রামনিধি গুপ্ত ওরফে ‘নিধু বাবু’ সন ১১৪৮ সালে হুগলি জেলায় (ত্রিবেণীর সন্নিকট) চাপতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম হরিনারায়ণ গুপ্ত। গুপ্ত মহাশয় জাতীয় চিকিৎসা—ব্যবসা অবলম্বন করিয়া জীবিকা—নির্বাহ করিতেন। ইঁহাদের আদি নিবাস কলিকাতার অন্তর্গত কুমারটুলি। হরিনারায়ণ, মাতুলালয় চাপতাগ্রামে প্রথম বাস করিতে আরম্ভ করেন। সে সময়ে কলিকাতা অঞ্চলে বর্গির হাঙ্গামা ছিল। বর্গির ভয়ে ভীত হইয়াই হরিনারায়ণ পৈত্রিক বাস পরিত্যাগ করেন।
রামনিধির বাল্যজীবনের শিক্ষা, গ্রামস্থ পাঠশালায় আরম্ভ হইয়াছিল। সেকালে হস্তলিপি, শুভংকরী প্রভৃতিই পাঠশালার উচ্চশিক্ষার মধ্যে পরিগণিত হইত। কিন্তু রামনিধির শিক্ষাপিপাসা বলবতী দেখিয়া, পিতা হরিনারায়ণ পুত্রকে ইংরেজি শিক্ষা দিতে বাসনা করিলেন। নিকটস্থ কোনো স্থানে সে শিক্ষার সুবিধা হইল না। অবশেষে তিনি পুত্রের ইংরেজি শিক্ষা এবং নিজ ব্যবসায়ের উন্নতির জন্য মাতুলালয় ত্যাগ করিয়া, সপরিবারে পুনরায় কলিকাতায় আসিয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেন। বণিক ইংরেজরা তখন দুর্গনির্মাণ ও খালখননের দ্বারা বর্গির হস্ত হইতে কলিকাতাকে সুরক্ষিত করিয়াছিলেন, এবং তাঁহাদের ব্যবসার ক্রমোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতারও দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি হইতে আরম্ভ হইয়াছিল।
কলিকাতার এক পাদরি সাহেবের হস্তে রামনিধির ইংরেজি শিক্ষার ভার অর্পিত হয়। কিন্তু তাহাতে শিক্ষার যত উন্নতি না হউক, বালকের সংগীতচর্চার বিশেষ সুযোগ ঘটিল। তাঁহার কণ্ঠস্বরও অতি মধুর ছিল। যেখানে কোনোরূপ সংগীতের আলোচনা হইত, বালক রামনিধি সংবাদ পাইলেই তথায় উপস্থিত হইত।
সেকালে অল্প ইংরেজি শিখিলেই চাকুরির অভাব হইত না। রামতনু পালিত, কবিরাজ মহাশয়ের বিশেষ বন্ধু ও প্রতিবেশী। তিনি ছাপড়ার কালেক্টরি অফিসের একজন পদস্থ কর্মচারী ছিলেন। তাঁহারই অধীনে কুড়ি বৎসর বয়সের সময়, রামনিধি এক কেরানিগিরির চাকুরি পাইলেন। ছাপড়ায় তখন অনেকগুলি হিন্দুস্থানি কালোয়াতি গায়ক বাস করিতেন। রামনিধি সন্ধান করিয়া তাঁহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিলেন। এতদিন তিনি কোনো ওস্তাদের নিকট রীতিমত সংগীতচর্চা করেন নাই; কর্ণে শুনিয়া যতদূর শিক্ষা সম্ভব, তাঁহার কেবল সেই শিক্ষাই হইয়াছিল। এইবার তিনি দস্তুরমতো সংগীতশিক্ষায় প্রবৃত্ত হইলেন। অফিসের কার্যের পর তিনি যাহা কিছু অবসর পাইতেন, অসীম অধ্যবসায় ও যত্নের সহিত তাহা সংগীতচর্চায় অতিবাহিত করিতেন। ওস্তাদদিগের নিকট হইতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বহুসংখ্যক খেয়াল, টপ্পা, গজল প্রভৃতির সুর আয়ত্ত করিয়া ফেলিলেন। এই সকল হিন্দি গানের চর্চা করিতে করিতে তাঁহার মনে হইল যে, তাঁহার মাতৃভাষায় অনেক পরমার্থ ও ধর্মবিষয়ক গান আছে বটে, কিন্তু হিন্দি খেয়ালের অনুকরণে টপ্পা বা প্রণয়সংগীত অল্পই দেখা যায়। ভাষার এই অভাব পূরণ করিবার জন্য তিনি ‘শোরি মিঞা’র টপ্পার অনুকরণে বাঙালায় টপ্পা রচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। তখন নিজে গান রচনা করিয়া, তিনি নিজেই সেই সকল গান সুর—লয়ে গাহিয়া অপরকে শুনাইতেন। সে সময় প্রণয়—সংগীতের মধ্যে এক ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের গান এবং প্রাচীন বৈষ্ণব কবিদের রচিত প্রণয়সংগীত প্রচলিত ছিল। কিন্তু সরল বাঙালা ভাষায় ‘শোরি মিঞা’র ন্যায় সুন্দর টপ্পা যে রচিত ও গীত হইতে পারে, এ ধারণা তখন অনেকেরই ছিল না। সুতরাং কোনো মজলিসে বিশুদ্ধ সুর—লয়ে নিধু বাবু যখন স্বরচিত বাঙালা টপ্পা গাহিতেন, তখন শ্রোতৃবর্গ একেবারে মোহিত হইয়া যাইতেন।
অল্পদিনের মধ্যেই নিধু বাবুর যশঃসৌরভ চারিদিকে ব্যপ্ত হইয়া পড়িল। এখন তিনি কেবল সুগায়ক নহেন, একজন সুকবি বলিয়াও পরিচিত হইলেন। সরল ও সহজ কথায় এমন অপূর্ব কবিত্বপূর্ণ মর্মস্পর্শী গান বাঙালা ভাষায় অক্ষয় জীবন লাভ করিয়াছে। তাঁহার গানের ভাব আলোচনা করিয়া মনে হয়, প্রণয়ে যে কখনো পাপস্পর্শ করিতে পারে, এ কথা গান রচনার সময় নিধু বাবুর মনে আদৌ স্থান পাইত না। কবির উচ্চভাবে তিনি প্রণয়কে দেখিতেন, এবং সেইভাবে বিভোর হইয়া তিনি গান রচনা করিতেন। একদিকে উচ্চঅঙ্গের প্রণয়ের উৎকৃষ্ট বৃত্তি যেমন তাঁহার গানে পরিস্ফুট দেখা যায়, অন্যদিকে ভোগলালসা ও কামপিপাসা প্রভৃতি নিকৃষ্ট বৃত্তিমূলক গানও তাঁহার রচিত গানের মধ্যে যথেষ্ট দেখিতে পাওয়া যায়। তবে সে সম্বন্ধে একটি কথা আছে। পরবর্তী অনেক গান রচয়িতার টপ্পা গানও এখন নিধু বাবুর রচিত প্রণয়সংগীতের পুস্তক মধ্যে স্থানলাভ করিয়াছে। রামপ্রসাদ, ভারতচন্দ্র প্রভৃতির ন্যায় নিধু বাবুর গানের শেষে কোনো ভণিতা না থাকায়, তাঁহার গান কোনগুলি—এখন তাহা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। এমনকি, নিধু বাবুর নামে প্রচলিত কয়েকটি উৎকৃষ্ট গান, শ্রীধর কথকের রচিত গান বলিয়াও প্রচলিত। আমাদের এই সংগ্রহে প্রসঙ্গক্রমে তাহাও দেখাইতে ত্রুটি করি নাই।
নিধু বাবুর তিন বিবাহ ছিল। তাঁহার প্রথম বিবাহ কুড়ি বৎসর বয়সের সময় শুকচর গ্রামে হইয়াছিল। এই স্ত্রীর গর্ভে ১১৭৫ সালে তাঁহার এক পুত্র জন্মে। কিন্তু তিন বৎসর বয়সেই সে পুত্রের মৃত্যু হয় এবং তাহার অল্প দিন পরেই তাঁহার প্রথম স্ত্রী পরলোক গমন করেন। নিধু বাবুর দ্বিতীয় বার বিবাহ ১১৭৮ সালে কলিকাতার জোড়াসাঁকোয় সংঘটিত হয়। বিবাহের তিন বৎসর পরেই তাঁহার দ্বিতীয় স্ত্রীরও মৃত্যু হয়। তখন নিধু বাবুর বয়ঃক্রম ৩৩ বৎসর মাত্র। কিন্তু তিনি আর বিবাহ করিতে সম্মত হইলেন না; কেবল সংগীতচর্চায় অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করিতে কৃতসংকল্প হইলেন। এইরূপ গৃহশূন্য অবস্থায় তাঁহার জীবনের আরো ২০ বৎসর অতিবাহিত হইয়া যায়। অবশেষে বিশেষ অনুরোধে পড়িয়া ৫৩ বৎসর বয়সে তিনি হাবড়ার অন্তর্গত বরিজহাটী গ্রামে তৃতীয় বার দারপরিগ্রহ করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে ক্রমে ক্রমে তাঁহার চারি পুত্র ও দুই কন্যা জন্মে। তিন পুত্র ও দুই কন্যা রাখিয়া ১২৩৫ সালের একুশে চৈত্র, ৮৭ বৎসর বয়সে নিধু বাবু লোকান্তর গমন করেন। তাঁহার পরলোক—গমনের পর আজ প্রায় শতাব্দী হইতে চলিল, কিন্তু তাঁহার নাম এ দেশের আবাল—বৃদ্ধ—বণিতার মুখে আজিও প্রতিধ্বনিত।
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত ‘বাঙ্গালীর গান’ (১৯০৫) গ্রন্থে সংকলিত।