প্রায় পাঁচশো বছর আগে জন্ম হয় মধ্যযুগের বাংলায় শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেবের। ফাল্গুন মাসের পূর্নিমা তিথিতে সন্ধ্যে নাগাদ শচীমাতা জন্ম দিলেন নিমাইয়ের। এই নামকরণ করেন অদ্বৈত আচার্যের স্ত্রী সীতাদেবী। অনেক সন্তানের অকালমৃত্যুর দুর্লক্ষণ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই নাম। নিম গাছের তলায় আর তিক্ত নামে যমের অরুচি ভেবেও হয়তো এমন নামকরণ। পাড়ার মেয়েরা ফর্সা রঙের ছেলেটিকে ডাকতেন গোরা বলে— তাই থেকেই গৌরাঙ্গ। পরে দীক্ষা শেষে শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্য— সংক্ষেপে চৈতন্য।
ফাল্গুনী পূর্ণিমা আমিস হইল প্রকাশ।।…..
সংকীর্তন সহিতে প্রভুর অবতার
গ্রহণের ছলে তাহা করেন প্রচার।। (চৈতন্যভাগবত, আদিখন্ড।।)

তাঁর জন্মলগ্নে দৈবযোগে চন্দ্রগ্রহণ হয়।।(চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা)। আবার কিছু সাহেব গবেষকরা ঘড়ি গুণে বলেছিলেন, ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুনের ওই দিনে পূর্নিমা তিথি ছিলো বটে, কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ ঘটেনি। যে তিথিতে নবদ্বীপের পূর্নচন্দ্র জন্মেছেন— তাতে রাহু-কেতুর দৃষ্টি পড়বে কী করে!!
সেই সময়ে একটি মানুষকেই বাঙালি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন— সেইজন্যই ‘গ্রহণ’ কথাটি এসেছে। স্নান করার সময়ে গঙ্গায় দাঁড়িয়ে অদ্বৈত আচার্য উচ্চস্বরে প্রার্থনা করতেন— প্রভু জগৎ যে পাপে মালিন্যে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো, তুমি এসে জগৎতারণ প্রভু তোমার সন্তানের রক্ষা করো। সেই আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে ধরাধামে আবির্ভূত হন চৈতন্যদেব।
দোল উৎসব মূলত ব্রজলীলার অঙ্গ। ‘রাধাকৃষ্ণের মিলিত তনু’ চৈতন্যদেবের হাত ধরেই সম্ভবত বাংলায় দোলযাত্রার সূচনা হয়। দিনটিকে তাই গৌড়পূর্ণিমা বলা হয়।

চৈতন্যদেবের অপ্রকটের পর তাঁর উত্তরসূরি ভক্তসমাজ এই দিনটিকে পালন করেন বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে। এই সময়ে হাজার হাজার ভক্তদের সমাগম ঘটে নবদ্বীপে। মঠে-আশ্রমে-ঠাকুরবাড়ীতে চলে নিরবিচ্ছিন্ন নাম সংকীর্তন, পূজাপাঠ ও শাস্ত্রালোচনা।
দোলের আগে সাতদিন, পাঁচদিন বা তিনদিন ধরে চলে নবদ্বীপ মন্ডল পরিক্রমা। গৌড় ভক্তবৃন্দ চৈতন্যদেবের প্রাক সন্ন্যাস পর্বে যে সকল স্থানে লীলা করেছেন (প্রায় ৭২ কিলোমিটার পথ) সেই সকল স্থানে সংকীর্তন সহযোগে অতিক্রান্ত করে। এতটা পথ হাঁটতে অক্ষম ভক্তদের চৈতন্যধাম নবদ্বীপের ভগ্ন দেউল, নদীর পাড়, প্রান্তর, পাড়া গাঁ ছুঁয়ে যাওয়ার রীতি ও প্রচলন আছে।
মহাপ্রভুর জন্মের স্থান আবীর, কুমকুম নয় বরং পঞ্চামৃত দিয়ে সাজানো হয়। দোল পূর্ণিমার সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ উঠলে শুরু হয় শাঁখ, পেটা, মৃদঙ্গ, মন্দিরার ধ্বনিতে প্রভুর মহাঅভিষেক পর্ব। চৈতন্যদেবের প্রতীক হিসেবে জগন্নাথ মিশ্রের গৃহে ‘রাজরাজেশ্বর’ শিলাকে ১০৮ ঘড়া জলে স্নান করানোর পর ষোড়শোপচারে অভিষেক বা অন্য জাত কর্মসূচির সঙ্গে বদলে যায় কীর্তন থেকে আরতির সুর। গৌরাঙ্গদেবকে পরানো হয় শিশুর লাল চেলি। লালচেলিতে ধামেশ্বর মহাপ্রভুর দুর্লভ দর্শন করতে আসেন অগুনিত ভক্তবৃন্দ শিশুর খেলনা নিয়ে। রুপোর থালা, বাটি, গ্লাসে ছাপন্ন রকমের ভোগ প্রভুকে অর্পণ করা হয়।

চৈতন্যদেব শাকান্ন খেতে ভালোবাসতেন। ভক্তরা তাঁকে কখনো কখনো দশের অধিক শাক রান্না করে খাওয়াতেন। মহাপ্রভুর অন্নপ্রাশনে তৈরি করা হয় শালিধানের ভাত, মোচার ঘন্ট, পটল-ফুলবড়ি ভাজা, নিম-বেগুন, কুমড়ো-বড়ি-মানকচু-আলু-থোড়-বার্তাকুর তরকারি, মুগ ও কলাই ডাল, কচুর শাক, বেগুনপাতুরী, ছানার রসা (ডালনা), ধোকার ডালনা, লাউ, চালকুমড়ো, পোস্ত দিয়ে হরেক রকমের পদ, কুল-তেঁতুল-আম-আমড়ার চাটনি, নারিকেলের পিঠে, ক্ষীরপুলি, পিঠাপানা, অমৃতমন্ডা ইত্যাদি। মহাপ্রভুর ভোগে পুঁইশাক, মুসুর ডাল, টমেটো নিষিদ্ধ।
মহারাজ গিরিশচন্দ্র দোলের সময় নবদ্বীপ আসতেন এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। এমনকি পথে কোথাও ধুলো দেখা গেলে রাজামশাই বিরক্ত হতেন। সংকীর্তনের মধুর ধ্বনিতে ও আবীরের ছোঁয়ায় মুখরিত হয়ে উঠতো নবদ্বীপ।
প্রাচীন জনপদ নবদ্বীপে উৎসবে বসতে লক্ষ্মী। নবদ্বীপ-মায়াপুরের দোল এখন আন্তর্জাতিক মহিমা সমৃদ্ধ। দোল উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে শুধু নয় বিদেশ থেকে আসে হাজার হাজার পর্যটক।

কেনা বেচা চলে মুদিখানা থেকে মিষ্টি, খাবার, জল, সানগ্লাস, ঔষধপত্র, নবদ্বীপের অতীত ঐতিহ্যের কাঁসার বাসনপত্র, তাঁতের শাড়ি, গৃহদেবতার পোশাক, গয়না ইত্যাদি। দোলের পনেরো দিন এই শহরে লক্ষাধিক বহিরাগতের আসা যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে এই দোলযাত্রা ।
নবদ্বীপ প্রকৃত অর্থে উৎসব নগরী। এখানকার দোলযাত্রায় খোল করতালের ধ্বনিতে রাধাকৃষ্ণকে আলাদা ভাবা যাবে না এখানে, চৈতন্যদেব যে ‘রাধিকার ভাব-কান্তি কবি অঙ্গীকার / নিজরস আস্বাদিতে করছি অবতার।’।।
তথ্যসূত্র : নবদ্বীপ মহিমা, বারিদবরণ ঘোষ এবং মৃত্যুঞ্জয় মন্ডলের পুস্তিকা।
ভালো লাগল
Dhonyobad
বেশ ভালো
থ্যাঙ্ক ইউ
তথ্য সম্মৃদ্ধ দোল উৎসব ও নবদ্বীপ উৎকৃষ্ট থচনা
ভালোলাগালো।
আন্তরিক ধন্যবাদ