| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

দুর্গাপূজার মূল্যায়ন এবং সার্বজনীনতা : সঞ্জীব কুমার দেবনাথ

Reporter
সঞ্জীব কুমার দেবনাথ / ১৭৬২ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১

কালচক্রে ফিরে ফিরে আসে শারদীয় দুর্গোৎসব। সারা বিশ্বজুড়ে বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় চলে মায়ের পূজার আয়োজন। পূজা উপলক্ষে বিশেষ খাওয়া-দাওয়া, ভালো সাজ-পোশাক, বেড়ানো, পারস্পরিক ভাব বিনিময়, একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো- এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে পূজাস্থল মিলনমেলার রূপ নেয়। ফলে শান্তি ও সৌহার্দ্য সহজলভ্য হয় এবং অন্তরের সঙ্কীর্ণতা দূর করে সবাইকে উদার করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুুদ্র, দীন, একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সমস্ত মনুষত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ’। দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালি হৃদয়কে প্রসারিত করে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে আপন করে নিতে শেখায়। দীর্ঘ একটি বছর অপেক্ষা শেষে ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত সবাই মেতে উঠে আনন্দে-উৎসবে। পূজা উপলক্ষে পত্রপত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাপানো হয়। স্কুল-কলেজ, আফিস-আদালত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়। দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান। এভাবে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত উৎসবটি সার্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করে এখন বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

প্রত্যেক জীবের আকাক্সক্ষা অসীম ঈশ্বরকে লাভ করে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হবে, এ জন্যই সে ধর্মকে গ্রহণ করেছে এবং নিজ নিজ ধর্মের কর্মকাণ্ড আন্তরিকতার সঙ্গে লালন করতে সচেষ্ট রয়েছে। সনাতন ধর্মের মূল বিষয় দর্শন, পৌরাণিক কাহিনী এবং পূজার্চনা। শাস্ত্রীয় প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দর্শন মানে-বেদের উপনিষদসমূহ, ব্রহ্মসূত্র ও গীতার মূল বাণীসমূহের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণপূর্বক হৃদয়ঙ্গম। পৌরাণিক কাহিনী মানে- রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত ইত্যাদি উপাখ্যান, যার মাধ্যমে সেই ধর্মীয় দর্শনকে সহজভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। পূজার্চনা মানে- বিভিন্ন দেব- দেবীকে ভক্তিভরে ফুল দিয়ে অর্চনা।

দুর্গাদেবীর উৎপত্তি, নিবাসস্থান, মাহাত্ম এবং দুর্গাপূজার প্রচলনের শাস্ত্রীয় পেক্ষাপট যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী প্রচলিত বারো মাসে তেরোটি পূজা-পার্বণের মধ্যে দেবী দুর্গাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ‘দুর্গাপূজা’ বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ‘দুর্গা’ নামের ব্যাখ্যায় ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক এবং ‘আ-কার’ ভয়-শত্রুনাশক হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা। অপরদিকে শব্দকল্পদ্রুম অনুসারে ‘দুর্গ’ নামক অসুরকে যিনি বধ করেন তিনিই দুর্গা। শ্রীশ্রীচণ্ডীর বর্ণনানুযায়ী দুর্গা সকল দেবতার সম্মিলিত এক মহাশক্তির প্রতিমূর্তি। এ পূজায় বৈদিক, তান্ত্রিক, পৌরাণিক, আনুষ্ঠানিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব ভাবের সমন্বয় ঘটেছে।

শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কালের ওপর ভিত্তি করে প্রতি বছর দুবার দুর্গাপূজা করা যায়। শরৎকালে অর্থাৎ আশ্বিন মাসে অনুষ্ঠিত হয় শারদীয়া দুর্গাপূজা আর বসন্তকালে অর্থাৎ চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত হয় বাসন্তি দুর্গাপূজা। আমাদের দেশে শরৎকালীন দুর্গাপূজার প্রচলনই বেশি। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষটি হলো ‘দেবীপক্ষ’ আর দেবীপক্ষের প্রথম দিনটির নাম ‘মহালয়া,’ এবং শেষ দিনটির নাম ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’। মহালয়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তর্পণের মাধ্যমে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’ ধন-স¤পদের দেবী লক্ষীর পূজা করে। পাঁচ দিনব্যাপী এ পূজায় থাকে বৈচিত্র্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা। তন্মধ্যে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হলো নবপত্রিকা স্নান এবং মহাস্নান। নবপত্রিকা মানে নয় প্রকার শস্য। ধান, গম, যব, কচু, মানকচু, হলুদ, অশোক, বেল, ডালিম। কথিত আছে, মহামায়া দুর্গা প্রকৃতিতে এসব শস্য হয়ে মানুষের ক্ষুধারূপ দুঃখ দূর করেন। মহাসপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নানের পর মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। মহাস্নানের সময় নদীর জল, শঙ্খজল, গঙ্গাজল, নারকেলের জল, শিশিরের জল, পষ্ণগব্য, মধু, দুধ, তিলের তেল, রাজদ্বারের মাটি, চৌমাথার মাটি, গঙ্গামাটি, সব তীর্থের মাটি, গজদন্ত মৃত্তিকা, বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা, ইত্যাদি দিয়ে দুর্গাকে স্নান করানো হয়। এর মাধ্যমে মায়ের পূজায় চাষা-ভূষা, মুচি-মেথরসহ সমাজের সব স্তরের মানুষ এবং জীব-জগতের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে তান্ত্রিকমতে অনুষ্ঠিত কুমারীপূজা এবং সন্ধি পূজা খুবই জনপ্রিয়। কুমারীপূজা হলো অনধিক ষোলো বছরের অরজঃস্বলা কুমারী মেয়ের পূজা। মহাষ্টমী পূজার শেষে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মতান্তরে নবমী দিনও এ পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে। বর্তমানে এ পূজার প্রচলন নেই বললেই চলে। তবে রামকৃষ্ণ মিশনসমূহে কুমারী পূজা উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয়। তাছাড়া অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দেবী চামুণ্ডারূপে পূজিত হয় এবং দেবীকে ষোলটি উপাচার নিবেদন করা হয়।

মা দুর্গার আবির্ভাব, ঐশ্বর্য এবং তাঁর পূজা প্রচলনের বিষয়টি সনাতন ধর্মের পুরাণসমূহে বিভিন্ন কাহিনীর মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ব্রহ্মবর্ত পুরাণ মতে, সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ বৈকণ্ঠে প্রথম দুর্গাপূজা করেন, দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেন ব্রহ্মা ‘মধু-কৈটব’ অসুরের ভয়ে, তৃতীয় পূজা করেন শিব ‘ত্রিপুরা’ নামে এক অসুরের ভয়ে এবং চতুর্থ পূজা করেন ইন্দ্র ‘দুর্বাসা মুনি’র অভিশাপে লক্ষীকে হারিয়ে। এরপর থেকে মুনিঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মনুষ্যজগতে দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়। তাছাড়া দেবদেবীর সাথে অসুরদের দ্ব›দ্ব পৌরাণিক সাহিত্যের একটা অন্যতম বিষয় বিধায় পুরাণে অসুরের কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। যেমন : বামনপুরাণে অসুররাজ মহিষাসুর-এর উৎপত্তি এবং মহিষমর্দিনী দেবী কাত্যায়নীর কথা পুরাণকার মহামুনি পুলস্তের মুখে উপস্থাপন করেছেন।

দুর্গার আবির্ভাব সম্পর্কিত ব্রহ্মবর্ত পুরাণের কাহিনীটি হলো- বিষ্ণু যোগনিদ্রায় বিভোর থাকাকালীন তাঁর নাভিকমল থেকে ব্রহ্মা এবং কর্ণমল থেকে মধু ও কৈটব নামে দুই অসুর বের হয়। ব্রহ্মা যখন তাঁর সৃষ্টির কাজ শুরু করবে, তখনই অসুরদ্বয় ব্রহ্মাকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে। এমতাবস্থায় ব্রহ্মার স্তবে বিষ্ণুর আখিপল্লব থেকে মহামায়া দুর্গা আবির্ভূত হয়ে বিষ্ণুকে জাগ্রত করেন এবং মধু-কৈটবকে বধের মাধ্যমে সৃষ্টি রক্ষা করেন। অপরদিকে মহিষাসুর স্বর্গরাজ দখল করে দেবতাদের তাড়িয়ে দিলে দেবতারা মহামায়ার আরাধনা শুরু করেন। তাঁদের আরাধনায় তুষ্ট হয়ে মহামায়া অসুর শুম্ভ-নিশুম্ভকে নিধন করে দেবতাদের অধিকার ফিরিয়ে দেন।

কালিকা পুরাণ এবং বৃহদ্ধর্ম পুরাণের মতে রাম-রাবণের যুদ্ধের সময় রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা শরৎকালে দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কিন্তু হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। ফলে অসময়ে ব্রহ্মার এ পূজাকে ‘অকাল বোধন’ বলা হয়ে থাকে। তবে কৃত্তিবাসের রামায়ণে রাবণ-বধে রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন মর্মে উল্লেখ রয়েছে। এ জন্যই স্মৃতিশাস্ত্রগুলোতে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেয়া হয়েছে। তবে ভগবান বিঞ্চু দেবী দুর্গার আবির্ভাব ও তাঁর পূজার কথা পূর্বেই ভাগবতে বলে দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন- অধর্ম, দম্ভ, ক্রোধ, লোভ, মোহ, খারাপ ব্যবহার ইত্যাদি আসুরিক ভাবের প্রকাশ। এ থেকে মুক্ত হতে দুর্গা মায়ের আরাধনার প্রয়োজন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়ের জন্য এজন্যই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দুর্গার স্তব করতে বলেছিলেন।

দুর্গা ও দুর্গাপূজা সম্পর্কিত যতগুলো কাহিনী রয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনী পাওয়া যায় ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ বা মার্কণ্ডেয় পুরাণে। দুর্গাপূজায় চণ্ডীপাঠ করা বাধ্যতামূলক বিধায় গ্রন্থটি দুর্গাপূজার একটি অবিচ্ছেদ অংশ। মোট তেরোটি অধ্যায় এবং সাতশটি শ্লোক সংবলিত গ্রন্থে দুর্গাকে নিয়ে মধু-কৈটব বধ, মহিষাসুর বধ, এবং শম্ভু-নিশম্ভু বধ নামে তিনটি গল্প রয়েছে। তাছাড়া রয়েছে দুর্গাপূজা প্রচলন সংক্রান্ত রাজা সুরথের গল্প।

শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের ‘মধু-কৈটব’-এর গল্পে মধু ও কৈটব নামে দুই অসুরভ্রাতার সঙ্গে ভগবান বিষ্ণুর পাঁচহাজার বছর ধরে যুদ্ধের পরিণাম এবং মহামায়ার সহযোগিতায কিভাবে তাঁর হাতে সেই দুষ্টচক্র নিহত হয়েছে তা বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ের ‘মহিষাসুর বধ’-এর গল্পে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরাকালে শতবছরব্যাপী যুদ্ধে মহিষাসুর কর্তৃক স্বর্গ থেকে দেবতাদের বিতাড়নের কাহিনী। বিতাড়িত দেবতাগণ তাঁদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হিমালয়ে স্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে একত্রিত হলে তাঁদের সম্মিলিত তেজঃপুঞ্জ এক নারীমূর্তি ধারণ করে। তিনিই হলেন দুর্গা। কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভূত হওয়ায় এ দেবী কাত্যায়নী নামে অভিহিত হন। মহাদেবের তেজ থেকে দেবীর মুখ, অগ্নির তেজে নয়নযুগল, যমের তেজে কেশকলাপ, বিষ্ণুর তেজে অষ্টাদশ ভুজ, চন্দ্রের তেজে স্তনযুগল, ইন্দ্রের তেজে দেহের মধ্যদেশ ও করাঙ্গুলি, বরুণের তেজে উরু, জংঘা ও নিতম্ব, সূর্যেও তেজে পদদ্বয়, যক্ষগণের তেজে নাসিকা, বায়ুর তেজে কর্ণদ্বয় নির্মিত হয়। দেবতাদের কাছ থেকে বিবিধ শক্তি দ্বারাও সুসজ্জিত হন তিনি। মহাদেব দিলেন ত্রিশুল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনু, সূর্য দিলেন তুণ ও শর, ইন্দ্র দিলেন বজ্র, যম দিলেন দণ্ড, কুবের দিলেন গদা, ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, মহাকাল দিলেন বর্ম ও অসি, চন্দ্র দিলেন হার, সমুদ্র দিলেন মালা, হিমালয় দিলেন সিংহ। এই দেবীর হাতে মহিষাসুর নিহত হয় এবং দেবতাগণ তাঁদের হারানো স্বর্গের অধিকার ফিরে পান। তৃতীয় অধ্যায়ের ‘শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ’-এর গল্পে বর্ণিত হয়েছে শুম্ভ-নিশুম্ভ নামে দুই ভ্রাতা কর্তৃক স্বর্গ ও দেবতাদের যজ্ঞভাগ অধিকার করায় কিভাবে মহামায়া তাদের বধ করেন।

চণ্ডীতে বর্ণিত রাজা সুরথ-এর গল্পটিকে উপর্যুক্ত তিনটি গল্পের অবতরণিকা ও যোগসূত্র বলা যেতে পারে। বর্ণিত গল্পে দেখা যায়- সুরথ রাজা এবং সমাধি বৈশ্য দুজনই নিকটাত্মীয়দের ষড়যন্ত্রে ধন-স¤পদ হারিয়ে মনের দুঃখে বনে চলে আসেন। কিন্তু যারা তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, সেই স্ত্রী-সন্তানদের কল্যাণ-অকল্যণের কথা চিন্তা করে তাঁরা সব সময়ই শঙ্কিত হতেন। এর কারণ উদঘাটনের জন্য তাঁরা মেধা ঋষির কাছে যান। মেধা ঋষি এর উত্তর দিতে গিয়ে তিনটি গল্প বলেন। গল্প শুনে সুরথ এবং সমাধি নদীর তীরে তিন বছর কঠিন তপস্যা ও মাটির মূর্তি তৈরি করে শরৎকালে দুর্গাপূজা করেন। পরিশেষে দেবী দুর্গা তাঁদের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে সুরথকে তার হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দেন এবং বৈশ্যকে তত্ত্বজ্ঞান দান করেন। মার্কণ্ডেয় পুরাণে অসুর দমনে এবং দুঃখ-দুর্গতি নাশে দেবতা ও মানব উভয়েরই মা দুর্গার পূজা করার বিধান দেয়া আছে। মূলত এ গল্পগুলোই শ্রীশ্রী চণ্ডীর অলোচ্য বিষয়।

এসব গল্প থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো- মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনা করতে হবে। শ্রী ভগবানকে মাতৃরূপে আরাধনার কথা মার্কণ্ডেয় পুরাণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। শ্রী গীতাতেও ভগবান বলেছেন, আমি জগতের মাতা। বাঙালি সমাজ মায়ের ভালোবাসায় মুগ্ধ। ঈশ্বর সব জীবের মা হয়ে বিরাজ করেন। মাতৃভাবে ঈশ্বরের আরাধনা তাই স্বাভাবিক। মানুষ দম্ভ-অহঙ্কার, কাম-ক্রোধ ও লোভের বশবর্তী হয়ে দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত হয়। একাগ্র চিত্তে মাতৃরূপ মহামায়া দুর্গার পূজায় মানুষ এ সব আসুরিকতা থেকে মুক্তি পেয়ে সুরথ রাজার মতো নির্বিঘ্নে সংসারের ঐশ্বর্য ভোগ করে পরম সুখী হতে পারে, আবার মুক্তিকামী হলে সমাধি বৈশ্যের মতো মুক্তিও লাভ করতে পারে।

অপরদিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে রাধারমন রায় তাঁর ‘কলকাতার দুর্গোৎসব’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন- মনুষ্যজগতে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া এবং কলকাতায়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে পলাশীর রণাঙ্গনে মীরজাফরের বেইমানির দরুন ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভের হাতে নবাব সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটে। ক্লাইভের পরামর্শে নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্র এবং কলকাতার নবকৃষ্ণ বসন্তকালীন দুর্গাপূজাকে শরৎকালে পিছিয়ে এনে পলাশী যুদ্ধের বিজয়-উৎসবরূপে শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু করে যা পরবর্তীতে পলাশী যুদ্ধের স্মারক-উৎসবে পরিণত হয়। প্রতি বছর এই উৎসব পালনের জন্য তারা অন্যান্য হিন্দু জমিদার ও ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতেন। ফলে সেকালে জমিদার ও বিত্তশালীদের বাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো ব্যক্তিপর্যায়ে। সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ক্রমান্বয়ে কয়েকজনের চাঁদার টাকায় বারোয়ারী পূজা এবং পরবর্তীতে জনসাধারণের চাঁদায় ১৯২৬ সালে কলকাতায় সার্বজনীন পূজার প্রচলন শুরু হয়। সিমলা ব্যায়াম সমিতির অতীন্দ্রনাথ বসু ছিলেন এর উদ্যোক্তা।

সুতরাং রাজা সুরথ এবং সমাধির শরৎকালে দুর্গাপূজা করার বিষয়টির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কারণ মার্কণ্ডেয় পুরাণের কাহিনী অনৈতিহাসিক। রাবণ বধের আগে রামচন্দ্র শরৎকালে দুর্গাদেবীর অকালবোধন করেছিলেন বলে যা কথিত আছে, তা কৃত্তিবাসের রামায়ণে পাওয়া গেলেও বাল্মীকির রামায়ণে নেই। সুতরাং গল্পটির জন্ম কৃত্তিবাসের কল্পনায় এবং দুর্গামূর্তি বাঙালির নিজস্ব কল্পনার বস্তু। কারণ এখনো বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে এই মূর্তি পূজার প্রচলন বিশেষ নেই। উল্লেখ্য, মাঝখানে সুদীর্ঘকাল বাঙালি জনসাধারণের সঙ্গে এই মূর্তিপূজার সম্পর্ক ছিল না। যেমন : রাজা শশাঙ্কের আমলে বাঙালিদের মধ্যে শিবপূজার আধিক্য ছিল, দুর্গাপূজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। পালযুগে ভারতবর্ষে বৌদ্ধপ্রভাব বিস্তৃত হলে এখানে মূর্তিপূজা কমে যায়। আবার সেনযুগে হিন্দুপ্রভাব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে মূর্তিপূজার আধিক্য ঘটে এবং সাধারণ মানুষের কাছে আবারো এর আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়।

প্রকৃতপক্ষে অতীতে নবপত্রিকা পূজা হতো শরৎকালে। দুর্গাপূজা হতো বছরের শ্রেষ্ঠ ঋতু বসন্তকালে। যখন প্রকৃতি ফুলে ফলে রঙিন হয়ে উঠত তখন গরিব প্রজাদের কাছ থেকে খাজনার নামে ছিনিয়ে আনা রক্তরাঙা টাকায় রাজা-জমিদাররা জৌলুশ জাহিরের জন্য দুর্গাপূজা করতেন। এ পূজা বাসন্তি দুর্গাপূজা নামে পরিচিত ছিল। দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মূর্তি আর নবপত্রিকা পূজার সঙ্গে জড়িয়েছিল নয়টি উদ্ভিদ। পরে এ দুটিকে গুলিয়ে একাকার করে ফেলা হয়েছে। মূলত ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের বিজয় উৎসব পালন করার জন্য বসন্তকালের দুর্গাপূজাকে শরৎকালে নিয়ে এসে নবপত্রিকাপূজার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়। এ জন্যই শরৎকালের দুর্গাপূজার বোধনের দনকার হয় এবং নবপত্রিকাপূজা সম্পন্নের পর দুর্গাপূজা করতে হয়।

এ কথা সত্যি যে, শরৎকালে অনুষ্ঠিত দুর্গপূজার প্রচলন যেভাবেই হোক না কেন, বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় তা অতি আগ্রহভরে গ্রহণ করেছে। এখন এই সর্বজনীন দুর্গাপূজাই শারদোৎসবের প্রধান আকর্ষণ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এ পূজার আনন্দ উপভোগ করে থাকে। বাঙালি হিন্দু সমাজে তাই এটি প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হয়েছে বাঙালির জাতীয় উৎসবে। দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতায় বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাঙালির সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থার বাস্তব রূপ লক্ষ করার মতো। আমাদের দেশের বাঙালি বধূরা যেমন সন্তান-সন্ততি নিয়ে বাপের বাড়ি যান, ঠিক তদ্রƒপ মা দুর্গা তাঁর ছেলে শৌর্য-বীর্যের প্রতীক কার্তিকেয় ও সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং মেয়ে ধনদাত্রী লক্ষী ও বিদ্যাদায়িনী সরস্বতীকে নিয়ে বাপের বাড়িতে আসেন কয়েকদিনের জন্য আবার ফিরে যান স্বামীগৃহে। পরিবার সমেত মায়ের প্রতিমার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই সে কাঠামোর মধ্যে নিহিত রয়েছে। মনুষ্যজগত, পশুজগত, পক্ষিজগত, সরীসৃপজগত, উদ্ভিদজগত, হিমালয়দুহিতা, কৈলাসপতিগৃহিণী হৈমবতী, নদীরূপে সরস্বতী এবং সমুদ্রসম্ভূতা লক্ষীর মাধ্যমে পৃথিবীর নদী ও সমুদ্রসমূহকেও তাঁর সাম্রাজ্যের অঙ্গ করেছেন। মূষিকবাহন গণপতি ভূমি ও ভূমিতলে বিচরণকারী কিন্তু ময়ূরবাহন কার্তিকেয়র স্বর্গ, মর্ত, অন্তরিক্ষ সর্বত্র নির্বাধ গতি। সুতরাং স্বর্গ, মর্ত্য, অন্তরিক্ষের কীটপতঙ্গ এমনকি ঘৃণিত অসুরও মায়ের চরণতলে স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেউ মায়ের পরিবার বহির্ভূত নয়। একদিকে শিব-কল্যাণদাতা, অপরদিকে দুর্গা- দুর্গতনাশিনী। জীবনে কল্যাণ তখনই নেমে আসে যখন গণপতির গণসংহতি বা ঐক্যশক্তি, লক্ষীর ধনশক্তি, সরস্বতীর জ্ঞানশক্তি এবং কার্তিকেয়র বীর্যশক্তি সমন্বিত হয়। তখনই জীবনে দুর্গার অধিষ্ঠান হয় অর্থাৎ সব দুর্গতির অবসান হয়। এ জন্যই বাংলায় মা দুর্গা সপরিবারে পূজিত হন।

বাঙালিরা দুর্গোৎসবকে হিমালয়ে দেবী দুর্গার স্বামীগৃহে যাওয়ার অনুষ্ঠান হিসেবেই দেখে। কন্যার শ্বশুরবাড়ি যাার অনুভূতি এবং মায়ের আকুতি দেখে বাঙালি সমাজ অভ্যস্ত। এসব ভাবের সাথে ধর্মকে এক করে নিয়ে জীবন থেকে ধর্ম যে আলাদা নয় তা দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতায় স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয়। বাঙালি মা হিমালয়-পতœী মেনকার অন্তরে বিকশিতা। তিনি হিমালয়কে বারবার অনুরোধ করছেন মেয়ে উমাকে কৈলাশ থেকে নিয়ে আসার জন্য। মেয়েকে তিনি স্বপ্নে দেখেছেন, মায়ের কাছে আসবে বলে মা মা বলে কাঁদছে মেয়েটা। বাঙালি মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় মা-মেয়ের চোখের জলে যে মাতৃস্নেহ ফুটে ওঠে, তেমনি গোপালের বিরহে যশোদা কিংবা রামের বিরহে কৌশল্যারও ঠিক একই অবস্থা। মায়ের কাছে সন্তান নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয়। সন্তানের সুখে সুখী হন, সন্তানের দুঃখে দুঃখী হন। মেনকা-হিমালয়ের মেয়ে উমা এবং তাঁর পতি ভোলানাথ একসময় দরিদ্র ছিলেন। এমনকি জীবনধারণের তাগিদে তাঁকে ভিক্ষাবৃত্তি পর্যন্ত করতে হয়েছে। কিন্তু গৌরীর ভাগ্যে তিনি হয়েছেন বিশ্বেশ্বর আর উমা হয়েছেন অন্নপূর্ণা-অন্নদায়িনী, জীবের জীবিকা নির্ধারণ করছেন। মেয়ের এ সুখ, এ ঐশ্বর্য দেখে মায়ের আনন্দ হচ্ছে। আমাদের বাঙালি সমাজ ব্যবস্থায়ও এর ব্যতিক্রম নয়।

দুর্গামূর্তি বাঙালির নিজস্ব কল্পনার বস্তু। কারণ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা ছাড়া এ পূজার প্রচলন খুব একটা নেই। ভক্তেরা দুর্গা মায়ের মনোময়ী মূর্তি গড়ে তোলেন তাদের নিজ নিজ মনের মাধুরী মিশিয়ে। ধর্মমত নির্বিশেষে প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই উৎসবে যোগ দেন। অহিন্দুরা পূজা কমিটির সদস্য হন, পূজার চাঁদা দেন, সেজেগুজে প্রতিম দেখতে বের হন। তাঁদের কেউ কেউ দুর্গাপূজার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অতিথির আসনও অলঙ্কৃত করেন। মাটির দুর্গাপ্রতিমা অনুপম শিল্পে পরিণত হয় মৃৎশিল্পীদের হাতের কৌশলে। ঢাকি-ঢুলিরা দুর্গোৎসবে একটা ভূমিকা পালন করে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় তাদের ভূমিকা আরো বৃদ্ধি পায়। ডেকোরেটররা ফি বছর যেমন মণ্ডপের ঢঙে নিয়ে আসেন অভিনবত্ব, আলোক শিল্পীরাও তেমনি সৃষ্টি করেন আরো আশ্চর্য চমক। পূজার জৌলশ বাড়ে মণ্ডপ আর আলোকের চোখ-ধাঁধানো সজ্জায়, পূজামণ্ডপের সামনে আরতি প্রতিযোগিতা এবং ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠানে। কবি-সাহিত্যিকগণ যুগ যুগ ধরে তাঁদের নিজ নিজ কল্পনায় মায়ের রূপ বর্ণনা করেছেন। নজরুল বলেছেন- যিনি ছিলেন গৌরী তিনিই মহাকালের কোলে এসে হলেন মহাকালী। তবুও মায়ের রূপ হারায় না। কারণ- সে রূপ ছড়িয়ে আছে চন্দ্রতারায়, নিত্য সূর্যপ্রদীপ জ্বেলে, সে রূপের আরতি হয়। মায়ের চরণ দুখানির বর্ণনায় গিরিশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, মায়ের ‘নখরে অরুণ ছুটে, পদচিহ্নে পদ্ম ফুটে’ অনিলবরণ রায় তাঁর বিখ্যাত মল্লার রাগিণীর গানে মায়ের রূপের বর্ণনা দিয়ে জানান- মায়ের ‘অধরে মৃদু হাসির রেখা, যেন গো দামিনী গগনে আঁকা’। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে মায়ের বদনমণ্ডলের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ঈষৎ হাস্যময় পূর্ণচন্দ্র সদৃশ নির্মল সেই মুখমণ্ডল খাঁটি সোনার মতো উজ্জ্বল এবং সে মুখমণ্ডলের আভা সমগ্র জগৎকে মোহিত করে রেখেছে।

মায়ের স্বরূপ বর্ণনায় চণ্ডীতে আরও বলা হয়েছে- তিনিই মহাশক্তি এবং জগতের মূল কারণ। তিনি বিষ্ণু ও শিবাদি দেবগণেরও অজ্ঞাত। তবে ভক্তদের কথা আলাদা। তিনি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণময়ী হলেও যাদের মনে হিংসা-দ্বেষ থাকে তারা তাঁকে জানতে পারে না। ব্রহ্মা থেকে কীট পর্যন্ত এ অখিল বিশ্ব তাঁরই অঙ্গাংশ। কারণ তিনিই সবার আশ্রয়-রূপিণী। জড়বস্তুর মতো কোনো বিকার নেই তাঁর। তিনি চিন্ময়ী, পরমাপ্রকৃতি। তিনিই শাক্তদের মহামায়া, বৈষ্ণবদের বিষ্ণুমায়া এবং শৈবদের শিবশক্তি। তাই সব ভক্তই মায়ের পূজার দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন, তাঁর আদর-ভালেবাসায় সিক্ত হতে। প্রতি বছর মায়ের পূজার আয়োজন না করলে মন দীন হয়ে পড়ে, মনে হয় কি উৎসব যেন হারিয়ে গেল অবহেলায়।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev