স্বপ্ন দেখার শুরু সেই ২০০২ সালে। থ্যালাসেমিয়া মুক্ত এক সমাজের। থ্যালাসেমিয়া মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাত্র সতের বছর বয়সেই এক থ্যালাসেমিয়া রোগীর রক্তের প্রয়োজনে ২০০২ সালে জীবনের প্রথমবার রক্তদান করেন এক কিশোর ছাত্র। সেদিনের সেই কিশোর ছাত্র পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমার ব্লকের ব্যবত্তারহাটের সন্দীপ চক্রবর্তী আজ বছর চল্লিশের পরিপূর্ণ যুবক।থ্যালাসেমিয়া মুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখা সেদিনের কিশোর ছাত্র সন্দীপ চক্রবর্তী স্বপ্নের বীজ বপন করতে করতে ইতিমধ্যে নিজেই এখনও পর্যন্ত ৭৩ বার রক্তদান করেও ফেলেছেন। লক্ষ্য ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি ৯০ দিন অন্তর মানব সেবায় নিজে ১৮৮ বার রক্তদান করে অন্যকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করে নতুন নতুন রক্তদাতা তৈরী করা।
চ্যারিটি বিগেনস্ এ্যাট হোম ভাবনায় বিশ্বাসী সন্দীপ নিজে ৭৩ বার রক্তদান করা ছাড়াও নিজের বড়দা স্বপন চক্রবর্ত্তীকে ২৫ বার আর ছোটভাই জয়দীপ চক্রবর্ত্তীকে ৪৪ বার রক্তদান করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। রক্তদান আন্দোলনকে তৃণমূল স্তরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তের সঙ্কট দুর করে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৈরির লক্ষ্যে ২০২১সালে পূর্ব মেদিনীপুর ডিস্ট্রিক্ট ভলান্টারী ব্লাড ডোনার্স অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেছেন সন্দীপ। তিনি নিজেই বর্তমান এই সংগঠনের সম্পাদক পদে আসীন।

২০১৭ সালে কবি ও প্রধান শিক্ষক শিব্যেন্দু সরকারের সঙ্গে যুগ্ম- সম্পাদনায় দ্বি-মাসিক ‘৫-এ পঞ্চবাণ’ দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। তমলুক পুরসভা ভবন লাগোয়া তমলুক-ঘাটাল কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের দেওয়ালে ২৪ ফুট বাই ৮ ফুটের বিশাল দেওয়াল জুড়ে ‘৫-এ পঞ্চবাণ’ দেওয়াল পত্রিকার ব্যাপ্তি বিশাল। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে তমলুক পুরসভা সংলগ্ন তমলুক- ঘাটাল কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের দেওয়ালে দেওয়াল জুড়ে প্রতি দুমাস অন্তর নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। এতো বিশাল দেওয়াল পত্রিকা তমলুক ছাড়া সারা ভারতের আর কোথাও নেই বলেই দাবি পত্রিকার অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক সন্দীপ চক্রবর্তীর।
পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমার ব্লকের ব্যবত্তারহাটের বাসিন্দা সন্দীপের হরিহরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের পর ব্যবত্তারহাট আদর্শ হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক। মহিষাদল রাজ কলেজ থেকে সন্দীপ বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তোর পাশ করেন।

স্কুল জীবনে থেকেই লেখালেখি শুরু। ব্যবত্তারহাট আদর্শ হাই-স্কুলের দেওয়াল পত্রিকা ‘শঙ্খ’য় প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। পরে ব্যবত্তারহাট বাণী স্মৃতি পাঠাগারের ‘উদয়ণ’-এ নিয়মিত লেখা প্রকাশ হওয়া ছাড়াও পাঠাগারের সদস্য থাকার দরুন দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশের সাথে আজও যুক্ত আছেন। মহিষাদল রাজ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন দেওয়াল পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে লেখা ছাড়াও কলেজের বর্ষপত্র ‘অমিত্রাক্ষর’ পত্রিকাতেও নিয়মিত লেখেন। কলেজে পড়ার সময় একটি পাক্ষিক সংবাদপত্রের যুগ্ম- সম্পাদক হিসাবে কাজ শুরু করে পরবর্তীতে মহিষাদল থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক প্রেক্ষাপট পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে কাজকর্মও শুরু করেন। বর্তমানে ‘তাম্রলিপ্ত সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মিলনী’র সম্পাদক সন্দীপ চক্রবর্তী কলেজ ছাত্রজীবনে ২০০৬ সালে যুব সংসদ প্রতিযোগিতায় জেলাস্তর ও রাজ্য স্তরে শ্রেষ্ঠ বিরোধী দলনেতার সম্মান প্রাপ্তি ছাড়াও স্কুল ও কলেজে বিতর্ক, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, আবৃত্তি, কুইজ সহ জেলা ও রাজ্যস্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হন। ছাত্র যুব উৎসবেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কৃতিত্বের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন একাধিক বার। ২০১২ সাল থেকে নিজের বাড়িতে নিজের উদ্যোগে দেশের ৪৫০ এর অধিক স্বাধীনতা সংগ্রামী ও দেশের বীর বরণ্য প্রথিতযশা মনীষীদের জন্ম ও মৃত্যুদিন বা আত্মবলিদান দিবস নিয়মিত পালন করে আসছেন। পেশায় রাজ্য সরকারের সেচ দফতরের কর্মী সন্দীপ চক্রবর্তী ‘থ্যালাসেমিয়া’ রোগীদের সাহায্যে বদ্ধপরিকর। স্বপ্ন দেখেন থ্যালাসেমিয়া মুক্ত এক সমাজের।” সেই স্বপ্নে বিভোর সন্দীপ চক্রবর্তীর সারাদিনের বেশিরভাগ সময় কাটে রক্ত দাতাদের জোগার করে একাধিক নতুন রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা আর নতুন নতুন রক্তদাতা তৈরির সন্ধানে।
সন্দীপ দা এক রক্তযোদ্ধা, নিজে রক্তদান করেন এবং অপরকেও অনুপ্রাণিত করেন। রক্তের ব্যবস্থাও করে দেন। প্রনাম, শ্রদ্ধা ও কুর্নিশ জানাই।