যেকোন লোকশিল্প ও সংস্কৃতি আসলে স্থানীয় মানুষ ও শিল্পীদের অভিজ্ঞতার বিবরণ। যার মধ্যে তারা বড় হয়েছেন, কাজ করেছেন এবং বেঁচে আছেন স্বাভাবিকভাবেই তা সেখানে বারবার ঘুরেফিরে আসে। বাংলাতেও তাই ঘটেছে। নিজেদের দেখা, শোনা ও অনুভব হস্তশিল্প-ছবি-নাচ-গানের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন লোকশিল্পীরা। বীরভূমের নানুর বা পূর্ব বর্ধমানের বননবগ্রামের কাঁথাস্টিচ শিল্পের দিকে তাকালে একথা স্পষ্ট হয়। বাড়ির বাতিল পুরনো নরম কাপড় সূঁচ সুতো দিয়ে পরতে পরতে গেঁথে পরিবারের ব্যবহারের জন্য বানানো হত কাঁথা। যা ছিল বাংলার এক নিত্যব্যবহার্য শয্যাসামগ্রী। আসন, কুশন, টেবিলক্লথ সবকিছুর গায়ে উঠে আসতো কাঁথার এই নকশা।

সূঁচ সুতোর ফোঁড় দিয়ে নানা চিত্রবিচিত্র নকশা করতেন বাড়ির মেয়েরা। স্থানীয় গাছপালা, পশুপাখি, লতাপাতা, ফুল, আলপনা, মঙ্গলচিহ্ন সবই এই নকশার বিষয়। নানা রঙের সুতো দিয়ে বোনা এই নকশা পরবর্তীকালে উঠে এসেছে বাংলার কাঁথাস্টিচ শাড়িতে। কাঁথা নামক বাংলার গার্হস্থ শিল্পটির (domestic art) যেন নবজন্ম হয়েছে কাঁথাস্টিচ শাড়িতে। বীরভূমের নানুর, পূর্ব বর্ধমানের বননবগ্রামের কাঁথা শিল্পের খ্যাতি এখন আঞ্চলিকতার গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও তারিফ কুড়োচ্ছে।

বাংলার লোকশিল্প যেন এই জনপদের জীববৈচিত্র, প্রাণীবৈচিত্র, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র ও রীতিনীতিগুলির এক জীবন্ত ছবি। জীবন্ত হলেও তা কিন্তু মোটেই কোন কার্বনকপি নয় বরং এখানে রয়েছে শিল্পীর নিজের মত করে দেখা, নিজের মত করে অনুভব করা। পাখি থেকে মাছ, সিংহ থেকে ঘোড়া সেখানে অন্য রঙে বা ভিন্ন অলঙ্করণে হাজির হয়। তাদের চালচলন, রঙঢঙ সবই আলাদা। নান্দনিকতাই সেখানে শিল্পীর মূল বিবেচ্য। এই ব্যাপারটাই শিল্পকর্মটিকে বিশিষ্ট করে তোলে। এটা শুধু কাঁথা নয়, বাংলার অন্যান্য হস্তশিল্পের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়ার ডোকরা শিল্প, পোড়ামাটির কাজ থেকে শুরু করে বর্ধমানের নতুনগ্রামের প্যাঁচা সবেতেই শিল্পীদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণটি স্পষ্ট।

ঝাড়গ্রামের সাবাই ঘাসের হাতি বা শুয়োরের বিমূর্ততা অবাক করে দেওয়ার মত। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের ড্রইংরুমে জায়গা পেতে পারে এই কাজ। প্রশ্ন আসে এত অ্যাবস্ট্রাকশন বা বিমূর্ততা গ্রামীণ শিল্পীরা পেলেন কোথা থেকে? প্রবল কল্পনা এবং গ্রামীণ সারল্য একসঙ্গে না মিশলে এ ঘটনা ঘটেনা। এর জোরেই বাংলার লোকশিল্পীরা নিজের মত করে কানেক্ট করতে পারেন বিশ্বের যেকোন প্রান্তের মানুষদের সঙ্গে। নিজেদের মত করে ধরতে পারেন আঞ্চলিক বৈচিত্রকেও। অসাধারণ হয়েও তা এতই সাধারণ যে পৃথিবীর অন্য গোলার্ধের মানুষদেরও তা বুঝতে অসুবিধা হয়না। এটাই বাংলার লোকশিল্পের বিশ্বজয়ের মূল সূত্র।