| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

চণ্ডীপুথিতে দুর্গাপূজা : সুখেন্দু হীরা

Reporter
সুখেন্দু হীরা / ৫৩৫ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মানুষের জ্ঞান পিপাসা সহজাত। অচেনাকে চেনা, অজানাকে জানার আগ্রহ মানুষের চিরকালীন। হয়তো এই কৌতূহল প্রবৃত্তি থেকেই মানুষের ঈশ্বরের খোঁজ। এই জ্ঞানের সন্ধানে মানুষ যা লাভ করে, তা হল অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা অন্যান্য সঙ্গীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য মানুষ লিপিবদ্ধ করতে শুরু করল তাঁর সেই অভিজ্ঞতা। এই ভাবে মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডার সঞ্চিত হল। এই সঞ্চিত জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাজে এলো।

জ্ঞান লিপিবদ্ধ করার জন্য প্রথম মানুষ বেছে নিয়েছিল পাথরের দেওয়াল, তারপর পোড়ামাটির পাত্র, ধাতব আধার, গাছের ছাল, গাছের পাতা, তারপর গাছের থেকে তৈরি কাগজ। গাছের পাতা বা কাগজের ওপর হাতে লেখা গ্রন্থকে বলা হয় পুথি। যতদিন পর্যন্ত ছাপাখানা আবিষ্কার হয়নি। ততদিন পর্যন্ত মানবসভ্যতার প্রধান জ্ঞানের আধার ছিল পুথি। প্রথমদিকে মনুষ্য জ্ঞানের অধিকাংশ জুড়ে ছিল আধ্যাত্ম জ্ঞান। এই কারণে পুথির সিংহভাগ রচিত হত ধর্মীয় পুথি।

যখন ছাপাখানায় বই ছাপা হতে লাগল, তখন এই পুথির চর্চা বন্ধ হয়ে গেল। পুথির তুলনায় পুস্তক সহজলভ্য হওয়ায় পুথি লেখাও বন্ধ হয়ে গেল। পুথিগুলি লালশালু বন্দি হয়ে পাঠাগারে, কুলঙ্গিতে বা দেবতার আসনে ঠাঁই পেল। ধর্মীয় পুথিগুলি সহজেই ঠাকুরের আসনে উঠল। আগে যে পুথিগুলি পূজা-আর্চার সময় পাঠ করা হত, সেইগুলো সহজেই দেবতায় পরিণত হল। কারণ পাঠ করার মতো পুস্তক বাজারে চলে এসেছে। তাছাড়া পুথিগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংস্কৃত বা প্রাচীন বাংলা লিপিতে লিখিত। তাই অনেক জায়গায় পুথি পাঠ লোকজন পাওয়া গেলনা। তাই পুথিগুলো সহজেই লালশালু বন্দী হয়ে দেবতা হয়ে গেল।

গ্রামবাংলায় ঘুরলে অনেক বাড়িতে, মন্দিরে দেখা যাবে পুথি নিয়মিত বা বিশেষ উৎসবে পূজিত হয়। বৈষ্ণব পুঁথিগুলি সংকীর্তনের সময় মাঝখানে রেখে কীর্তন করা হয়। কিছু পুথি নারায়ণ জ্ঞানে নিত্য পূজা করা হয়। চণ্ডীপুথিকে দুর্গা জ্ঞানে পূজা করা হয়।

বঙ্গদেশে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত পুঁথির মধ্যে সর্বাধিক হলো শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথি। সংস্কৃত শাস্ত্রগুলির মধ্যে ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’র প্রতিটি শ্লোক মন্ত্র রূপে ব্যবহৃত হয়। এই গ্রন্থ আদ্যাশক্তির মন্ত্রময়ী রূপ হিসেবে পূজিত হয়। তাই এই পুথির পবিত্রতা বিশেষ রক্ষিত হত।

যেমন শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথি তুলট কাগজে নয়, তালপাতাতে লেখা হত। তালপাতা ভঙ্গুর, অনেক ক্ষেত্রে কালি মুছে যায়। তুলট কাগজে লেখার জায়গায়ও বেশি। তা সত্ত্বেও শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথি তালপাতায় লেখা হত। কারণ তুলট কাগজ তৈরির অন্যতম উপাদান ভাতের মাড়। তাছাড়া ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই তুলট কাগজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকত।

বিশেষজ্ঞরা বলেন তালপাতায় পুঁথি লেখার আরেকটি কারণ হল — যোগিনীতন্ত্রের একটি নিদর্শন। সেখানে মহাদেব পার্বতীকে বলছেন, “হে প্রিয় ভূর্জপত্র, তেজপত্র অথবা তালপত্রকে কিঞ্চিৎ গুরু (মোটা) করে পুস্তক করাবে। স্বম্ভব হলে স্বর্ণপত্র, এমনকী তাম্রপত্রেও লেখা যায়। অন্য বৃক্ষত্বকে, কেতকিপত্র, মৃৎপাত্র, আম্রপত্র, রৌপ্যপত্র, বটপত্র বা বহুদলযুক্ত পত্রে যে লিখে অভ্যাস করে, তার দুর্গতি ও নিশ্চিত ধনহানি হয়।”

বাংলায় ভূর্জপত্র পাওয়া যায়না। সে যুগে আমদানি করা হলেও তা ছিল অপ্রতুল। তেজপাতা খুব ছোটো, স্বর্ণপত্র ও তাম্রপত্রে লিখতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। আর গ্রামবাংলায় তালগাছের অভাব নেই। তাই তালপাতার পুথিও প্রতুল। এই সব কারণে তালপাতাতেই শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথি লেখা হত। তুলট কাগজে চণ্ডী পুথি লেখা হলেও তার সংখ্যা খুব কম।

এছাড়া ‘পদ্মপুরাণ’-এর পাতাল খণ্ডের ত্রিষষ্টিতম অধ্যায়ে রামচন্দ্র ও শিবের কথোপকথনে মহাদেব ‘শ্রীতাল’ পাতায় দেবাক্ষরে লিখিত পুথির প্রসঙ্গ এনেছেন। ‘পাল যুগের চিত্রকথা’ গ্রন্থের লেখক সরসীকুমার সরস্বতীর মতে পূর্বভারতে দু-ধরনের তালপাতা পাওয়া যেত — খরতাড় ও শ্রীতাড়। এরমধ্যে শ্রীতাড় পুথি লেখার জন্য উপযুক্ত। এই পাতাকে ‘তেরেট’ পাতাও বলা হয়। তাড় ও তাল একই শব্দের ধ্বনি পরিবর্তন। বোঝা যাচ্ছে পুরাণের যুগ থেকে তালপাতা পবিত্র বলে ধরা হয়।

তালপাতায় লিখিত শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথির এত মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা ছিল যে, বাংলায় ছাপাখানার প্রবর্তন হলে প্রকাশকরা তালপাতাতেও শ্রীশ্রীচণ্ডী ছাপাতেন। এর সূচনা করেছিলেন জনপ্রিয় নাট্যকার তথা পত্রিকা সম্পাদক হরিপদ চট্টোপাধ্যায়, তাঁর ‘শাস্ত্রপ্রকাশ কার্যালয়’ নামে ছাপাখানা থেকে তালপাতায় সীসার টাইপ দিয়ে প্রাচীন পুথির আকারে মুদ্রণের ব্যবস্থা করেছিলেন।

শ্রীমদ্ভাগবত গীতার মতো শ্রীশ্রীচণ্ডীও হিন্দুদের নিত্য পাঠ্য। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গীতা যেমন মহাভারতের অংশ। তেমনি শ্রীশ্রীচণ্ডী মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ। মজার ব্যাপার হচ্ছে গীতা ও শ্রীশ্রীচণ্ডী একই লেখক দ্বারা বিরচিত — মহামুনি ব্যাসদেব। কারণ, বলাহয় বেদব্যাস মহাভারত ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ দুইই লিখেছিলেন।

মার্কণ্ডেয় পুরাণে ৮১ তম অধ্যায় থেকে ৯৩ তম অধ্যায় অর্থাৎ ১৩টি অধ্যায় দেবী মাহাত্ম্য নামে উল্লিখিত। এখানে মহামায়া বা দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। এতে সাতশ মন্ত্র আছে, তাই এর আরেক নাম ‘সপ্তশতী স্তব’ বা ‘সপ্তশতী স্ত্রোত্র’। মৎস্য সূত্রে বলা আছে যজ্ঞের মধ্যে অশ্বমেধ যজ্ঞ শ্রেষ্ঠ, দেবতাদের মধ্যে ভগবান শ্রীহরি অর্থাৎ বিষ্ণু শ্রেষ্ঠ, স্তবের মধ্যে সপ্তশতী স্তব শ্রেষ্ঠ।

শ্রীশ্রীচণ্ডীকে সপ্তশতী স্তব বললেও এতে সাতশ শ্লোক নেই। শ্লোক আছে ৫৭৮টি। ৫৭৮ শ্লোক ৭০০ মন্ত্রে বিভক্ত। শ্রীশ্রীচণ্ডী তিন ভাগে বিভক্ত — প্রথম চরিত, মধ্যম চরিত ও উত্তর চরিত। প্রথম অধ্যায় নিয়ে শুধু প্রথম চরিত। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ এই তিনটি অধ্যায় নিয়ে মধ্যম চরিত। পঞ্চম থেকে ত্রয়োদশ অধ্যায় অর্থাৎ ন’টি শেষ অধ্যায় নিয়ে উত্তর চরিত।

দেবী মাহাত্ম্যের মধ্যে আছে মধুকৈটভ বধ, মহিষাসুর বধ ও শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ। প্রথম চরিতে আছে মধুকৈটভ বধ, মধ্যম চরিতে আছে মহিষাসুর বধ, এবং উত্তর চরিতে আছে শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ। তিন চরিতে তিন মহা অসুর বধের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অসুরদের বধের মাধ্যমে দেবী মাহাত্ম্য কীর্তন করা হয়েছে। এরমধ্যে দ্বিতীয় অধ্যায়ে মা দুর্গা এবং সপ্তম অধ্যায় মা কালীর আবির্ভাব কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম চরিতের দেবতা মাহাকালী, দ্বিতীয় চড়িতে মা লক্ষ্মী ও তৃতীয় চরিতে মা সরস্বতী।

চণ্ডী পাঠের দ্বারা সকাম ভক্ত সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার, রোগমুক্তি এবং সর্বাধিক ঐহিক সুখ লাভ করেন। নিষ্কাম ভক্ত পরম জ্ঞান লাভ করে মুক্তি লাভ করেন। দুর্গাপূজার সময় চণ্ডীপাঠ করা হয়। বলা হয় দুর্গাপূজা, কলির অশ্বমেধ। অশ্বমেধ যজ্ঞের উদ্দেশ্যে ছিল শত্রু দমন, দ্বিগবিজয় ও ধর্ম সাম্রাজ্য গঠন। তলিয়ে দেখলে বলা যাবে দুর্গাপূজার উদ্দেশ্যও তাই।

শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথি পাঠেও একাধিক বিধিনিষেধ প্রচলিত ছিল। যিনি পুথির অনুলিখন করতেন, তিনি সেই পুথি পাঠ করতে পারতেন না। নিজে পুথি লিখলেও পাঠ করার সময় অন্যের পুথি নিয়ে আসতে হবে। সকালে স্নান করে পবিত্র ভাবে ও একান্তচিত্তে পূর্ব বা উত্তর দিকে মুখ করে বসে বিশুদ্ধ উচ্চারণ সহকারে শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ করতে হয়। পাঠের সময় কথা বলতে নেই। এক অধ্যায় শেষ না করে পাঠ থামানো যায় না। পুস্তক হাতে ধরে বা মাটিতে নামিয়ে রেখে পাঠ করতে নেই। কোনও আধারে রেখে পাঠ করতে হয়।

শাস্ত্রে শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠের শুরুতে ও শেষে পূজার বিধি আছে। এই সময়ে পুথিটিকে পূজা করা হয়। বলা আছে শ্রীশ্রীচণ্ডী পুস্তকখানি কাঠ বা অন্য কোনও আধারে রেখে গন্ধ পুষ্পাদি দ্বারা পূজা করতে হবে — “এষ গন্ধ: ওঁ দেবী মাহাত্ম্য পুস্তকায় নমঃ” ইত্যাদি। এবং হ্রীং মন্ত্রে প্রাণায়াম করে পাঠ করতে হবে। প্রত্যেক অধ্যায়ের পাঠ শেষে ঘন্টা বাজাতে হবে। ঘট স্থাপন করে পূজা করলে ঘট বিসর্জন দিতে হবে।

পুথিপূজার সময় পুথির ওপর ও নিচের কাঠের পাটা বা মলাটের বর্হিভাগে চন্দন, সিঁদুর, কুমকুম দিয়ে চর্চিত করা হত। তাই প্রাচীন শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথির পাটাতে চন্দন ও সিঁদুরের পুরু আস্তরণ দেখা যায়।

সারা বছর চণ্ডীপাঠ করা গেলেও, দুর্গাপূজার সময় পাঠ করা হবেই হবে। কোনও কোনও জায়গায় শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথিকে দুর্গা রূপে পূজা করা হয়। যেমন পুরুলিয়া জেলার পাড়া থানার আনাড়া গ্রামে চক্রবর্তী পরিবারে দুর্গাপূজাতে কোনও মূর্তি বা ঘট পূজিত হয়না। এই পরিবারের পূর্বপুরুষ বনমালী পণ্ডিত কর্তৃক লিখিত তালপাতার শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথিকে দুর্গা জ্ঞানে পূজা করা হয়। পুথিটি নাকি মহিষের রক্ত দিয়ে লেখা।

এই জেলার করচা গ্রামে চক্রবর্তী পরিবারেও তাল পাতায় লেখা শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথিতে দুর্গাপূজা হয়। চক্রবর্তী পরিবারের প্রাচীন তালপাতার পুথিটি বাঁশের সরু বাতা দিয়ে তৈরি প্রকোষ্ঠ বা খুঙ্গিতে রাখা থাকে। আর থাকে একটি খড়্গ। শারদীয়া দুর্গাপূজা ও বাসন্তী দুর্গাপূজার চার দিন এই পুঁথি বার করে বিশেষ পূজা করা হয়।

বাঁকুড়া জেলাতে অনেকগুলো জায়গাতে পারিবারিক পুজোয় শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথিকে পুজো করা হয়। সব ক্ষেত্রেই যে শুধু শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথি পূজা করা হয় তা নয়, কোথাও পটে পূজা হয়, কোথাও দেবী মূর্তি আছে, কোথাও প্রতিবছর প্রতিমা তৈরি করা হয়। দুর্গাপূজার চারিদিন, কোথাও আবার সন্ধিপূজার দিন শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথিকে পূজা করা হয়। কোথাও আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথির নিত্যপূজা হয়। এখানের পূজাতে চণ্ডীপাঠ হলেও পূজিত শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথি গুলি পাঠ হয় না; এমনকি খোলাও হয় না।

বাঁকুড়া জেলার ওন্দা থানার অধীন মাজডিহা গ্রামে মহাপাত্র পরিবারে ঘটে ও পটে দুর্গা পূজা হয়। সপ্তমীর দিন পট মেলা হয়। ঘট ও পটের সঙ্গে একটি চণ্ডীপুথির পূজা হয়। পুথিটি লাল-শালুতো মোড়া। আগে পাঠ হত। এখন খোলা হয় না। পটের নিচে পাটাতে পুথিটি থাকে। দশমীর দিন পট গোটানো হয়ে গেলেও চণ্ডী পুথিটি আসনেই থাকে। পাশে থাকে নারায়ণ শিলা। নিত্য পূজা হয় চণ্ডীপুথি ও নারায়ণ শিলার। দিনে অন্ন ভোগ। রাতে শীতল — মিষ্টি, মুড়কি, ফল।

পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া জেলাতে অনেক কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ পরিবারে দুর্গাপূজার সময় শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথিকে পূজা করা হয়। এজন্য এখানে অনেকে দুর্গামন্দিরকে চণ্ডীমন্দির বলে। এখানে বাঁকুড়া জেলার কয়েকটি কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ পরিবারের দুর্গাপূজার কথা উল্লেখ করা হল।

বড়জোড়া থানার মালিয়াড়া রাজবাড়িতে দুর্গাপূজাতে পূজিতা হন অষ্টধাতুর সিংহবাহিনী মূর্তি। অষ্টমী-নবমী সন্ধিক্ষণে এখানে এখনও কামান দাগা হয়। এই সন্ধি পূজার মুহূর্তে শ্রীশ্রীচণ্ডী পুথির পূজা হয়। আগে নাকি এই পুথি দুর্গাপূজার সময় পড়া হতো। কোনও এক পাঠকের অকাল মৃত্যু হওয়ায় আর পুথিটি খোলা হয় না। সন্ধি পূজার দিন পুরোহিত সঙ্গে করে পুথিটি নিয়ে আসেন। পূজার পর আবার পুথিটি ফেরত নিয়ে যান।

শালতোড়া থানার সালমা গ্রামে গোস্বামী বাড়ির দুর্গাপূজা হয় ‘নবপত্রিকা’তে। পূজা হয় শাক্ত মতে। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে হয় বলি। মন্দিরে একটি চণ্ডী পুথি আছে। তালপাতার পুথি লালশালুতে মোড়া। তবে দেখার উপায় নেই। এখন ভিতরে কী অবস্থায় আছে কেউ জানেন না। এই পুথিটিকে শুধুমাত্র দুর্গাপূজার সময় পূজা করা হয়।

গঙ্গাজলঘাটি থানার নতুন গ্রামের গোস্বামী পরিবারের দুর্গাপূজা হয় প্রতিমা গড়ে। গোস্বামী পরিবারে আগে চারটি পুথি ছিল। এগুলোকে দুর্গাপূজার সময় পূজা করা হত। চারটি পুথির মধ্যে দুটি পুথি বর্তমানে নিখোঁজ। বর্তমানে যে দুটি পুথি আছে তার একটি চণ্ডী পুথি ও আর একটি লক্ষ্মী পুথি। এগুলো খোলা হয় না। চণ্ডী পুথিটি আগের দূর্গা পূজার সময় পাঠ হত। এখন পাঠ হয় না এবং পূজাও হয় না। পরিবারের লোকেরা দাবি করেন একটি ত্রিশূলাঙ্কিত চণ্ডী। সম্ভবত পুথির গায়ে ত্রিশূল অঙ্কিত আছে। এখন শুধু লক্ষ্মী পুথিটি পূজা হয়।

তথ্যসূত্র :

১) শ্রীশ্রীচণ্ডী — স্বামী অরুণানন্দ (ভারত সেবাশ্রম সংঘ)

২) পুঁথি চর্চার আলোকে শ্রীশ্রীচণ্ডী — শুভম্ মুখোপাধ্যায় [উদ্বোধন ১২৫, ভাদ্র ১৪৩০, অষ্টম সংখ্যা]

৩) ক্ষেত্র সমীক্ষা।

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev