শান্ত তাঁতিপাড়া। বন্ধ খটাখট। তন্তুবায় জাতির জন্মদিন আজ। কথিত, কৈলাস যাওয়ার পথে প্রত্যেক বছর আজকের দিনে মা উমা তাঁতির ঘরে আসেন শুভেচ্ছা জানাতে। সবাইকে পুজোয় নতুন বস্ত্র পরানোর কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বয়ং মায়ের ভালবাসায়। যেহেতু আজ তিনি তাঁতঘরেই থাকেন, তাই সেখানেই তাঁর আরাধনা। তাঁত গর্তে পা নৈব নৈব চ।
সত্যি মিথ্যা জানি না। আজও মানা হয় এবং নিশ্চয়ই হচ্ছে সর্বত্র। তবে হস্তচালিত কাঠের তাঁতের যুগ পেরিয়ে আমরা এখন অনেকেই লৌহনির্মিত পাওয়ার লুমে এসে গেছি। তন্তুবায় নন, এমন অনেকেই সেগুলি চালান। সেগুলি আজ বন্ধ নাও থাকতে পারে। নাও ঘটতে পারে মায়ের পদার্পণ সেইসব জায়গায়।
শৈশবে কৈশোরে দেখতাম, রথযাত্রার পর থেকেই যেকোন ধরণের শাড়ির প্রচুর চাহিদা। ধুতি গামছারও। তাঁতিপাড়ার বিশ্রাম নেই। উদয়াস্ত খাটনি। তখন পুজো মানেই জামদানি, টাঙ্গাইল, বালুচরী– এইসব ট্রাডিশনাল শাড়ির চাহিদা। ধনীদের মুর্শিদাবাদ সিল্ক, কেঠে, মটকা, মসলিন, বাপ্তা, গরদ, তসর। ৬০ ও ১০০ সুতোর চাহিদা থাকলেও ৮০ সুতোর ওপর কাজ হত বেশি। তাঁতির বৌয়ের সুতো লাটানো, ললি পাকানো, মাড় করতেই দিন কাবার।

বাড়ির বড়দের মতো ছোটদেরও হাত লাগাতে হত শাড়িতে। বাবার দু-পাশে বসে ভাই-বোনেরা ডগা মোটা বিশেষ ধরণের সূচ দিয়ে কত ফুল তুলেছি শাড়িতে। মনে পড়ে। ফুল মানে যে সবসময় ফুল, তা নয়। বিভিন্ন ধরণের নকশা। কাজটার নাম ফুল তোলা। কখনো বা ডবিতে করে দিত হত নানারকম নকশা সেটিং। রীতিমতো অঙ্ক কষে। কখনো বা বোনা শাড়ি রোদে শুকোনো। নানারকম কায়দায় ভাঁজ। সেসব ভাঁজের নামের যে কত ভাঁজ! সব মিলিয়ে মহাজন থেকে শুরু করে সুতো রংকারী, শিল্পী, লাটানি, বাঁটানি সক্কলের ব্যস্ততা তুঙ্গে পুজোর আগে।
সেসব যুগ পেরিয়ে আমরা এখন অনেক আধুনিক। আগে মেয়ে বড় হলেই আর ফ্রক কিনে দেওয়া হত না। শাড়ি দিত। বিয়ের পর পরতে পারবে ভেবে। আর এখন? বিবাহিত মেয়েরাও কজন শাড়ি পরে, হাতে গুণে বলা যাবে। বাঙালি মেয়েরা শাড়ি পরতে ভুলে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক। কাজে কাজেই, তাঁতিপাড়াও এখন আগের মতো ব্যস্ত নেই অতটা।
শিল্পী’ গল্পের মদন তাঁতির মতো ক-জন মাত্র আছে তাঁতিপাড়ায় তাঁত আগলে। ধুঁকছে তাঁতিপাড়া। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকার কেউই তাঁতিদের জন্য কিচ্ছু করছে না। বামেরাও করেনি কস্মিনকালে। এর মূল কারণ, মদন তাঁতিরা জোটবদ্ধ হতে পারেনি। এ যুগে জোটবদ্ধ হয়ে অন্যায় করে গেলেও সরকার মেনে নিচ্ছে। শিল্পীর ন্যায্য দাবি দাওয়া তো মানতেই হবে। না মানলে রাজাকে উলঙ্গ করে পথে নামাতে হবে অবশেষে।

“অতি লোভে তাঁতি নষ্ট”-এই প্রবাদটা কে বলেছিল কে জানে! জানতে পারলে ধাওয়া করতাম। তাঁতিরা কোনোদিন লোভী ছিল না। আজও নেই। আমরা সংগ্রাম করে বাঁচি। সহ্য করি। অপরকে শোষণ, লুণ্ঠন, প্রভাব খাটানো তাঁতিদের স্বভাব নয়। সে শিল্পী। তাই খিয়ে খিয়ে (সুতোয় সুতোয়) তার বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা। যার উপযুক্ত দাম সে কখনো পায়নি। তাই প্রবাদটা আর নয়।
অভাব অনটন সত্ত্বেও জন্মদিনটা এখনো আসে। মা দুগ্গাও হয়ত আসেন তাঁতঘরে। যথাসাধ্য খাওয়া দাওয়ায় হয়। তাঁত বন্ধ থাকায় একে অন্যের বাড়ি গিয়ে খণ্ড আর চালভাজা খাবার সময়টাও পাওয়া যায়। তারপর আবার শুরু হয় মন্দার সাথে লড়াই করে রোজ বেঁচে থাকা। মহাজনদের শোষণ, অসুখ আর ধার-দেনাকে নিয়ে পথ চলা। দিনগত পাপক্ষয়। জন্মদিনে সমস্ত তাঁতশিল্পীকে আমার শ্রদ্ধা শুভেচ্ছা ভালবাসা। মা দুর্গার আশীর্বাদে সব দুর্গতির অবসান হোক এই প্রার্থনা করি।
লেখাটা নিলয় কুমার বসাকের সাহায্য পাওয়া।