তব্য কি শুধু এটুকুই। পয়লা জানুয়ারি ‘নিউ ইয়ার’ ও ‘কল্পতরু’ উৎসব একই মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়, ঠিক এইভাবেই ১২ জানুয়ারিকে কি আমরা ‘স্বামীজির জন্মদিন’ ও ‘সূর্যদার মৃত্যুদিন’ হিসেবে সম মর্যাদায় পালন করতে পারি না? এটা ভাবার সময় এসেছে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev