পট বলতেই মনে আসে গাজীর পটের কথা। বিশেষ করে মুসলিম ধর্মের মানুষদের কাছে গাজীর পট ছিল খুবই জনপ্রিয়। আর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুজো করতেন দুর্গাপট, লক্ষ্মীপট সামনে রেখে। পট মানে কাপড়। তার ওপর দেশী রং দিয়ে আঁকা ছবি। বাংলায় দু-ধরনের পট প্রচলিত রয়েছে। একটি চৌকাপট, অন্যটি বহুপট বা দীর্ঘপট। যখন কোনো রীতিসিদ্ধ শিল্পকলা ছিল না, তখন পটচিত্রই প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যকে সযত্নে ধারণ করেছিল। বিশেষ করে বারো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত পটের চর্চা ছিল বেশ জনপ্রিয়। পট আঁকিয়েরা হলেন পটুয়া। পট দেখিয়ে তাঁরা গানও করতেন। গাজীর পটে চম্পাবতীর কাহিনী, গাজী পীরের বীরত্বগাথা অলৌকিক শক্তি কথা ছবি সহ উপস্থাপিত হত। সঙ্গে গানে গানে বর্ণনা করা হত কাহিনি। হিন্দুদের কাছে জনপ্রিয় ছিল রামকাহিনী, কৃষ্ণকাহিনী, মহাভারত ও রামায়ণের চরিত্র। একইভাবে আঁকা হতো দুর্গাপট ও লক্ষ্মীপট। জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গোৎসব সম্ভব না হলেও দুর্গাপটের পুজো হত। আঁকা ছবিতে লক্ষ্মীর অর্চনাও হত। এখনও পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে পটের পুজো হয়।
বর্ধমান রাজবাড়ির পটচিত্রের দুর্গা পুজো শুরু হয়েছিল পাঞ্জাবি বণিকের হাতে। মুঘল রাজত্বকালে তিনি বাংলায় এসে ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন। তাঁর আমলেই শুরু হয়েছিল ন’দিন ব্যাপী নবরাত্রি এবং দুর্গোৎসব পালন। তারপর থেকে লক্ষ্মী নারায়ণ জিউয়ের মন্দিরে মহাধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। আর একেবারে গোড়ার দিন থেকেই হাতে আঁকা পটচিত্র দিয়ে পুজো হয়ে আসছে। তবে গোটা বাংলায় যেভাবে দুর্গাপুজো হয়, তার থেকে অনেকটাই আলাদা বর্ধমানের এই পুজোর। কারণ, এখানে অবাঙালি প্রথা নবরাত্রির সঙ্গে বাঙালির দুর্গাপুজো মিলেমিশে একাকার। আসলে এই রাজপরিবারের পূর্বপুরুষরা লাহোর থেকে আসার সময় দেবী চন্দ্রিকার একটি মূর্তি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। যিনি কিনা দুর্গারই আরেক রূপ। তারপর থেকেই প্রতি নবরাত্রিতে দেবী চন্দ্রিকার মূর্তিতে পুজোর পাশাপাশি হাতে আঁকা পটচিত্রের দুর্গা পুজো শুরু হয়। ভোগের ক্ষেত্রেও এখানে বৈচিত্র রয়েছে। খিচুড়ির বদলে এখানে দেওয়া হয় ছোলা-পুরি এবং হালুয়া। তবে বর্ধমান রাজপরিবারের সদস্যদের কোনওভাবেই পাঞ্জাবী বলে চিহ্নিত করা যাবে না, তাঁরা মনেপ্রাণে পুরোপুরি বাঙালি।
বিষ্ণুপুরের শাঁখারি বাজার এলাকার বাসিন্দা ফৌজদার পরিবার বা মল্লরাজের কুলদেবী মৃন্ময়ীর পুজো প্রায় হাজার বছরের পুরনো। অতীতের রীতি মেনে এখানে পুজো শুরু হয় পনেরো দিন আগে। রথের দিন রাজপুরোহিত পট আঁকার জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় পৌঁছে দেন ফৌজদার পরিবারে। ওই দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় পট তৈরির প্রস্তুতি। বিশেষ পদ্ধতিতে ওই কাপড়কে আঁকার উপযোগী করে তোলা হয়। পট আঁকার জন্য সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হয়। কাঁচা হলুদ থেকে সংগ্রহ করা হয় হলুদ রঙ, পুঁই শাকের ফল থেকে বেগুনি রঙ, গিরিমাটি থেকে খয়েরি, খড়িমাটি থেকে সাদা রঙ তৈরি করা হয়। প্রয়োজনমতো এই রঙগুলি বিভিন্ন অনুপাতে মিলিয়ে তৈরি করা হয় অন্যান্য রঙ। জিতাষ্টমীর পরের দিন মৃন্ময়ীর মন্দিরে শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজার উৎসব। প্রাথমিক ভাবে মল্ল রাজারা ঘটে-পটে মৃন্ময়ীর পুজো শুরু করেছিলেন। সেই প্রথম পুজো-উৎসবের সময়েই পট আঁকার দায়িত্ব পড়ে সেনাপতি ফৌজদারের উপর।
পটচিত্রে দুর্গা পুজোর প্রচলন রয়েছে বাঁকুড়ার সিমলাপালের পার্শ্বলা, কুকড়াকোন্দড় আর রানিবাঁধের আখখুটার মল্লিক বাড়িতে। গ্রামের মল্লিক বাড়ির ব্যতিক্রমী এই পূজোকে ঘিরে মেতে ওঠেন এলাকার মানুষ। মল্লিক পরিবার থেকে জানা যায়, প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি আগে, হুগলির গোঘাটের শ্যামবাজার ফুলুই গ্রামে মহামারির প্রকোপ দেখা দিলে পেশায় ব্যবসায়ী জনৈক ক্ষেত্রমোহন মল্লিক ও তাঁর পরিবার বাঁকুড়ার সিমলাপালের পার্শ্বলা গ্রামে চলে আসেন। এখানে তাঁরা স্থানীয় রাজার কাছ থেকে পার্শ্বলা, কুকড়াকোন্দড়, আখখুটা সহ ২২ টি মৌজা কিনে নেন। শ্যামবাজার-ফুলুই গ্রামে থাকাকালীনও মল্লিক বাড়িতে দুর্গা পুজো হত। তবে তা হত প্রস্তর মূর্তিতে। পরে সেই মূর্তি পার্শ্বলা গ্রামে আনার চেষ্টা করলে স্থানীয়দের কাছে মল্লিক পরিবার বাধা পান। পরে কুলগুরুর নির্দেশ অনুসারে মল্লিকরা পটচিত্র আঁকিয়ে দুর্গা পুজো শুরু করেন। সেই প্রথা এখনো চলছে। ক্রমে মল্লিক পরিবার আখখুটা ও কুকড়াকোন্দড়ে ছড়িয়ে পড়ায় দু’জায়গাতেও পটচিত্রে দুর্গা পুজো শুরু হয়।
পটের দুর্গা পুজো হয় পঁচেটগড় রাজবাড়িতেও। জানা যায় ওড়িশার কটক জেলার আটঘর এলাকার বাসিন্দা কালুমুরারি মোহন দাস মহাপাত্র আকবরের রাজ কর্মচারী ছিলেন। তিনি পটাশপুর পরগনায় বাদশাহ আকবরের দেওয়া নানকর ভূমিতে জমিদারি শুরু করেন। পরে পঁচেটগড় গ্রামে বিশাল গড় নির্মাণ করেন তিনি। পরবর্তীকালে এখান থেকে উদ্ধার হওয়া এক শিবলিঙ্গকে কেন্দ্র করে কালুমুরারি মোহন দাস মহাপাত্র তৈরি করেন পঞ্চেশ্বর মন্দির। পরে বেনারস থেকে আরও চারটি শিবলিঙ্গ এনে স্থাপন করা হয়। ক্রমে পঞ্চেশ্বর নামটি প্রচার হতে থাকে। তারপর শুরু হয় দুর্গাপুজো। প্রথমদিকে মূর্তিপুজো হত, রাজপরিবার শৈব থেকে বৈষ্ণব হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় মূর্তিপুজো। কিন্তু শোলা ও পটে আঁকা দুর্গাপুজোর চল শুরু হয়। তখন থেকেই ঐতিহ্য মেনে পটের দুর্গা পুজো চলছে।