ছেলেবেলায় আমাদের গাঁয়ে কোনও বারোয়ারি দুর্গাপুজো হ’ত না। গোটা এলাকা জুড়ে কেবল আমাদের গাঁয়ের জমিদারবাড়িতেই হ’ত পারিবারিক দুর্গাপুজো। সত্যি কথা বলতে কী, দুর্গাপূজাটা গাঁয়ের অধিকাংশ মানুষের কাছেই কোনও সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না।
তখন আশ্বিন কিংবা কার্তিক মাস। আমাদের একফসলা জমির দেশে, বৈশাখ মাসের মধ্যেই ধান-চাল ফুরিয়ে যেত অধিকাংশ বাড়িতে। আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে ভাদ্রের মাঝামাঝি অবধি চাষের জমিতে কাজ জুটত মজুরদের। দিনান্তে আধপেটা হলেও জুটত। ভাদ্রের মাঝামাঝি থেকে পুনরায় কর্মহীন হয়ে পড়ত গাঁয়ে ঘরের বারো আনা মানুষ। তারপর আসত সেই ঘোর আশ্বিন ও কার্তিক—দীর্ঘ দু-দুটো মাস। গাঁয়ের বারো আনা মানুষের ঘরে একদানাও ধান-চাল নেই। মাঠেঘাটে কাজও নেই তিলমাত্র। গোটা ছেলেবেলা জুড়েই দেখেছি, ওই দুটো মাস আমাদের এলাকায় নেমে আসত পুরোপুরি দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। এলাকার বারো আনা মানুষ বলা যায় তখন অনাহারেই দিন কাটাত। বনেবাদাড়ে, পুকুরপাড়ে ঘুরে ঘুরে, কুড়িয়ে-বাড়িয়ে নিয়ে আসত কন্দকচু, শাকপাতা—দিনান্তে ওগুলোই সেদ্ধ করে পেটে পুরত। আর, উপোসি পেটে ওইসব অখাদ্য-কুখাদ্য প্রবেশ করা মাত্রই বাধিয়ে দিত ধুন্ধুমার কাণ্ড। বাহ্যি, বমি,—উপোসি শরীরগুলো তাতে করে আরও অসাড় হয়ে যেত। এমনকী, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতেও দেখেছি, কোনওগতিকে দুটো পয়সা সংগ্রহ করে পরিবারের কর্তাটি দিনান্তে এক কিলো আটা নিয়ে বাড়ি ফিরল। সেই আটা এক হাঁড়ি জলে ফুটিয়ে বাড়িসুদ্ধ মানুষ এক বাটি করে পেটে পুরে খিদে মেটাল। মনে পড়ে, ওই দিনগুলোতে রোজ দিনই গ্রামের কোনও না কোনও প্রান্ত থেকে কান্নার রোল উঠত। কিনা, মাঝিপাড়ায় ভাগবৎ দলুইয়ের মা বসতে বসতে ঢলে পড়েছে মাটিতে। কিংবা চারগেড়্যার পুঁটু মান্নার বউটা নাগাড়ে পাঁচদিন অনাহারে থেকে আজ চলেই গেল ওপারে। বাস্তবিক, আমাদের ছেলেবেলায় ফি-বছরই ওই দু-আড়াই মাস ভয়াল হয়ে দেখা দিত গোটা এলাকায়।
ঠিক তেমনই পরিস্থিতিতে ফি-বছর গাঁয়ের জমিদার বাড়িতে বেজে উঠত পুজোর ঢাক। উপোসি অর্ধচেতন মানুষগুলো সেই ঢাকের আওয়াজে নিভু নিভু চোখ দুটিকে অতি কষ্টে খুলত। পরমুহূর্তে আবার বুজে আসত চোখ দুটি। বলাই বাহুল্য, ওই পুজোয় যোগ দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকত না গাঁয়ের বারো আনা মানুষ। তাদের তখন অষ্টপ্রহর চলছে একপেট খিদের সঙ্গে নখে-দাঁতে লড়াই।
মাঝিপাড়ার গয়াপ্রসাদ দলাই শাস্ত্র-পুরাণের গল্প-টল্প অল্পবিস্তর জানত। একান্তে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলত, এমন ঘোর দুর্দিনে পূজা? উৎসব? এটা তো আসল দুর্গাপুজোই লয়। রামচন্দর রাবণ-রাজাকে হারাবার তরে, লঙ্কার বালুচরে অকালবোধন করেছিল। তা, রামচন্দর ছিল রাজার ব্যাটা, তার পক্ষে বছরের সব মাসই পৌষ মাস। একালেও, তার সমকক্ষ যারা, রাজা, জমিদার—তারাই কেবল এমন অসময়ে মেতে উঠতে পারে উৎসবে। এটা হইল রাজা-রাজড়াদের দুগ্গাপূজা।
দেখেছি, মহালয়ার পর থেকেই ছকবাঁধা গোরুর গাড়িতে চড়ে রোজদিন আসছে সুবর্ণ-বর্ণা, সালঙ্কারা রমণীর দল…জমিদারবাড়ির বউ-ঝি, আত্মীয়-কুটুমের দল। মেঠো পথে গোরুর গাড়ির ঢকচানিতে তাদের সোনার অঙ্গে স্বর্ণালংকারগুলি সুরেলা হয়ে বাজত অবিরাম। দুধসাদা, ফিনফিনে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, পায়ে পাম্প-শ্যু মসমসিয়ে গাঁয়ের পথে হেঁটে আসতেন গৌরবর্ণ পুরুষেরা। সকলেই জমিদার বাড়ির আত্মীয়বর্গ ওঁরা।
তখন রোজদিন বাবুদের দিঘিতে জাল পড়ছে। উঠে আসছে পাকা পাকা রুই-কাতলা। বিশাল বিশাল পিস বানিয়ে ডুবন্ত তেলে দিনভর ভাজা চলছে ওই মাছ। ঝোল-ঝাল, কালিয়া-কোর্মা রেঁধে চলেছে মিহির ঠাকুর। রোজ সকালে খাঁটি ঘি’তে লুচি ভাজার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে হাওয়ায়। সুজির মোহনভোগের সৌরভে ম-ম করছে বাতাস। তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অন্তঃপুরচারিণী যুবতীদের কলহাস্য…। নিজেদের মধ্যে আড্ডা খুনসুটি করতে করতে মাঝে মাঝেই সুরেলা হাসিতে ভেঙে পড়ছেন তাঁরা।
সদর মহলে তাসপাশার আসর বসছে রোজ। মাঝে মাঝেই হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে যুযুধান দু’পক্ষের আস্ফালন, হু-হুংকার, অট্টহাস্য…।
নিস্তেজ হয়ে আসা উপোসি শরীরগুলো দূর থেকে শুনতে থাকে সবকিছু। ডুবন্ত তেলে ভাজা পাকা মাছ, খাঁটি ঘিয়ে ভাজা লুচি আর মোহনভোগের সুবাস হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে অজান্তে ঢুকে পড়ে ওদের অসাড় হয়ে আসা ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে। ক্ষণকালের জন্য সাড় ফিরে আসে তাতে। মানুষগুলো লম্বা করে শ্বাস টেনে নেয় হাওয়ায়। তারপর পুনরায় ঝিমিয়ে পড়ে।
আমাদের আর্থিক অবস্থা অবশ্য এতখানি শোচনীয় ছিল না। বরং বলা যায় বেশ সচ্ছলই ছিল। আমার বাবা ছিলেন গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। আমাদের গাঁয়ের শেষ জমিদারটিও ছিলেন বাবার ছাত্র। সেই সুবাদে জমিদারবাড়িতে বাবার বেশ কদর ছিল। আমরা বাচ্চারা তার সুযোগ পুরোপুরি ভোগ করেছি ছেলেবেলায়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, ছেলেবেলায় পুজোর ক’দিন আমাদের মতো গুটিকয় ভাগ্যবান বাচ্চার জীবনে ভারী মিষ্টি সুবাস বয়ে আনত।
ফি-বছরই পুজোর আগে বাবা যেতেন মেদিনীপুর শহরে। সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীগুলি কিনে-টিনে বেশ গভীর রাতে ফিরতেন তিনি। সাধারণত অত রাত অবধি কস্মিনকালেও জেগে থাকতাম না আমরা, বাচ্চারা। কিন্তু ওই রাতটায় কিছুতেই ঘুম আসত না চোখে। কারণ, আমরা তো জানি, অন্য সামগ্রীর পাশাপাশি আমাদের জন্যও নতুন জামা-কাপড় কিনে আনবেন বাবা। সেই কারণেই ওই সন্ধেটা ছিল আমাদের কাছে বছরের অন্য সন্ধেগুলোর চেয়ে একেবারেই স্বতন্ত্র। আমরা অনেক রাত অবধি ওই জামা-কাপড়ের টানেই জেগে থাকতাম। বাবা আমাদের সামনে সদ্য কেনা জামা-কাপড়গুলি বের করে ধরে দিতেন। আমরা যে যার জামা-কাপড়গুলোকে নিজে নিজের গায়ের সঙ্গে লটকে দিয়ে মাপটা দেখে নিতাম। তারপর, যে যার বিছানায় ওগুলোকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।
দুই
ষষ্ঠীর ভোরে বাবুদের বাখুলে ডজনডাক ঢাক বেজে উঠত একসঙ্গে। চড়াচ্চড় আওয়াজে সকালের আকাশ-বাতাস উতরোল হয়ে উঠত। আমরা ভাইবোন ক’জনা ঠাঁই নিতাম বাবুদের গড়ে। মাস্টারমশাইয়ের ছেলেপুলে জ্ঞানে কিঞ্চিৎ বাড়তি মনোযোগও পেতাম। ওইদিন ও পরবর্তী তিনদিন আমাদের সকালের জলখাবার থেকে রাতের ভোজ অবধি সবই হত বাবুদের বাড়িতে।
পুজোর তিনদিন যাত্রাগান হত মন্দিরের সামনে প্রশস্ত নাটমণ্ডপের তলায়। সামনের সারিতে বাবুভায়ারা বসতেন। ওঁদের পেছনে বসত অন্যান্যরা। আমরা অবশ্য আসরের সামনেই বসবার সুযোগটা পেতাম। বাবুদের বাড়িতেই রাতের খাওয়া সাঙ্গ করে আমরা সটান চলে যেতাম যাত্রার আসরে। পালাগান শেষ হলে ঘুম ঘুম চোখে ফিরে আসতাম বাড়িতে। পরের দিন সকালে উঠেই আবার দে দৌড় বাবুদের গড়ে। আর, তখনই খবর পেতাম, গেল রাতে মারা গিয়েছে কোনও পাড়ার কোনও এক হতভাগ্য। একপেট খিদে নিয়ে কাতরাতে-কাতরাতে বেচারা চলে গিয়েছে ওপারে।
তারপরই তো এল ওই অভিশপ্ত রাতটি। যে রাতের স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি। পরবর্তীকালে আমার বহু রচনায় বহু অনুষঙ্গে এসেছে ওই রাতটির কথা।
তিন
সেটা বুঝি নবমীর রাত। কাঁথি থেকে এসেছে ওই সময়ের বিখ্যাত অপেরাদল ‘চলন্তিকা অপেরা’। হিমাংশু পণ্ডা, বেণী পণ্ডা, মধু পণ্ডা, হেমন্ত বরদের মতো ওই সময়ের আসর কাঁপানো কুশীলবরা ছিলেন ওই দলে।
ওই রাতে ওরা গাইছে ‘মহম্মদ তুঘলক’ পালা। মহম্মদ তুঘলকের রোল করছেন স্বয়ং হিমাংশু পণ্ডা। প্রথম অঙ্ক থেকেই জমে উঠেছে পালা। মহম্মদ তুঘলকের দরবারে নেচে চলেছে লাস্যময়ী নর্তকীরা। দেখতে দেখতে মজে রয়েছে গোটা আসর।
হেনকালে কলরব উঠল গাঁয়ের একপ্রান্তে। আসরে বসেই মানুষজনের কানে পৌঁছাল ওই আওয়াজ। তৎক্ষণাৎ প্রায় গোটা আসর দৌড় মারল ওইদিকে। দেখাদেখি আমরাও। ততক্ষণে সবাই বুঝে ফেলেছে, গাঁয়েরই কারওর ঘরে ডাকাত পড়েছে। সেটা তখন স্বাভাবিক ছিল। ডাকাতরা জানত, নামী-দামি অপেরার পালাগান শুনতে বাবুভায়ারা ঝেঁটিয়ে যাবেন বাবুদের গড়ে। বাড়িতে বুড়োথুড়োরা ছাড়া আর কেউই থাকবে না। ওই সুযোগটাকে প্রায়শই কাজে লাগাত ওরা।
কলরবটা ভেসে আসছিল তিতামণি-দিদার বাড়ির খিড়কি-পুকুরের দিক থেকে। তিতামণি-দিদারাও জমিদারদের একটা ছোট তরফ। অচিরেই সবাই পৌঁছে গেলাম অকুস্থলে।
জানা গেল, একটা চোর ধরা পড়েছে তিতামণি-দিদাদের বাড়ির খিড়কি-পুকুরের পাড়ে। বাড়ির মাহিন্দাররা চোরটাকে বামাল পাকড়াও করে চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। এক্কেবারে পাশটিতে গিয়ে চোরটাকে দেখামাত্র, বড়দের কী মনে হয়েছিল জানিনে, কিন্তু আমার কচি বুকের মধ্যেটা একেবারে হু-হু করে উঠেছিল।
আমাদের গাঁয়েরই শশী ভুঁইয়া। দীনহীন খেত-মজুর। এমনিতে প্রবল হাঁফানির টানে সারাক্ষণ বুকটা হাঁপরের মতো লাফায়। সংসারে সাত-আটটি পোষ্য নিয়ে এই ঘোর কার্তিকে তার অবস্থা একেবারেই সঙ্গীন। শুনতে পাই, দিনের পর দিন না খেয়ে, কিংবা শাকপাতা খেয়ে কোনওগতিকে বেঁচে রয়েছে।
আমাদের এলাকায় পুকুরের পাড়ে-টাড়ে তখন এন্তার বুনো ওলের গাছ জন্মাত নিজের থেকেই। বর্ষায় ওগুলো ঝাড়ে-বংশে বাড়ত। আশ্বিন-কার্তিকের পর থেকে ওই গাছগুলোর তলার মাটি খুঁড়ে ওল বের করা যেত। তবে ওই ওল অসম্ভব কুটকুটে হত। অবস্থাপন্নরা ওই বস্তুটি পারতপক্ষে খেত না। খেত গরিব-গুরবোরা। তাও কুচি কুচি করে কেটে, রাতভর জলে ভিজিয়ে রেখে, সেদ্ধ করে, সরষে-বাটা, লেবুর রস কিংবা তেঁতুলের মণ্ড মিশিয়ে খেত।
দেখলাম, বাবুদের মাহিন্দারদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে শশী তখনও অবধি কুকুরের মতো হাঁফাচ্ছে। পাশটিতে রয়েছে, চুরির মাল হিসেবে, গুটিকয় বুনো ওল এবং একটি বোঁচা কোদাল।
নিমেষের মধ্যে বাকিটা বুঝে ফেললাম সবাই। নিদারুণ অনাহার সইতে না পেরে বেচারা এসেছিল বাবুদের খিড়কি-পুকুরের পাড়ে কয়েকটা বুনো ওল চুরি করতে। বাবুর বাড়ির পাহারাদার মাহিন্দারদের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছে।
সবাই ওই নিয়ে প্রচুর হাসাহাসি করল। গ্রামবাসীদের মধ্যস্থতায় ওলগুলো শশীকেই দান করল মাহিন্দাররা। কিন্তু তার তখন ওলগুলোকে বয়ে নিয়ে বাড়ি অবধি পৌঁছানোর মতো অবস্থা নেই। জনাকয় সহৃদয় গ্রামবাসীর মধ্যস্থতায় মাহিন্দারদের একজন ওলগুলো ওই রাতে পৌঁছে দিয়েছিল শশী’র বাড়িতে।
ছেলেবেলার দুর্গাপুজোর স্মৃতি রোমন্থন করতে বসলে, আজও ওই রাতের স্মৃতিটা মনের মধ্যে কদর্যভাবে ভেসে ওঠে।