রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বামেদের বিতর্ক নতুন নয়। অতীতে অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে আরএসএস বিরোধীতায় আবদুল কালামের বিরুদ্ধে বামেরা লক্ষ্মী সায়গলকে প্রার্থী করেছিল। কিন্তু এবার আরএসএসের বিরোধীতা করতে গিয়ে আরেক কট্টর আরএসএস ভক্তকে রাষ্ট্রপতি করতে বামেরা তৃণমূলের সঙ্গে জোট বাঁধল। এটা ঘটনা যে যশবন্ত সিনহা তীব্র হিন্দুত্ববাদী নেতা। তিনি চন্দ্রশেখর মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন। তারপর বিজেপিতে যোগ দেন, ১৯৯৬ সালে বিজেপি-র জাতীয় মুখপাত্র হন, অটলবিহারী বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিছুদিন আগে তৃণমূলে যোগ দেন। কিন্তু তিনি কোনও অংশেই দ্রৌপদী মুর্মুর থেকে কম আরএসএস ভক্ত নন। তিনি বিজেপিতে থাকার সময় গুজরাটে গোষ্ঠি সংঘর্ষ ঘটেছিল। দলীয়স্তরে আর গুরুত্ব না পেয়ে তিনি নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে সরব হন। পরে বিজেপি ত্যাগ করে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বামেরা প্রণব মুখোপাধ্যায় বা মীরা কুমারের পক্ষ নিয়েও তৃণমূলের সঙ্গে একপথে হেঁটেছে। এমনকি জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের সঙ্গেও বামেরা অতীতে সমন্বয় রেখে চলেছে। চলার ইতিহাসও পুরনো। তবে সরাসরি তৃণমূলের কোনও নেতা তথা প্রার্থীকে বামেরা এই প্রথম সমর্থন জানাল। তাছাড়া এ কে গোপালন ভবনের নির্দেশ, কেরল, তামিলনাড়ু, ত্রিপুরা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র বা বিহার থেকে বাম সাংসদ ও বিধায়কদের যশবন্ত সিনহাকেই ভোট দিতে হবে। বাংলা থেকে সরাসরি সেই কাজ করতে হবে রাজ্যসভার একমাত্র সাংসদ বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘জাতীয় স্তরে বিরোধী ঐক্যের স্বার্থে একটা অবস্থান নিতেই হত। কিন্তু প্রার্থী বাছাই ঠিক হয়নি”।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের সর্বসম্মিলিত প্রার্থী এক সময়কার দুঁধে আরএসএস তথা বিজেপি নেতা, দল ছেড়ে তৃণমূলের সদ্য প্রাক্তন নেতা যশবন্ত সিনহাকে বামেদের সমর্থন করা নিয়ে বাংলার সিপিএম কর্মী-সমর্থকরা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, এই যশবন্ত সিনহা বাবরি মসজিদ ভাঙাকে সমর্থন করেছিলেন, তিনি গোধরা কাণ্ডের সমর্থনে একাধিকবার মন্তব্য করেছিলেন। কেবল তাই নয়, আজ বাংলায় যে তৃণমূল দলের বিরুদ্ধে সিপিএম পার্টির কর্মী সমর্থকরা প্রতিনিয়ত লড়াই করছে, সিপিএম পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব সেই তৃণমূলের সদ্য প্রাক্তন নেতাকেই সমর্থন করার নির্দেশ দিল।
যশবন্ত সিনহাকে সমর্থন করা নিয়ে সিপিএম দলের মধ্যে ক্ষোভের পারদ চড়ছিল। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন জায়গায় যায় যে, সিপিএমের সর্বভারতীয় ফেসবুক পেজে যশবন্ত সংক্রান্ত পোস্টে কমেন্ট সেকশনই বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার আগে সিপিএমের ফেসবুক পেজে যশবন্তকে সমর্থন করার পরপরই ৯০টিরও বেশি কমেন্ট পড়ে। যার মধ্যে অধিকাংশ মন্তব্যেই যশবন্তকে সিনহাকে সমর্থন করার কারণে পার্টি নেতৃত্বকে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যশবন্ত সিনহাকে সমর্থন করা ছাড়া সিপিএমের অন্য কোনও উপায়ও ছিল না। কারণ, বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে দেশের অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বামেদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতো। তাই সিপিএম কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী জোটের সর্বসন্মত প্রার্থী তৃণমূলের যশবন্ত সিনহার বিরুদ্ধে আলিমুদ্দিনকে কোনও বিরূপ মন্তব্য যাতে করা না হয় সে রকমই বার্তা পাঠিয়েছে। এ কে গোপালন ভবনের বক্তব্য, সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে রুখতে যেহেতু সব বিরোধী দলগুলি ঐকমত্যে পৌঁছেছে তখন যেন বাংলা ভিন্ন পথে না হাঁটে।
তার আগে মমতা যখন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করা নিয়ে প্রথম বৈঠক ডেকেছিলেন সেখানে সিপিএমের তরফে প্রতিনিধি থাকা নিয়ে পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আলিমুদ্দিন ক্ষোভ জানিয়েছিল। সেখানে যশবন্ত সিনহাকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলার নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হয়নি বলেও অভিযোগ। এতে আলিমুদ্দিনের নেতারা ইয়েচুরির বিরুদ্ধে ক্ষোভপ্রকাশ করেন। ইয়েচুরির বক্তব্য, যশবন্ত সিনহা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির পদ ছাড়ায় তাঁকে সমর্থনের ক্ষেত্রে পার্টিগত কোনও অসুবিধা নেই। পার্টির বাংলা শাখা যাতে প্রশ্ন না তোলে তাই ইয়েচুরি সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজাকে শরদ পাওয়ারের কাছে পাঠিয়েছিলেন যাতে যশবন্ত সিনহা তৃণমূলের দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাছাড়া ইয়েচুরি কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও রাজ্য সম্পাদক কোডিয়ারি বালকৃষ্ণনের সঙ্গে আলোচনা করে এলমারাম করিমকে প্রতিনিধি হিসাবে মমতার ডাকা বৈঠকে পাঠিয়েছিলেন। প্রশ্ন যশবন্তকে সমর্থন নিয়ে আলিমুদ্দিন কি আগামী কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে সীতারামকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারবে?
সিপিএমের মতো দলে কর্মীদের অনুশাসনে বাঁধার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু দল কী শুধু কর্মীদের, লক্ষ লক্ষ পার্টি সমর্থকের নয়, ফলে
তাদের ক্ষোভটা তারা কোথায় জানাবেন ?