ছিলেন বটে জবরদস্ত রাজ্যপাল। নাম যাঁর জগদীপ ধনখড়। রাজ্যপালের আলংকারিক পদটাকে তিনি ঘষে মেজে এমন চকচকে করে তুলেছিলেন যাতে মনে হত, রাজ্য চলবে রাজভবন থেকে। নির্বাচিত শাসক নয়, মনোনীত রাজ্যপালই হবেন রাজ্যের হর্তাকর্তা। বাবু জগদীপ রাজভবনে পা দিয়েই যুদ্ধ শুরু করে দিলেন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। এ সরকার আইন মানে না, বিরোধীদের দমন করে, শিল্প-শিক্ষা-কৃষি সব গেল রসাতলে। বিরোধী দলনেতা দলবল নিয়ে মাঝে মাঝে হাজির তাঁর দরবারে। যা অভিযোগ করুন না তাঁরা, তাতেই শিলমোহর।
তা বাবু জগদীপ তাঁর প্রভুভক্তির পুরস্কার পেলেন। তিনি উপরাষ্ট্রপতি হলেন। এই রাজ্যে অস্থায়ী রাজ্যপাল হয়ে এলেন লা গণেশন। এ কি রে বাবা, গণেশনের দাদার বিয়েতে মমতা যাচ্ছেন তাঁর দেশের বাড়ি, আবার মমতার বাড়ির কালীপুজোয় গনেশন চলে আসছেন। সে সব তবু সহ্য করছিলেন গেরুয়া নেতারা। কিন্তু রাজভবনে যখন-তখন তাঁদের যাতায়াতে বাধা কেন? চাইলেই কেন তাঁরা পাবেন না সময়? দলবদলু বিরোধী নেতাটির মাথা গরম হয়ে গেল বিশেয একটা ঘটনায়। রাজ্যের মন্ত্রী অখিল গিরি রাষ্ট্রপতি সম্বন্ধে কি একটা মন্তব্য করেছিলেন। বিরোধী দলনেতা রাজভবনে গেলেন তার প্রতিবাদ জানাতে। গণেশন তাঁকে দেখা করার সময়ই দিলেন না। কি এতবড় আস্পর্ধা! বিরোধী দলনেতা সাঁ করে উড়ে গিয়ে দিল্লিতে দরবার করলেন শাহজির সঙ্গে।
হাতে নাতে ফল। রাজ্যে এলেন স্থায়ী রাজ্যপাল। কেরলের কোট্টায়ামের সি.ভি আনন্দ বোস। দিল্লিশ্বর মোদিজির সঙ্গে বোসবাবুর সম্পর্ক ভালো। রাজ্য সরকারকে টাইট দেওয়া যাবে। কিন্তু দিনকতক পর থেকেই বেচাল দেখা গেল। শপথ গ্রহণের দিন মুখ্যমন্ত্রী দরাজ প্রশংসা করলেন রাজ্যপালের। গন্ধটা সন্দেহজনক। ডালমে কুছ কালা হ্যায়। আরে, বোসবাবু যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছেন, চাইছেন বাংলা শিখতে। সরস্বতী পুজোর দিন তাঁর হাতেখড়ি হল। সেখানে হাজির মুখ্যমন্ত্রী। ভাব-ভাব হাসি-হাসি মুখ তাঁর। গন্ধটা সন্দেহজনক। বিরোধী নেতা ও দলনেতার আমন্ত্রণ ছিল। যান নি তাঁরা। যাবেন কেন? বোসবাবু তো আর ধনখড়বাবুর মতো শত্রুর শত্রু নন। না, এমন রাজ্যপাল চাই না। যেতে হবে দিল্লি, দিল্লিকা লাড্ডু ধরাতে হবে বোসবাবুর হাতে।
এমন রাজ্যপাল চাই না। কিন্তু এমনই উপাচার্য চাই। বলছি বিশ্বভারতীর উপাচার্যের কথা। একেবারে বাঘের বাচ্চা। ভয়ডর বলে কিচ্ছুটি নেই কো। এসেই পাঁচিল তুলে দিলেন। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হল, বিক্ষোভ হল। থোড়াই কেয়ার। সাসপেণ্ড হওয়া ছাত্র রূপা চক্রবর্তী, ফাল্গুনী পান, সোমনাথ সৌকে বহিষ্কার করে দিলেন। শুরু হল আন্দোলন। উপাচার্যের ইস্তফার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠল ছাত্ররা। তারা জানাল উপাচার্য করে চলেছেন নানা বেনিয়ম। হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও পরীক্ষায় বসতে দিলেন না ছাত্রদের। বিক্ষোভকারী পড়ুয়াদের দিকে ইঁটও ছুঁড়লেন। বুঝিয়ে দিলেন তিনিও ‘বাহুবলী’। ছাত্র বিক্ষোভে উস্কানি দিচ্ছেন বলে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ্ত ভট্টাচার্যকে শোকজ করলেন। গত দু বছরে তিনি ১৬০ জন অধ্যাপক ও কর্মীকে শোকজ করেছেন। শিক্ষিকা শ্রুতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেতন মামলায় হাইকোর্টের নির্দেশকে অমান্য করলেন। এইসব অনিয়ম ও বরখাস্তের বিরুদ্ধে সুমিত সরকার, প্রভাত পট্টনায়েক, যোগেন্দ্র যাদব, আব্দুল কাফি, নিবেদিতা মেনন প্রমুখ দেশের ২৬১ জন শিক্ষক রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিলেন। কিন্তু উপাচার্যের হেলদোল নেই।
এ হেন মানুষ যে অমর্ত্য সেনকে ‘জমিচোর’ আখ্যা দেবেন তাতে আর বিচিত্র কি। অমর্ত্য না কি বিশ্বভারতীর ১৩ ডেসিম্যাল জমি হজম করে বসে আছেন। অন্যায় করেছেন বলে ভয় পাচ্ছেন আদালতে যেতে। একেবারে দিলীপ ঘোষ মশায়ের ভাষায় আক্রমণ। কটূক্তি করে বললেন উপাচার্য, ‘জমি কব্জা করলেও রাবীন্দ্রিক’। শুধু তাই নয়, অমর্ত্য সেনের নোবেল প্রাইজ নিয়েও তাঁর বক্রোক্তি : ‘অমর্ত্য সেন নোবেল লরিয়েট নন। উনি নিজেই দাবি করেন যে উনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন।’ উপাচার্যের আছে বটে বুকের পাটা।
তবে হ্যাঁ, তিনি যেমন ঠৌঁটকাটা, তেমনি কানকাটাও। এক কান নয়, দু কান কাটা। প্রবাদ আছে না, এক কান কাটা গ্রামের ধার দিয়ে যায়, আর দু কান কাটা গ্রামের মাঝ দিয়ে যায়।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক