মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর চোখের পলক না ফেলেই চার পাণ্ডবের ক্ষাত্র-ক্ষমতা একে একে নির্মোক করে দিতে থাকেন। পাণ্ডবপক্ষের প্রধান মহাবীর অর্জুন তার শরীরের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠা গাণ্ডীব তুলতে ব্যর্থ হলে। মধ্যম পাণ্ডব অসহায় চোখে দেখলেন দ্বারকায় পুরনারী হরণের ঘটনা। স্বর্গারোহনকালে সাধারণ মানুষের মত অপঘাতে মৃত্যু ঘটল চার মহাতেজের।
গত কয়েক বছর ধরে আমরা বাংলাতে মহাভারতের শেষ দৃশ্যের বিয়োগান্তক ঘটনাগুলো একে একে বাস্তবে ঘটতে দেখছি। ২০১৯-এর বাংলা কুরুক্ষেত্রের মহারণের টাগ-অব-ওয়ারের শুরুতে বিরোধীপক্ষের মহারথীরা ক্ষমতাসীন তৃণমূলের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে কোণঠাসা করে দু-অঙ্কের আসন দখল করে বিধানসভা নির্বাচনে বঙ্গ দখলের ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন। ২০২১-এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু বিরোধীপক্ষের সেই চ্যালেঞ্জই রুখলেন না, ক্রমশঃ তাদের পতন নিশ্চিত করে ২০২২-এর তিন দফা পুরসভা নির্বাচনে, লোকসভা, বিধানসভার চ্যালেঞ্জার মহারথীদের পতন বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন, নিজের দলের বিদ্রোহীদের থোঁতা মুখ ভোঁতা করলেন, আর তৃণমূলকে স্বকীয় মহিমায় পৌঁছে দিলেন অসীম উচ্চতায়। কেন্দ্রে চ্যালেঞ্জহীন ক্ষমতা ভোগ করলেও বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কমিটির রাজ্যের রাজা হয়ে উঠতে থাকার প্রক্রিয়ার প্রাণভোমরা কেড়ে নিয়ে প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। ২০১৯-এর মাঝামাঝি লোকসভার ভোটে, এনআরসি-সিএএর পালে হাওয়া লাগিয়ে তৃণমূলকে জব্বর ধাক্কা দেওয়া ক্রোনোলজি স্মরণ করানো দুই মহাতেজ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন বিজেপি সঙ্ঘপরিবারের কেন্দ্রিয় নেতাদের তূণীরের সমস্ত বিষাক্ত তীর নিজের গায়ে অভেদ্য বর্ম পরে নিষ্ক্রিয় করলেন মমতা। ২০২১-য় বিজেপির বাংলার ক্ষমতা দখল এবং ২০২২-এর পুরভোটে প্রধান বিরোধীপক্ষ হয়ে ওঠা খোয়াবের অপমৃত্যু ঘটল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই রণকৌশলে আরেক পাখিও মারলেন। মহাভারতের যুদ্ধ শেষে অর্জুনের প্রাণসখা, পথপ্রদর্শক কৃষ্ণ যাদব সাধারণ এক ব্যাধের তীরে যে রকম অসহায়ভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, ঠিক তেমনই ২০১৯-এর তৃণমূল দলের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ শুরু করা সংস্থাটির বাংলার শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ওঠার খোয়াব এক তীরেই অপমৃত্যু ঘটিয়ে দিলেন ভারতজুড়ে বিজেপি বিরোধিতার প্রধান মুখ হয়ে ওঠা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই তীরের আঘাতে শুধু রথারোহী পরামর্শদাতা শ্রীকৃষ্ণরূপী কর্পোরেট নেতারই পতন ঘটল না, তার সঙ্গ দেওয়া বেশ কিছু তৃণমূলী হেভিওয়েট সাঙ্গপাঙ্গও নির্মোক হলেন।
আমরা কয়েকমাস আগে প্রথম দফার নির্বাচন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পেজফোরের পাতাতেই বলেছিলাম এনআরসি-সিএএর বিজেপির যেমন পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা দখলের প্রাণভোমরা হতে পারে, তেমনি ইস্যুটির অপব্যবহার আবার বিজেপিকে খাদেও ছুঁড়ে ফেলতে পারে। যে কনফিডেন্সে লোকসভায় সঙ্ঘপরিবারের বিভাজনের শিক্ষায় শিক্ষিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলার নমঃশূদ্রের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বিল আনলেন, সেই কনফিডেন্সে কিন্তু তিনি আর তার দপ্তর আড়াই বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে আসা উদ্বাস্তু মতুয়াদের দাবি অনুযায়ী সিএএর রুল ফ্রেম করতে পারলেন না। মতুয়াদের দাবি পূরণ না হওয়ায় স্বয়ং কেন্দ্রিয়মন্ত্রী, কেন্দ্রিয় সরকারের নীরবতা আর নিষ্ক্রিয়তাকে গালি দিলেন। গরম গরম বক্তৃতা করে ২০২১-এ দলকে বিধানসভায় ৭০+ আসন দেওয়া রাজ্য প্রভারীকে সরিয়ে দেওয়া হল। ৩০০০ কোটি টাকা ফান্ড নিয়েও একা কুম্ভ মমতার কাছে বিজেপির সেই যে গোহারান শুরু হল বিজেপির তারপরে আর উঠে দাঁড়াতে পারল না। বাংলার কুরুক্ষেত্র শেষ রণে একপায়ে খেলে জিতিয়ে আনলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্গ বিজেপির পতনের কারন হল সিএএর রুল ফ্রেম করার ব্যর্থতা।
বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যেমন তৃণমূল প্রধান মাঠের বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছেন, তেমনি মুষিক থেকে খাদক সিংহ হয়ে ওঠা দলীয় পরামর্শদাতা শ্রীকৃষ্ণকেও একই বেপরোয়া ভঙ্গীমায় মাঠের বাইরে পাঠিয়েছেন। দলীয় নেতারা বহুকাল ধরেই অভিযোগ করছিলেন আপাত বিনয়ী প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আইপ্যাক লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের সাফল্যে ধরাকে সরা জ্ঞান করে দলের মধ্যে কর্পোরেট স্টাইলে সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তৃণমূলের কেন্দ্রিয় এবং জেলার নেতারা নেত্রীর কাছে আইপ্যাকের কর্মপ্রণালী নিয়ে অসন্তোষ লুকিয়ে রাখেন নি। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর বিধানসভা নির্বাচনের সাফল্যের পর দলের মধ্যে সেই ঔদ্ধত্য চরমে ওঠে। দলীয় বৈঠকে আইপ্যাকের কর্মীরা দলের/নেতাদের সিদ্ধান্তে ভেটো দিতে থাকলে বহু নেতাই অসন্তোষ আর দলের ভেতরে না রেখে প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। সর্বোচ্চ নেত্রী প্রমাদ গুণতে থাকেন। তিনি তার স্টাইলেই পরামর্শদাতা সংস্থাকে সংযমে থাকার বার্তা দিচ্ছিলেন। শেষ দফার পুরসভার নির্বাচনে আসন তালিকা নিয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণ বিভ্রাট ঘটানোয় চরম ক্ষুব্ধ নেত্রী শোনা যাচ্ছে আইপ্যাকের সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কচ্ছেদের কথা ভাবছেন। আইপ্যাকের হয়ে ব্যাটিং করায় দু-একজন বর্ষীয়ান সাংসদ এবং বিধায়ক নেত্রীর কাছ থেকে ঘোর লাল কার্ড দেখেছেন। নেত্রী দলীয় নেতাদের সংযমে থাকার বার্তা দিয়েছেন। তৃণমূলের আড়াই বছরের শ্রীকৃষ্ণের পতনের সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু তৃণমূলী সাঙ্গপাঙ্গেরও পতন ঘটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আপাতত বাংলা রণভূম শান্ত। ডবল মাস্টারস্ট্রোকে দুই উচ্চাকাঙ্ক্ষী শত্রু এবং মিত্রকে সাইডলাইনের ধারে বার করে দিয়ে তিনি শেষ ফ্রন্টিয়ার উত্তরপ্রদেশ ছুটেছেন।
তার সামনে সমস্যা একটাই, অপ্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল। এই সমস্যাকে তৃণমূলেশ্বরী কীভাবে সামলান সেদিকেই সারা বাংলার নজর থাকবে।