“অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে/প্রদীপ-শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম/তোমায়, হে সুন্দর, বন্দিতে! /সঙ্গীতে সঙ্গীতে॥”
নদীর মত বয়ে চলা জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জুড়ে রয়েছে সংগীতের মূর্ছনা। আর সেই সংগীত যখন উৎসবে পরিণত হয় তখনই তৈরি হয় মিলনমেলা। গত বৃহস্পতিবার ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে দমদম সেন্ট মেরি স্কুলের মাঠে ‘দমদম সংগীত মেলা’। চললো ৫ ফেব্রুয়ারি রবিবার পর্যন্ত। টানা চারদিন ধরে মেতে থাকলো শহর দমদম শুধুই সুরের মূর্ছনায়। বহু নামী দামী শিল্পী ও শ্রোতাদের সহাবস্থানে প্রতিদিন বিকাল পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত চলতো সঙ্গীত মেলা। প্রবেশ অবাধ। কেবলমাত্র গান নয়, মেলার চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা অসাধারণ হস্তশিল্প দমদম সংগীত মেলায় অন্যতম আকর্ষণ।

এবছর তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করল দমদম সংগীত মেলা। গত দু-বছর কোভিডের কারণে বন্ধ ছিল প্রায় সমস্ত রকম অনুষ্ঠান। দমদমের বিধায়ক অধ্যাপক ব্রাত্য বসুর আন্তরিক উদ্যোগে, প্রবীর পালের (প্রাক্তন পৌরপ্রধান পারিষদ,দ: দমদম পৌরসভা) ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই সঙ্গীত মেলার আয়োজন। শুরু থেকেই এই সমারোহের উদ্দেশ্য ছিল, রাজনীতি বিরোধিতা সমাজনীতি বিভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে সমস্ত মানুষকে এক সুরের তারে গাঁথা। গানের সুর ভুলিয়ে দিতে পারে, যে কোন যন্ত্রণাকে। এ তথ্য নতুন নয়। মিউজিক থেরাপির ব্যবহার এখন বহু ক্ষেত্রেই করা হচ্ছে। সেই বার্তাই মেলার আনাচে কানাচে, বিভিন্ন সুরযন্ত্রে মানুষের কণ্ঠে খুঁজে পাওয়া গেলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য। তিনি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং আশা রাখলেন বাংলা সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হবে এ ধরনের অনুষ্ঠানে। যাদের হাত ধরে বাংলা গান আগামীতে এগিয়ে যাবে তাদের মধ্যে অন্যতম অন্বেষা দত্তগুপ্ত এবারেই প্রথম এই মেলায় গান গেয়েছেন। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক হলেন মীর। সঙ্গীতের এই মহোৎসবে সঞ্চালনার দায়িত্ব পেয়ে তিনিও নিজেকে ধন্য বলে মনে করেছেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ব্রাত্য বসু ও আহ্বায়ক প্রবীর পাল (কেটিদা) মহাশয়কে। দমদম সংগীত মেলার মতো উদ্যোগ এই সময় এবং আগামী দিনে খুবই জরুরী বলে মনে করেন মীর।

মেলার দ্বিতীয় দিনে সংগীতের মহাসম্মেলনে একই মঞ্চে গানের ডালি নিয়ে উপস্থিত থেকেছেন শহরের বিখ্যাত বাংলা ব্যান্ডের শিল্পী সিধু, পটা (ক্যাকটাস), সৌমিত্র (ভূমি) অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় (চন্দ্রবিন্দু) অনিন্দ্য বোস (শহর), গাবু (লক্ষ্মীছাড়া) এবং তিমির বিশ্বাস (ফকিরা)। সিধু বলেন,— ‘বাংলা ব্যান্ডের শিল্পীরা নিজস্ব ভাবে আর কোথাও এভাবে সঙ্গীত পরিবেশন করেছে কিনা জানিনা কিন্তু বাংলা ব্যান্ডের শিল্পী ও কলা কুশলীদের এই মিলন মঞ্চ তৈরি করে দেওয়ার জন্য দমদম সংগীত মেলার উদ্যোগে সাধুবাদ জানাচ্ছি।’
বাংলা ব্যান্ডের জনপ্রিয় শিল্পী অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় ব্রাত্য বসুকে কুর্নিশ জানিয়ে বলেন, দমদম সংগীত মেলা আমাদের কাছে একটি নস্টালজিয়া। করোনার পরে আমরা সবাই আবার কাজ করছি, গান গেয়েছি, আবার একসঙ্গে মিলিত হয়েছি— এটা অনেক বড় পাওনা। দমদম সংগীত মেলা এটাই করে দেখাচ্ছে।

বাংলা গানের এমন এক মহোৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে বাংলাদেশের শিল্পী লীমন রীতিমত গর্বিত। সঙ্গীত যে সার্বজনীন, তার যেকোনো বেড়া নেই — এই মেলা তাই প্রমাণিত করলো। বাংলা ব্যান্ডের অন্য এক শিল্পী সৌমিত্র রায় বললেন, — ‘এই যে হাজার হাজার শ্রোতা অনুষ্ঠান শেষে আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন এটাই তো যেকোনো উদ্যোগের সার্থকতা। সেই দিক থেকে দমদম সংগীত মেলা সার্থক। এত কিছুর মধ্যে তারা মানুষকে নির্মল আনন্দ দিতে পেরেছেন।’
শনিবার মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পদ্মপলাশ, জিৎ গাঙ্গুলী, মোনালি ঠাকুর।। অনুষ্ঠানের শুরুতে কীর্তনসাধক পদ্মপলাশ হালদারের সুরের ভক্তিতে রসময় হলেন শ্রোতা। বিখ্যাত সংগীত পরিচালক এবং গায়ক জিৎ গাঙ্গুলী গানে গানে দর্শকদের মন জয় করলেন। উত্তর কলকাতার ছেলে জিৎ গাঙ্গুলীর কলকাতায় গান করাকে নিজের ঘরে গান করা বলে মনে করেন। তার কণ্ঠে ‘ঢাকের তালে কোমর’ দোলালেন শহরবাসী।

বাংলা তথা বলিউডের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অতি পরিচিত নাম মোনালি ঠাকুর। গলা খারাপ থাকা সত্ত্বেও শহরবাসীর আবেগ ও ভালবাসায় ‘হাওয়া কে ঝোকে’ আপ্লুত করলো শ্রোতাদের। রাত প্রায় সাড়ে দশটা পর্যন্ত মাতিয়ে রাখলেন শ্রোতাকে তার সুরের জাদুতে।
কাল ছিলো সঙ্গীত মেলার শেষ দিন। শ্রীরাধা বন্দোপাধ্যায়, অর্ক মুখোপাধ্যায় এবং শান-এর মতো শিল্পীরা তাদের গানের অঞ্জলি নিয়ে উপস্থিত থাকলেন মঞ্চে। রবীন্দ্র সংগীত, বাংলা-হিন্দি সিনেমার গান শোনালেন শান। রাত এগারোটায় ‘অল ইস ওয়েল’ হয়ে সমাপ্ত হলো সঙ্গীতানুষ্ঠান।
বাঙালির সাঙ্গীতিক-সংস্কৃতির মিলন মঞ্চে সুরের মূর্ছনায় মন, হৃদয় আলোড়িত হলো সকল শহরবাসীর। সার্থক হলো সংগীতের মাধ্যমে এই অনবদ্য মিলন উৎসব।
খুবই সুন্দর উপস্থ্পনা
ধন্যবাদ।
আগে জানলে একদিন যেতাম, খুব মিস করলাম অনন্য অনুষ্ঠান, যদি পরে ভিডিও দেখতে পাই ভালো লাগবে। সুন্দর বর্ণনা।
পরের বছর আগে থেকে বলবো। সুন্দর আয়োজন।