‘ডাক্তার হৈমবতী সেন’— এই নামটির সঙ্গে পাঠকেরা অনেকেই হয়তো পরিচিত নন। কিন্তু উনিশ শতকের বাংলায় হতদরিদ্র কিছু মানুষের কাছে ডাক্তার হৈমবতী সেন ছিলেন বিধাতাস্বরূপ। হ্যাঁ, সমকালীন বাংলার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানহীন রোগীদের দিনের পর দিন পরিষেবা দিয়ে গেছেন ডাক্তার হৈমবতী সেন। একজন প্রকৃত চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। নিষ্ঠাভরে নিজের দায়িত্ব মনে করেই তিনি অবহেলিত নিম্নবর্ণের হতশ্রী জনগণের সেবাকার্যে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, যাদেরকে তৎকালীন উচ্চ বর্গীয় ডাক্তারেরা চিকিৎসা পরিষেবা দিতে বিশেষভাবে কুণ্ঠিত হতেন। কিন্তু ডাক্তার হৈমবতী সেন তাদের কখনো নিরাশ করেননি। নিজের সাধ্যমত তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বাসস্থানহীন রোগীদের নিজগৃহে আশ্রয় পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

কিন্তু ডাক্তার হৈমবতী সেন আজ খুব বেশি চর্চিত নন। এদিকে বাংলার মহিলা চিকিৎসকদের মধ্যে একেবারে প্রথম পর্বের একজন মহিলা চিকিৎসক ছিলেন হৈমবতী। তবুও তাঁর সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। হৈমবতীর প্রামাণ্য জীবনীও প্রায় দুর্লভ। তবে সম্প্রতি নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরে ডাক্তার হৈমবতী সেনকে নিয়ে এক আলোচনাসত্রের আয়োজন করা হয়েছিল। আয়োজক সংগঠনের নাম মুক্তধারা। কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা মুক্তধারা দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের আলোচনাসত্রের আয়োজন করে আসছে। এটি ছিল তাদের ৪৪তম আলোচনাসত্র। হৈমবতী সেন যেহেতু এখন বিস্মৃতপ্রায়, সেই দিকটি মাথায় রেখেই মুক্তধারার এদিনের আলোচনাসত্রের শিরোনাম রাখা হয়েছিল ‘ডাক্তার হৈমবতী সেন— উনিশ শতকের এক অ-নন্দিত মানবী সত্তা’। আলোচক ছিলেন পঞ্চশীলা মজুমদার।

ডাক্তার হৈমবতী সেন সম্পর্কে আলোচনা শুনতে এদিন মুক্তধারার নিয়মিত দর্শকদের পাশাপাশি সমাজের নারী প্রতিনিধিরাও এসেছিলেন। সভাকক্ষে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতামণ্ডলীর মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সমাজকর্মীরাও। মুক্তধারার আলোচনাসত্রগুলিতে জেলার বিশিষ্টজনের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। ৪৪তম আলোচনাসত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ইতিমধ্যে মুক্তধারা তাদের আলোচনাসত্রগুলি আয়োজনের মাধ্যমে নিজস্ব কিছু দর্শক-শ্রোতামণ্ডলী তৈরি করতে পেরেছে। এই প্রথম নয়, বিগত দিনেও মুক্তধারা এই ধরনের বৈচিত্রপূর্ণ বিষয়ে আলোচনাসত্রের আয়োজন করেছে। যেমন— ‘মুক্তধারা’-র ৪০তম আলোচনাসত্রের বিষয় ছিল ‘দুঃসময়ের চিত্রকলা : শিল্পীর ভূমিকা’ (১১ জুন ২০২২), যেখানে আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত। ‘মুক্তধারা’-র ৪১তম আলোচনাসত্রের বিষয় ছিল ‘এখন সব অলীক — কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় এবং…’ (৬ আগস্ট ২০২২), যেখানে আলোচক ছিলেন বিজয়লালের অন্যতম স্নেহধন্য কবি রামকৃষ্ণ দে। ‘মুক্তধারা’-র ৪২তম আলোচনাসত্রের বিষয় ছিল ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ভাষাচর্চা’ (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২), যেখানে আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ড. দেবাশিস ভৌমিক। ‘মুক্তধারা’-র ৪৩তম আলোচনাসত্রের বিষয় ছিল ‘বিজ্ঞানের মেজাজ নিয়ে দু-চার কথা’ (১৩ নভেম্বর ২০২২), যেখানে আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ড. সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। আর সম্প্রতি ‘মুক্তধারা’-র ৪৪তম আলোচনাসত্র অনুষ্ঠিত হল, যেখানে আলোচক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা এবং সমাজকর্মী পঞ্চশীলা মজুমদার। আর আলোচনার বিষয় ছিল ‘ডা: হৈমবতী সেন— উনিশ শতকের এক অ-নন্দিত মানবী সত্তা’ (২৮ জানুয়ারি ২০২৩)।

হৈমবতী সেন ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার শ্রীরামপুর নৈহাটিতে এক কুলীন কায়স্থ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রসন্নকুমার ঘোষ ছিলেন সেখানকার জমিদার। হৈমবতীর পিতামহ শিবনাথ ঘোষ নীলকুঠি সাহেবের বিরোধিতা করে বাংলার বাহাদুর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। বছর পঁয়তাল্লিশের এক বিপত্নীক পাত্রের সঙ্গে হৈমবতীর বিবাহ দেওয়া হয়েছিল, যখন তাঁর বয়স মাত্র সাড়ে নয়। বিবাহের কয়েকদিন পরেই হৈমবতী বিধবা হন। ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি হৈমবতী বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। পড়াশোনা চালানোর অনুমতির শর্তেই ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক কুঞ্জবিহারী সেনের সঙ্গে হৈমবতী দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দ্বিতীয় বিবাহের পর তিনি হৈমবতী সেন নামে পরিচিত হন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সংগ্রামশীল। বাল্যবিধবা হয়েও তিনি কেবল আত্মবিশ্বাসে ভর করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। হৈমবতী কলকাতার ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুলের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সেই সূত্রে তিনি ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ডাক্তারিবিদ্যার ছাত্রী হিসেবে তিনি বিশেষ পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি চল্লিশ টাকা বেতন নিয়ে হুগলির চুঁচুড়ায় লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে যুক্ত হয়েছিলেন। হৈমবতীর পাঁচ সন্তান-সন্ততি ছিল— ধ্রুবজ্যোতি, আত্মজ্যোতি, শান্তজ্যোতি, জগজ্যোতি এবং ভক্তিসুধা। হৈমবতীর ৬৭ বছরের কর্মময় জীবন থেমে যায় ৫ আগস্ট ১৯৩৩, তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

২৮ জানুয়ারি ২০২৩ (শনিবার) কৃষ্ণনগর পৌরসভার দ্বিজেন্দ্র মঞ্চে হৈমবতী সম্পর্কে ‘মুক্তধারা’-র ৪৪তম আলোচনাসত্র অনুষ্ঠিত হল। উনিশ শতকের একজন উল্লেখযোগ্য মহিলা ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও হৈমবতী সেন সম্পর্কে খুব বেশি আলোচনা হয় না— এই বিষয়টিকে মাথায় রেখেই এই আয়োজন করা হয়েছিল। সমসাময়িক অন্যান্য বিশিষ্ট নারী ব্যক্তিত্বদের আলোচনায় হৈমবতী সেনের নাম অনেক ক্ষেত্রেই অনুল্লেখিত থেকে যায়। কিন্তু আলোচক এদিন বলেন যে, তৎকালীন সময়ে যে সকল সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে হৈমবতী সেন জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, সেগুলি সকলের জানা প্রয়োজন। ‘মুক্তধারা’-র আলোচনাসত্রের বিষয় হিসেবে নারী ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায় উপস্থাপনা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতামণ্ডলীর খুব ভালো লাগে। ডাক্তার হৈমবতী সেন সম্পর্কে দর্শক-শ্রোতাদের অনেকেই নতুন ভাবে জানতে পারেন এবং এতে তারা আপ্লুত হন। এই ধরনের বিষয় নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে মুক্তধারা যেন আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল।

আসলে ডা: হৈমবতী সেন সাধারণ মানুষ বিশেষ করে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে, অবহেলিতদের পাশে দাঁড়িয়ে, এমনকি যারা হৃত সর্বস্ব তাদের নিজের কাছে আশ্রয় দিয়ে এমন কিছু উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন, যা সে যুগের প্রেক্ষিতে ব্যতিক্রম বলা চলে। তাঁর এধরনের অনবদ্য কিছু কাজের জন্যই সেযুগে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ডাক্তার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু আজ তিনি বিস্মৃত। ডাক্তার হৈমবতী সেনের জীবনের এহেন বহুবিধ বিষয় নিয়েই আলোচক পঞ্চশীলা মজুমদার এদিন আলোচনা করেন। তিনি বলেন যে, ডাক্তার হৈমবতী সেন সম্পর্কে এ ধরনের আরো অনেক বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশতবর্ষের সময় থেকেই মুক্তধারার পথচলা শুরু হয়। আলোচনা সভা থেকে শুরু করে পত্রিকা প্রকাশ, সংগীতানুষ্ঠান, রবীন্দ্র মেলা— এই ধরনের বহুবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে মুক্তধারা একীভূত হয়ে যায়। তারপর ২০১৫ সাল নাগাদ শুরু হয় নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক এই ধরনের আলোচনাসত্র। ক্রমান্বয়ে পথ চলতে চলতে ২০২৩ সালের সূচনায় অনুষ্ঠিত হল তাদের ৪৪তম আলোচনাসত্র। অন্যান্য বারের মতোই মুক্তধারার প্রথা মেনে ৪৪তম আলোচনাসত্রের শুরুতে একটি উদ্বোধন সংগীত পরিবেশিত হয়। এদিনের বিষয়ের সঙ্গে সাজুজ্য রেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আমি মারের সাগর পাড়ি দেব বিষম ঝড়ের বায়ে, আমার ভয়ভাঙা এই নায়ে” গানটি নির্বাচন করা হয়েছিল। সংগীতশিল্পী ঐশ্বর্য মজুমদারের কণ্ঠে গানটি পরিবেশিত হয়, যা অনুষ্ঠানের শোভা বর্ধন করে। এদিনের সমগ্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন মুক্তধারার অন্যতম সদস্য শুভময় সরকার। মুক্তধারার ৪৪তম আলোচনাসত্রের আহ্বায়ক ছিলেন সম্পদনারায়ণ ধর, তপনকুমার ভট্টাচার্য এবং দীপাঞ্জন দে। মুক্তধারার শ্রোতা-দর্শক বন্ধুদের কাছে ডাক্তার হৈমবতী সেনকে নিয়ে প্রায় ঘন্টা দেড়েকের এদিনের অনুষ্ঠান খুব মনোগ্রাহী হয় এবং তারা মুক্তধারার সান্ধ্যকালীন আলোচনা বেশ ভালো ভাবে উপভোগ করেন। আয়োজকদের কাছে যা ভবিষ্যতের আলোচনাসত্র আয়োজনে প্রেরণাদায়ক হবে বলেই মনে করি।
লেখক : আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
মুক্তধারার আয়োজিত ৪৪ তম আলোচনাসত্রতে মাননীয়া পঞ্চশীলা মজুমদার-এর বক্তৃতায় হৈমবতী সেন এর মতো বিচক্ষণ ও সহমর্মী চিকিৎসক-এর ওপর আলোকপাত অত্যন্ত মনোগ্রাহী ছিল। হৈমবতীর মতো মেয়েদের এই জীবনযুদ্ধের ইতিহাস সত্যিই বড্ড প্রেরণা যোগায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যাঁতাকলে ক্রমাগত নিষ্পেষিত হয়েও নিজস্ব সত্তা বজায় রাখার দৃষ্টান্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। অনেক অনুপ্রেরণা ও ভালোলাগা নিয়ে বাড়ি ফিরেছি আজ। মুক্তধারার এই উদ্যোগকে কুর্ণিশ জানাই ।
মন্তব্যটি বেশ ভালো লাগলো এবং খুবই যথাযথ।